লেগুনার চাঁদাবাজরা কাটছে যাত্রীদের পকেট

লেগুনার চাঁদাবাজরা কাটছে যাত্রীদের পকেট

শফিকুল বারী ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২০:২২ ১২ জুন ২০১৯  

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

রাজধানীর কিছু এলাকায় লেগুনার লাগামহীন ভাড়া বৃদ্ধিতে অতিষ্ঠ যাত্রীরা। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে খেয়াল খুশি মতো দফায় দফায় ভাড়া বাড়লেও দেখার কেউ নেই। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন- চাঁদাবাজির কারণে বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে যাত্রীদের। আর প্রশাসনকে ম্যানেজ করে কিছু অসাধু রাজনীতিবিদ ও তাদের সহযোগী চাঁদাবাজরা এই ভাড়া বৃদ্ধি করে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। লেগুনার ফিটনেস না থাকলেও প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে প্রকাশ্যে চলছে এসব যানবাহন। 

রাজধানীর শ্যামপুরের জুরাইন রেলগেট থেকে যাত্রাবাড়ী, দয়াগঞ্জ, গুলিস্তান, মিডফোর্ড; অন্যদিকে শ্যামপুর ঢাকা ম্যাচ থেকে যাত্রাবাড়ী ও পোস্তগোলা থেকে সদরঘাট পর্যন্ত প্রতিদিন প্রায় ৪ শতাধিক লেগুনা ও হিউম্যান হলার চলাচল করে। 

জুরাইন-দয়াগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় ২ কিলোমিটার রাস্তায় লেগুনার ভাড়া ছিল ৫ টাকা। কয়েক মাস আগে তা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৮ টাকা। একইভাবে একই দূরত্বের যাত্রাবাড়ীর ভাড়াও প্রথম দফায় ৫ টাকা থেকে ৮ টাকা ও দ্বিতীয় দফায় ১০ টাকা করা হয়েছে। অন্যদিকে জুরাইন-মিডফোর্ডের ভাড়াও একইভাবে ১০ থেকে ১২ টাকা ও পরে ১৫ টাকা করা হয়েছে। 

অন্যদিকে জুরাইন-গুলিস্তান ও পোস্তগোলা-সদরঘাটের ভাড়া ১০ টাকা থেকে দুই দফায় বাড়িয়ে ১৫ টাকা করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকা ম্যাচ থেকে যাত্রাবাড়ীর ভাড়া ১০ টাকা থেকে এক ধাপে বাড়িয়ে করা হয়ছে ২০ টাকা। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, জুরাইন রেলগেট-যাত্রাবাড়ী-ঢাকা ম্যাচ পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮০টি লেগুনা চলাচল করে। এই রুটে প্রতিদিন গাড়ি প্রতি মালিকদের চাঁদা দিতে হয় ৫৫০ টাকা। এরমধ্যে যাত্রাবাড়ী যুবলীগ নেতা সায়েম খন্দকার ২৫০, মালিক সমিতি ১০০, নব্য শ্যামপুর থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আদম আলী ৫০, এই এলাকার এমপি জাতীয় পার্টির আবু হোসেন বাবলার ভাগিনা মাশুক (মামা বলে পরিচিত) ৮০ ও ঢাকা ম্যাচ এলাকার আরেক আওয়ামী লীগ নেতা ফজুকে চাঁদা দিতে হয় ৭০ টাকা। এই রুটে মাসিক চাঁদার পরিমাণ প্রায় ১৪ লাখ টাকা।

জুরাইন-দয়াগঞ্জ-গুলিস্তান রুটে প্রতিদিন চলাচল করে গড়ে ৭০টি গাড়ি। এ রুটে মালিক সমিতি ১০০, দয়াগঞ্জে আলমগীর ও রাসেল ৮০ এবং গুলিস্তানে মহসিন, নুর মোহাম্মদ ও হৃদয় ১৫০ টাকা করে প্রতিদিন প্রতি গাড়ি থেকে ২৩০ টাকা চাঁদা আদায় করে। এ রুটে প্রতিমাসে চাঁদা আদায় হয় প্রায় ৫ লাখ টাকা। জুরাইন-বাবুবাজার রুটে চলাচল করে গড়ে ৬০ থেকে ৭০টি হিউম্যান হলার। এখানে প্রতিদিন গাড়ি প্রতি নেয়া হয় ৪০০ টাকা। প্রতি মাসে চাঁদা আদায়ের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৯ লাখ টাকা। 

বাহাদুর শাহ পরিবহন মালিক সমিতি সূত্রে জানা যায়, এসব তারাই নিয়ন্ত্রণ ও ম্যানেজ করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন মালিক ও লেগুনাচালক জানান, চাঁদার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় চাঁদাবাজদের ইশারায় ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়। এ নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে প্রতিদিনই চালক ও হেলপারের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হয়। চাঁদাবাজরা এতই ক্ষমতাশালী যে, যাত্রীরা প্রতিবাদ করলেও কোনো প্রতিকার হয় না। বরং যাত্রীদের হেনস্থা হতে হয়।

সরেজমিনে যাত্রীদের সঙ্গে কথা বললে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, দফায় দফায় খেয়ালখুশি মতো ভাড়া বৃদ্ধি হলেও দেখার কেউ নেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট এক লেগুনাচালক জানান, এসব চাঁদার একটি অংশ দিয়ে নিকটস্থ থানা ও ট্রাফিক ইন্সপেক্টরদেরও (টিআই) ম্যানেজ করা হয়। ফলে অবাধে চলছে ফিটনেসবিহীন এসব গাড়ি।

যাত্রাবাড়ী যুবলীগ নেতা সায়েম খন্দকার অভিযোগ অস্বীকার করে ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়টি মালিক-শ্রমিক কমিটির। আমিতো কোনো কমিটিতে নেই। আমি এলাকার পঞ্চায়েতের সরদার। এলাকার সামাজিক ও মানবিক বিষয় নিয়ে কাজ করি। আমি এলাকায় ১টি মসজিদ, লাশ গোসল করানোর স্থান, জানাজার জায়গা ও একটি ব্লাড ডোনেশন সেন্টার ছাড়াও বিভিন্ন সমাজ সেবার কাজে জড়িত। কোনো একটি মহল আমার রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে এসব মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।

এ বিষয়ে স্থানীয় এমপি জাতীয় পার্টির আবু হোসেন বাবলার ভাগিনা মাশুক বলেন, যেকোনো লেগুনাচালক মালিককে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবেন, ব্যক্তিগতভাবে আমি কোনো চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নই। যুবলীগের সায়েম খন্দকার, আওয়ামী লীগ নেতা ফজু ও জাতীয় পার্টির লোকজন এসব চাঁদা সংগ্রহ করছে। 
তিনি আরো বলেন, এই রুটে কোনো লেগুনা নামাতে হলে সায়েমকে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়।

তবে অনেকবার মুঠোফোনে ঢাকা ম্যাচ এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা ফজু’র সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

এ বিষয়ে শ্যামপুর থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আদম আলী বলেন, আমি দয়াগঞ্জ ট্রাক-শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা। আমি লেগুনার চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নই। যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই সত্যি ঘটনা জানতে পারবেন। লেগুনার চাঁদাবাজি করছে সায়েম ও সোরাবের লোকজন।

বাহাদুরশাহ পরিবহন মালিক সমিতি’র সেক্রেটারি ফারুকের সঙ্গে বারবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি, তিনি ফোনও ধরেননি।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসআই/এস/এমআরকে