লকডাউনের নিস্তব্ধতা ভেঙে বাড়ির বাইরে স্পেনের শিশুরা

লকডাউনের নিস্তব্ধতা ভেঙে বাড়ির বাইরে স্পেনের শিশুরা

কবির আল মাহমুদ, স্পেন ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২০:০৮ ২৭ এপ্রিল ২০২০   আপডেট: ২০:১৫ ২৭ এপ্রিল ২০২০

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

দীর্ঘ দেড় মাস পর রোববার স্পেনের রাস্তাগুলো মুখরিত ছিল শিশু-কিশোরদের কোলাহল আর উচ্ছ্বাসে। স্কুটার, সাইকেল, খেলনা বল আর মানুষের পদচারণায় পরিপূর্ণ ছিল দেশটির ব্যস্ততম রাস্তা, পার্ক, সমুদ্র সৈকতসহ খোলামেলা সব স্থানগুলো। গত ১৫ মার্চ দেশটিতে লকডাউন ঘোষণা দেয়ার পর গতকাল রোববার প্রথমবারের মত স্পেনের রাস্তাগুলি খানিকটা সময়ের জন্য দেখতে পায় তার চিরচেনা লোক সমাগম। যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুরা।

কঠোর নিয়মশৃঙ্খলা অব্যাহত রেখে স্পেন সরকার গেল সপ্তাহে কমবয়সী শিশু-কিশোরদের স্বার্থে ২৬ এপ্রিল রোববার থেকে লকডাউনে কিছুটা শিথিলতা থাকার ঘোষণা দেয়। এতে করে খানেকটা স্বস্তি আসে টানা ছয় সপ্তাহ ধরে গৃহবন্দী থাকা স্পেনীয় জনগোষ্ঠীর মাঝে। আর তাই তো রোববার সকাল থেকেই বিভিন্ন বয়সী মানুষের পদচারণায় ব্যস্ত হতে শুরু করে দেশের প্রতিটা বসতিপূর্ণ অঞ্চলের রাস্তাঘাট আর ছোট-বড় উদ্যানগুলো। এ দৃশ্য দেখে মনে হয়েছিল প্রকৃতি যেন দীর্ঘদিন পর নিস্তব্ধতা ভেঙে প্রশান্তির নিশ্বাস নিচ্ছে।

এদিন দেশটির ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুরা একটানা ৪৩ দিন ঘরবন্দী থাকার পর মুক্ত বাতাসে নিশ্বাস নিয়েছে। শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, স্পেনের অনূর্ধ্ব ১৪ বছর বয়সী প্রায় ৬৩ লাখ শিশু এখন প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টার মধ্যে এক ঘণ্টার জন্য বাড়ির বাইরে থাকতে পারবে। এক্ষেত্রে তাদের গন্তব্য হবে বাড়ির এক কিলোমিটারের গন্ডির মধ্যে, সঙ্গে থাকবে বাবা-মা কিংবা পরিবারের কোনো জ্যেষ্ঠ ব্যক্তি। আর একদলে তিনজনের বেশি হবে না।

করোনা মহামারির এই অচেনা সময়ে, এক মাসেরও বেশি সময় গৃহবন্দী হয়ে থাকার এ ঘটনা শিশুদের জীবনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আজ সারা স্পেনে প্রায় ৬০ লাখ শিশু এই বন্দী পরিস্থিতি কাটিয়ে রাস্তায় নেমেছে, যদিও বিভিন্ন প্রদেশে বৃষ্টি ছিলো। তবুও নানা শিশুদের আবেগে উচ্ছ্বাসিত হয়ে রাস্তায় ছুটতে দেখা গেছে।

এদিকে করোনা মহামারির কারণে তৈরি হওয়া সামাজিক দূরত্বে হুমকির মুখে পড়েছে স্পেনের বার-রেস্টুরেন্টের ব্যবসা। ধারণা করা হচ্ছে, মহামারি পরবর্তী পরস্থিতিতে এ ধরনের ৪০ হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে, যা ১৫ শতাংশের মতো। স্পেনে মোট ২ লাখ ১৯ হাজার বার-রেস্টুরেন্ট আছে।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে স্পেন এই ব্যবসার শীর্ষে। কিন্তু করোনা মহামারি অকল্পনীয় সময়ের মধ্যে (তিন দিনের ভেতরে) সব ব্যবসা গুটিয়ে নিতে হয়েছে। এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, কবে আবার খুলবে, আর কিভাবে ব্যবসা পরিচালিত হবে? এখন সামাজিক দূরত্বের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এই ব্যবসায়  জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলো চোখে অন্ধকার দেখছে।

আগামী ২ মে থেকে সংক্ষিপ্ত হাঁটা বা পায়চারি করার জন্য বয়স্করা সড়কে বের হতে পারবে বলে নিশ্চিত করেছে সরকার। তবে এর মধ্যে যদি কোনো ধরনের সংক্রমণ বৃদ্ধির প্রাদুর্ভাব থাকে, তাহলে সময় পরিবর্তন হতে পারে।

এদিন সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ভাইরাল হতে থাকে একের পর এক ছবি ও ভিডিও ক্লিপ। যেখানে দেখা যায়, শিশু-কিশোর এবং তাদের সঙ্গে আসা প্রাপ্তবয়স্ক সবাইকে বেশিরভাগ সতর্কতা অনুসরণ করে বাইরে বের হয়েছেন। প্রায় সবাই গ্লাভস এবং স্যানিটারি মাস্ক পরেছিলেন। তারা তাদের বাড়ি থেকে সর্বাধিক এক ঘণ্টা এবং এক কিলোমিটারেরও কম পথ অবধি চলেছেন। 

এ সময় বিভিন্ন শহরের অনেক বড় বড় রাস্তাগুলোতে যানজটও লক্ষ্য করা যায়। এর কারণ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ছবি এবং ভিডিওগুলো বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, তাদের অনেকেই কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা সঠিকভাবে অনুসরণ করেনি। নির্দেশনা অনুযায়ী, একজন প্রাপ্ত বয়স্কের সঙ্গে সর্বোচ্চ তিনজন নাবালক থাকার কথা থাকলেও কোথাও কোথাও দেখা যায় পুরো পরিবার মিলে হাঁটা-চলা করছেন, কখনো কখনো অন্য পরিবারের সঙ্গে একত্রে কথা বলতে বা আড্ডায় মেতে থাকতেও দেখা গেছে। তাছাড়া বাচ্চাদের মাঝেও দেখা যায় গেম এবং খেলনা সামগ্রী একে অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিতে।

তবে সবকিছু ছাড়িয়ে রোববার স্পেনের রাস্তাঘাট, পার্ক এবং উদ্যানগুলোতে মানুষের ভিড় যেন দেশটিতে বছরের প্রথম বসন্তের ছবি ফুটিয়ে তুলেছিল। প্রকৃতি তার পরিচিত মুখগুলোকে ফিরে পেয়ে নিজেই যেন প্রফুল্লচিত্তে হেসে উঠেছিল।

অন্যদিকে স্পেনের জাতীয় স্বাস্থ্য সংস্থা রোববার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এদিন স্পেনের করোনাভাইরাস পরিস্থিতির সবচেয়ে উত্তম দিন কেটেছে। এদিন স্পেনে মৃত্যুর সংখ্যা ২৮৮'তে নেমে এসেছিল, যা ২০ মার্চের পর থেকে বিগত ৩৭ দিনের মধ্যে সর্বনিম্ন সংখ্যা। আর আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৭২৯ জন, যা আশানুরূপ উন্নতির দিকে।

উল্লেখ্য, রোববার স্পেনে মৃতের সংখ্যা নেমে আসে ৩০০ এর নিচে। গত ৬ সপ্তাহ ধরে মহামারির প্রাদুর্ভাবে প্রতিনিয়ত আশার আলো হতাশার আঁধারে ফিকে হয়ে আসছিল। ২৬ এপ্রিল থেকে যেন সেই বহুল প্রত্যাশার আলোর আভাস দেখা মিলতে শুরু করেছে। গত ২১ মার্চের পরে সবচেয়ে কম মৃত্যুর সংখ্যা এটি।

এদিকে ২৬ এপ্রিল ২৪ ঘণ্টায় স্পেনে মোট মৃতের সংখ্যা নথিভুক্ত করা হয়েছে ২৮৮ জন। ২৫ এপ্রিল মৃতের সংখ্যা ছিলো ৩৭৮ জন। আর ২৪ এপ্রিল  ছিলো ৩৬৭ জন।

এছাড়া ২৬ এপ্রিল নতুন আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ৭২৯ জন। নতুন আক্রান্তের তুলনায় সুস্থ হওয়ার সংখ্যা যথেষ্ট বেশি । ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত মোট সুস্থের সংখ্যা ৩ হাজার ২৪ জন। আর মোট মৃতের সংখ্যা ২৩ হাজার ১৯০ জন। মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ ২৬ হাজার ৬২৯ জন। সুস্থ হয়েছেন প্রায় ১ লাখের কাছাকাছি, মোট ৯৮ হাজার ৭৩২ জন।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডআর