Alexa সক্রেটিস থেকে গ্যালিলিও, ইতিহাসের যত আলোচিত বিচার

সক্রেটিস থেকে গ্যালিলিও, ইতিহাসের যত আলোচিত বিচার

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১১:২২ ২১ জুলাই ২০১৯  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

আদালত না থাকলে অপরাধীর বিচার হবে কোথায়? স্থিতিশীল সমাজের আবেদনেই আদালতের জন্ম। ঠিক-ভুলের সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার তুলে দিয়েছে অন্য কারো হাতে। কিন্তু বিচারকেরা তো ঈশ্বর বা ফেরেশতা নন। অনেক শুদ্ধির পরেও তাই তাদের ভুল হয়। অথবা বিচারকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় নানান নাটকীয়তা। কখনো ইচ্ছায় কখনো বা অনিচ্ছায়। ঠিক-ভুলের অজস্র বিচারের ইতিহাসে কিছু গল্প আলোচিত হয়ে আসছে নিজস্বতা নিয়ে। এমন কয়েকটি গল্প নিয়েই আজকের আয়োজন।   

সক্রেটিসের অপরাধ
৩৯৯ খ্রিষ্টপূর্ব। এথেন্সের আদালতে হাজির হলেন এক বয়স্ক আসামী। অপরাধ এথেন্সের যুবসমাজকে পথভ্রষ্ট করা এবং প্রচলিত ধর্মের অবমাননা। অথচ সক্রেটিস নিজেকে মনে করতেন ধাত্রীর মতো। মানুষের চিন্তার প্রসবের সহযোগিতা করা যার কাজ। মাঝে মাঝে নিজেকে তুলনা করেছেন মাছির সাথে। যে পশুরূপী রাষ্ট্রের চারপাশে ভনভন করে। গ্রীক দর্শনের জন্মদাতা। আদালতে দাঁড়িয়ে অসঙ্কোচে ধরিয়ে দিয়েছেন নিজের অবস্থান। এথেন্সের মানুষ, আমি তোমাদের শ্রদ্ধা করি ও ভালোবাসি। কিন্তু তারচেয়ে বেশি দায়বদ্ধ ঈশ্বরের প্রতি। যতক্ষণ জীবন ও সামর্থ্য আছে, দর্শন চর্চা এবং শিক্ষাদান থেকে কেউ আমাকে থামাতে পারবে না। 

সক্রেটিসের বিষপান মুহূর্তকখনো বদলাবোনা আমার এই পথ। যদি বহুবার মৃত্যুবরণ করতে হয়, তবুও না। বিচারে সক্রেটিসকে বন্দী রাখা হলো। সিদ্ধান্ত এলো হেমলক (এক ধরনের বিষ জাতীয় উদ্ভিদ) পানে মৃত্যুদণ্ডের। সকল ঘটনা বর্ণনা করেছেন শিষ্য দার্শনিক প্লেটো ও জেনোফোন। কারাগার থেকে সক্রেটিসের পালানোর সুযোগ করে দিতে চাইলে তিনি তা গ্রহণ করেননি। নির্ধারিত দিনে স্বেচ্ছায় মুখে তুলে নিলেন হেমলক। এই বিচার দার্শনিক মহলকে ব্যাপকভাবে নাড়া দেয়। উত্থাপন করে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন। গণতন্ত্রের প্রকৃতি কেমন? মত প্রকাশে স্বাধীনতার মূল্য কতটুকু? নৈতিক ও ধর্মীয় অনুশাসনের বিরোধ কোথায়? রাষ্ট্রের মূলনীতি কেমন হওয়া উচিত?

গ্যালিলিও বনাম চার্চ
সক্রেটিসের দুই হাজার বছর পর। ১৬৩৩ সাল। রোমে তলব করা হলো গ্যালিলিওকে। অপরাধ চার্চের আদেশ অমান্য, বিনা অনুমতিতে বই প্রকাশ, ধর্মবিরোধী মত এবং বাইবেল সম্পর্কে সংশয় প্রচার। তারও আগে ১৬১৬ সালের দিকে তাকে বলা হয়েছিল কোপার্নিকাসের মত নিয়ে ঘাটাঘাটি না করতে। ইতোমধ্যে গ্যালিলিও আবিষ্কার করেন টেলিস্কোপের মতো যন্ত্র। সাথে আছে পড়ন্ত বস্তু এবং সরল দোলকের সূত্রের মতো কিছু মতবাদ। প্রত্যক্ষ করেন পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে নিয়ত ঘূর্ণায়মান। এরিস্টটল ও টলেমীয় নীতি মোতাবেক, পৃথিবীই সৌরজগতের কেন্দ্র। স্বয়ং বাইবেলের বর্ণনাও তা বলে। ]

গ্যালিলিও বনাম চার্চসুতরাং ১৬৩২ সালে গ্যালিলিও তার মত প্রকাশের সাথে সাথে ডাকা হয় আদালতে। বিচারক পোপ অষ্টম আরবানের নিযুক্ত ফাদার ভিনসেনজো ম্যাকোলিনি। জীবনের প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে গ্যালিলিও বিবাদে জড়াতে চাননি। গ্যালিলিও কৌশল করলেন। তিনি যা লিখেছেন, তা নিজে বিশ্বাস করেন না। বিচারক শুনে শাস্তির মাত্রা কমালেন। বই বাজেয়াপ্ত, অনির্দিষ্টকালের জন্য কারাবাস এবং প্রতি সপ্তাহে সাতটি করে তিন বছর বাইবেলের শ্লোক পাঠ। রায় শুনে গ্যালিলিও শুধু আস্তে পা ঠুকে বলেছিলেন, ‘তবুও পৃথিবী ঘুরবে’। ১৯৯২ সালে ক্যাথোলিক চার্চ নিজের ভুল মেনে নেয়। ২০০০ সালে পোপ দ্বিতীয় জন পল গ্যালিলিওর বিচার ও অন্যান্য ভুলের জন্য স্বীকারোক্তি দেন।

সালেমের ডাইনি
ম্যাসাচুসেটস্-এর একটা গ্রামের নাম সালেম। সময়টা ১৬৯২ সালের বসন্তের দিকে। ৯ বছর বয়সী এলিজাবেথ এবং ১১ বছর বয়সী আবিগেইল আক্রান্ত হলো হিস্টেরিয়ায়। স্থানীয় ডাক্তার কিছুক্ষণ দেখেশুনে সিদ্ধান্ত দিলেন জাদুর কারসাজি। জাদু করেছে কোনো ডাইনি। ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো হিস্টেরিয়া। প্রতিষ্ঠিত হলো ডাইনিদের জন্য বিশেষ বিচারের ব্যবস্থা। টিটুবা, সারাহ অসবোর্ন ও সারাহ গুডকে সাব্যস্ত করা হলো ডাইনি হিসেবে। বিচারের জন্য আনা হলে বাকি দু’জন অস্বীকার করে। প্রচণ্ড চাপে ও ভয়ে নিজেকে ডাইনি বলে স্বীকার করে নেয় টিটুবা। খুব সম্ভবত কিছু তথ্য দিয়ে নিজেকে রক্ষা করার জন্য। ফলে গোটা ম্যাসাচুসেটস্ জুড়ে প্রচারণা ছড়িয়ে পড়ল। 

সালেমের ডাইনিরাচিরুনি তল্লাশি চালিয়ে যোগাড় করা হলো সন্দেহভাজন ডাইনিদের। ১৯ জনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর। কারাগারে অসংখ্য। আবহাওয়া পরিবর্তন ঘটতে শুরু করলো দ্রুত। হ্রাস পেতে থাকলো হিস্টেরিয়া প্রকোপ। বিচার নিয়ে সন্দেহ উঠতে দেরি হলো না। প্রথমে থামলো, তারপর নিন্দা জানালো মানুষ। অন্যান্য অপরাধের ন্যায় ডাইনিদের অপরাধের শাস্তি দেবার আগে প্রমাণের শর্ত যুক্ত করার প্রসঙ্গ আসলো। দশজন ডাইনির মুক্তি পাওয়া একজন নিষ্পাপকে শাস্তি দেয়ার চেয়ে উত্তম। গভর্নর বিশেষ আদালতের বিলুপ্তি ঘোষণা করলেন অক্টোবরের দিকে। মুক্তি পেলো যারা কয়েদি অবস্থায় ছিলো। ম্যাসাচুসেটস্-এর সাধারণ আদালত পরবর্তীতে দণ্ডপ্রাপ্তদের ক্ষতিপূরণ মঞ্জুর করেন।

লিজি বোর্ডেন আখ্যান
তার খালাস পাবার একশো বছর পরেও ঘটনাটা মানুষকে প্রভাবিত করেছে। জন্ম দিয়েছে ভৌতিক, রোমাঞ্চকর এবং রহস্যময় নানা গল্পের। ঘটনাটা আরো বেশি পরিচিতি পায় নার্সারিতে পাঠ্য একটা ছড়ার জন্যও। 

‘লিজি বোর্ডেন কুঠার নিলো তুলে, 
আর তা দিয়ে চল্লিশ কোপে মাকে দিলো ফেলে; 
দেখলো যখন কী করেছে সব, 
বাপ ফিরলে বসিয়ে দিলো একচল্লিশ কোপ।’ (অনূদিত) 

লিজি বোর্ডেন সম্পর্কে অভিযোগ, সে তার বাপ-মাকে কুড়াল দিয়ে হত্যা করেছে। আগস্টের ৪ তারিখ, ১৮৯২ সাল। লিজির বাবা এন্ড্রু ব্যবসায়িক কোনো কাজে বাইরে বেড়িয়েছিলেন। বাসায় ছিলেন লিজি, তার সৎ মা অ্যাবি এবং এক আইরিশ দাসী ব্রিজেট সালিভান। বাসায় ফেরার পর এন্ড্রু একটু শুয়েছিলেন। সময় সকাল ১১টা ১৫মিনিট। লিজির ভাষ্যমতে, সে তার বাবাকে মৃত দেখতে পায়। কুড়াল দিয়ে বারবার আঘাত করা হয়েছে মাথায়। উপরের তলায় পাওয়া গেলো অ্যাবির মৃতদেহ। তাকে হত্যা করা হয়েছে আরো নির্মমভাবে। পরবর্তীতে পরীক্ষায় জানা যায় অ্যাবির মৃত্যু হয়েছে স্বামী এন্ড্রুর আগে। 

জানা যায়, আগের দিন ৩ আগস্ট লিজি প্রাসিক এসিড বা হাইড্রোজেন সায়ানাইড (একপ্রকার বিষ) কেনার চেষ্টা করে। কিছু দিন পরে অভিযোগ করা হয় সে চুলায় একটা পোশাক পুড়েছিল। তারপরেও ১৮৯৩ সালে বিচারকেরা তাকে খালাস দেয়। কারণ তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ শুধুই অনুমিত, প্রমাণিত নয়। ঘটনার সাথে সরাসরি লিজি জড়িত এমন কোনো তথ্য নেই। সে যা-ই হোক, পরবর্তী সংস্কৃতিতে এই রহস্যময় ঘটনাকে নানাভাবে উপস্থাপন করে রচিত হয়েছে নানা আখ্যান।

স্কোপস এবং বানর মামলা
যুগের দুই বিখ্যাত আইনজীবী মুখোমুখি হলেন একে অপরের। রাষ্ট্র ও বাদীপক্ষে উইলিয়াম জেনিংস ব্রায়ান এবং বিবাদীপক্ষে ক্ল্যারেন্স ডারো। মামলাটা ডারউনের বিবর্তনবাদ শিক্ষা দেয়াকে কেন্দ্র করে। ১৯২৫ সালের মার্চে টেনিসীর প্রশাসক বাইবেলের সৃষ্টিতত্ত্ব অস্বীকার করাকে অপরাধ ঘোষণা করেন। ডারউইনের মতবাদ বাইবেলের সাথে সাংঘর্ষিক। সুতরাং তা শিক্ষা দেয়া আইন অস্বীকারের নামান্তর। জন টি স্কোপস্ নামক স্কুলশিক্ষককে দোষী সাব্যস্ত করা হলো। 

বাদীপক্ষে উইলিয়াম জেনিংস ব্রায়ান এবং বিবাদীপক্ষে ক্ল্যারেন্স ডারোরাষ্ট্রীয় ব্যায়ে চালিত স্কুলে ভুল শিক্ষা দেবার দায়ে জরিমানা করা হলো ১০০ ডলার। মামলাটি ‘মৌলবাদী আক্ষরিক বিশ্বাস বনাম ধর্মগ্রন্থের উদার ব্যাখ্যা’ হিসাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে মানুষের। ব্রায়ান মামলায় জিতলেও জনগনের সামনে অপমানিত হন তার মৌলবাদী ধ্যানধারণার জন্য। ঠিক পাঁচ দিন পরে মৃত্যুবরণ করেন ব্রায়ান। ১৯২৭ সালে আবার সামনে আসে মামলাটি। সাংবিধানিক বিষয়গুলো মীমাংসিত হয় ১৯৬৭ সালে। বিতর্কিত আইনকে রদ করার মধ্য দিয়ে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস

Best Electronics
Best Electronics