দূরবীনপ্রথম প্রহর

শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ওরা

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
ছবি: সংগৃহীত

১১ বছরের শিশু কাওসার। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে রায়দা ফোটোকপি ও স্টেশোনারি দোকানে বই খাতা বিক্রি করে। বাবা-মাকে হারিয়ে নানার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই তার বসবাস। ছোট্ট এই বয়সে যখন তার বইখাতা নিয়ে স্কুলে যাবার কথা, তখন সে বই খাতা বিক্রি করে অন্যদের পড়ালেখার সহায়তা করছে। সকাল থেকে শুরু করে রাত ১০টা অবধি চলে তার এই পরিশ্রম। দু’মুঠো ভাতের জন্য তার এই সংগ্রাম। সারাদিন পরিশ্রম শেষে তার আয় ১৫০ টাকার কাছাকাছি। সহপাঠীদের সঙ্গে হৈ হুল্লোড় আর বিদ্যালয়ে বই নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করার কথা থাকলেও তাকে এখন চিন্তা করতে হয় জীবিকার!

বরিশাল শহরের সর্বত্রই শিশু শ্রমিকদের দেখা মেলে। করিম তাদের একজন। বাবা মোমেন রিক্সাচালক। মা বাসাবাড়িতে কাজ করেন। তিন সন্তানের জনক মোমেন দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। বাধ্য হয়েই করিমকে সারাদিন বাসের হেলপারি করতে হচ্ছে। প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়ে বরিশালের নথুল্লাবাদ থেকে ফরিদপুর এই রাস্তায় যাত্রী সংগ্রহে তার দিন কাটে। যাত্রীদের দুর্ব্যবহার ছাড়াও গাড়ি চালকের শাসানিত আছেই। সারাদিন খাটুনি শেষে তার আয় মাত্র ১০০ টাকা। নির্মম কষ্টে কাটছে তার জীবন। সে জানায়, দু’বেলা দু’মুঠো খেয়ে বেঁচে থাকার জন্যই তার এ সংগ্রাম।

একাধিক তথ্যমতে, বিশ্বে শিশু শ্রমের দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর পরিচালিত ২০১৭ সালের এক প্রকাশিত জরিপ সূত্রে জানা যায়, পূর্বের চেয়েও শিশু শ্রমিকের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। পূর্বে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ৭৯ লাখ হলেও, বর্তমান জরিপে এই সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, সরকার ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) গৃহীত নানা পদক্ষেপের কারণে পূর্বের তুলনায় শিশু শ্রমিকের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত ওই জরিপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বরিশাল শাখার চেয়ারম্যান মো: আকতার উদ্দীন জানান, বাংলাদেশে বর্তমানে ফোর্স লেভার তেমন নেই। পোশাক শিল্পে শিশু শ্রম পুরো বন্ধ হয়ে যাওয়া দেশের জন্য ইতিবাচক। তবে ছোট ছোট পোশাক কারখানায় এখনও গুটিকয়েক শিশু শ্রমিকের উপস্থিতির কথা শুনা যায়।

তবে, বাস্তবতার চিত্র ভিন্ন। শিশু শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা একাধিক ব্যক্তি বলছেন, শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরিসংখ্যান বা জরিপ থেকে এরা বাদ পড়ে যায়। অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটই এর মূল কারণ। অধিকাংশ সময় সচেতন মহলও মানবিক কারণে এই শিশুদের কাজ দিতে বাধ্য হন। কাজ না পেলে ওই শিশুদের জীবনে শঙ্কা আরও ঘনীভূত হয়। অপরাধমূলক নানা কাজে জড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে প্রবল।

শিশু শ্রমিক কমে যাওয়ার প্রসঙ্গকে ‘একটি অযৌক্তিক দাবি’ আখ্যা দিয়ে 'বরিশাল হিউমার রাইট ফর চিলড্রেন ' এর সভাপতি বলেন, শিশু শ্রম কমেছে বলে আমি মনে করি না। এটি একটি নিছক ভুল ধারণা। শিশুরা কাজের এক ক্ষেত্র থেকে আরেক ক্ষেত্রে স্থানান্তরিত হচ্ছে, ফলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় শিশু শ্রমিক হ্রাস পাচ্ছে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। ভাল করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে শিশু শ্রম প্রতিনিয়তই বাড়ছে।

বাংলাদেশের শ্রম আইন (২০০৬) অনুসারে শ্রমিকের বয়স কোনক্রমেই ১৪ এর নিচে হওয়া যাবে না। আইনটি অনেক ক্ষেত্রেই কাগুজে মাত্র, বাস্তবে ১৪ বছরের নিচের বহু শিশুই ভিন্ন ভিন্ন ধরনের কাজের সঙ্গে জড়িত।

বহু পূর্বেই সরকারীভাবে সারাদেশে ৯৯ শতাংশের বেশি শিশুর বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার আগেই প্রায় ৪০ শতাংশ শিশু বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ছে। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পারিপার্শ্বিক নানা কারণে এই ঝরে পড়া শিশুদের বড় অংশটি নানাভাবে শিশু শ্রমের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এদের কেউ কেউ বাস, টোম্পো, হিউম্যান হলারে সহকারী হিসেবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে। বেশিরভাগ সময় এদের ঝুঁকিপূর্ণভাবে ঝুলে থাকতে দেখা যায়। কেউ কেউ চায়ের দোকান, হোটেল, রেস্তরাঁসহ মোটর গাড়ি ও রিক্সার গ্যারেজ, সাইকেল নির্মাণ কারখানা, ইটভাঁটিসহ নানা ধরনের ছোট ছোট কারখানায় কাজ করছে। পোশাক শিল্পে পূর্বতন সময়ে শিশু শ্রমিক লক্ষ্য করা গেলে বর্তমানে পোশাক শিল্প খাত তাদের এই কলঙ্ক মোচন করেছে। বাসা বাড়িতে এখনও শিশু শ্রমিক লক্ষ্য করা যায়। মেয়ে শিশু শ্রমিকের পাশাপাশি ছেলে শিশুদেরও রান্না-বান্নার কাজে পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়।

মিজবাহ বরিশাল শহরের রূপাতলি সংলগ্ন একটি গাড়ির গ্যারেজে কাজ করে। শিশুটিকে সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত একটানা কাজ করে যেতে হয়। এই সময়ে কোন কাজে বিন্দুমাত্র ভুল হলে তাকে লোহার যন্ত্রপাতি দিয়ে আঘাত করা হয়। মিজবার বাবা সুমন পেশায় একজন কসাই, মা আছমা বেগম গৃহিণী। মাদারীপুরের গ্রামের বাড়িতে সে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে। বার্ষিক পরীক্ষায় ফেল করায় পরিবার থেকে তার লেখাপড়া বন্ধ করে দেয়া হয়। মিজবাহর মা স্বামীর চোখ ফাঁকি দিয়ে ছেলেকে দূরের স্কুলে পড়তে পাঠায়; তবে সে পথেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় স্বয়ং বাবা। ‘লেখাপড়ায় অমনোযোগী’ এই বাহানায় তাকে কাজে পাঠানো হলো। বরিশাল শহরের নথুল্লাবাদ,চৌমাথা, সদররোড, রূপাতলি, তিরিশ গোডাউন বস্তি এলাকাসহ বেশ কয়েকটি স্থানে সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায় ওইসব স্থানের গ্যারেজে, হোটেলে,দোকানপাটে কাজ করা অধিকাংশের বয়স ১৪ এর নিচে।

শিশু শ্রম বন্ধে আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই। সাম্প্রতিক সময়ের তথ্য উপাত্তে ইতিবাচক অনেক তথ্য উঠে আসলেও, সমাজের সর্বত্রই চোখ মেলে তাকালে দেখা যাবে অবর্ণনীয় কষ্টে রয়েছে সমাজ থেকে ছিটকে পড়া একটি শিশু শ্রেণী। শ্রমের বিনিময়েই জীবিকা নির্বাহ করছে তারা! তাদের দেখার কেউ নেই! আইন থাকলেও আইনের প্রয়োগ নেই। বেঁচে থাকার জন্য তাদের বেচে নিতে হয় এই পথ, সেখানে আর আইন করে কতটা বন্ধ করা যাবে শিশু শ্রম?

মানবাধিকার নেতা আরিফুল ইসলাম বলেন, অর্থনৈতিক মুক্তিই একমাত্র শিশু শ্রম বন্ধ সহায়ক হতে পারে। দেশের অর্থনীতি পুরো স্বচ্ছল হলে শিশু শ্রম কমে আসবে। কোন বাবা-মা তার ছেলেমেয়েকে বাধ্য হয়ে কাজে দেয় না। শিশু শ্রম বন্ধে আইন বা সচেতনতা মানবিক কারণে তেমনভাবে কার্যকর নয়। তাদের তো খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকতে হবে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সকল সূচকে অগ্রগতি হলে দেশের প্রেক্ষাপট বদলে যাবে, আর তখনই শিশু শ্রম বন্ধ হতে পারে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমএইচ

daily-bd-hrch_cat_news-10-10