লন্ডন টাওয়ারে এখনো দেখা মেলে অষ্টম হেনরির দ্বিতীয় স্ত্রীর আত্মা

লন্ডন টাওয়ারে এখনো দেখা মেলে অষ্টম হেনরির দ্বিতীয় স্ত্রীর আত্মা

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:৩২ ১৩ মার্চ ২০২০   আপডেট: ১৬:৩৪ ১৩ মার্চ ২০২০

লন্ডন টাওয়ার (ছবি: ইন্টারনেট)

লন্ডন টাওয়ার (ছবি: ইন্টারনেট)

হরর মুভি দেখতে কে না পছন্দ করেন। অথবা গা শিওরে ওঠা হরর গল্প। কয়েকজন বন্ধু এক সঙ্গে হলেই সারা রাত আড্ডা আর হরর মুভি বেশ জমে। যতই ভয় থাকুক না কেন হরর মুভির নেশা কাটানো কিন্তু কষ্টই বটে।

আপনি কি হরর মুভি দেখতে পছন্দ করেন? যদিও এগুলো সাজানো থাকে। বাস্তবে যদি এর অভিজ্ঞতা নিতে চান তাহলে ইংল্যান্ড আপনার জন্য উপযুক্ত জায়গা। এখানকার ভৌতিক স্থানগুলো আপনাকে নিরাশ করবে না। ইংল্যান্ডজুড়ে রয়েছে অনেক ভৌতিক জায়গা। আজ আপনাদের জানাবো সেখানকার ভৌতিক জায়গাগুলোর খোঁজ।  

লন্ডন টাওয়ার

লন্ডন টাওয়ারের গল্পটা শুরু হয়েছিল প্রায় ৯৫০ বছর আগে। যখন এখানে দেশদ্রোহিতা এবং ব্যাভিচারের অভিযোগে ১৫৩৬ সালে অষ্টম হেনরির দ্বিতীয় স্ত্রী অ্যান বোলেনের শিরশ্ছেদ করা হয়েছিল। অনেকেই দাবি করেন সেন্ট পিটার অ্যাড ভিঙ্কুলার চার্চে অ্যানের আত্মাকে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে। এছাড়া ১৮৬৪ সালে লন্ডন টাওয়ারের একজন প্রহরী অ্যানকে দেখেছিলেন বলে দাবি করেন। 

টাওয়ারের সবচেয়ে বিখ্যাত গল্প হলো চতুর্থ অ্যাডওয়ার্ডের দুই ছেলের হারিয়ে যাওয়া। তারা তাদের চাচা তৃতীয় রিচার্ডের সঙ্গে এখানে এসেছিলেন। এরপর তাদের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। অনেকে মনে করেন যে রিচার্ড তাদের হত্যা করেছিল। তবে তাদের ভাগ্যে আসলে কি ঘটেছিল তা আজও রহস্যই থেকে গেছে। প্রায়ই সাদা গাউন পরা দুটি অল্প বয়সী ছেলেকে এখানে দেখতে পান প্রহরীরা।   

লন্ডনের টাওয়ারের ভেতরে চিতাবাঘ, সিংহ, হাতির মূর্তি রাখা হয়েছিল। ১৮১৬ সালে একজন প্রহরী দাবি করেন যে, তিনি এগুলোর সঙ্গে একটি ভাল্লুক দেখেছেন। তবে সেটা মূর্তি ছিল না। জীবন্ত ছিল। এমনকি তিনি তার বেয়নেট দিয়ে এটিকে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন। তবে মুহূর্তেই তা উধাও হয়ে যায়। এর কিছুদিন পরই সেই প্রহরী হঠাৎ মারা যান। 

বোর্লে রেক্টেরি, এসেক্স 

এ জায়গাটি ইংল্যান্ডের সর্বাধিক ভুতুড়ে বাড়ি হিসেবে পরিচিত। এখানে মাথাবিহীন এক ঘোড়সওয়ারকে প্রায়ই ঘোড়া চালিয়ে যেতে দেখা যায়। ১৮৬২ সালে নির্মিত এই বিল্ডিংটি একটি গুজবের শিকার হয়েছিল। এছাড়া এখানে অলৌকিকভাবেই ঘণ্টা বাজার আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায়। অথচ পুরো রেক্টেরিতে কোনো ঘণ্টা নেই। এ গল্পগুলো মিডিয়া এবং অলৌকিক তদন্তকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। মনস্তাত্ত্বিক গবেষক হ্যারি প্রাইস ১৯২৯ সালে এখানে আসেন। পরবর্তীতে গবেষণার জন্য ১৯৩৭ সালে তিনি রেক্টরিটি এক বছরের লিজ নেন। তখন তিনি অনেক ঘটনার সম্মুখীন হন। হঠাৎ করে ফুলদানি পড়ে ভেঙে যাওয়া। অথবা এমনিতেই আয়না ভেঙে যাওয়া। এসব কিছুই হ্যারি প্রাইস নথিভুক্ত করেছিলেন। দুই বছর পরে রেক্টরিটি আগুনে পুড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ১৯৪৪ সালে এটি ভেঙে ফেলা হয়।

বোর্লে রেক্টেরি, এসেক্স 

কুলোডেন ব্যাটেলফিল্ড, স্কটল্যান্ড

কুলোডেনে প্রায় ২৭৫ বছর আগে যুদ্ধ হয়েছিল। তবে স্থানীয়দের মতে এখনো সেখানে তরোয়ালের আওয়াজ, গুলির বর্ষণ এবং ধ্বংসস্তূপ থেকে আহত মানুষের আহাজারি শুনতে পাওয়া যায়। এছাড়া সৈন্যদের যুদ্ধ করতে দেখা যায়। চার্লস অ্যাডওয়ার্ড স্টুয়ার্টকে সিংহাসনে বসানোর জন্য জ্যাকবীয়রা ১৭৪৬ সালে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধ করেছিল। এ যুদ্ধ জয় উইলিয়াম তৃতীয় এবং মেরি দ্বিতীয়কে ক্ষমতায় ধরে রাখতে সহায়তা করেছে। ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতাচ্যুত জেমস দ্বিতীয়, সপ্তম সমর্থকরা তাকে এবং তার পরবর্তী বংশধরদের সিংহাসনে পুনরুদ্ধারের জন্য লড়াই চালিয়ে গিয়েছে। তাদের এ প্রচেষ্টাই কুলোডেনকে রক্তাক্ত পরিণতি দিয়েছিল। যেখানে চার্লস অ্যাডওয়ার্ড স্টুয়ার্টের নেতৃত্বে জ্যাকবাইট সেনাবাহিনী দ্বিতীয় রাজা জর্জের অনুগত হ্যানোভারীয় বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করে। এতে তারা নির্মমভাবে পরাজিত হয়। এ যুদ্ধে প্রায় এক হাজারেরও বেশি জ্যাকবাইট সৈন্য নিহত হয়েছিল। 

কুলোডেন ব্যাটেলফিল্ড, স্কটল্যান্ড

জামাইকা ইন, কর্নওয়াল

নির্জন বোডমিন মুরের এ জায়গাটি মূলত রেস্ট হাউজ হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল। সমুদ্র উপকূলে হওয়ায় চোরাচালানকারী এবং জলদস্যুদের তাদের কাজের জন্য হয়ে ওঠে আদর্শ জায়গা। ১৮ শতাব্দীর দিকে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে এখন এটি বিশ্বের ভৌতিক জায়গার তালিকায় থাকা অন্যতম একটি। আশেপাশের বাসিন্দারা দাবি করেন তারা এখানে ঘোড়ার খুরের শব্দ পান। এছাড়া বিচিত্র এক ভাষায় অনেকে গল্প করছে এমনও শোনেন তারা। পাশাপাশি খালি এ রেস্ট হাউজে যেন কেউ ঘুরে বেড়াচ্ছে নিজের মনে। একজনকে করিডোর দিয়ে পায়চারি করতে দেখেছেন অনেকে।   

স্থানীয় এক জনশ্রুতি অনুসারে, একবার এক দর্শনার্থী এখানে থাকতে এসেছিলেন। এর পরদিন তার মরদেহ পাওয়া যায়। তবে তার মৃত্যুর কারণ এখনো একটি রহস্য। ১৯১১ সালে এখানে এক ব্যক্তিকে দেখা যায়। যিনি এই রেস্ট হাউজের বাইরে বসে থাকতেন। কখনোই সেখান থেকে উঠতেন না। কারো সঙ্গে কথাও বলতেন না। তার পোশাক এবং আচরণ সে সময়কার মানুষদের মতো ছিল না। অনেকে বিশ্বাস করেন যে এটি কোনো মৃত ব্যক্তির ভূত।

জামাইকা ইন, কর্নওয়াল

থিয়েটার রয়্যাল ড্র্যারি লেন, লন্ডন

লন্ডনে সবচেয়ে প্রাচীনতম থিয়েটার হিসেবে পরিচিত ড্র্যারি লেন। ব্যবহারের পাশাপাশি এটি বিশ্বের সবচেয়ে ভুতুড়ে থিয়েটারের স্থানও দখল করে রেখেছে।  এখানে ম্যান ইন গ্রে নামের একজনকে দেখা যায়। যিনি ট্রাইক টুপি, উইগ এবং লম্বা ধূসর রঙের কোটে উপস্থিত হন। ১৮৪০ সালে থিয়েটারের ভেতরে বুকে ছুরি বিদ্ধ অবস্থায় তার লাশ পাওয়া যায়। তিনি ছিলেন এই থিয়েটারের মেকআপ ম্যান। এছাড়া জোসেফ গ্রিমাল্ডিকেও এখানে ভাসমান অবস্থায় মাঝে মাঝেই দেখা যায়। গ্রিমাল্ডি ছিলেন আধুনিক ক্লাউনিংয়ের জনক। তবে থিয়েটারে ভূতের উপস্থিতি এখানকার পারফরম্যান্সের জন্য শুভকামনা বলে মনে করা হয়।

থিয়েটার রয়্যাল ড্র্যারি লেন, লন্ডন

বেরি পোমেরো ক্যাসল, ডিভন

ডিভনের এই রোমান্টিক ধ্বংসযজ্ঞ জায়গাটি ব্রিটেনের অন্যতম ভুতুড়ে দুর্গ। পঞ্চদশ শতাব্দীতে নির্মিত এটি অ্যাডওয়ার্ড সিমুরের বাড়ি। সিমুর ছিলেন ষষ্ঠ অ্যাডওয়ার্ডের লর্ড প্রোটেক্টর এবং হেনরি অষ্টমীর তৃতীয় স্ত্রী জেন সিমারের ভাই। ১৭ শতাব্দীর পর থেকে এটি ভিক্টোরিয়ান দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। লেডি মার্গারেট পোমেরয়ে এ দুর্গের অন্ধকারে বন্দী অবস্থায় অনাহারে মারা গিয়েছিল। তার দুই ভাই তাকে এখানে বন্দী করে রাখে। তার মৃত্যুর পর এখানে তার প্রিয় ঘোড়াকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। এছাড়া ২০১৮ সালে কয়েকজন দর্শনার্থী কিছু ভুতুড়ে ঘোড়া চালকের ছবি তুলেছেন বলে দাবি করেন। লেডি মার্গারেটেকেও মাঝে মাঝে দেখা যায় ঘুরতে দেখেছেন অনেকে।

বেরি পোমেরো ক্যাসল, ডিভন

হ্যাম্পটন কোর্ট প্রাসাদ, সারে

২০০ বছরেরও বেশি পুরনো এই রাজকীয় প্রাসাদটি নানা ইতিহাসের সঙ্গে প্রচুর ভুতুড়ে গল্পের জন্য বিখ্যাত। এ প্রাসাদে অষ্টম হেনরির দুই স্ত্রী থাকতেন। হেনরির তৃতীয় স্ত্রী জেন সিমুর ১৫৩৭ সালে তাদের ছেলের জন্মের পরেই এ প্রাসাদে মারা যান। জনশ্রুতি রয়েছে যে তিনি মারা যাওয়ার পরও তাকে এ প্রাসাদে বিভিন্ন সময় দেখা যেত। বেশিরভাগ সময় তাকে সিঁড়িতে বসে থাকতে দেখেছেন প্রাসাদের অনেকেই।

এছাড়া হেনরির পঞ্চম স্ত্রী ক্যাথরিন হাওয়ার্ডকে ১৫১৪ সালে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে গ্রেফতার করে এখানে বন্দী রাখা হয়েছিল। ১৫৪২ সালে তার শিরশ্ছেদ করা হয়। এরপর থেকেই তার যন্ত্রণাদায়ক কান্নার আওয়াজে অনেকবারই ভীত হয়েছে এ প্রাসাদ। ১৯৯৯ সালে একই দিনে আলাদা দলের দুই নারী দর্শনার্থী প্রাসাদের ভেতর একই জায়গায় অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। ২০০৩ সালে এর ভেতরের একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, একটি কঙ্কাল ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটি আগুনের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে।

হ্যাম্পটন কোর্ট প্রাসাদ, সারে

এছাড়া ইংল্যান্ডের আরো অনেক ভৌতিক জায়গা রয়েছে। চাইলেই সেখানে গিয়ে থেকে আসতে পারেন। দেখা মিলতেও পারে অষ্টম হেনরির স্ত্রীদের সঙ্গে। অথবা ১৫শ’ শতাব্দীর জলদস্যুদের সঙ্গে। এসব জায়গার গা ছমছমে গল্পের চেয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা আরো ভালো হবে তা আশা করাই যায়।

সূত্র: হিস্ট্রিএক্সট্রা

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআর