Alexa ‘লাল গির্জা’র ঘণ্টা দিনে সাতবার বেজে ওঠার রহস্য কী? 

এশিয়ার দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ গির্জা

‘লাল গির্জা’র ঘণ্টা দিনে সাতবার বেজে ওঠার রহস্য কী? 

শামীম আহমেদ, বরিশাল প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১২:১৬ ১৭ নভেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৫:৩৬ ১৭ নভেম্বর ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

প্রেমিকা মুনিয়ার সঙ্গে কবি জীবনানন্দ দাশের প্রথম দেখা হয়েছিলো কোথায় জানেন কি? বরিশালের অক্সফোর্ড মিশনের গির্জায়। মুনিয়ার মা ওই গির্জায় সেবিকার কাজ করতেন, এমনটিই কথিত রয়েছে। শুধু কি তাই? বরিশালের পুরনো লাল গির্জাটির সঙ্গে জীবনানন্দের সম্পর্কও ছিল নিবিড়। ছাত্রাবস্থায় অক্সফোর্ড মিশনের ছাত্রাবাসে থাকতেন তিনি। ফলে এখানকার ফাদার ও মাদারদের সঙ্গেও ছিল তার ঘনিষ্ঠতা। জীবনানন্দের বাড়ি থেকে দু-কদম এগুলেই পামগাছ ঘেরা অক্সফোর্ড মিশনের গির্জাটির সীমানা। 

গাছের ফাঁক দিয়ে তাকালেই দেখা যায় টেরাকোটা রঙের সুউচ্চ আর্চওয়ে চার্চ। এশিয়ার ব্যতিক্রমী এ গির্জার পাশেই রয়েছে একটি বেল টাওয়ার। মূল গির্জার আদলেই গড়ে তোলা বেল টাওয়ারটিতে প্রার্থনার পাঁচ মিনিট আগে ঘণ্টাধ্বনি বাঁজানো হয়। এই ঘণ্টার শব্দ শুনেই ভক্তরা এখানে প্রার্থনার জন্য আসেন। বেল টাওয়ারের বেল স্থাপনের খরচ বহন করেছিলেন ফাদার স্ট্রং। তিনি ছিলেন বিখ্যাত ক্রীড়াবিদ। বিভিন্ন খেলায় পাওয়া তার সম্মানী পুরস্কারের অর্থ দিয়ে তিনি ওই বেল স্থাপন করেছিলেন।

দেশের অন্যতম অভিজাত ও সুন্দর গির্জা হল বরিশালের এপিফানী গির্জা। বাংলাদেশ চার্চ বা অক্সফোর্ড মিশন বরিশাল। এপিফানী উপাসনালয় এ গির্জার কেতাবি নাম। ১১৪ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী এ গির্জাটি শুধু সুন্দরই নয়, এশিয়া মহাদেশের দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ গির্জা এবং দেশের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন পুরাকীর্তিগুলোর একটি। 

পুকুর পাড়লাল গির্জার অবস্থান

এর মূল নাম এপিফানী গির্জা হলেও স্থানীয় সাধারণের কাছে অক্সফোর্ড মিশন চার্চ নামেই বেশি পরিচিত। বরিশাল সদরের প্রাণকেন্দ্রে বগুড়া রোডের ধারে এর অবস্থান। এটি ‘লাল গির্জা’ নামেও পরিচিত। গির্জাটি একতলা হলেও উচ্চতা পাঁচতলা ভবনের সমান প্রায় ৫০ ফুট। গির্জার মূল প্রার্থনা কক্ষটির আয়তনও প্রায় ৫০ ফুট। সিস্টার এডিথের স্কেচ ও ডিজাইন অনুসারে ফাদার স্ট্রং এ গির্জার নকশা চূড়ান্ত ও উন্নত করেন। 

এ কাঠামোর প্রধান প্রকৌশলী ছিলেন ফ্রেডেরিক ডগলাস (ব্রিটিশ)। মূলত গ্রিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এ গির্জার প্রধান আকর্ষণ বিশাল ও নান্দনিক প্রার্থনা কক্ষ। এর ছাদ কাঠের তৈরি, আর ফ্লোরে সুদৃশ্য মার্বেলের টাইলস্। মূল বেদীর ওপর একটি বড় ক্রশ স্থাপিত রয়েছে। এমন স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যের গির্জা আর দু’টি চোখে পরেনা।

চল্লিশটি খিলানের ওপরে এ গির্জাটি দাড়িয়ে রয়েছে। ৩৫ একর জমির ওপরে উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা। তেরটি ছোট-বড় পুকুর, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, আবাসিক ছাত্র হোস্টেল, ফাদার ও সিস্টারদের আবাসন, পাঠাগার ও হাসপাতাল নিয়ে এ চার্চটি অবস্থিত। দিনে সাতবার এশিয়ার সবচেয়ে বড় ঘণ্টা (গির্জার ঘণ্টা) বেজে ওঠে এ চার্চে। সুদৃশ্য ঘণ্টা বেল টাওয়ারের নিচেই চার্চের ছোট্ট অফিস। 

লাল গির্জার ভিতরের দৃশ্যইতিহাস যা বলে...

১৯০৩ সালে এ চার্চের প্রথম ধাপের কাজ সম্পন্ন হয় ও একই বছরের ২৬ জানুয়ারি এটি উদ্বোধণ করা হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপের কাজ ১৯০৭ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। লাল ইট দিয়ে নির্মিত শতবর্ষী এ চার্চ চমৎকার রক্ষণাবেক্ষণের সুবাদে আজো ঝকঝকে। তবে জনসাধারণের জন্য এখানে প্রবেশ সংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে। 

গির্জাটি এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যাতে বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগেও এর স্থাপত্যশৈলী বিনষ্ট না হয়। ১৯৬০ ও ১৯৭০ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়েও গির্জাটি সম্পূর্ণ অক্ষত থেকে যায়। চার্চের কেয়ারটেকার ডেইলি বাংলাদেশকে জানান, ধর্মীয় সাপ্রদায়িক পরিবেশে নিরাপত্তাজনিত কারণে নিজস্ব সম্প্রদায়ের মানুষ ব্যতীত জণসাধারণের জন্য চার্চের সীমানার ভেতর প্রবেশাধিকার নিষেধ। 

এ গির্জার সব নির্মাণ সামগ্রীই বাংলাদেশের। শুধু ভেতরের চারটি বেদির মার্বেলপাথর আনা হয়েছিল ভারতের কলকাতা ও বড় ক্রুশটি প্যালেস্টাইনের বেথলেহেম থেকে আনা। এটি দেশীয় মাটি দিয়ে তৈরি আস্তনে পোড়া লাল শক্ত ইট দিয়ে নির্মিত হয়েছিল। এর সঙ্গে রড, বালু, সিমেন্ট, কাঠ এবং নির্মাণশ্রমিক সবই ছিলো বাংলাদেশের। আজো এর আদি ও অকৃত্রিম রূপের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।  

লাল গির্জার সৌন্দর্যলাল গির্জা ও লুসি হল্ট

লুসি হল্টকে নিশ্চয়ই সবাই চেনেন! তার পুরো নাম লুসি হেলেন ফ্রান্সিস হল্ট। জন্ম ১৯৩০ সালের ১৬ ডিসেম্বর ইংল্যান্ডের সেন্ট হ্যালেন্সে। বৃটিশ নাগরিক লুসি হল্ট ১৯৬২ সালে ৩০ বছর বয়সে সেবায়েত হিসেবে বরিশাল অক্সফোর্ড মিশন হাসপাতালে আসেন। দুই বছর পর দেশে ফেরার কথা থাকলেও এখানকার প্রকৃতি, মানুষ ও মাটির ভালোবাসায় আটকে যান। ৫৭ বছর ধরে চলছে লাল সবুজের দেশের সঙ্গে তার মিতালী। গভীর ভালোবাসা থেকে রপ্ত করেছেন পুরোপুরি বাঙালিয়ানা। হৃদয় জুড়ে এখন তার বাংলাদেশের প্রেম।

লুসির মতে, বাংলাদেশের জন্ম ১৬ ডিসেম্বর। আমার জন্মও এই দিনে। কাকতালীয় হলেও বিষয়টি আমাকে খুব ভাবায়। হয়তো এটা ঈশ্বরেরই ইচ্ছা। আমার জীবনের একটা গভীর যোগসূত্র রয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে। ৫৭ বছর ধরে বাংলাদেশে কাজ করছেন তিনি। তার কর্মক্ষেত্রের বেশিরভাগ সময় কেটেছে বরিশালের অক্সফোর্ড মিশনে। মহান মুক্তিযুদ্ধের নিভৃতচারী নিরব স্বাক্ষী এ মানুষটি যুদ্ধাহত মানুষের সেবা দিয়েছেন অকাতরে। তাইতো এখানকার মায়ায় বরিশালের মাটিতেই মরতে চান লুসি। 

লুসি হল্টঅক্সফোর্ড মিশন হোস্টেলের একটি ছোট কামরায় বাস করেন এই বৃটিশ নাগরিক। মিশনের ভিতরে কবরস্থানে লুসি তার নিজের কবরের জায়গাও ঠিক করে রেখেছেন। লুসিকে শান্ত, দরদী ও পরোপকারী হিসেবেই মিশনের সবাই জানেন। অক্সফোর্ড মিশনের ব্যবস্থাপক বেনডিক্ট বিমল ব্যাপারি জানান, বৃটিশ নাগরিক হিসেবে মাসে ৭০ পাউন্ড ভাতা পান লুসি। 

যার প্রায় সবটাই অসহায়দের মাঝে বিলিয়ে দেন লুসি। তিনি আরো বলেন, লুসির সঞ্চয় বলতে কেবলই এ দেশের ভালবাসা। তিনি সব ধর্ম শ্রেণি ও পেশার মানুষকে সম্মান করেন, ভালোবাসেন। মিশনের পরিচর্যাকারী ঊষা দাস লুসির ছাত্রী। ঊষা বলেন, প্রথম শ্রেণিতে পড়াশুনা অবস্থায় প্রথম সিস্টার লুসিকে দেখি। তিনি আমাদের স্কুলে পড়াতেন। তিনি আগের মতোই শান্ত আর পরোপকারী এবং দরদী মানুষ।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস