Alexa শুভ দিনের শুভ খবর: প্রধানমন্ত্রীর ‘ভ্যাকসিন হিরো’ অর্জন 

শুভ দিনের শুভ খবর: প্রধানমন্ত্রীর ‘ভ্যাকসিন হিরো’ অর্জন 

প্রকাশিত: ১৬:২৪ ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৭:৩৩ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

নব্বইয়ের দশকের অন্যতম কবি বীরেন মুখার্জী। পেশা: সাংবাদিকতা। পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস রাজনৈতিক কলাম লিখে চলেছেন একাধারে।  তার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘লোকঐতিহ্য’। সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঘোর’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মর্যাদাপূর্ণ ‘ভ্যাকসিন হিরো’ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। 

টিকা দান কর্মসূচিতে বাংলাদেশের অসামান্য সাফল্যের স্বীকৃতি স্বরূপ সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক বিশ্বব্যাপী টিকা দান সংস্থা গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনেশন এবং ইমিউনাইজেশন (জিএভিআই) এই পুরস্কার প্রদান করে। জিএভিআই বোর্ড সভাপতি ড. এনগোজি অকোনজো ইবিলা’ স্থানীয় সময় সোমবার সন্দ্যায় প্রধানমন্ত্রীর হাতে এই সম্মাননা তুলে দেন। এটা আমাদের জন্য আনন্দের খবর। আরো বেশি আনন্দের ব্যাপার হচ্ছে আজ প্রধানমন্ত্রীর ৭৩তম জন্মদিন। শুভ এই দিনে এমন একটি বিষয় নিয়ে লেখার আনন্দও অসামান্য।

সম্মাননা গ্রহণ করেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তা বাংলাদেশের জনগণের জন্য উৎসর্গ করেন।  প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজ যে পুরস্কার গ্রহণ করলাম সে পুরস্কার আমার নয়। এটা বাংলাদেশের জনগণের এবং আমি তাদেরকেই এই পুরস্কার উৎসর্গ করলাম।’ এটা অত্যন্ত যৌক্তিক কথা যে, বাংলাদেশের জনগণের সার্বিক সহযোগিতার কারণেই দেশ আজ সংক্রামক রোগের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছে।  

এবার একটু পেছন থেকে আসা যায়, ১৯৭৯ সালে যখন টিকাদান কর্মসূচির যাত্রা শুরু হয়েছিল বাংলাদেশে, তখন মানুষকে টিকাদানে উৎসাহিত করার বিষয়টি এত সহজ ছিল না। ১৯৮৫ সালের সরকারি জরিপে দেখা যায়, ১ বছরের কম বয়সী শিশুদের পূর্ণ টিকা প্রাপ্তির হার ছিল মাত্র ২ শতাংশ। সময়ের পরিক্রমায় সরকারি ও আন্তর্জাতিক নানা সংস্থার নানা উদ্যোগে এখন টিকাদানের হার ৮২ শতাংশের বেশি। যক্ষা, হাম, ধনুষ্টংকার, ডিপথেরিয়া, পোলিও ও হুপিং কাশির মতো রোগের কারণে বহুকাল ধরেই বহু শিশুকে প্রাণ হারাতে হয়েছে কিংবা প্রতিবন্ধী হয়ে কষ্টের জীবন মেনে নিতে হয়েছে। জন্মের পর কিংবা শিশু বয়সে অজানা রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু কিংবা পঙ্গুত্ববরণ এক সময় আমাদের দেশের শিশুদের জন্য ছিল নিয়মিত ঘটনা। কিন্তু টিকাদান কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের ফলে অনেক সংক্রামক রোগই বরং এখন বিলুপ্তির পথে। 

টিকাদান কর্মসূচির প্রথম দিকে মানুষ টিকা নিতে ভয় পেত। ফলে টিকা কেন্দ্রে যাওয়া দূরের কথা, স্বাস্থ্যকর্মীরা মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়েও অনেক সময় টিকা দিতে ব্যর্থ হতো। আর এখন গ্রামের মানুষ এতটাই সচেতন যে, গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সব মানুষ জানে বাচ্চাকে কখন কোথায় টিকা দিতে হবে। ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত মানুষ নিজ উদ্যোগেই বাচ্চাকে টিকা দিতে নিয়ে আসে। মায়েরা নিজেরাই মনে রাখে কোন তারিখে কোন টিকার জন্য যেতে হবে। দেশজুড়ে সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিনামূল্যে যেমন টিকা দেয়া হয় তেমনি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতেও টিকা দেয়ার সুযোগ নেন বহু মানুষ। যেসব রোগ ঠেকাতে টিকাগুলো দেয়া হতো তার কয়েকটি এখন বিলুপ্ত হয়েছে বললেই চলে। যেমন পোলিও। বাংলাদেশ সরকার দেশকে পোলিওমুক্ত ঘোষণা করেছে কয়েক বছর আগেই। 

জানা যায়, ২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ভ্যাকসিনের দশক ধরা হয়েছে। প্রতিবছর ২০ হাজার শিশু নিউমোনিয়ায় মারা যায়। এজন্য নিউমোনিয়ার ভ্যাকসিনও অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা হচ্ছে। রুবেলা থেকে মুক্তির জন্য প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৮৬ জনকে এমআর ভ্যাকসিনও দেয়া হচ্ছে। তবে এখনও টিকাদানে শতভাগ সফলা আসেনি। তথ্য অনুযায়ী, বিস্ময়করভাবে বাংলাদেশে গ্রামের চেয়ে শহরে এমনকি রাজধানী ঢাকাও টিকাদানে পিছিয়ে আছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘বিশ্বের সব জায়গায় টিকাদানের ক্ষেত্রে ভালো অবস্থান থাকে শহর এলাকার। কিন্তু বাংলাদেশ এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। এখানে গ্রামের অবস্থা বেশি ভালো। সাফল্যকে শতভাগে নিয়ে আসতে হলে শহরের পাশাপাশি চা বাগান, হাওড় এলাকা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে জোর দিতে হবে। এমনকি ঢাকা নিজেই একটা বড় চ্যালেঞ্জ। সিটি কর্পোরেশনের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে কিন্তু তাদের কোনো স্বাস্থ্য কাঠামো নেই।’ এ বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা দরকার সংশ্লিষ্টদের। তবে সার্বিকভাবে টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশ অনন্য নজির স্থাপন করেছে- এটাই সত্য। 

তথ্য অনুযায়ী, ডিপথেরিয়া, হুপিংকাঁশি, ধনুষ্টংকার, যক্ষা, পোলিও এবং হাম- শিশুদের এই ৬টি রোগের প্রতিষেধক টিকাদান কর্মসূচি। এসব রোগ টিকাদানে প্রতিরোধ্যযোগ্য। এই রোগগুলি নির্মূল করার উদ্দেশ্যে বিশ্ব ব্যাংক ‘শিশু টিকাদান কর্মসূচি’ গ্রহণ করে। আর টিকাদান কর্মসূচির জন্য সার্বজনীন শিশু টিকাদানে আজ বাংলাদেশ অনন্য সাফল্য অর্জন করেছে। প্রধানত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির কল্যাণেই দেশের লাখ লাখ শিশুর মৃত্যু এড়ানো সম্ভব হয়েছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য মতে, বর্তমান সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির খরচ জিডিপি-র প্রায় ০.০৬%। বাংলাদেশের বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা খাতে বর্তমান বরাদ্দ জনপ্রতি প্রায় ৩.৫ ডলার, যা সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় টিকাদানের খরচ (শিশু প্রতি ১১.৭৬ ডলার) থেকে অনেক কম। কিন্তু সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির কারণে মৃত্যু হ্রাসের ফলে খরচের সাশ্রয় হয়েছে মাথাপিছু প্রায় ১৩৬ ডলার। শিশুদের টিকাদান পরিস্থিতির উন্নয়নে অসামান্য অবদানের জন্য বাংলাদেশকে ২০০৯ ও ২০১২ সালেও জিএভিআই অ্যালায়েন্সের এওয়ার্ডে ভূষিত হয়েছে।

উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, টিকাদান কর্মসূচির সফললতার কারণে বাংলাদেশ বর্তমানে পোলিও, কলেরাসহ বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি মুক্ত হয়েছে। এছাড়া এসব রোগ নির্মূলে ‘জিএভিআই’র সহযোগিতা এখনো অব্যাহত রয়েছে; সুতরাং, এই সহযোগিতা কাজে লাগিয়ে ২০২১ এবং ২০৪১ অনুযায়ী সকলের জন্য মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা ও পরিপূর্ণ পুষ্টি নিশ্চিত করার যে রূপকল্প সরকারের রয়েছে তা বাস্তবায়নের দিকেই এখন মনোযোগী হওয়া আবশ্যক। এছাড়া মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১১ লাখেরও বেশি আশ্রিত রোহিঙ্গা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য এটি ভয়ঙ্কর চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়টিও গুরুত্বসহকারের বিবেচনায় নিতে হবে। যদিও ইতিমধ্যে সরকার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সফলভাবে কলেরার টিকাদান কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে, ডিপথেরিয়া ও হাম ছড়িয়ে পড়া মোকাবেলা করেছে।

পাশাপাশি কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের জন্য জিএভিআই’র সমর্থিত জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এটাও সরকারের একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ। 
উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার শাসনামলে দেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধনের জন্য আন্তর্জাতিক অনেক সম্মাননা এবং পুরস্কার অর্জন করেছেন। বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি শিশুর সুরক্ষায় জিএভিআইকে সহযোগিতা এবং এর অংশীদার হিসেবে যারা ভ্যাকসিন এলায়েন্স মিশনে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন সেই বৈশ্বিক ব্যক্তিত্বদের তালিকায়ও এবার স্থান পেলেন তিনি। বাঙালি জাতি হিসেবে এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দ এবং গর্বের। ‘ভ্যাকসিন হিরো’ সম্মাননা অর্জন করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আন্তরিক অভিবাদন জানাই। পোলিও নির্মূল এবং ডিপথেরিয়া, হেপাটাইসিস বি ও রুবেলার মত মরণব্যাধি নিয়ন্ত্রণে ভ‚মিকা রাখার ক্ষেত্রে অর্জিত এই পুরস্কার আগামী দিনেও জনগণের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করার কর্মসূচিকে আরও এগিয়ে নেবে বলেই প্রত্যাশা করি।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর