শিকলবন্দী মোহাম্মদ উল্লাহকে বাঁচাবে কে?

শিকলবন্দী মোহাম্মদ উল্লাহকে বাঁচাবে কে?

শামীম আহমেদ, বরিশাল ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:১৮ ৩ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১৬:০৩ ৩ আগস্ট ২০২০

শিকলবন্দী মোহাম্মদ উল্লাহ

শিকলবন্দী মোহাম্মদ উল্লাহ

দিনের পর দিন অর্ধাহারে, অনাহারে থেকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার উপক্রম হয়েছে মোহাম্মদ উল্লাহর। দুই বছর অন্ধকার ঘরে শিকলবন্দী জীবন কেটেছে তার। আহার, ঘুম, টয়লেট, গোসল সবই ছিল একস্থানে। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাসহ অনলাইন মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশিত হলেও আজ পর্যন্ত মোহাম্মদ উল্লাহকে উদ্ধারের জন্য এগিয়ে আসেননি কোনো সংস্থা।

বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সংবাদকর্মীরা ইউএনও বকুল চন্দ্র কবিরাজ, উপজেলা সমাজসেবা অফিসার কারিজুল ইসলাম এবং হিজলা থানার ওসি উত্তম কুমার দাস এর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে রক্ষা করার  আহ্বান জানানোর পরও  কাজের কাজ কিছুই হয়নি। 

প্রশাসনের সবাই বিষয়টি শুধু দেখছেন বলে আশ্বাস দিয়ে আসছেন। মোহাম্মদ উল্লাহর বাবার অভিযোগ নিজ ছেলে শিকলবন্দী জানি, চোখে দেখার ক্ষমতা তার নেই। এর আগেও কয়েক দফা প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ব্যর্থ এ অসহায় বাবা। তিনি এখন নিরুদ্দেশ বাড়ি ছাড়া।

পারিবারিক রোষানলের শিকার মোহাম্মদ উল্লাহ তালুকদার। একটানা দুই বছর থেকেছেন ছাগলের খোঁয়াড়ে। মোহাম্মদ উল্লাহ পাগল, অভিযোগ পরিবারের। সরকারি প্রশাসন যন্ত্র,  সমাজপতি বা সমাজের মোড়লেরা কিংবা মানবাধিকার সংগঠনের কেউ এগিয়ে আসেনি উদ্ধারে। 

বরিশাল জেলার হিজলা উপজেলার গুয়াবাড়িয়া গ্রামের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অহিদুল আলম তালুকদারের ছেলে মোহাম্মদ উল্লাহ। উচ্চ শিক্ষিত, বিদেশ ভ্রমণ করেছেন কয়েকবার। এখন তিনি পাগল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বাড়িতে ঢুকতেই সংবাদকর্মীদের প্রথমেই পরিবারের সদস্যদের বাধার মুখে পড়তে হয়। পরবর্তীতে বাধা উপেক্ষা করে মোহাম্মদ উল্লাহর কাছে পৌঁছাতে দেখা যায়, বেঁধে রাখা হয়েছে মোহাম্মদ উল্লাহকে। 

মোহাম্মদ উল্লাহর ছোট বোন লায়লার অভিযোগ, ভাই পাগলামি করে তাই বেঁধে রাখা হয়েছে।

মোহাম্মদ উল্লাহর অপর ভাই আহাম্মদ উল্লাহ ফোনে জানান, ভাই পাগল তাই বেঁধে রাখা হয়েছে। পাগল না হলে আপন ভাইকে এভাবে বেঁধে রাখা হয়। 

মোহাম্মদ উল্লাহর মা রেবেকা বেগম এর সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তাকে পাওয়া যায়নি। মায়ের সন্ধান দিতে অপরাগতা প্রকাশ করেন পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা।

বাবা অহিদ মাস্টার রয়েছেন পলাতক। অজ্ঞাতস্থান থেকে তিনি ফোনে বাড়ির বিষয়ে শোনালেন রূপকথার গল্প। 

তিনি বলেন, আমার ছেলে মোহাম্মদ উল্লাহকে আগে বাঁচান। এভাবে ছেলেটিকে বন্দী করে রাখা হলে সে মারা যাবে।

বিষয়টি নিয়ে কথা হয় স্থানীয় অনেকের সঙ্গে। অহিদুল মাস্টারের (তালুকদার) পরিবার সম্পর্কে স্থানীয় কেউ মুখ খুলছেন না।

একাধিক ব্যক্তি জানান, বিষয়টি নিয়ে আলাপ করে লাভ নেই। এর সমাধান দিতে পারেনি এসপি, থানা পুলিশ, চেয়ারম্যান, মেম্বার এমনকি উপজেলা প্রশাসন। বিষয়টি হিজলা, মুলাদি, মেহেন্দিগঞ্জ, কাজিরহাটসহ বিভিন্ন প্রশাসন জানে। 

স্থানীয় ইউপি সদস্য ইব্রাহিম মোল্লা বলেন, বিষয়টি খুবই জটিল, মেম্বার হিসেবে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। 

গুয়াবাড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান শাহজাহান তালুকদার জানান, ওই পরিবার সম্পর্কে তার ধারণা নেই।

হিজলা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন ঢালী জানান, মোহাম্মদ উল্লাহ পাগল নন। তাকে পাগল সাজানো হয়েছে। আলম মাস্টারের সম্পত্তি এককভাবে ভোগ করার জন্য এ নাটক। 

তিনি ক্ষোভের সঙ্গে জানান, থানা পুলিশের কাছে গেলে সেখানেও পুলিশ একচোখা দৃষ্টিতে দেখছেন। মোহাম্মদ উল্লাহকে উদ্ধার করতে সক্ষম হলে বের হয়ে আসবে আসল রহস্য। 

মোহাম্মদ উল্লাহর ফুফু শুরমা বেগম জানান, বাবার বাড়ি যাওয়ার অধিকার নেই তার। শিকলবন্দী ছেলেটির কথা বলতে গেলেই কথায় কথায় চলে আসে তার এবং ভাতিজার উপর নির্যাতনের বিষয়টি। এখন আর ওই বাড়ির খোঁজ-খবর নেন না। ভাই অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অহিদুল আলম তালুকদার বাড়ি ছাড়া, নিরুদ্দেশ। বাড়িতে একটি আধা পাকা ঘর রয়েছে, সেটিও খালি। আর তার ছেলেকে শিকলবন্দী করে রাখা হয়েছে ছাগলের খোঁয়াড়ে। এ যে কি অমানবিক কাজ কাছে বিচার দেব? আমদের সমাজ এবং সমাজ ব্যবস্থায় এর কোনো বিহিত ব্যবস্থা নেই? নেই মোহাম্মদ উল্লাহর বাঁচার অধিকার? মোহাম্মদ উল্লাহকে বাঁচাবে কে?

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচ