Alexa রোহিঙ্গা সমস্যা জিইয়ে রাখা ঠিক হবে না

রোহিঙ্গা সমস্যা জিইয়ে রাখা ঠিক হবে না

প্রকাশিত: ২০:০৩ ১ সেপ্টেম্বর ২০১৯  

অাফরোজা পারভীন, কথাশিল্পী, কলাম লেখক, সম্পাদক। জন্ম ৪ ফোব্রুয়ারি ১৯৫৭, নড়াইল। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে অবাধ পদচারণা। ছোটগল্প, উপন্যাস, শিশুতোষ, রম্য, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, গবেষণা ক্ষেত্রে ১০১টি পুস্তক প্রণেতা। বিটিতে প্রচারিত টিয়া সমাচার, ধূসর জীবনের ছবি, গয়নাসহ অনেকগুলি নাটকের নাট্যকার। `অবিনাশী সাঈফ মীজান` প্রামাণ্যচিত্র ও হলিউডে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য `ডিসিসড` চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। রক্তবীজ ওয়েব পোর্টাল www.roktobij.com এর সম্পাদক ও প্রকাশক। অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

মায়ানমারের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর যুগের পর যুগ ধরে অত্যাচার চালিয়েছে মায়ামনার সরকার। তাদের বাড়িঘর, জমিজমা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। আগুন দিয়ে পুড়িয়েছে তাদের ঘরবাড়ি, প্রার্থনালয়, বিদ্যাপীঠ। 

১৯৮২ সালের বার্মিজ নাগরিকত্ব  আইনে তাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করা হয়েছে। ২০১৩ সালে জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের বিশ্বের অন্যতম নিগৃহীত সংখালঘু জনগোষ্ঠী হিসেবে উল্লেখ করেছে। 

পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠলে ২০১৭ সালে লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী টেকনাফ বর্ডার দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে। বাংলাদেশ সরকার মানবিক কারণে এই বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেয়। তাদের থাকা খাওয়ার সুব্যবস্থা করে। এ কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসিত হন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাকে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ উপাধি দেয়া হয়। 

২০১৭ সালের আগেও বিভিন্ন সময়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে কিছু রোহিঙ্গা রাখাইন থেকে উখিয়া, টেকনায় ও ককক্সবারে আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু বড় ঢল নামে ২০১৭ সালে। প্রথম অবস্থায় স্থানীয় জনগণও তাদের প্রতি অকাতরে সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা জনসংখ্যা ১১ লাখ। দু’বছর ধরে তারা এদেশে আছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠিকে সহায়তা দেয়ার জন্য দেশি বিদেশি বহু সংগঠন কক্সবাজারে কাজ করছে। তবে ঘটনা যাইই হোক, চাপটা কিন্তু বাংলাদেশের ওপরই পড়ছে। এই ১১ লাখ বাড়তি জনসংখ্যার জন্য সরকারকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে বাড়তি সমস্যা। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেছে। অপরাধ প্রবণতা বেড়েছে। মাদকের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। প্রতিদিনই এই জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে নতুন শিশুর জন্মগ্রহণের মাধ্যমে। তরুণ তরুণীদের মধ্যে অনৈতিক সম্পর্ক আর অনিয়ন্ত্রিত বিবাহের ঘটনা ঘটছে। 

ফলশ্রুতিতে কক্সবাজার, টেকনাফ এলাকার জনসাধারণ শিক্ষা স্বাস্থ্য পরিবেশগতভাবে বিভিন্নরকম হুমকির মধ্যে রয়েছে। পাহাড় জলাভূমি বনজ সম্পদ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দেখা দিচ্ছে পানি সঙ্কট। রোহিঙ্গারা মায়ানমারে যেখানে জীবনের ভীতির মধ্যে ছিল সেখানে এদেশে তারা আরাম আয়েশে জীবন যাপন করছে। কারণ শুধু বাংলাদেশ সরকারই নয়, বিভিন্ন দেশ থেকে আগত অসংখ্য এনজিওর মাধ্যমে তারা পাচ্ছে খয়রাতি সাহায্য। এনজিওগুলিও তাদের দিয়ে ব্যবসা করছে । ফুলে ফেঁপে উঠছে তারা। বিশ্ব ব্যাংক ইউনিসেফসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার সংস্থার অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবী এখানে কাজ করছে। 

কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা শুধুমাত্র কক্সবাজারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। তারা ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। জড়িত হচ্ছে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে। স্বাধীনতা বিরোধী কোনো কোনো চক্র রোহিঙ্গাদের সরকার বিরোধী উস্কানি দিচ্ছে বলেও শোনা যাচ্ছে। এদেশ ছেড়ে যাতে তারা মায়ানমান না যায় বিষয়ে একটা চক্র তৎপর রয়েছে। এমনকি রোহিঙ্গাদের জন্য অস্ত্র বানানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে। ইতোমধ্যে নানান অভিযোগে ৪১টি এনজিওকে ক্যাম্প এলাকা থেকে প্রত্যাহারও করা হয়েছে।

দেশের স্বার্থেই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন অতি জরুরি হয়ে পড়েছে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বেশ কয়েকটি উদ্যোগ কার্যকর করা যায়নি। গত ২২ আগস্ট আরেকটি উদ্যোগ নেয়া হয়। রোহিঙ্গারা প্রত্যাবসনে সম্মত হলেও প্রত্যাবাসন শুরু করার প্রাক্কালে তারা বেঁকে বসে। একজন রোহিঙ্গাও সেদিন ফেরৎ যায়নি। শুধু তাইই নয়, ২৫ আগস্ট কুতুপালং ক্যাম্পে তারা বিশাল শোডাউনও করে। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, নাগরিকত্ব প্রদানসহ তাদের উত্থাপিত ৫টি দাবি মায়ানমার সরকার না মানলে তারা ফেরৎ যাবে না। 

বাঙালি অতিথিপরায়ণ জাতি। এটা বাঙালির ঐতিহ্য। নিজে না খেয়ে তারা অতিথির পাতে খাবার তুলে দেয়। তাই তাদের প্রতি নির্যাতন নিপীড়ণ ও তাদের অসহায়ত্ব প্রত্যক্ষ করে অতিথিজ্ঞানে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছিল। কিন্তু যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠিকে একসময় মানিবক কারণে এদেশে আশ্রয় দেয়া হয়েছিল তারা এখন বিষফোঁড়ার মতো জ্বালাচ্ছে। 

১১ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে প্রায় ১০ লাখেরই হাতে অবৈধ সিমকার্ড রয়েছে। অসুস্থ, অন্ধ ও শিশু ছাড়া প্রতিটি রোহিঙ্গার হাতে মোবাইল আছে। আর তাতে একাধিক সিম আছে।  কারো কারো হাতে একাধিক মোবাইল। প্রতিটি মোবাইলে গড়ে দুটি করে সিম। এই সিম দিয়ে তারা মায়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি মায়ামনমারসহ বহিঃবিশ্বে জানাজানি হয়ে যাচ্ছে। তারা মোবাইলের মাধ্যমে সন্ত্রাস চাঁদাবাজি ধর্ষণ খুনের মতো অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন রকম গুজব ছড়িয়ে তারা রোহিঙ্গাদের উত্তেজিত করছে। প্রত্যাবসনে আগ্রহী বাঙালিদের মধ্যেও একই উপায়ে বিভেদ বিভাজন সৃষ্টি করছে তারা। তারা সোসাল মিডিয়ায় অংশ নিচ্ছে। ফেসবুক ইন্টারনেটের মাধ্যমে নানারকম গুজব ছড়াচ্ছে। 

প্রশ্ন হচ্ছে রোহিঙ্গারা এই সিম পেলো কী করে? কে তাদের এই সিম সরবরাহ করছে? তাদের আইডি নেই। বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাহলে তারা সিম পেলো কী করে? এর উত্তর খুবই সোজা। একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী তাদের এই সিমগুলো দিচ্ছে আইডি ও বায়োমেট্রিক ছাড়াই। কেউ কেউ নিজেদের বায়োমেট্রিক করা সিম এদের কাছে চড়াদামে বিক্রি করছে। এরইমধ্যে বেশ কয়েকজন সিম বিক্রেতা গ্রেফতারও হয়েছে। এই সিমগুলি এই দেশের বিরুদ্ধেই যাচ্ছে। সিমগুলি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করছে। 

রোহিঙ্গাদের নিজেদের মধ্যেও বিরোধ রয়েছে। ক্যাম্পে অবস্থানকারীদের মধ্যে কিছু লোককে অন্যরা ‘বেঈমান’ বা ‘কাফের’ বলে। তাদের ধারণা এই  লোকগুলি মোবাইলের মাধ্যমে মায়ানমার সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। তারা মায়ানমার সরকারের চর। এই লোকগুলিকে যারা নজরদারিতে রেখেছে তাদের অনেকে ‘সন্ত্রাসী’ বলছে। মূল কথা হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের মধ্যেও আন্তঃকোন্দল রয়েছে। গত দুই বছরে এই কোন্দলে ৪৫ জন নিহত হয়েছে।

অনেকের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা, নারী পাচার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য মামলা হয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি এখন আর রোহিঙ্গাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। কিছুদিন আগে যুবলীগের একজন কর্মী রোহিঙ্গা ইস্যুতে নিহত হন। গত দুই বছরে এই ইস্যুতে মারা গেছেন বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি। 

পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে খারাপের দিকে যাচ্ছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বিদ্যুৎ নেই, চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত রাস্তাও নেই। ক্যাম্পের ভিতরে চওড়া চওড়া কিছু রাস্তা আছে সেনা সদস্যদের চলাচলের জন্য। দুর্গম পাহাড়গুলিতে ওঠার জন্য বালির বস্তা ফেলে আর বাঁশ পুঁতে রাস্তা করা হয়েছে। সোলার বাতিরও কিছু ব্যবস্থা হয়েছে। তারপরও সে পথ দুর্গম। দিনের বেলা ক্যাম্পের চেহারা শান্ত দেখা গেলেও রাত হলেই ক্যাম্পে শুরু হয় সন্ত্রাসি কর্মকাণ্ড। কারণ ক্যাম্পের মধ্যে সন্ত্রাসী কাজ করে পালিয়ে যাওয়া খুব সহজ। ক্যাম্পে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু সেই নিরাপত্তা রোহিঙ্গারা কতদিন মানবে এ বিষয়ে সাধারণ মানুষ সন্দিহান। অনেকে বলছেন, সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন ক্যাম্পের নিরাপত্তার দায়িত্ব রোহিঙ্গারাই নিজ হাতে তুলে নেবে। 

আশঙ্কার কথা এটাই যে, উখিয়া ও টেকনাফ এলাকায় এখন স্থানীয় জনগণের চেয়ে রোহিঙ্গার সংখ্যা বেশি। স্থানীয় জনগণ শঙ্কিত এই ভেবে যে, একদিন না তাদের বাপ দাদার ভিটে ছেড়ে চলে যেতে হয়। অন্যদিকে এনজিও কর্মিরাও ভীত এই ভেবে যে, এখন না হয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ভালো সাহায্য সহযোগিতা দিচ্ছে, তারা সহযোগিতা কমিয়ে দিলে রোহিঙ্গারাতো মারমুখী হয়ে উঠবে। বিপরীত দিকে স্থানীয় জনগণ এনজিও গুলির ওপর অসন্তুষ্ট এজন্য যে, রোহিঙ্গারা যা চাচ্ছে তাই পাচ্ছে। এমন হলে তো কোনদিনই তারা এ মাটি ছেড়ে যাবে না।  রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশ সরকার এরইমধ্যে আড়াইহাজার কোটি টাকা খরচ করছে । এই পরিমাণ টাকা বাংলাদেশের পক্ষে বেশিদিন খরচ করা সম্ভব নয়। আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও আস্তে আস্তে সাহায্য সহযোগিতা কমিয়ে দেবে, এটই স্বাভাবিক। 

এহেন অবস্থায়  রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অতি জরুরী হয়ে পড়েছে। আর সেজন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মায়ানমার সরকারের ওপর অবিরাম চাপ সৃষ্টি করা। চাপ সৃষ্টি করা এজন্য যে, তারা যেন রোহিঙ্গাদের যথাযথ মর্যাদা যেমন নাগরিকত্ব দিয়ে নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। এবং সেটা যত দ্রæত সম্ভব। এজন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা প্রয়োজন। এ সমস্যা আর কোনোভাবেই জিইয়ে রাখা উচিত হবে না।  

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর
 

শিরোনামবঙ্গবন্ধু বিপিএলের উদ্বোধনী ম্যাচে সিলেট থান্ডারকে ৫ উইকেটে হারালো চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্স শিরোনামমানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রাজশাহীর বোয়ালিয়ার মো. আব্দুস সাত্তার ওরফে টিপু সুলতানকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শিরোনামঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান বাহিনীর মহড়ার কারণে আজ বুধবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ১২টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত সব ধরনের উড়োজাহাজ ওঠা-নামা বন্ধ থাকবে শিরোনামরোহিঙ্গাসহ অন্য সংখ্যালঘু নিপীড়নের জন্য মিয়ানমারের সেনাপ্রধানসহ শীর্ষ চার সামরিক কর্মকর্তার ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শিরোনামপদ্মা সেতুর দুই হাজার ৭০০ মিটার দৃশ্যমান হবে আজ