Alexa শীতে ঘোরার সেরা জায়গা: দমার চর

শীতে ঘোরার সেরা জায়গা: দমার চর

নুরুল করিম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:৩৯ ৬ নভেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৪:৪৯ ৬ নভেম্বর ২০১৯

দমার চর

দমার চর

শীতের ভোর। সূর্যের আলো তখনো কুয়াশা ভেদ করে মাটিতে পড়ার সাহস করেনি! কোথাও কেউ নেই। তবে পাখিরা ততক্ষণে জেগে গেছে, চারদিক কলরব কিচির-মিচির শব্দে। যেদিকে তাকানো যায় শুধু পাখি আর পাখি। সবমিলিয়ে হাতিয়ায় দমার চরের প্রথম সকাল ছিল বৈচিত্র্যে ভরপুর।

দমার চরে গিয়েছিলাম গত ডিসেম্বরের শেষে। তিন দিনের নিঝুম দ্বীপ ভ্রমণের একদিন বরাদ্দ ছিল দমার চরের জন্য। বঙ্গোপসাগর আর মেঘনার মেহনায় জেগে ওঠা বিশাল চরাঞ্চলের নাম দমার চর। নিঝুম দ্বীপের পূর্ব পাশেই বেড়ে ওঠা এই চর জলচর নানান পাখির নিরাপদ আবাসস্থল। তবে দমার চরের প্রধান আকর্ষণ দেশি গাঙচষা। বিপন্ন এই পাখির একমাত্র নিরাপদ বাসস্থান।

চরের কোথায় নেই পাখির দল? জিরিয়া, বাটান, হট টি টি, চখাচখি, রাঙা মানিকজোড়, গাঙচিল, পাকড়া, গুলিন্দা, বক, কমনশেলডাক, উল্টোঠুঁটি, পানচিল, কালালেজী জৌরালি, কাস্তেচরাসহ প্রায় ৪০ প্রজাতির পরিযায়ী পাখির আনাগোনায় মুখর থাকে পুরো চর। বিচিত্র রং এদের। বিচিত্র এদের অঙ্গভঙ্গি। কোনোটা কালো, কোনোটা সাদা, ছাইরংয়া, কোনোটা আবার হলুদ। নানা ভঙ্গিমায় স্বাধীনভাবে হেঁটে বেড়াচ্ছে চরের মাটিতে। এক এক ধরনের আওয়াজ করে ডাকছে এক এক প্রজাতির পাখি। যেন কোনো পাখির মেলা বসেছে। এখানে পাখি, ওখানে পাখি, সেখানে পাখি। সবচেয়ে দারুণ বিষয় হলো, চরে কোনো শিকারির ভয় নেই।

দমার চর হতে পারে নিঝুম দ্বীপ ভ্রমণের অংশ

নিঝুম দ্বীপের ‘নিঝুম রিসোর্ট’ থেকে খুব ভোরে রওনা আমাদের। সজোরে আওয়াজ তুলে নিঝুম দ্বীপ জাতীয় উদ্যানের পাশ ঘেঁষে চলতে শুরু করলো নৌকা। বনের উত্তর পাশে ব্যাপক ভাঙন আর ভেতরে ভেতরে গাছ নিধনের চিহ্ণ দেখে মনটা খারাপই হল। মোক্তারিয়া চ্যানেলে পৌঁছে গেলাম ঘণ্টা দেড়েক পর। এই চ্যানেল হাতিয়া থেকে নিঝুম দ্বীপকে বিচ্ছিন্ন করেছে। মোক্তারিয়ার ঘাট থেকে পূর্ব দিকেই দমার চর।

এরই মধ্যে সূর্যের আলোতে ভরে গেছে চারদিক। যে যার মতো তৈরি হয়ে নিচ্ছে চরে নেমে পাখি দেখবে বলে। ভাটা চলছে, চরে নামার উপযুক্ত সময় তো এখনই। ঝুপ ঝুপ করে নেমে পড়ি আমরা। নিচে পা রাখতেই হাঁটু অব্দি ডুবে যায় কাদার ভেতর। আমরা একে অপরকে সাহায্য করতে করতে এগিয়ে যাই সামনের দিকে। বিশ-ত্রিশ হাত যেতেই কাদা কমে গেল। সবুজ ঘাসের সমতল ভূমির দেখা পেলাম। কিন্তু ঘাসের ওপর পা রাখতেই সূচের মতো বিধতে লাগল পায়ে। ঘাসগুলো মাড়িয়ে এগোতেই শক্ত মাটি, আবার থকথকে কাদা পড়ল পথে।

হঠাৎ করে মাথার উপর থেকে বিকট শব্দে একঝাক পাখি উড়ে গেল। ভালোভাবে দেখতে পেলাম না। জিলালের সুযোগ হয়েছিল দু-একটি ক্লিক করার। আমাদের একজন ক্যামেরার মনিটরে ছবি জুম করে দেখলেন, এ তো গাঙচষা! এদের দেখতেই তো দমায় আসা আমাদের। চরের ভেতরের ছোট খালে ঢুকে পড়লাম আমরা। নৌকা থেকে নেমে চুপি চুপি হাঁটা শুরু করলাম। জুতা নৌকায়, আমরা হাঁটছি খালি পায়ে। ঘাসে ঢাকা দমার চরের এ জায়গায় খালি পায়ে হাঁটা কঠিন। ঘাষগুলোর মাথা সুচালো, পায়ের তলায়ও বিঁধে যায়। পাখিদের আকর্ষণে সেদিকে কারও খেয়াল নেই। দেখাও পেলাম নানান পাখির। ঝাঁকে-ঝাঁকে ওড়া দেশি গাঙচষা, গাঙাচিল, পানচিল, বাটান, গুলিন্দাসহ আরও অনেক জলচর পাখি দেখলাম দমার চরের আশপাশে।

শীতের শুরু থেকেই পাখিদের আনাগোনা বাড়ে

দমার চরকে এক কথায় বলা যায় দুর্গম অঞ্চল। চারদিকে নোনা পানি, থকথকে কাদা। টেউয়ের আসছেই। তবে এখানে এসে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। আমাদরে একজন বললো, বাংলার আর কোনো চর বা দ্বীপে রংবাহারি এমন পাখির মেলা দেখা যায় বলে আমার জানা নেই। সত্যিই, পাখি দেখতে দেখতে সময় ফুরালো বেশ দ্রুত। এবার ফেরার পালা। আমাদের নিয়ে চালক তাই নৌকা ঘুরালেন নিঝুম দ্বীপের দিকে।

কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে সদরঘাট থেকে লঞ্চে হাতিয়ার তমরুদ্দি। সদরঘাট থেকে এমভি ফারহান লঞ্চ ছেড়ে যায় তমরুদ্দির উদ্দেশ্যে। ভাড়া ডেকে জনপ্রতি ভাড়া ৩৫০ টাকা, প্রথম শ্রেণির একক কেবিন ৯শ’ থেকে ১ হাজার টাকা। এছাড়া দ্বৈত কেবিন ১ হাজার ৮শ’ থেকে ৩ হাজার ৫শ’ টাকা।

ঢাকা থেকে বিকেল পাঁচটায় ছেড়ে পরদিন সকালে পৌঁছায় তমরুদ্দি। সেখান থেকে অটো রিকশা নিয়ে সরাসরি যেতে হবে মোক্তারিয়ার ঘাটে। একটি অটোরিকশার রিজার্ভ ভাড়া ৫শ’ থেকে ৬শ’ টাকা ভাড়া। যাওয়া যাবে তিন, চারজন। মোক্তারিয়ার ঘাট থেকে ইঞ্জিন নৌকা ভাড়া করে বেড়ানো যাবে দমার চরে।

দমার চরে যেতে হয় খালের বুক চিরে

কোথায় থাকবেন

নিঝুম দ্বীপের নামা বাজার কিংবা বন্দরটিলায় থাকতে পারেন। নিঝুম দ্বীপে থাকার জন্য সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থা অবকাশ পর্যটনের নিঝুম রিসোর্ট। এখানে দুই শয্যার কক্ষ ভাড়া ১ হাজার ৫শ’ টাকা। তিন শয্যার কক্ষ ১ হাজার ৮শ’ টাকা। চার শয্যার কক্ষ ২ হাজার টাকা। ৫ শয্যার ডরমিটরির ভাড়া ১ হাজার ৮শ’ টাকা। ১২ শয্যার ডরমিটরি ৩ হাজার টাকা।

ঢাকা থেকে এ রিসোর্টের বুকিং দেয়া যায়। যোগাযোগ: অবকাশ পর্যটন লিমিটেড, শামসুদ্দিন ম্যানশন, ১০ম তলা, ১৭ নিউ ইস্কাটন, ঢাকা। ফোন: ০২-৮৩৫৮৪৮৫, ৯৩৪২৩৫১, ০১৫৫২৪২০৬০২।

পাখি দেখতে দমার চর যেতে পারেন এই শীতে

খাবেন কোথায়

লোকাল কিছু খাবারের হোটেল আছে। যেমন- হোটেল সি-বার্ড, দ্বীপ হোটেল এবং ভাই-ভাই হোটেল। এখানে আপনি মাছ, মুরগি,হাস, কাকড়া, শুটকি খেতে পারবেন। তবে ভালো মিষ্টি জাতীয় খাবার পাবেন না।

প্রয়োজনীয় তথ্য

ঢাকা থেকে দমার চরে ভ্রমণের জন্য কমপক্ষে দু’দিনের সময় প্রয়োজন। নিঝুম দ্বীপ থেকে নৌকায় দমার চরে যেতে কমপক্ষে দুই ঘণ্টার সময় প্রয়োজন। তাই মোক্তারিয়ার ঘাট কিংবা বন্দরটিলার স্লুইজগেইট থেকে নৌকা ভাড়া করে দমার চরে যাওয়া সহজ। লঞ্চে ঢাকা ফিরতে চাইলে খুব সকালেই বের হতে হবে তমরুদ্দির উদ্দেশ্যে। তমরুদ্দি থেকে ঢাকাগামী লঞ্চ ছেড়ে আসে দুপুর বারোটায়।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে