সমাজ ধুঁকছে, বিপন্ন মানুষ: জয় কি তবে সুদূর পরাহত?
Best Electronics

সমাজ ধুঁকছে, বিপন্ন মানুষ: জয় কি তবে সুদূর পরাহত?

প্রকাশিত: ১২:৪৩ ১৯ এপ্রিল ২০১৯  

অজয় দাশগুপ্ত সিডনি প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও ছড়াকার। জনপ্রিয় কলাম লেখক অজয় দাশ গুপ্তের জন্ম চট্রগ্রামে। দীর্ঘকাল প্রবাসে বসবাসের পরও তিনি দেশের একজন নিয়মিত কলাম লেখক। সম-সাময়িক বিষয়ের পাশাপাশি তির্যক মন্তব্য আর প্রেরণা মুলক লেখায় তিনি স্বীয় আসন নিশ্চিত করেছেন।

কী হয়েছে সমাজের? কী হচ্ছে দেশে? নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রার ছবি দেখে মনে হবে কাবুল বা সিরিয়ার কোন শহরে মানুষ নেমেছিল পথে। এত সৈন্য সামন্ত এত বাহিনী তাও আবার অস্ত্র তাক করা। এতো বিভীষিকাময়।

ক’দিন থেকে দেখছি ইমাম মোল্লাদের ব্যাপারে নেগেটিভ খবরে ভর্তি মিডিয়া।  এরপর দেখলাম পুরোহিতও বাদ পড়েনি। বালক বলৎকারের দায়ে পুরোহিতকে ধরা হয়েছে। হঠাৎ করে মোল্লা পুরুতরা একযোগে এসব কাজে নেমে পড়লেন কেন? আর যদি তা না হয় তো এসব রেগুলার ব্যাপার। সে দৈনন্দিন কাজের খবর কি কেউ জানতো না। এ এক  অদ্ভুত সমাজ এখন। কে যে কাকে কি জন্য কি করছে বোঝা মুশকিল। মাদ্রাসার মেয়ে নুসরাত আমাদের বিবেক কাঁপিয়ে দিয়ে গেছে।  এই কম্পন কতদিন টিকবে সেটাই বলা দায়। এও কি কোন সময়ের ব্যাপার? ভুলে যাবার দিন কি সমাগত?

খেয়াল করবেন সামাজিক অস্থিরতা খুব বেড়েছে। সরকার আর্থিক উন্নতি অগ্রগতির কথা যত বলুক সমান্তরাল বেড়ে উঠেছে  আপদ। এসব সামাজিক বিপদ এখন সর্বগ্রাসী। মেয়ের বয়সী মেয়েকে ধর্ষণ করা অপমান করা এখন স্বাভাবিক বিষয়। এ সমাজ তাহলে কোন উন্নতির মুখ দেখছে? আমি বলছি না উন্নতি তাদের বলেছে এসব করতে। আসলে যেটা বুঝতে হবে সমাজ উন্নতি থমকে গেছে। আমি বলবো প্রায় পথ হারিয়ে ফেলেছে। ধর্ম ধর্ম করতে করতে এখন এমন হাল ধার্মিকের চাইতে শো আপ করার প্রবণতা আজ জাঁকিয়ে বসেছে। কোথাও কোনো নিয়ম আছে বলে মনে হয় না। থাকলে ধর্মের নামে অন্য সম্প্রদায়ের ওপর এমন অকথ্য বাক্য প্রয়োগ বন্ধ হতো। এই যে উস্কানী এটাই আমাদের সমাজকে ক্রমাগত অন্ধ করে তুলছে। দেখলাম রবীন্দ্রনাথ ও আক্রমনের শিকার। অগ্নি স্নানে শুচি হোক ধরার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলা হচ্ছে এ নাকি বিধর্মীদের পথে নিয়ে যাবার ষড়যন্ত্র। 

আবার দেখুন এক মডেলকে নিয়ে কত কথা। কেউ ইহকাল বিশ্বাস করে না পরকালে বিশ্বাস করে তা কিছুকাল আগেও মানুষ এভাবে ভাবতো না। এসব তো ব্যক্তিগত বিশ্বাস। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নোংরামী প্রমাণ করে আমাদের সমাজে পচন ধরেছে। তা হলেও চলতো। কিন্তু দেখুন কথায় কথায় জীবনের ভয়। মরণের ভয়। কাউকে মেরে ফেলা যেন হাতের ময়লা। এতো সস্তা জীবন আমরা দেখিনি কখনো। একজন মানুষের বিশ্বাস নিয়ে এত হুমকি কী প্রমাণ করে? সমাজ যদি অভয় দিতে না পারে সে সমাজে মানুষ উন্নতি দিয়ে কি করবে? জীবনের প্রতি লোভী কামনা বাসনার দাস আমরা আসলে কী চাই? একদিকে  মানুষকে হেদায়েতের নামে ভয় দেখানো  আরেক দিকে চলছে লোভ লালসার বাড়াবাড়ি।  তা এমন এক জায়গায় পৌঁছে গেছে যে কেউ আর নিরাপদ না দেশে। কি করছি আমরা? দেশে বিদেশে কিছু মানববন্ধন কিছু হৈ চৈ তারপর প্রলেপ দিয়ে পরিবেশ ঠান্ডা রাখা। এর ফাঁকেই বেড়ে ওঠে আর কোন নতুন দানব। যার আগ্রাসনে আমরা অতীতের ঘটনা ভুলে যাই। ব্যস্ত হয়ে পড়ি নতুন কিছু নিয়ে। 

এমন করে চলতে দিলে সমাজ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? মুক্তিযুদ্ধের দেশ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বলে গলা ফাটানো জাতি আসলে কোন জায়গায়? কিভাবে এমন জায়গায় পৌঁছে গেছি আমরা? মূলত এর পেছনে আছে রাজনীতি। এক ধরণের রাজনীতি কোনোভাবেই দেশকে উদার আর মুক্ত থাকতে দিতে চায় না। এরা এখন চুপসে গেলেও আসলে তলে তলে এরা কিন্তু এখনো শক্তিশালী। ভোট ঠিক মত হয় না বলে তারা যে ফাল পাড়ে কথা কিন্তু মিথ্যা না। ঠিকমতো ভোট হলে আসলে কী হতো বা কী হতে পারে সবাই কম বেশি জানে। তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুরদর্শিতা আর প্রজ্ঞার কাছে মার না খেলে জাতির খবর ছিলো। একা তিনি শক্তহাতে হাল ধরে আছেন বলে অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু ভয় অন্যত্র। তিনি কি সবসময় তা পারবেন? তার তো বয়স হয়েছে। অন্যদিকে ষড়যন্ত্রকারীরা বসে নাই। রাজনীতির কূটচালে আওয়ামী শিবিরেও এখন প্রচুর স্বাধীনতা বিরোধী আর দুশমনেরা ঢুকে আছে। শুধু তা নয় প্ররোচনা আর ইন্ধনে এদের ভেতর ও ধর্মের নামে সংস্কার প্রবল। যে কারণে আওয়ামী লীগ ও আর আগের জায়গায় নেই।

তাদের মনে এখন যতটা পাপ পূন্য তার চেয়ে বেশি ভোটের হিসাব। ভোট পাওয়া না পাওয়ার এই হিসেবে তারা এমন কোন কাজ করতে রাজী না যাতে তাদের ভোট কমে যায়। সে হিসেবে হেফাজত আজ কৌশলের পার্টনার। এই আঁতাত কতটা মারাত্মক হবে সেটা কম-বেশি জানার পর ও পরিবেশ বাধ্য করেছে তা করতে। তার ফায়দা কারা নেবে? সেই গোষ্ঠী যাদের হাতে সমাজ জিম্মি। মূলত জিম্মি নারী সমাজ। নারীরা এদেশে আর কোনকালে এতটা অবহেলিত ও নিগৃহীত ছিলো জানিনা। একদিকে নারীর শাসন নারীর উন্নয়ন যখন বাংলাদেশকে দ্রুত সামনে নিয়ে যাচ্ছে আরেকদিকে চলছে প্রগতিশীলতার বিরুদ্ধে চরম ষড়যন্ত্র। তারা নারীদের কি চোখে দেখে সেটা বলার দরকার দেখিনা। চারদিক থেকে তাদের ওপর যে চাপ সে চাপ সমাজকে ভঙ্গুর করে এনেছে প্রায়। পোশাকে খাবারে কথায় কাজে এক নকলনবীশ জাতি হয়ে উঠছি আমরা। যার সাথে বাংলা বাঙালির মিল নাই। এভাবে  আর যাই হোক প্রকৃতি ও চারিত্র ঠিক রাখা যায় না। 

কথা হচ্ছে এর শেষ কোথায়? মঙ্গল শোভাযাত্রা সীমিত হয়ে পড়ছে ক্রমশ। মুখোশ নাই মুখ-ই এখন মুখোশ। বাদ্যযন্ত্র নিষিদ্ধ। নেই নিরাপত্তা। তবু জোর করে আমরা তা বজায় রাখছি। এই বজায় রাখা কিভাবে কতদিন চলবে কে জানে? ভয় আমাদের ঘিরে ধরছে আবার। এটা কোনো সুস্থ সমাজ বা ভালো সমাজের পরিচয় বহন করে না। এর ভেতর যে ভয় আর বিপদ তাকে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হলে কোনো উন্নতিই টিকবে না। তাই দায় সরকারকেই নিতে হবে। আইন আছে বিচার নেই। বিচার  আছে শাস্তি নাই। এ ভাবে চলতে দেয়া যায় না। আমরা নিশ্চিত জানি বঙ্গবন্ধু কন্যা উদার মনের মানবী। তিনি দেশ ও জাতিকে ভালোবাসেন। এ নেতৃত্ব দেশ আগে পায়নি। সৌভাগ্য  আমাদের তিনি আছেন। তাই তাকে আরো কঠিন হবার পথ বেছে নিতে হবেই। কারণ এই মৌলবাদের ক্যানসার কাউকে ছেড়ে কথা বলবে না।
মন খারাপের সময় শেষ হোক। মুক্তিযুদ্ধের দেশ ও সমাজ যেন আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে ।সে কাজ কবে কারা শুরু করবে কেউ জানে না। তবে একাজ হতেই হবে। বাংলাদেশ আর যাই হোক হেরে যেতে পারে না। জয় তার স্বভাব। সে জিতবেই। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর
 

Best Electronics