লকডাউন তোলার সিদ্ধান্ত সময়োচিত

লকডাউন তোলার সিদ্ধান্ত সময়োচিত

প্রকাশিত: ১৬:০৫ ২ জুন ২০২০  

পরিচিতি ও কাব্যচর্চা দুই বাংলায়। মূলতঃ কবি হলেও উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও পাঠকমহলে জনপ্রিয়। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই কলকাতায়। কর্পোরেটের চাকরি ছেড়ে সাহিত্যজগতে আত্মপ্রকাশ বেশ দেরিতেই। কিন্তু অগ্রগমন দ্রুত। এরইমধ্যে ১০ টি গদ্য ও উপন্যাস এবং ৪ টি কবিতা সংকলন প্রকাশিত তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আলতাফ, হুমায়ূন ও বঙ্গবন্ধুর কলকাতার জীবন অবলম্বনে লেখা উপন্যাস ‘মহানির্মাণ’।

কাকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হবে? অর্থনীতি, নাকি মানুষের প্রাণ? বিশ্বজুড়ে এটাই এখন সবচে বড় প্রশ্ন। করোনার প্রভাবে প্রায় গোটা বিশ্বেই লকডাউন জারি হয়েছিল। তার জেরে অর্থনীতি কার্যত ধসে পড়েছে। ফলে করোনার প্রকোপ না কাটলেও ক্রমশ লকডাউন তুলতে শুরু করেছে বিভিন্ন দেশ। যা নিয়ে বিতর্কও চলছে যথেষ্ট।

অ্যামেরিকায় সংক্রমণের হার এখনও কমেনি। কিন্তু দেশের জনগণ রাস্তায় বেরোতে শুরু করেছেন। প্রতিবাদ সভায় মাস্ক ছাড়াই অংশগ্রহণ করেছেন। নিউ ইয়র্কের মতো করোনাপ্রবণ জায়গায় রোববার রৌদ্রস্নান করতেও বেরিয়ে পড়েছিলেন মানুষ। হোয়াইট হাউসে করোনা টাস্ক ফোর্সের কো-অর্ডিনেটা ডেবোরা বার্ক্স লকডাউন হাল্কা করে দেয়ার বিরুদ্ধেও জোড়ালো সওয়াল করে। ট্রাম্প অবশ্য জানিয়েছেন, অর্থনীতি সচল রাখতে লকডাউন তুলতেই হবে। লকডাউন নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে অস্ট্রেলিয়াতেও। ধীরে ধীরে সেখানে স্কুল-কলেজ খোলার প্রস্তুতি শুরু করেছে সরকার। বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছে, এত তাড়াতাড়ি স্কুল-কলেজ খুলে দিলে নতুন করে করোনা সংক্রমণের পরিস্থিতি তৈরি হবে। ফলে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত। জার্মানিতেও স্কুল-কলেজ খোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এদিকে হু–এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, একবারে যদি এই লকডাউন তুলে নেওয়া হয়, তাহলে চরম ভোগান্তির মুখে পড়তে হবে সব দেশকেই। লকডাউন তুললেই দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে করোনা ভাইরাস। তাই এখনই মানুষকে বাইরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে বলা উচিত হবে না বলেই মনে করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। হু–এর চিকিৎসা বিষয়ক সংস্থার প্রধান ট্রেড্রস আধানম জানিয়েছেন, ‘‌হু দেখতে চায় বিশ্বের বেশিরভাগ জায়গায় লকডাউন উঠে গিয়েছে। কিন্তু হঠাৎ করে লকডাউন উঠে গেলে রোগের প্রকোপ বাড়তে পারে। যদি লকডাউন তুলে নেয়ার পর পরিস্থিতি ঠিক করে সামলানো না যায়, তাহলে হিতে বিপরীত হবে। করোনভাইরাস মহামারির প্যার্টান বা আক্রান্তের সংখ্যা নির্দেশকারী গ্রাফে এর ওঠানামার চিত্রটা দেখলে বোঝা  যাবে, সংক্রমণের বিষয়টা ঠিকমত নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। ইনফেকশনটা ধীরে ধীরে বেড়েই চলেছে, সেটা যে সহসা কমবে তার কোন (লক্ষণ) নেই। অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করছেন যে এই সংক্রমণ যদি অব্যাহত থাকে তাহলে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। হার্ড ইমিউনিটি- অর্থাৎ কিছু লোক মারা যাবে, এবং অনেক মানুষ ইমিউন (প্রাকৃতিকভাবে ভাইরাস প্রতিরোধী) হয়ে যাবে। কিন্তু এই ভাইরাস যদি এর মধ্যে মিউটেট করে (আচরণ পরিবর্তন করে), তাহলে কিন্তু তা নাও হতে পারে। কারণ মিউটেট করলে সেটা নতুন ভাইরাসে পরিণত হয়ে যাবে।

ভারতে চতুর্থ দফার লকডাউন পর্ব কাটিয়ে প্রথম দফায় আনলক ওয়ান শুরুতে জনজীবন স্বাভাবিক হলেও কিছুই নিয়ন্ত্রণে আসছে না বেহাল অর্থনীতির কর্মসংস্থানের হাল৷ দীর্ঘ লকডাউনের জেরে শুধুমাত্র গত এপ্রিল মাসে কাজ হারালেন অন্তত ১২ কোটি ২০ লক্ষ ভারতীয়। এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেছে সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকনমি নামে এক সংস্থার। ওই সংস্থার তরফে রিপোর্ট প্রকাশ করে জানানো হয়েছে, লকডাউন পর্বে সবথেকে বেশি ক্ষতি হয়েছে দিনমজুর ও ছোট ব্যবসারা৷ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ওই কাজে যুক্ত কর্মীরাও। তালিকায় রয়েছেন হকার থেকে শুরু করে রাস্তার ধারে পসরা সাজিয়ে বসা বিক্রেতারা। নির্মাণ সংস্থার কর্মী থেকে হস্তশিল্পী ও রিকশাচালক ক্ষতিগ্রস্ত বলে জানানো হয়েছে। করোনা মহামারীর জেরে গোটা বিশ্বের প্রায় ৪ কোটি ৯০ লক্ষ মানুষের আয় কমে গিয়েছে। দৈনিক দু’ডলারের কম তাঁদের আয় দাঁড়িয়েছে৷ প্রবল দারিদ্র্যের মধ্যে ডুবে গিয়েছেন তারা। যদিও বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ ভারতীয় এ বছর দারিদ্র্য সীমায় নিচে চলে যাবে। চলতি বছরে কর্মসংস্থানের হাল কোনও ভাবেই যে উন্নতি না, তা মানছেন পর্যবেক্ষক মহলের একাংশ। কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য বলছে, ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চ মাসে ভারতে নতুন নিয়োগ কমেছে ৪৪%।  

ভারতে লকডাউন উঠছে। কিন্তু কি ভাবে? একমাত্র কনটেনমেন্ট জোন ছাড়া আজ থেকে  লকডাউন উঠে গেল। কনটেনমেন্ট জোনের বাইরে থাকা এলাকাগুলি থেকে ধাপে ধাপে লকডাউন তোলা হচ্ছে। খুলে দেয়া হবে সবকিছু, শুধুমাত্র কনটেনমেন্ট জোনে লকডাউন বহাল থাকবে। আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত দেশের সমস্ত কনটেনমেন্ট জোনে লকডাউন বহাল থাকবে।

কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের নির্দেশিকা মেনে কনটেনমেন্ট জোন নির্ধারণ করবে জেলা প্রশাসন। কনটেনমেন্ট জোনের ভিতরে কেবলমাত্র জরুরি পরিষেবা চালু থাকবে। রাজ্যগুলিকে নিজেদের মতো করে কনটেনমেন্ট জোনের বাইরে থাকা বাফার জোন ঠিক করতে হবে। ওই জোনে ঠিক কি কি ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে সেই সঙ্গে কি কি নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে তার রূপরেখা ঠিক করবে রাজ্য।

রাজ্যগুলি পরিস্থিতি বিবেচনা করে কনটেনমেন্ট জোনের বাইরের এলাকাও বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে। সেই সঙ্গে আন্তঃরাজ্য পণ্য পরিবহন এবং রাজ্যের ভিতরে মানুষজনের যাতায়াতের ওপর বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হল। এই ধরনের যাতায়াতের ক্ষেত্রে কোনও ধরনের অনুমতির বা ই-পাসের প্রয়োজন আর পড়বে না। তবে যদি রাজ্য মনে করে সে ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বিধির কথা মাথায় রেখে নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেয় তা বিবেচনা করা হবে।

আগামী জুনের ১ তারিখ থেকে নাইট কার্ফুর সময়সীমা কমিয়ে আট ঘণ্টা করা হচ্ছে গোটা দেশ জুড়ে। রাত ৯ টা থেকে ভোর ৫ টা পর্যন্ত জরুরি কাজ ছাড়া বাইরে বেরোনোর ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকছে। তবে এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশিকা জারি করার কথা বলেছে কেন্দ্র।

আগামী ৮ জুন থেকে বেসরকারি অফিস, ধর্মীয় স্থান, হোটেল রেস্তোরাঁ, শপিং মল সব কিছুই খুলে দেয়ার কথা বলা হয়েছে কেন্দ্রের নির্দেশিকায়। তবে সামাজিক দূরত্ব বিধি মেনে চলতে হবে কঠোর ভাবে। দ্বিতীয় ধাপে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কোচিং সেন্টার সহ অন্যান্য সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খাোলার ব্যাপারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির কর্তৃপক্ষ এবং অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে রাজ্য সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জুলাই মাস থেকে এই সব প্রতিষ্ঠান খোলা যেতে পারে।

তবে দেশজুড়ে বেশ কয়েকটি বিষয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি থাকছে। এর মধ্যে মেট্রো রেল, আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী বিমান, বিনোদন পার্ক, থিয়েটার হল, সিনেমা হল, জিম, অডিটোরিয়াম, সুইমিং পুল সহ সামাজিক, রাজনৈতিক ক্রীড়া বিনোদন ও সাংস্কৃতিক এবং সেই সঙ্গে ধর্মীয় সমস্ত বড় ধরনের অনুষ্ঠান ও জমায়েতের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকছে। এগুলির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তোলা হবে পরিস্থিতি বিবেচনা করে। এটা হল তৃতীয় ধাপ।

দশ বছরের নিচে এবং পঁয়ষট্টি বছরের ওপরে যাদের বয়স তাদের জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বেরোনোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি থাকছে। কো মর্বিডিটি রয়েছে এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রেও এই একই নিয়ম বহাল থাকছে। সংক্রমণের ঝুঁকি আছে কিনা তা নিশ্চিত করতে আরোগ্য সেতু সক্ষম এমনটাও বলা হয়েছে। কর্মস্থানে সকল কর্মীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরোগ্য সেতু অ্যাপ থাকা বাধ্যতামূলক এমনটাও বলা হয়েছে কেন্দ্রের নির্দেশে।

প্রথম পর্যায় কনটেনমেন্ট জোনের বাইরে ৮ জুন থেকে খোলা যাবে ধর্মীয় স্থান, বেসরকারি অফিস, শপিং মল, হোটেল-রেস্তোরাঁ। সামাজিকভাবে দূরত্ব বিধি মেনে চলতে হবে কঠোরভাবে।

দ্বিতীয় পর্যায় স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, কোচিং সেন্টার খোলা যাবে। রাজ্য সরকারকে এব্যাপারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির কর্তৃপক্ষ এবং অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জুলাই মাসে এইসব প্রতিষ্ঠান খোলা যেতে পারে।

তৃতীয় পর্যায় দেশজুড়ে কয়েকটি বিষয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা আপাতত বহাল থাকছে। এর মধ্যে মেট্রো রেল, আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী বিমান, বিনদন পার্ক, সিনেমা হল, থিয়েটার হল, বার, জিম, সুইমিং পুল সহ সামাজিক রাজনৈতিক-ক্রীড়া-বিনোদন-সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় সব ধরনের বড় অনুষ্ঠান ও জমায়েত। পরিস্থিতি বিবেচনা করে এগুলি খোলার দিন ঘোষণা করা হবে। ১ জুন থেকে নাইট কার্ফু শুরু হবে। রাত ৯ টা থেকে রোজ ৫ টা পর্যন্ত নাইট কার্ফু চলবে। রাজ্য চাইলে আন্তঃজেলা এবং আন্তঃরাজ্য যাতায়াতে কোনো বাধা থাকবে না।

একই পদ্ধতিতে লকডাউন উঠছে বাংলাদেশে। বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাংলাদেশে দেখা দেয়ার পর টানা ৬৬ দিন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে গণপরিবহনসহ বাইরের সব ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দেয় সরকার। সম্প্রতি ঈদ সামনে রেখে দোকান-পাট খোলার পর রোববার থেকে অফিসও সীমিত পরিসরে খুলে দেওয়া হচ্ছে। গণপরিবহন চলবে সোমবার থেকে। সংকটকালীন সময়ে সরকার ত্রাণ দেওয়ার পরেও যখন মানুষ ‘প্রয়োজনের তাগিদে ঘর থেকে বেরিয়ে আসছেন’, সেই সময়ে লকডাউন তুলে দেওয়ার ‘বিকল্প ছিল না’ বলে মন্তব্য করেছেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলানো একজন প্রতিমন্ত্রী। এটা সত্য যে যদি এভাবে আমরা ঘরে বসে থাকি তাহলে আমাদের সামনে যে অর্থনৈতিক বিপর্যয় সেটি কিন্তু অবশ্যম্ভাবী। গার্মেন্ট শিল্পে অর্ডারগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল, ক্যানসেল হয়ে যাচ্ছিল, সেখানে টিকে থাকার জন্য প্রতিযোগিতার জন্য এমন একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালু করছে। সব বাস্তবতা বিবেচনা করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।”

বাংলাদেশের সোশাল মিডিয়াতে যে গেল গেল রব উঠেছে তা নিতান্তই ভিত্তিহীন ও আশঙ্কাপ্রসূত। লকডাউন তোলার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সাধারণ মানুষের জন্যে। যারা আশঙ্কিত তাদের তো নিজেদের গৃহবন্দী রাখার পূর্ণ স্বাধীনতা আছে। তারা থাকুন আগের মতই। শুধু শুধু সাধারণ দারিদ্রসীমার নীচে থাকা মানুষদের নিয়ে টানাটানি কেন?

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর