শিশুদের ভিডিও গেমসে করোনা সচেতনতা

শিশুদের ভিডিও গেমসে করোনা সচেতনতা

প্রকাশিত: ১৫:৪৩ ১৮ জুন ২০২০  

তথ্যপ্রযুক্তিবিদ প্রফেসর ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইআইটি বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। করেন গবেষণা ও লেখালেখি। দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকায় মন্তব্য কলাম লিখছেন নিয়মিত।  

বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বিপর্যস্ত জনজীবন। হোম কোয়ারেন্টাইনের গত তিন মাস যাবত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকলেও শিশুদের লেখাপড়া চলছেই।

‘আমার ঘরে- আমার স্কুল’ প্রোগ্রামের আওতায় সংসদ টেলিভিশনের মাধ্যমে সরকারি স্কুলের পাঠক্রম অনলাইনে পরিচালিত হচ্ছে। মোবাইল ফোনে হেল্পলাইনও (নম্বর-৩৩৩৬) খোলা হয়েছে বিশেষজ্ঞ শিক্ষকের পরামর্শ বা সেবা নেয়ার জন্য- এখানে পাঁচ মিনিট পর্যন্ত বিনা খরচে শ্রেণিপাঠ ও পরামর্শ নিতে পারবে। শুধু তাই নয়, শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে লেখাপড়ার খোঁজ নেবেন শিক্ষকগণ এবং পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বাবা-মার কাছে দিয়ে আসবেন পরীক্ষা নেওয়ার জন্য। ব্যক্তি মালিকানাধীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজস্ব উদ্যোগে  জুম-প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ক্লাস নিচ্ছে, হোমওয়ার্ক দিচ্ছে এবং সেই কাজ গুলো অনলাইনে তথা ইমেইলে ফেরত  নিচ্ছে। এভাবে গত তিনমাসে পরিবারের বড় ভাই-বোন, বাবা-মা এবং অন্যান্য সদস্যরা যখন অনেকটা কর্মহীন ভাবে সময় কাটাচ্ছে- তখন ঘরের ছোট্ট সোনামণিরা ব্যস্ত সময় পার করছে তাদের লেখাপড়া নিয়ে।

প্রাণঘাতী কোভিড-১৯ রোগ থেকে বাঁচতে প্রাপ্তবয়স্করা কোনোভাবে বাড়িতে থাকতে পারলেও, ছোট শিশুটিকে ছোটাছুটি, ঘরের বাইরে যাওয়া বা অন্য শিশুর সঙ্গে খেলাধুলা থেকে বিরত রাখা সহজ নয়। আবার দীর্ঘদিন যাবত ঘরে থাকলে শিশুমনে মানসিক চাপ বাড়তে পারে। অবশ্য প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কম থাকলেও তাদের এসব বিষয় সম্পর্কে জানাতে হবে। আতঙ্ক ও ভয় দূর করে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে ছোটকাল থেকেই। শিশুমনে করোনার বিষয়ে যেন আতঙ্ক ও ভয়ের সৃষ্টি না হয়, এজন্য পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের সময় দিতে হবে মা-বাবাকে, ঘরের ভেতরেই শিশুদের হাসিখুশি রাখতে, খেলাধুলা ও বিনোদনের আয়োজন করতে হবে। আর বিনোদনের তালিকায় যদি থাকে কম্পিউটার গেমস, তাহলে তো আর কোনো কথাই নেই। তাই করোনাভাইরাসকে পুঁজি করে সফটওয়্যার কোম্পানিগুলো শিশুদের জন্য তৈরি করছে মজার মজার ফ্রি অনলাইন গেম যা মোবাইল/ডেস্কটপ/ল্যাপটপ দিয়ে খেলা যায়। অর্থাৎ লেখাপড়া ও খেলা চলবে সমানতালে।

শিশুদের জন্য বিশ্বের প্রথম করোনাভাইরাস গেম বানালেন ইউনিভার্সিটি অব হার্টফোর্ডশায়ারের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক রিচার্ড ওয়াইজম্যান। গেমটির নাম ‘ক্যান ইউ সেভ দ্য ওয়ার্ল্ড’। গেমটিতে শিশুরা সামাজিক দূরত্ব সম্পর্কে, ব্যস্ত রাস্তায় কিভাবে পথচারী, সাইকেল আরোহী এবং মানুষের হাঁচি-কাশি এড়িয়ে চলা যায় সেটা দেখানো হয়েছে। এভাবে গেমটিতে নিজেকে রক্ষার পাশাপাশি যত বেশি মানুষকে বাঁচানো যাবে গেমের স্কোর তত বাড়বে। ‘লাইফ দ্য গেম’ নামের অপর গেমটিতে ছোট একটি ছেলে খেলার মাঠে ঘুরে বেড়ায় যেখানে আরো কিছু শিশু তাদের নিজেদের মতো করে খেলাধুলা করে। অন্য শিশুদের থেকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে মাঠের মধ্যে দিয়ে শিশুটিকে টেনে নিয়ে যেতে পারলে পয়েন্ট পাবে। উদ্ভাবনী এ গেমটি একটি বাচ্চাকে সামাজিক দূরত্ব শিখতে প্রশিক্ষণ দেবে যা কোভিড-১৯ এর ঝুঁকি রোধে গুরুত্বপূর্ণ। এদিকে ‘Cerba-20’ নামে শিশুদের জন্য মজার একটি গেম বানিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে মাত্র ৯ বছর বয়সী ইতালির শিশু লাপো দাতুরি। এই গেমের খেলোয়াড়েরা মহাকাশযানে চড়ে যুদ্ধ নামে প্রতিপক্ষ কোভিড–১৯’র বিরুদ্ধে। সকল করোনাভাইরাসকে মেরে ফেলে যুদ্ধে এরা জয়ী হয়। 

শিশুদের অতি প্রিয় ‘মিনা-রাজু’ কার্টুনে করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত স্বাস্থ্যবিধিগুলো চমৎকারভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। মিনা ও রাজু তাদের সঙ্গীদেরকে নিয়ে রুমাল দিয়ে নাক চেপে ধরা এবং সাবান দিয়ে হাত ধৌত করার দৃশ্য দেখেই প্রতিপক্ষ করোনাবাহিনী পালাতে থাকে। এমনি করে ‘সিসিমপুর’ শিশুতোষ কার্যক্রমটি ৩ থেকে ৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের বিকাশ, জীবন-দক্ষতার উন্নয়ন, মৌলিক শিক্ষার চাহিদা পূরণের জন্য তৈরি হয়েছে, যেখানে শিশুদের পাশাপাশি তাদের পিতা-মাতা এবং শিক্ষকেরাও অন্তর্ভূক্ত আছেন। করোনাকালীন সময়ে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সকল বিধি নিষেধ গুলো দেখাচ্ছে এবং মেনে চলার আহ্বান জানাচ্ছে। মহামারি করোনা রোগ প্রতিরোধে সচেতনতামূলক গান নিয়ে হাজির হয়েছেন আলোচিত গানের জুটি তবীব মাহমুদ ও পথশিশু রানা মৃধা। কথোপকথনের মতো করে প্রশ্ন-উত্তরের মাধ্যমে করোনা প্রতিরোধের পদ্ধতিগুলো তুলে ধরা হয়েছে এতে। গানে গানে উঠে আসে গৃহহীন মানুষের সাবান কিনে হাত ধুতে না পারার কথাও। এভাবে গান, খেলা ও ভিডিও গেমের মাধ্যমে শিশুরা ছোটকাল থেকেই হাত, মুখ, নাখ পরিষ্কার রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারছে।

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে মাস্ক একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বস্তু। এবার সেই মাস্কে ছেয়ে গেছে শিশুদের অনলাইন গেমেও। কোথাও গেম শুরু করার আগে নিজের পছন্দের চরিত্রের মুখে বাঁধতে হচ্ছে মাস্ক, আবার কোথাও খেলার প্রধান কুশীলবেরা সকলেই হাজির হচ্ছে মাস্ক পরে। খুদেদের খুবই পছন্দের খেলা ‘মাই হর্স স্টোরিজ গেম’ – যেখানে ফার্মের পছন্দের ঘোড়ায় চড়া শিখতে হলে কাউবয়কে সাজতে হবে মাস্ক পরে। গেমে তাদের পছন্দের নায়ক-নায়িকা এমনকি সুপারহিরোদের মুখও এখন মাস্কে ঢাকা। এভাবে পছন্দের মাস্ক মুখে লাগিয়ে নিলেই এগোনো যাবে পরবর্তী ধাপে। ‘হিপহপ’, ‘ব্যালে’ বা ‘জ্যাজ’ নাচের জন্য ‘ডান্স স্কুল স্টোরিজ’, ‘আইস স্কেটিং’ বা ‘প্রিটি ব্যালেরিনা’র মতো গেমের চরিত্রেও আজ মুখ ঢেকেছে মাস্কে। ‘চিয়ারলিডার ডান্স অব চ্যাম্পিয়নশিপে’ নামতে গেলে শারীরচর্চার জন্য যেতে হয় জিমে। সেখানেও দেখা যাচ্ছে, জিম থেকে ডান্স ফ্লোর- মাস্ক পরলে তবেই মিলছে ছাড়পত্র। এভাবে পরবর্তী ধাপে গেলেই অপেক্ষা করছে হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাথার কেপ, পিপিই ইত্যাদি। কোনো কোনো গেমে শুধু গুলি করেই ‘করোনা’ মারতে হবে এবং মারতে মারতেই হবে জয়। কয়েক দফায় জিতে ‘কোয়ারেন্টিন জ়োন’-এ ঢুকে পড়লে লড়াই আরও কঠিন। কোনো গেম আবার জানাচ্ছে, ভাইরাসে ভরে গেছে শহর। ছোঁয়া বাঁচাতে আক্রান্ত মানুষদের থেকে ছুটে পালাতে হবে। অপর একটি গেমে আবার খেলোয়াড়দের হাসপাতালের কর্মী সাজিয়ে হাসপাতালেরই বাস চালিয়ে ভাইরাস আক্রান্তদের পিষে মারার প্রতিযোগিতায় নামাচ্ছে। ছোটদের করোনা সংক্রমণ নিয়ে জানাতে এবং করোনা সংক্রান্ত স্বাস্থ্য সরঞ্জামের কার্যকারিতা শেখাতেই এতসব উদ্যোগ। তাই একদিকে ভিডিও কোম্পানিগুলো যেমন গেমকে প্রাণবন্ত করছে, অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসকে পুঁজি করে প্রতিনিয়ত বাজারে ছাড়ছে নিত্যনতুন মজার মজার শিশুতোষ গেম।

টিভি, মোবাইল, ট্যাব তথা স্ক্রিন মিডিয়া শিশুমনে  কিরূপ প্রভাব ফেলে- এনিয়ে বিশ্বে অনেক গবেষণা চলছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব গেমে সামাজিক ইতিবাচক আচরণকে উৎসাহিত করে সেগুলো বাস্তবেও মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে। ভিডিও গেমের মাধ্যমে যে বার্তা দেয়া হয় তা মানুষকে বিশেষ করে শিশুদের জীবনে সত্যিকারের প্রভাব ফেলে। তাদের মতে সরকার, স্কুল এবং স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ লকডাউন তোলার পরও শিশুদের উৎিসাহিত করার জন্য গেমটি ব্যবহার করতে পারে। তবে এসব গেম নিয়ে চিন্তায় আছে সমাজতত্ত্ববিদ, মনোরোগ চিকিৎসক এবং সাইবার বিশেষজ্ঞগণ। এধরনের ভাইরাস গেম হিংসাত্মক আচরণকে প্রশ্রয় দেয় কিনা সেটা চিন্তার বিষয়। তারা জানায়, গেমের নিয়ম মানতে গিয়ে মৃত্যুর উদাহরণও রয়েছে। পাবজির মতো গেম খেলায় শিশুমনে বিরূপ প্রভাব পড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল দিল্লির শিশুসুরক্ষা কমিশন। আইওয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির তিন মনোবিজ্ঞানীর পরিচালিত এক সমীক্ষায় তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম গ্রেডের ১৩২৩ জন ছেলেমেয়ের উপর সমীক্ষায় দেখা গেছে, যেসব ছেলেমেয়ে দৈনিক দু’ঘণ্টার বেশি টিভি বা ভিডিও গেম দেখে, তারা গড় হারের দেড়গুণ থেকে দু’গুণের বেশি মনোসংযোগ সমস্যায় পড়ে। শিশু মনোবিজ্ঞানী ডগলাস জেনটাইলের মতে, ভিডিও গেমগুলোতে দ্রত দৃশ্যবদল, আলো, শব্দ, ক্যামেরার অ্যাঙ্গেলের সর্বক্ষণ পরির্বতন ও কম্পন এমনভাবে হয়ে থাকে যে শিশুদের মনে ও মস্তিষ্কে তা স্থায়ী হয়ে যায়। এই অবস্থায় শিশুরা যখন ক্লাসরুমে যায় তখন সেখানে এধরনের কিছু না পেয়ে শিক্ষকের নীরস পাঠদানের প্রতি মনোসংযোগ থাকে না।

তাই বাড়িতে হোক কিংবা ক্লাসরুমেই হোক, বাচ্চাদের মনোযোগ পাওয়ার জন্য যেসব বাবা-মাকে হিমশিম খেতে হয়, তাদের উচিত সন্তানের টিবি দেখা বা ভিডিও গেম খেলা সীমিত করে দেওয়া। শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে দীর্ঘক্ষন টিভির পর্দা, মোবাইল ফোন কিংবা  ট্যাবলেটের মতো ছোট স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকলে চোখের দৃষ্টি ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই শিশুদেরকে অন্যান্য বিনোদনমূলক কাজ যেমন ছবি আঁকা, নাচ-গান, গল্প-কবিতা-আবৃত্তি, ধর্ম-কর্মের কাজ, এমনকি মায়ের সঙ্গে সংসারে ছোটখাট কাজে তথা ছাদে বা বারান্দায় বাগান পরিচর্যায় সম্পৃক্ত করানো উচিত।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর