শতবর্ষের প্রাক্কালে কলকাতার আত্মজ শেখ মুজিবুর রহমান
Best Electronics

শতবর্ষের প্রাক্কালে কলকাতার আত্মজ শেখ মুজিবুর রহমান

প্রকাশিত: ১৫:০৫ ১৭ মার্চ ২০১৯  

কবি হিসেবেই পরিচিতি অমিত গোস্বামীর। তবে উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও বেশ সুনাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এই লেখকের। পেশায় সাংবাদিক। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই ভারতে। তবে বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে বিশেষ টান। বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে উপন্যাস লিখে এরইমধ্যে সাড়া ফেলেছেন।

শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বাঙালির আবেগ অন্তহীন। আজ তার নিরানব্বইতম জন্মদিবস। 

বাঙালির নিজস্ব রাষ্ট্র বাংলাদেশের স্থপতি তিনি। সেদেশের জাতির পিতা। শিখর ছোঁয়া তার কীর্তি। বাংলাভাষায় তার সম্পর্কে যত শব্দ ছাপার অক্ষরে বেরিয়েছে তা আর কোনো প্রসঙ্গে প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু তার রাজনীতির পাঠ যে কলকাতা শহরের দান এ কথা কাউকে বলতে শুনিনি। শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম অবিভক্ত ভারতের বাংলা প্রদেশের ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমায়। বেড়ে ওঠা সে শহরেই এবং কিছুটা মাদারীপুরে। তার পরিবারের আস্থার শহর ছিল কলকাতা। 

১৯৩৪ সালে বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হওয়ায় বা ১৯৩৬ সালে চোখে গ্লুকোমা দেখা দেওয়ার সময় তার চিকিৎসা হয়েছিল কলকাতায়। চোখের অপারেশনও এই শহরে। ১৯৪১ সালে মেট্রিক পরীক্ষার পরে তার কলকাতায় পড়তে আসা। তার বছর তিনেক আগে তার সঙ্গে আলাপ তৎকালীন বাংলার নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী’র সঙ্গে এবং চিঠিপত্রে সংযোগ দৃঢ় হয়ে ওঠে। তিনি কলকাতায় এসে ভর্তি হন তৎকালীন ইসলামিয়া বর্তমানের মৌলানা আজাদ কলেজে। থাকতে শুরু করেন বেকার হোস্টেলে। সে সময় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী অখণ্ড বাংলার শ্রমমন্ত্রী। শেখ মুজিব কলকাতায় আসার পরে তার রাজনৈতিক শিক্ষাগুরু হয়ে ওঠেন তিনি। শেখ মুজিব তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইয়ে লিখছেন “ আমি ছিলাম শহীদ সাহেবের ভক্ত। ... তিনি যে সত্যি আমাকে ভালবাসতেন ও স্নেহ করতেন, তার প্রমাণ আমি পেয়েছি তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার দিন পর্যন্ত। 

... আমার জীবনে প্রত্যেকটা দিনই তার স্নেহ পেয়েছি। এই দীর্ঘদিন আমাকে তাঁর কাছ থেকে কেউ ছিনিয়ে নিতে পারে নাই এবং তার স্নেহ থেকে কেউই আমাকে বঞ্চিত করতে পারে নাই।“ 

শেখ মুজিবকে কিভাবে তিনি রাজনীতির শিক্ষা দিয়েছেন? এ প্রসঙ্গ অবতারণার পূর্বে স্বীকার করে নেওয়া ভাল যে শেখ মুজিবের স্বাভাবিক নেতৃত্বগুণ বাল্যকাল থেকেই ছিল। এই গুণ দ্রুত পরিস্ফুট হয়েছিল দুটি কারণে। প্রথমতঃ অসুস্থতার জন্যে তার শিক্ষার তিনটি বছর নষ্ট হওয়ায় শেখ মুজিব সহপাঠীদের চেয়ে বয়েসে বড় ছিলেন। স্বভাবতই ক্লাসের নেতৃত্ব তার হাতে বর্তেছিল। দ্বিতীয়তঃ তার শিক্ষিত পিতা শেখ লুৎফর রহমান কখনই তাকে গন্ডীবদ্ধ করতে চান নি। সব সময় তার রাজনৈতিক কর্মকান্ডে উৎসাহিত করেছেন, আলোচনা করেছেন এবং অর্থ যুগিয়েছেন। কাজেই এমন পরিমণ্ডল থেকে উঠে আসা তরুণের দরকার ছিল বড় একটি মঞ্চ ও জাতীয় রাজনীতি সম্পর্কে হাতেকলমে বাস্তব জ্ঞানলাভ। এই দুটি ক্ষেত্রে শহীদ সোহরাওয়ার্দী তাকে সমৃদ্ধ করলেন। ইসলামিয়া কলেজে জনপ্রিয়তা লাভ এবং নির্বাচনে জয়ী হওয়া খুব বড় কীর্তি নয়। কিন্তু ছাত্র সংগঠনের নেতা যখন মূল সংগঠনের নেতৃত্বলাভ করে সেটা অবশ্যই বিরাট কৃতিত্বের বিষয়। শেখ মুজিব প্রাদেশিক মুসলিম লীগ কাউনসিলের সদস্য হন ১৯৪৩ সালে। তার এই পদপ্রাপ্তির কারণ তিনটি। 

প্রথমতঃ সেই সময়ের দুর্ভিক্ষ বা মন্বন্তরে শহরে ‘কন্ট্রোল’ এর দোকান খোলা ও গ্রামে গ্রামে লঙ্গরখানা খুলে এই সমস্যার মোকাবিলা করার নেতৃত্বে ছিলেন শেখ মুজিব। তখন সিভিল সাপ্লাই মন্ত্রী ছিলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। এই ব্যাপারে তার সাহায্য ছিল অপরিসীম। 
দ্বিতীয়তঃ গোপালগঞ্জে পাকিস্তানের দাবিতে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে সংগঠিত হল ‘দক্ষিণ বাংলা পাকিস্তান কনফারেন্স”। 
তৃতীয়তঃ শেখ মুজিবের নেতৃত্বগুণে মুগ্ধ শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সুপারিশ। এই সদস্যপ্রাপ্তির কারনে শেখ মুজিব ডাক পেলেন দিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ সম্মেলন’-এ। 

এখানে তার অভিষেক ঘটল সর্বভারতীয় রাজনীতিতে। তিনি দেখলেন, বুঝলেন সর্বভারতীয় রাজনীতির ব্যাপ্তি। এরপরে ১৯৪৬ সালে এপ্রিলের শুরুতে জিন্নাহ সাহেব মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সদস্যদের সম্মেলন ডাকলেন। শেখ মুজিব স্পেশাল ট্রেনে শহীদ সাহেবের সাথে দিল্লি পৌঁছলেন। আলাপ হল জিন্নাহ সাহেবের সাথে। এই প্রাপ্তি তার অভিজ্ঞতায় নতুন মাত্রা সঞ্চার করল। সে বছরই ২৯ জুলাই জিন্নাহ সাহেব মুম্বাইতে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ কাউনসিলের সভা ডাকলেন। মুজিব পরীক্ষার কারণেই গেলেন না। জিন্নাহ সাহেব ১৬ অগাস্ট ঘোষণা করলেন ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে। সেইদিন তুমুল দাঙ্গা হল কলকাতায়। তারপরে নোয়াখালীতে, তারপরে বিহারে। মুজিব প্রথমে গেলেন বিহারে, তারপরে আসানসোলে এসে দুর্গতদের সেবা করলেন। তখন তিনি বাংলার মুসলিম লীগের বিশ্বাসযোগ্য নেতা। নিজের মানসিক উত্তরণ নিয়ে শেখ মুজিব তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে লিখেছেন “ শহীদ সাহেব ছিলেন, উদার, কোন সংকীর্ণতার স্থান ছিল না তার কাছে। ... আমি খুব রাগী ও একগুঁয়ে ছিলাম, কিছু বললে কড়া কথা বলে দিতাম। কারও বেশি ধার ধারতাম না। ... পূর্বে আমার দোষ ছিল, সোজাসুজি আক্রমণ করে বক্তৃতা করতাম। তার ফল বেশি ভাল হত না। উপকার করার চেয়ে অপকারই হত বেশি।“ নিজের কথায় এই পরিবর্তন তিনি এনেছিলেন ছাত্রাবস্থায়। যার ফলশ্রুতি তার ৭ মার্চ, ১৯৭১ এর ঐতিহাসিক ভাষণ যা বাংলাদেশের স্বাধীনতার সনদ। তিনি শিখেছেন শের এ বাংলা এ কে ফজলুল হকের কাছ থেকে। একদিন মুসলিম লীগ থেকে সদ্য বহিষ্কৃত এই নেতা মধ্যাহ্নভোজনে মুজিবকে ডাকলেন। তার কাছে গিয়ে মুজিব বুঝলেন আভ্যন্তরীণ দলাদলির কথা। যে মানুষ ১৯৪০ সালে লাহোর সম্মেলনে ‘পাকিস্তান’ প্রস্তাব রেখেছেন তিনিই আজ দল থেকে বাদ! তিনি শিখেছেন মহাত্মা গান্ধীর কাছ থেকে। মহাত্মা গান্ধী ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী’র সাথে দাঙ্গা থামাতে গেলেন ব্যারাকপুর। শেখ মুজিব মহাত্মা গান্ধী সম্পর্কে লিখছেন “ তার বক্তৃতা সেক্রেটারি পড়ে শোনালেন। সত্যই ভদ্রলোক জাদু জানতেন। লোকে চিৎকার করে উঠল, হিন্দু মুসলমান ভাই ভাই। সমস্ত আবহাওয়ার পরিবর্তণ হয়ে গেল এক মুহুর্তেই।“ অসাম্প্রদায়িকতার ও শৌর্যের শিক্ষা তিনি আরো পেয়েছিলেন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর কাছ থেকে। তিনি বারেবারে কথাটা স্বীকার করেছেন। তার মুগ্ধতা ছিল এই নেতার কর্মকান্ডে যা বাংলাদেশ সৃষ্টির সময়ে শেখ মুজিবের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রমাণিত।

শেখ মুজিব কী চেয়েছিলেন? তিনি চেয়েছিলেন স্বাধীন অখণ্ড বাংলা যার রাজধানী হবে কলকাতা। কলকাতা থেকে যে তাকে চলে যেতে হবে তিনি ঘুণাক্ষরেও ভাবেন নি। তিনি একজায়গায় আক্ষেপ করেছেন তার বাড়ি যেহেতু পাকিস্তানে, কাজেই তাকে তো যেতে হবেই। ঢাকা সম্পর্কে বলেছেন “ আব্বা, মা ও রেণুর কাছে কয়েকদিন থেকে সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা এলাম। পূর্বে দু’একবার এসেছি বেড়াতে। পথঘাট ভাল করে চিনি না।“ এখান থেকে বোঝা যায় তাকে ঢাকা শহরে নতুন করে আস্তানা গাড়তে হয়েছিল।

যে কোন রাজনৈতিক নেতার গড়ে ওঠার সময় তার ছাত্রজীবন। এ সময়েই ভিত তৈরি হয়। শেখ মুজিবের রাজনৈতিক ভিত গড়ে দিয়েছিল কলকাতা। এ’কথা তার আত্মজীবনীতে পরিস্ফুট। তাই রাষ্ট্রনায়ক শেখ মুজিবুর রহমানকে কলকাতা যদি তার আত্মজ বলে দাবি করে অত্যুক্তি হবে কি?

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর
 

Best Electronics