শ্বাসরুদ্ধকর ৮ ঘণ্টা: যেভাবে আম্ফানের রাতে অপহৃত শিশু উদ্ধার

শ্বাসরুদ্ধকর ৮ ঘণ্টা: যেভাবে আম্ফানের রাতে অপহৃত শিশু উদ্ধার

নিজস্ব প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ০৯:২৯ ২২ মে ২০২০   আপডেট: ১০:০৭ ২২ মে ২০২০

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

রাজধানীর মগবাজার থেকে সিফাত (৪) নামে এক শিশুকে অপহরণের আট ঘণ্টা পর শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করেছে পুলিশ।  

বুধবার দুপুরে অপহরণ হওয়া শিশুকে ওইদিনই আম্ফানের তাণ্ডবময় রাতে পাটুরিয়া ফেরী ঘাট থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। শিশু সিফাত জানান বাবার সহকারী ‘মিলন মামা’ দোকান থেকে চকোলেট কেনার কথা বলে তাকে নিয়ে যান। তবে অপহরণকারী মিলনকে এখনও খুঁজে পায়নি পুলিশ। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

জানা যায়, সিফাতের বাবা ফিরোজ হাওলাদার পেশায় রঙ মিস্ত্রি। দুই ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে হাতিরঝিল থানাধীন মগবাজার ভাড়া বাসায় থাকে। বড় ছেলের বয়স ১১ বছর। ছোট ছেলে সিফাতের বয়স ৪ বছর।

করোনার সময়ে সরকারের সাধারণ ছুটি চলাকালীন তিনি বাসায়ই থাকছেন। কোন কাজ না থাকায় পুলিশ, আত্মীয় স্বজন প্রতিবেশিদের সহযোগিতায় টুকটাক করে সংসার চালাচ্ছিলেন। বুধবার সকালে বাবা ফিরোজ হাওলাদার ঘুমিয়ে ছিলেন আর তার স্ত্রী রান্না ঘরে কাজে ব্যস্ত ছিলেন। সিফাত বাসার সামনেই খেলা করছিল।

বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে সিফাত ঘরে ও আশেপাশে নেই দেখে চিৎকার শুরু করে তার মা। পুরো এলাকা ও আশপাশ খুঁজেও পাওয়া যাচ্ছিল না সিফাতকে। এরপর দুপুর দেড়টার দিকে সিফাতের বাবার মুঠোফোনে অজ্ঞাত ফোন থেকে জানানো হয় সিফাতকে অপহরণ করা হয়েছে। শিশু সিফাতকে মুক্ত করতে হলে লাগবে ৫০ হাজার টাকা। আর পুলিশকে যদি বিষয়টি জানানো হয় তবে শিশু ছেলের লাশ পাওয়া যাবে বলেও হুমকি দেয়া হয়।

কিন্তু ফিরোজ হাওলাদারের সংসারে তো চাল চুলোই নেই, কোথায় পাবে সে এতো টাকা। দ্রুত হাতিরঝিল থানার ওসি আব্দুর রশীদকে বিষয়টি খুলে বলেন তিনি। থানায় কথা শেষে ফিরোজ হাওলাদারের স্ত্রী যখন জানতে পারেন পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশে যোগাযোগ করা হয়েছে, তখন তিনি মুঠোফোন বন্ধ করে দেন।

হাতিরঝিল থানার ওসি আব্দুর রশীদ বলেন, বিষয়টি জানার পর আমরা ফিরোজ হাওলাদারের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি। কিন্তু তার মুঠোফোন আমরা বন্ধ পাই। পরে পুরো ঘটনা তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) বিপ্লব বিজয় তালুকদারকে জানাই, তিনি সিফাতদের বাসা খুঁজে তার মা-বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করে অপহৃত সিফাত উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত বাসায় না ফেরার নির্দেশ দেন সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের।

বিকাল প্রায় সাড়ে তিনটায় ফিরোজ হাওলাদারের বাসা খুঁজে পায় হাতিরঝিল থানা পুলিশ। সিফাতের বাবা মাকে সিফাতকে উদ্ধারের নিশ্চিয়তা দিয়ে সিফাতের দুই বছর বয়সী একটা ছবি নিয়ে অপারেশনে নামে পুলিশ।

তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (এডিসি) হাফিজ আল ফারুক জানান, পুলিশের পরামর্শে অপহরণকারীদের সঙ্গে মোবাইলে মুক্তিপণের বিষয়ে নেগোসিয়েশন চালিয়ে যেতে থাকে ফিরোজ হাওলাদার। হাতিরঝিল থানার এসআই শরিফুল ইসলামের নেতৃত্বে হাতিরঝিল থানার একটি দল শিশু সিফাতকে রাত ১১টা ৪০ ঘটিকায় মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ঘাট এলাকা থেকে উদ্ধার করে। মুঠোফোনে কথোপকথন আর তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় অপহরণকারীদের তাড়া করে ডেমরা, মিরপুর, সাভার হয়ে রাত পৌনে ১১ টার দিকে পাটুরিয়া ঘাটে পৌঁছায় পুলিশ। 

পুলিশের গাড়িতে বসিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুণতে থাকেন সিফাতের বাবা। তিনি বলেন, প্রচণ্ড বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ার পাশাপাশি ঈদ উপলক্ষ্যে সরকারি নির্দেশ উপেক্ষা করে গ্রামে ফিরতে উদগ্রীব মানুষে ভরা পাটুরিয়া ঘাট। নৌযান চলাচল বন্ধ। সব কিছু উপেক্ষো করে দলটি দুভাগে ভাগ হয়ে খুঁজতে থাকে সিফাতকে। রাত ১১টা ৪০ মিনিটে পুলিশ একটি টং ঘরের দেয়াল ঘেষে ঘুমন্ত অবস্থায় উদ্ধার করে সিফাতকে। গাড়ি থেকে ডেকে আনা হয় তার বাবাকে। বাবাকে দেখে কোলে ঝাপিয়ে পড়ে কাঁদতে থাকে সিফাত।

সে সময় সিফাত জানায়, সে যখন বাসার বাইরে খেলছিল, তখন ‘মিলন মামা’ দোকান থেকে চকোলেট কিনে দেয়ার কথা বলে তাকে নিয়ে যায়।

এডিসি হাফিজ আল ফারুক বলেন, মিলন কয়েক মাস যাবত সিফাতের বাবার সহকারি হিসেবে কাজ করছিল। বাসায় প্রায়ই আসতো। মিলনকে মামা ডাকতো সিফাত। অপহরণকারী মিলন পলাতক থাকলেও তাকে দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্রেফতার করা হবে বলেও জানান তিনি।

ডেইলি বাংলাদেশ/ইএ/টিআরএইচ