লাশের কফিন ঘাড়ে নিয়ে নৃত্য প্রদর্শন করাই তাদের পেশা

লাশের কফিন ঘাড়ে নিয়ে নৃত্য প্রদর্শন করাই তাদের পেশা

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৩:৩৩ ১৮ মে ২০২০   আপডেট: ১৩:৫৬ ১৮ মে ২০২০

ছবি: কফিন ডান্সার

ছবি: কফিন ডান্সার

মৃত্যু অতি প্রাকৃত এবং অবধারিত বিষয় হলেও মেনে নেয়া খুবই কষ্টের। সেই সঙ্গে প্রিয়জন হারানোর বেদনা যেন ভোলা যায় না কিছুতেই। সারা বিশ্বে মৃত্যু কষ্ট বা শোকের ব্যাপার হলেও একটি জাতির জন্য সেটি তেমনটা নয়। আফ্রিকার দেশ ঘানায় ব্যাপারটা একেবারেই অন্যরকম। 

সেখানে নতুন একটি ধারা চালু হয়েছে, যার মাধ্যমে মৃতদের বিদায় জানানো হয় নাচের মাধ্যমে। ফলে শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে অনেকটা স্ফূর্তির ছায়া। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এক ধরনের লোকেরদের ভাড়া পাওয়া যায়। যারা টাকার বিনিময়ে মৃত ব্যক্তির জন্য কান্নাকাটি করে। 

এদের রুদালি বলা হয়। ঘানায় তেমনই টাকার বিনিময়ে নৃত্যশিল্পী ভাড়া পাওয়া যায়। যারা মৃতদেহকে নিয়ে নাচানাচি করেন৷ মৃতের কফিন ঘাড়ে নিয়ে, ড্রামের তালে নাচতে নাচতে কবরস্থানে যান এই নৃত্যশিল্পীরা৷ তাদের সঙ্গে যোগ দেন পরিবারের সদস্যরাও।

লাশ ঘাড়ে নিয়ে নাচছেন তারাকালো স্যুট-টুপি, জুতা আর সাদা শার্ট পরে ছয়জন একেকটি কফিন বহন করে নাচতে থাকেন। দলের মেয়েদের পরনে থাকে সাদা পোশাক। পেছনে ঢোল নিয়ে তারা বাজাতে থাকেন৷ মৃতদের আত্মীয়রা জানিয়েছেন, যখন আপনার প্রিয় একজনকে তার শেষ ঠিকানায় নিয়ে যাওয়া হয়, তখন এই মানুষগুলো নাচগান করে।  

কফিন কাঁধে করে রীতিমত নেচেই যাচ্ছেন কিছু আফ্রিকান যুবক। সম্প্রতি এমনিই কিছু ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। অনেক সময় হয়তো আপনারও মনে হয়েছে অন্যান্য ভাইরাল হওয়া ভিডিওর মতো কোনো নাটকের দৃশ্য এটি। একেবারেই না, এর নেপথ্যে রয়েছে করুণ এক কাহিনী। যা হয়তো আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না।  

এই নাচ-গানের রীতি আপাতদৃষ্টিতে মজার বলে মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে একটি গভীর জীবনদর্শন। এটি নিছক আমোদ-প্রমোদমূলক কোনো অনুষ্ঠান নয়। আফ্রিকার দুর্ভিক্ষ আর দারিদ্রপ্রবণ দেশগুলোর মধ্যে ঘানা অন্যতম। তারা বিশ্বাস করেন, একজন মানুষ তার জীবদ্দশায় প্রচুর দুঃখ-কষ্ট নিয়েই বেড়ে ওঠে, দরিদ্র দেশে তো এমনটাই হয়! 

কফিন নিয়ে শুয়েও নাচছেন তারাতাই এই প্রাচীন প্রথার মধ্য দিয়ে মৃত ব্যক্তির আত্মীয় পরিজনেরা বিশ্বাস করেন, তাদের প্রিয়জনের বিদায় যাত্রাকে খানিক আনন্দময় করে তোলা যেতে পারে। তারা বিশ্বাস করেন, জীবনের সর্বশেষ পথটুকু নাচগানের মধ্যে দিয়ে আনন্দ করতে করতে গেলে, জীবিতকালে পাওয়া দুঃখ-কষ্টের বোঝা খানিক ম্লান হতে পারে পরজন্মে।   

২০১৫ সালে প্রথম ইউটিউবের একটি চ্যানেলে এমন একটি ভিডিও প্রকাশ পায়। একজন মৃতের আত্মীয় তার প্রিয়জনের শেষযাত্রা ভিডিও করেছিল। জানেন কি? কফিন ডান্সারদের আসল পরিচয়। দীর্ঘদিন প্রশিক্ষণ নেয়ার পর তারা এই কাজে আসে। এই প্রাচীন প্রথাটি নিয়ে স্বল্পদৈর্ঘ্যের একটি তথ্যচিত্র প্রকাশ করে বিবিসি। 

সেখানে জানা যায় এই মৃতের কফিন কাঁধে নিয়ে যারা নাচ করেন তারা সবাই পেশাদার। শেষযাত্রায় নাচাটাই তাদের পেশা। তাদের বলা হয় ডান্সিং পলবিয়ারার। এদের কাজই হলো যখন কেউ মারা যায়, তখন শেষকৃত্যের জন্য মৃতব্যক্তির মরদেহ নেয়ার সময় নাচানাচি করা। 

মৃত ব্যক্তির বিদায় অনুষ্ঠানে সবাই আনন্দ করেএতে মৃত ব্যক্তির বিদায়টা আনন্দের হয় বলে মনে করে এ দলটি। ২০০৭ সালে ঘানার আক্রায় নানা ওতাফ্রিজা পলবিয়ারিং নামের এক প্রতিষ্ঠান খোলেন বেঞ্জামিন আইদু। গান ও নাচের মাধ্যমে শেষকৃত্য অনুষ্ঠান আয়োজন করে মৃত ব্যক্তিকে সম্মান জানানোর প্রক্রিয়া শুরু করেন। 

আইদুরের দাবি, কিছু মানুষ এখন আর কাঁদতে চায় না। অন্যরা কাঁদে। তবে তারা কাঁদতে চান বা না চান, আমরা সবাইকে খুশি করি। আমরা যা করি, তাতে অন্যরা খুশি হয়। নতুন ধরণের এই উদ্যোগের মাধ্যমে অন্তত এক হাজারের বেশি তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান হয়েছে। 

উদ্যোক্তা বেঞ্জামিন জানিয়েছেন, মৃতদেহের সঙ্গে নাচানাচি করার বিষয়টি ছড়িয়ে পড়েছে। এর মাধ্যমে দেশের বেকারত্ব কিছুটা কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। এছাড়াও ঘানার অধিবাসীরা এমন সব কফিন তৈরি করেন যাতে সেই মৃত ব্যক্তির জীবনযাত্রা, তার স্বপ্ন, আবেগ ও সামাজিক মর্যাদা ফুটে ওঠে। 

সেখানকার রাজধানী আক্রায় রয়েছে এমন অনেক কফিন কারখানা। মৃত ব্যক্তির বা তার পরিবারের ইচ্ছায় তৈরি হয় এসব কফিন। গাড়ি, ঘর, মাছ, বিভিন্ন ফল, নৌকা, প্লেন বিভিন্ন জিনিসের আদলে তৈরি হয় এসব কফিন। এসব কফিন বানাতে কাঠমিস্ত্রিরা সাধারণ যন্ত্রপাতিই ব্যবহার করে থাকেন।

এখানে দেখুন কফিন ডান্সারদের নাচের ভিডিও>>>

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস