দূরবীনপ্রথম প্রহর

সমাজে প্রচলিত শিরক (পর্ব-১)

প্রিয়ম হোসেনডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
ফাইল ছবি

শিরক হচ্ছে সকল পাপের বড় পাপ। যা আল্লাহ তায়ালা কখনোই ক্ষমা করবেন না।

যদি কোনো ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে শিরক করে মারা যায় তাকে চিরস্থায়ী জাহান্নামে থাকতে হবে। শিরকের ভয়াবহতা এত বেশি যে, শিরক মানুষের সব আমল নষ্ট করে দেয়, মানুষকে চিরস্থায়ী জাহান্নামের দিকে ঠেলে দেয়।

(১) আহ্বানের শিরক: আহ্বানের শিরক বলতে মানুষের ক্ষমতার বাইরে এমন কোনো পার্থিব লাভের আশায় অথবা কোনো পার্থিব ক্ষতি হতে রক্ষা পাবার উদ্দেশে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে আহ্বান করা বুঝায়। (সূরা জিন ৭২:১৮, রাদ-১৩:১৪, মারিযাম-১৯:৪৮)

(২) ফরিয়াদের শিরক: ফরিয়াদের শিরক বলতে নিতান্ত অসহায় অবস্থায় আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সাহায্যের জন্য ডাকাকে বুঝায়। রোগ নিরাময়ে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ডাকা। (সূরা আনফাল-৮:৯, আনকাবুত-২৯:৬৫)

(৩) আশ্রয়ের শিরক: কোনো অনিষ্টকর বস্তু বা ব্যক্তি হতে বাঁচার জন্য আল্লাহ ব্যতিত অন্য কারো কাছে আশ্রয় নেয়া বা সরনাপন্ন হওয়া। (সূরা ফুসসিলাত/ হা-মিম আসসাজদাহ-৪১:৩৬, সূরা মুমিনুন-২৩:৯৭-৯৮, সূরা ফালাক ১১৩:-১-৫, সূরা নাস ১১৪:১-৬) (৪) আশা বা বাসনার শিরক: মানুষের অসাধ্য কোনো বস্তু আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে কামনা করা। যেমন, কোনো পিরের কাছে সন্তান কামনা করা। (সূরা আশ-শুআরা-৪২:৪৯,৫১)

(৫) নামাজের শিরক: রুকু, সিজদাহ, সওয়াবের আশায় কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর সামনে বিনম্রভাবে দাঁড়ানো বা নামাজের শিরক বলতে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাতগুলো ব্যয় করাকে বুঝান হয়। (সূরা হাজ্জ-২২:৭৭, আনআম-৬:১৬২-১৬৩)

(৬) তাওয়াফের শিরক: কাবা ঘর ব্যতিত অন্য কোনো বস্তুর তাওয়াফ করা। (হাজ্জ-২২:২৯, বাকারাহ-২: ১২৫)

(৭) তাওবার শিরক: আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে তাওবা করা। (সূরা নুর-২৪:৩১, আল ইমরান-৩:১৩৫)

(৮) জবাইয়ের শিরক: আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নৈকট্য লাভের জন্য পশু জবাই করা। চাই তা আল্লাহর নামেই করা হোক বা অন্য কারো নামে বা নবী বা জিনের নামে। (সূরা আনআম- ৬:১২১, ১৬২-১৬৩)

(৯) মানতের শিরক: আল্লাহ ছাড়া অন্য কারোর জন্য মানত করা। (সূরা-হাজ্জ-২২:২৯, বাকারাহ-২:২৭০, আনআম-৬:১৩৬)

(১০) আনুগত্যের শিরক: বিনা ভাবনায় শরিয়তের গ্রহণযোগ্য কোনো প্রমাণ ছাড়াই হালাল হারাম জায়েজ নাজায়েজের ব্যপারে আলেম বুজুর্গ বা উপরস্থ কারো সিদ্ধান্ত অন্ধভাবে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নেয়া। (তাওবা-৯:৩১, আনআম-৬:১২১,আরাফ-৭:৩,)

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্ধভাবে চার মাঝহাবের চার জন মহামতি ইমামের অন্ধ অনুসরণ করাও শিরক। উপরন্তু এই চার জন মহান ব্যক্তি কখনোই নিজেকে অন্ধভাবে অনুসরন করতে বলেনি। যদি কোনো ব্যক্তি মনে করে বর্তমান যুগে ইসলামিক শাসনব্যবস্থা অচল এবং গণতন্ত্র, রাজতন্ত্র, পীরতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ ইত্যাদিই হলো আধুনিক পদ্ধতি তাহলে সে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাবে। খ্রিস্টানরা তাদের আলেমদের উপাসনা করত না তবে তারা হালাল হারামের ব্যপারে বিনা প্রমানে তাদের আলেমদের সিদ্ধান্ত মেনে নিত। আর এটিই হচ্ছে শিরক। (তিরমিজি-অধ্যায় ৪৭ হা: নং ৩০৯৫)

(১১) ভালোবাসার শিরক: দুনিয়ার কাউকে এমন ভাবে ভালোবাসা যাতে তার আদেশ নিষেধকে আল্লাহ তায়ালার আদেশ নিষেধের ওপর প্রাধান্য দেয়া অথবা সমপর্যায়ের মনে করা। প্রকৃতিগত ভালোবাসা (খাবার), স্নেহ জাতীয় ভালোবাসা (সন্তানের জন্য পিতার), আসক্তিগত ভালোবাসা (স্বামীর জন্য স্ত্রীর) ইত্যাদির কোনটাকেই আল্লাহ তায়ালার ভালোবাসার উপর স্থান দেয়া যাবে না। (বাকারাহ-২:১৬৫, তাওবা-৯:২৪)

(১২) ভয়ের শিরক: একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কাউকে প্রকাশ্যভাবে দুনিয়া বা আখিরাত সংক্রান্ত যেকোনো ক্ষতি সংঘটন করতে পারে বলে অন্ধ বিশ্বাস করে তাকে ভয় পাওয়াকে বুঝানো হয়। মানুষ, মূর্তি, জিন ইত্যাদির অনিষ্টতা থেকে ভয় পাওয়া শিরক। প্রভাবশালি শাসকের ভয়ে ভালো কাজ বা জিহাদ হতে দূরে থাকা ছোট শিরক। তবে শত্রুর ভয়, বাঘের ভয় ইত্যাদি স্বাভাবিক ভয় শিরকের অন্তরভুক্ত নয়। (সূরা আনাআম- ৬:৮০-৮১, হুদ-১১:৫৪-৫৫, তাওবাহ-৯:১৩)

(১৩) ভরসার শিরক: মানুষের অসাধ্য ব্যপারসমূহের ক্ষেত্রে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো প্রতি ভরসা করা। কারো সমস্যা দূরীকরণ, চাকরি লাভ, রোগমুক্তি ইত্যাদি ব্যপারে আল্লাহর উপরেই ভরসা রাখতে হবে। দান, সাদাকার ব্যপারে নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তির উপর ভরসা ছোট শিরক। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিক তাঁর কর্মচারীদের উপর মালামাল উৎপাদন বা কোনো সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ভরসা করতে পারে। তবে সম্পূর্ণরূপে ভরসা করা শরিয়াতে জায়েজ নয়। (মায়িদাহ-৫:২৩, ইউনুস-১০:৮৪)

(১৪) সুপারিশের শিরক: আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে পরকালের মুক্তির জন্য সুপারিশ কামনা করা শিরকের অন্তর্ভুক্ত। (জুমার-৩৯:৪৪, আনাআম-৬: ৫১, বাকারাহ-২:২৫৫)

(১৫) হিদায়াতের শিরক: আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ কাউকে হিদায়াত করতে পারে এমন বিশ্বাস করা অথবা কারো নিকট হিদায়াত কামনা করা। (বাকারাহ-২:২৭২, ইউসুফ-১০:১০৩)

(১৬) সাহায্য প্রার্থনার শিরক: মানুষের সাধ্যের বাইরে কোনো কাজ একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নিকট কামনা করা। (ফাতিহা-১:৫)

(১৭) কবরের শিরক: কবরে শায়িত কারো জন্য ইবাদাত ব্যয় করা। অর্থাৎ সেখানে সালাত আদায় করা, সিজদাহ করা শিরক (মুসলিম-৯৮৯)

তার নিকট কিছু চাওয়া। তার (ওসীলায়) মাধ্যমে আল্লাহর নিকটে কিছু চাওয়া। সেখানে মসজিদ নির্মাণসহ আরো অসংখ্য শিরক বিদ্যমান। (নুহ-৭১:২৩, ) (বুখারি- ৪২৭,২৮)

(১৮) আল্লাহর অবস্থান সম্পর্কিত শিরক: আল্লাহ মুমিনের অন্তরে বিরাজমান মনে করা। আল্লাহ সবার অন্তরে বিররাজমান মনে করা। আল্লাহ সকল বস্তুর মাঝে লুকায়িত মনে করা। আল্লাহ সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো, তিনি আরশের উপর অবস্থান করছেন। তাঁর আকার আছে কিন্তু তিনি তাঁর মত। তার সদৃশ (মত) কেউ নেই। (মূলক- ৬৭:১৬-১৭, , ইমরান- ৩:৫৫, আরাফ- ৭:৫৪)

(১৯) দেখা ও শোনার শিরক: আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো মানুষ হোক নাবি বা রাসূল সব শুনতে বা দেখতে পান এমন মনে করা শিরক। (সূরা ইউনুস- ১০:৬১, তাহা-২০:৪৬)

(২০) কিয়ামতের শিরক: কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা ছাড়া অন্য কোনো নবী, রাসূল, পীর, ওলি, ইত্যাদি মানুষরা অন্যান্য মানুষদের আজাব হতে বাচাতে পারবে এটা মনে করা শিরক। এছাড়া অন্য কেউ মানুষকে আল্লাহর আজাব হতে কাউকে ক্ষমা করাতে পারবে এমনটা মনে করাও শিরক। (সূরা তাহরিম- ৬৬:১০, শুআরা- ২৬:২১৪, তাওবাহ- ৯:৮০)

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে

daily-bd-hrch_cat_news-20-10