Alexa শুভ জন্মদিন বাংলাদেশের কন্যা শাওন মাহমুদ

শুভ জন্মদিন বাংলাদেশের কন্যা শাওন মাহমুদ

  অমিত গোস্বামী ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:০৫ ৬ আগস্ট ২০১৯   আপডেট: ১৬:০৬ ৬ আগস্ট ২০১৯

শাওন মাহমুদ

শাওন মাহমুদ

আজ শাওন মাহমুদের জন্মদিন। কে শাওন? শহীদ আলতাফ মাহমুদের একমাত্র কন্যা। তিনি কি অভিনেত্রী? কবি? গায়িকা? সুরকার? সবক’টি হওয়ার প্রতিভা থাকলেও কোনোটাই নন। তাহলে? তিনি নিজেকে বাংলাদেশের কন্যা চাষি শাওন হিসেবে-ই পরিচয় দিতে স্বাচ্ছ্বন্দ্যবোধ করেন ।তাকে নিয়ে কেন আমি লিখতে বসলাম?

আমি লিখছি কারণ আমাকে লিখতে হবে বলে। এটা আবশ্যিক, এটা কর্তব্য। কিসের বাধ্যবাধকতা? কিসের কর্তব্য? কারণ আমার চোখে শাওন অগ্নিকণ্যা। শাওন বাংলাদেশ দ্যুহিতা। শাওন বুকে ধারণ করে বাংলাদেশকে। শাওনের চোখে আমি চিনেছি বাংলাদেশকে। ভালবেসেছি। আমার বুকেও তিনি গেঁথে দিয়েছে এক খণ্ড লাল সবুজ ভূখণ্ড।

শাওন মাহমুদের জন্ম ১৯৬৮ সালের ৬ অগাস্ট। পাকিস্তানের নামী ও দামী সুরকার আলতাফ মাহমুদের অতি আদরের কন্যা। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নামী পরিবার বিল্লাহ পরিবারের মেয়ে আলতাফজায়া সারা আরা মাহমুদের চোখের মনি। জাম খাবে বলায় আলতাফ একঝুড়ি জাম কিনে এনেছিল একদিন। ক্ষীর খাবে বলায় মা রান্না করেছিলেন এক হাঁড়ি ক্ষীর। লাল ছোট জুতো পরে সে বাড়িময় যখন ঘুরে বেড়াত আলতাফের মনে হত– স্বর্গ যদি কোথাও থাকে তা এখানেই। কিন্তু ছন্দপতন ঘটল একাত্তরে। ছোটবেলা থেকে রাজনৈতিক চেতনায় সমৃদ্ধ বঙ্গবন্ধুর অতি আদরের সুরকার ও গায়ক আলতাফ দেশের স্বাধীনতার ডাক উপেক্ষা করতে পারলেন না। ঢাকায় ‘ক্র্যাক প্লাটুন’-এর মাস্টারমাইন্ড আলতাফের বুদ্ধি ও নিখুঁত পরিকল্পনায় ঢাকা জুড়ে গেরিলারা ২৫ অগাস্ট অবধি ঢাকা জুড়ে তাণ্ডব চালাল। পাক বাহিনী ‘মুক্তি’ শব্দে কেঁপে উঠতে শুরু করল। কিন্তু জনৈক সহযোদ্ধা নাম ফাঁস করে দেয়ায় ধরা পরল দলের অনেকেই। ধরা পরলেন আলতাফ মাহমুদ। নাহ। আর তিনি ফিরে আসেন নি। শাওন ফিরে পাননি কখনো তার বাবাকে। পাকিস্তানি বাহিনী যখন আলতাফ মাহমুদকে ধরে নিয়ে যায় তখন শাওন মাহমুদের বয়স মাত্র ৩ বছর। বাবা-হারা এ সন্তানের কাছে বাবা মানে ভাসা ভাসা কিছু স্মৃতি। একটি সাদাকালো ছবি। টুকরো টুকরো কিছু স্মৃতি ও বাবার সম্পর্কে বিভিন্ন জনের স্মৃতি কথার মাঝেই বাবাকে অনুভব করেন তিনি। বাবার ব্যবহৃত জিনিসপত্রের মাঝেও যেন বাবাকে খুঁজে পান তিনি।

সম্প্রতি কলকাতায় এক ব্যক্তিগত আড্ডায় শাওন মাহমুদ বলেন, আমার কাছে বাবা মানে পুরো বাংলাদেশ। বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকার মানে হচ্ছে, আমার বাবার ভাতের থালা। আমি চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই দীর্ঘদেহী আলতাফ মাহমুদ নুয়ে পড়ে টিনের থালায় ভাত আর পেঁপে ভাজিতে কাঁচা মরিচ মাখিয়ে লোকমা তুলে তৃপ্তি সহকারে খাচ্ছেন। কপালের চামড়া বেয়োনেটের আঘাতে ঝুলে আছে, প্রচণ্ড জ্বরের ঘোরে খোলা মুখের সামনের পাটির দাঁতগুলো ভাঙা। শেষবারের মতো সবাইকে নিয়ে ভাত খাচ্ছেন আলতাফ মাহমুদ- হাতের আঙুলে জমে থাকা রক্ত দিয়ে সাদা ভাত লাল, সঙ্গে সবুজ কাঁচা মরিচ।

নিজের ছোটবেলা প্রসঙ্গে শাওন বললেন - আমার ছেলেবেলা, এক বিভীষিকাময় আতঙ্কের ছেলেবেলা। সেই প্রভাতের ভীতসন্ত্রস্ত আমি যখন গুটি গুটি পায়ে স্কুলের ক্লাসরুমে বসতাম, আমাকে জানালার পাশে বসতে হতো। কালো স্কুল গেটের নিচ দিয়ে ওপারে থাকা মেজো মামার এক জোড়া পা দেখতে পেলেই আমার স্বস্তি আসত। কত দিন কেঁদেছি, পা জোড়া হয়তো দেখতে পাইনি ঠিক করে। হারানোর ভয় থেকেও হারিয়ে যাওয়া মানুষের জন্য অপেক্ষা, অসীম এক বেদনাসম। আর একটু বড় হওয়ার পর আস্তে আস্তে বুঝে নিয়েছিলাম, আমার চাওয়ার পরিধি খুব সীমিত। সাদা রুটিতে হলুদ আলুভাজি দিয়ে রোল খেয়ে কাটিয়েছি কত শত স্কুলের টিফিন ব্রেক। কখনো স্কুলের ধু ধু সীমানা দিয়ে খেতে খেতে মাঠে হেঁটে বেড়িয়েছি যেন চিল ছোঁ মেরে আমার রোলটা নিয়ে যায়, বন্ধুরা এগিয়ে এসে ওদের ভালো ভালো টিফিন সাধবে বলে। দিদু লাউ– চিংড়ি রাঁধার সময় লাউ দেওয়ার আগে ছোট পিরিচে ভুনা চিংড়ি লুকিয়ে রাখতেন আমার জন্য। লাল লাল কুচা চিংড়ি দিয়ে ভাত মেখে খাব বলে কত দিন অপেক্ষা করেছি, জানা নেই।বিশেষ কোনো বিকেলে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চায়ের সঙ্গে টোস্ট বিস্কুট পেলে মনে হতো স্বর্গ পেয়েছি। সপ্তাহের পর সপ্তাহ পার করেছি এক টাকার একটা কোকাকোলা খাব বলে। একটু একটু করে বিশাল এক শূন্যতার উপস্থিতি টের পাচ্ছিলাম একসময়। নামকরা স্কুলে পড়েছি আমি। ভিখারুন্নিসা আমার সহপাঠীদের বাবারা সমাজের অনেক উঁচু পদের মানুষ ছিলেন। কেউ ডাক্তার বা মন্ত্রী, সচিব বা ইঞ্জিনিয়ার। হঠাৎ একদিন খেয়াল করে দেখলাম আমার সহপাঠীরা সবাই স্কুলে গাড়ি চড়ে আসা-যাওয়া করে, একমাত্র আমিই রিকশায়। আমার খারাপ লাগত না, লাগতে দিতাম না, অজস্র অজানা প্রশ্নভরা আকাঙ্ক্ষাগুলোকে উড়িয়ে দিতে পারতাম আমি। অপেক্ষার আশীর্বাদে মেনে নিতে নিতে আমি সহজেই মানিয়ে নিতাম, বাবা ফিরে এলে আমাকে গাড়ি করে স্কুলে আনা-নেয়া করবে। বাবার গাড়ি ছিল। অস্টিন। বাবার অপেক্ষা করতে করতে কষ্টগুলো আমার জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসে।

এই অগাস্টের শেষে বাবার অন্তর্ধান দিবস।  এই মাসে আমি চলে যাই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে, একদম কাছাকাছি এক ভাসমান দোলাচলে ঘুরতে থাকি রমনা থানা, ড্রাম ফ্যাক্টরি, ৩৭০ আউটার সার্কুলার রোড। তখন আমার সঙ্গে ঘুরতে থাকে বাবা আর তার সহযাত্রীরা। চারপাশের ছায়া হয়ে কাছে আসে শহীদ আজাদ, রুমী, জুয়েল, বদি, বাকের, আলতাফ মাহমুদ। কানের কাছে গুন গুন করতে থাকে ওরা—শাওনমণি খুঁজে পেলে কি আমাদের? খুঁজতে চলো এবার তাহলে। আচ্ছা বাংলাদেশ কি মনে রেখেছে আমাদের? ওদের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিনি। খুঁজে পাইনি ওদের শেষ ঠিকানা। শুধু এক জীবনের বিশাল স্বস্তিভরা বিজয়ের ক্ষণে আমার আর জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছে হয়নি, মেরে কোথায় ফেলেছিলি ওদের? শুভ সময়ে মন খারাপ করতে নেই। আমরা সবাই ভালো থাকব, আমাদের ভালো থাকতেই হবে।

শাওনের সঙ্গে আমার আলাপ ৩১ জানুয়ারি, ২০১৪। বাংলাদেশে আমার প্রথমদিন। কিছুই জানি না বাংলাদেশের। শুধু আলতাফ মাহমুদ সম্পর্কে কিছু জানি। শহিদ পরিবারে সেদিন এসে আমি মিশে গেলাম পুরো পরিবারের সঙ্গে। আমি চে গুয়েভারার ফ্যান ছিলাম। শাওনও। ক্রমে চিনলাম জানলাম আলতাফ মাহমুদকে। জানলাম বাংলাদেশকে। জানলাম শহিদ পরিবারের সুখ দুঃখ। জানলাম শাওনকে। জানলাম ওর স্বামী সায়িদ হাসান টিপুকে। একাত্ম হয়ে গেলাম এই পরিবারের সঙ্গে। দেখলাম বিদেশের সুখের জীবন ছেড়ে কিভাবে শাওন বাংলাদেশে থেকে লড়ে যাচ্ছে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিরুদ্ধে। ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে। কী পাচ্ছে? কিচ্ছু না। সরকারি কোনো বদান্যতা? না। সামাজিক স্বাচ্ছন্দ্য? না। কোনোরকম স্বীকৃতি? না। তবে? কারণ একটাই। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ যেন আমার মত অস্থির জীবন না কাটায়। শান্তি সমৃদ্ধির দেশ হয়। তাই সে অবস্কিওরের মত পেশাদার ব্যান্ড দলকে প্রভাবিত করে দেশের গান গাওয়ায়। তীব্র দেশপ্রেম তার অন্তরে। তীব্র ভালোবাসা দেশের মানুষের জন্যে। ভালো থাকা ও ভালো রাখার বিরল সংস্কৃতির প্রতিনিধি। দেশ গড়তে প্রতিনিয়ত এমন মানুষ দরকার। ভাবীকালের এমন নেত্রী। ভালো থাকুন শাওন। অনেক শুভেচ্ছা। দীর্ঘ হোক আপনার সুস্থ জীবন। এভাবেই এগিয়ে যান আলোকবর্তিকা হয়ে। আপনার উদ্যোগে সমৃদ্ধ হোক দেশ। দেশের মানুষ।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর