Alexa রোহিঙ্গা সংকট: সমস্যা গভীরেই প্রোথিত

রোহিঙ্গা সংকট: সমস্যা গভীরেই প্রোথিত

প্রকাশিত: ১৬:৫০ ২৯ আগস্ট ২০১৯   আপডেট: ০৮:২৪ ৩১ আগস্ট ২০১৯

নব্বইয়ের দশকের অন্যতম কবি বীরেন মুখার্জী। পেশা: সাংবাদিকতা। পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস রাজনৈতিক কলাম লিখে চলেছেন একাধারে।  তার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘লোকঐতিহ্য’। সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঘোর’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

অচিরেই রোহিঙ্গা সংকট নিরসন হচ্ছে না; আর এমন আভাসই ফুটে উঠেছে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বাংলাদেশকে বিষয়টি নিয়ে অনুরোধ করায়। 

ক্ষমতাধর ওই দুটি রাষ্ট্র বাংলাদেশকে অনুরোধ করেছে, মিয়ানমারে শরণার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত না পাঠাতে। ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া যে আবারো অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঝুলে গেল, সেটি স্পষ্ট। অপরদিকে, কবে-কখন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হবে, কিংবা আদৌ হবে কি না- তা নিয়ে কোনো পক্ষেরই সূচিন্তিত কোনো দিকনির্দেশনা নেই। আর এ কারণেই রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে দেশবাসীর মধ্যে আগ্রহ এবং উদ্বেগ দুই-ই বাড়ছে। 

প্রবাদ আছে ‘সর্ষের মধ্যে ভূত থাকলে তা দিয়ে তা দিয়ে ভূত তাড়ানো যায় না।’ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সাম্প্রতিক অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলার এ প্রবাদটিই যেন সত্য হতে চলেছে। আমরা জানি, রোহিঙ্গা ইস্যু বর্তমানে এমন অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে; যা এখন বাংলাদেশ-মিয়ানমারের একক সমস্যা নয়। বিষয়টি আগেও ছিল না। লক্ষ্য করা গেছে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে নতুন করে রোহিঙ্গারা প্রাণের ভয়ে এদেশে পালিয়ে আসা শুরু করলে বাংলাদেশ সম্পূর্ণ মানবিক কারণেই তাদের আশ্রয় দেয়। পরবর্তীতে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তিও করে। অথচ মিয়ানমার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। উপরন্তু নানান সময়ে বাংলাদেশকে বিপদে ফেলার চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশও যে বসে ছিল তেমনটি নয়। রোহিঙ্গা সংকট শুরুর এক মাসের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেয়া ভাষণে সংকট সমাধানের জন্য পাঁচটি সুপারিশ তুলে ধরেন। একই সাথে সংকট সমাধানের জন্য বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সমর্থন লাভের চেষ্টা করে। বাংলাদেশের কূটনীতির বড় প্রচেষ্টা ছিল মিয়ানমারের ওপর চাপ তৈরি করা। কিন্তু মিয়ানমারের ওপর কোনো দেশই তেমন কোনো চাপ প্রয়োগ করেনি। কেন করেনি, সেটিও একটি বিশাল প্রশ্ন। 

একটু পেছন থেকে আসা যাক। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ১৫টি দেশ সদস্য। তাদের মধ্যে পাঁচটি দেশ স্থায়ী সদস্য। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন। এই পাঁচ দেশের রয়েছে ভেটো ক্ষমতা অর্থাৎ ‘আমি মানি না’ বলার ক্ষমতা। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের এই ক্ষমতাই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ ও কোন্দল দীর্ঘস্থায়ী করে রেখেছে, বয়ে নিয়ে এসেছে অশান্তির দাবানল আর অনেক সত্যকে যুগ যুগ মাটিচাপা দিয়ে রেখেছে। রোহিঙ্গা সংকটেরও কি সেই একই দশা হবে? যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সাম্প্রতিক অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এ প্রশ্নটি ঘুরে ফিরে উচ্চারিত হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারের নীতিনির্ধারকরাও যে এই অনুরোধের কারণে উভয় সংকটে পড়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সম্মেলনে কথা উঠেছে। 

লক্ষ্য করা গেছে ৫৭ জাতির ওআইসি গ্রুপের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকেও রোহিঙ্গা সংকট ছিল অন্যতম প্রধান এজেন্ডা। কথা উঠেছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদেও। এত কিছুর পরও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়া এক অন্ধকার আগামীকে নির্দেশ করে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। 

যুগ যুগ ধরে বাস করা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার সরকার নাগরিক হিসেবে অস্বীকার করছে। অথচ রাখাইনেই তাদের জন্ম, তাদের দেশ। ইতিহাস মতে, চতুর্দশ শতকে আরাকানে মুসলিমরা বসতি স্থাপন করে। ততকালীন বৌদ্ধ রাজা নারেমেইখলি (যিনি তার রাজ্য পুনরুদ্ধার করেছিলেন গৌড়ের সুলতান জালালুদ্দিন শাহের সহযোগিতায়) তার রাজ দরবারে মুসলিম উপদেষ্টা এবং সভাসদদের সাদরে গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু পরে দক্ষিণের বৌদ্ধ বর্মীরা আরাকান দখল করে নেয়, নারেমেইখলি পরাজিত হন। আরাকান দখলের পর বৌদ্ধ বর্মীরা সব রোহিঙ্গা মুসলিমদের তাড়িয়ে দিয়েছিলো। তখন প্রায় ৩৫ হাজার রোহিঙ্গা তৎকালীন ব্রিটিশ-ভারতের অন্তর্গত বাংলায় (বর্তমান চট্রগ্রাম এলাকায়) পালিয়ে এসেছিলো। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৮ সালে প্রথম সামরিক হামলার মুখে রোহিঙ্গারা ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। তখন বিষয়টি সাময়িক মনে করা হলেও তা একটি স্থায়ী সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। মাঝখানে নানা কূটনীতিক উদ্যোগের কারণে কিছু শরণার্থী বার্মা ফিরিয়ে নিলেও বিভিন্ন ঘটনায় তারা আবার বাংলাদেশে ফিরে এসে এক মারাত্মক মানবিক সংকট তৈরি করেছে। ধারণা করা হয়, এ পর্যন্ত আনুমানিক ১১ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রিত। বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল দেশের পক্ষে বছরের পর বছর এই বিপুল শরণার্থীর ভার বহন করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া এদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা নানান সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশের নিরাপত্তাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। অপরদিকে যেসব দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠন আশ্রিত রোহিঙ্গা নানামুখী সেবা ও সহযোগিতা দিচ্ছে তারাও শরণার্থীদের মৌলিক অধিকার ও মিয়ানমারে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার দাবি জানিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের না ফেরার জন্য নানামুখী ইন্ধনও জোগাচ্ছে এসব সংগঠন। এতে সার্বিকভাবে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হয়ে পড়ছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষ থেকে প্রত্যাবাসন নিয়ে রোহিঙ্গাদের মতামত জানতে চাইলে তারা সেদেশ ফিরতে চায় না বলে জানিয়েছে। আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মতামত নেয়া যেতে পারে তাদের নিরাপত্তা বিষয়ে। কিন্তু তারা যখন নিজ দেশে ফিরতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন বিষয়টিকে সহজভাবে নেয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। 

এর আগে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি) এক প্রতিবেদনে বলেছিল, ‘বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বড় ধরনের নিরাপত্তার সংকট তৈরি করতে পারে।’ গণমাধ্যমের নানান খবরে বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে যে, রোহিঙ্গাদের একটি অংশ অপরাধমূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি জঙ্গি তৎপরতায়ও যুক্ত হয়ে পড়ছে। ইসলামিক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো, মিয়ানমারের ঘটনাকে মুসলমান নিধন হিসেবে জাহির করে আন্তঃসীমানা আক্রমণের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে পারে, আইসিজি বিশ্লেষকরা এমন বার্তাও দিয়েছিল। বলাই বাহুল্য পরিস্থিতি যেন ধীরে ধীরে সেদিকেই গড়াচ্ছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এটিকে বাড়িয়ে বলা হচ্ছে দাবি করলেও বিদ্যমান পরিস্থিতি একটি দেশের দেশের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। রোহিঙ্গাদের পূর্বপুরুষরা শত শত বছর ধরেই সেখানে বসবাস করে আসছে কিন্তু মায়ানমার (বার্মা) সরকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠিকে কখনো নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। কেন দেয়নি সেটা মিয়ানমারের নিজস্ব ব্যাপার হতে পারে। কিন্তু তারাও তো মানুষ। মানুষ হিসেবে তারা এই পৃথিবীতে প্রকৃতির দেয়া যে ভূমিতে জন্মগ্রহণ করেছে, সেখানে তারা বাস করতে পারবে না? যারা এটা করতে দিতে চায় না তারা মানবতার শত্রু বিশ্বশান্তির শত্রু, পৃথিবীর শত্রু। এদের বিচার হওয়া উচিত।

তবে, কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত নয়, রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানই প্রত্যাশিত- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বার বারই এ কথা বলে এসেছেন। তিনি বলেছেন, জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। প্রকৃত প্রস্তাবে, রোহিঙ্গাদের শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবাসনই বাংলাদেশের চাওয়া। পরিস্থিতি যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে তাতে, বাংলাদেশের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে বললেও অত্যুক্তি হয় না। ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে বাংলাদেশের কর্তব্য হওয়া দরকার ক‚টনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো। রোহিঙ্গা সংকটকে কোনো অবস্থায়ই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। এর সমস্যা অনেক গভীরেই প্রোথিত। এ সংকট তৈরিতে কোনো গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার বিষয়টিও উড়িয়ে দেয়া যাবে না। যে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল, এমনকি স্বাধীন দেশে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর না করতে বাংলাদেশ নানানভাবে বলে এসেছে, তারা সুযোগ পেলেই বাংলাদেশকে আঘাত করতে পারে- এ বিষয়টিও বাংলাদেশকে মাথায় রেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর