Alexa রোহিঙ্গা বিষয়ে প্রয়োজন স্থায়ী সমাধান

রোহিঙ্গা বিষয়ে প্রয়োজন স্থায়ী সমাধান

প্রকাশিত: ১৬:৫২ ৩১ জুলাই ২০১৯   আপডেট: ২১:০৪ ৩১ জুলাই ২০১৯

দৃশ্যত পরিচয়ে সাহাদাৎ রানাকে সাংবাদিক হিসেবেই চেনে সবাই। তবে শুধু সাংবাদিক তিনি নন। গল্প, কবিতা লেখা, সাংগঠনিক দক্ষতাসহ তার রয়েছে নানা গুণ। বর্তমানে বেসরকারি টেলিভিশন এটিএন নিউজে কর্মরত রয়েছেন। দায়িত্ব পালন করেছেন সাংবাদিকদের সংগঠন ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। জাতীয় প্রেসক্লাবের স্থায়ী সদস্য এই সাংবাদিক।

ইতালিয়ান রাজনৈতিক দার্শনিক এন্থনিও গ্রামসি বলেছেন- ‘সবকিছুই ভালো, কিন্তু একটা নিদিষ্ট সীমা পর্যন্ত’। অর্থাৎ ভালোরও একটা নির্দিষ্ট সীমা আছে। 

এ বিষয়ে আমাদের দেশে বহুল প্রচলিত একটি কথাও রয়েছে। বেশি ভালো, ভালো না। এগুলো সাধারণত রূপক অর্থে কোনো কাজের ক্ষেত্রে বলা হয়। গ্রামসির বক্তব্যটি আজ আমাদের জাতীয় জীবনে বাস্তব হয়ে উঠেছে অনেকখানি। এই ভালোর বিষয়বস্তু রোহিঙ্গা বিষয়ে। প্রায় দুই বছর আগে রোহিঙ্গাদের মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়েছিলেন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু মানবিক কারণ ও সরল বিশ্বাসে সেই আশ্রয় দেয়াটা যেন এখন ক্রমশ কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের জন্য। কারণ রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন অপরাধমূল কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার বিষয়গুলো আমাদের প্রতিনিয়ত ভাবাচ্ছে। বর্তমানে আমাদের দেশে প্রায় ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। এতো বড় সংখ্যার বোঝা সামাল দেয়া একটি দেশের জন্য সত্যিই কঠিন। আবার যখন আশ্রিত রোহিঙ্গারা নিজেদের ইচ্ছে মতো কর্মকান্ড করে জড়িয়ে পড়েন নানা অপরাধে। তখন তা হয় ভাবনার কারণ। একটু পেছনে ফিরে তাকানো যাক। মূলত মিয়ানমার সরকার তাদের রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে তাদের নাগরিক হিসেবে মনে করে না। মিয়ানমার সরকারের এমন কাল্পনিক বিশ্বাসের কারণে সত্তর দশকের শেষ থেকে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকে। আগে বিভিন্ন সময়ে কম-বেশি ডুকলেও দুই বছর আগে রোহিঙ্গাদের প্রবেশের সংখ্যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। মূলত সরকারের মানবিক বিবেচনায় এতো বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

এতো দীর্ঘ সময় ধরে রোহিঙ্গারা এখানে বসবাস করায় নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। রোহিঙ্গাদের উপস্থিতি বাংলাদেশের সামাজিক অবস্থাকেও সংকটাপন্ন করে তুলেছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া এই রোহিঙ্গারা শরণার্থী ক্যাম্পের নিয়মের বাহিরে গিয়ে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে পাহাড়ি গ্রামগুলোতে রোহিঙ্গারা শরণার্থী বসতি স্থাপন করেছে। শুধু তাই নয়, তাদের অবাদ বিচরণ স্থানীয় শ্রমবাজারে পড়েছে বিরূপ প্রভাব। মিথ্যা তথ্য দিয়ে বাংলাদেশি পাসপোর্ট বানিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে অভিবাসন এবং স¤প্রতি বঙ্গোপসাগর দিয়ে মালয়েশিয়ায় মানব পাচারের মতো অনৈতিক কাজেও তারা জড়িয়ে পড়েছে।

মিয়ানমার প্রথমে তাদের নিতে অস্বীকৃতি জানালেও আন্তর্জাতিক চাপে ধীরে ধীরে তাদের নেয়ার বিষয়ে কিছুটা নমনীয় হয়। গত সোমবার মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিব মিন্ট থোর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে এক বৈঠক করেন বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব কামরুল আহসান। যেখানে রাখাইন রাজ্যে প্রত্যাবাসনের আগে যাচাইয়ের জন্য ২৫ হাজার রোহিঙ্গার নতুন একটি তালিকা মিয়ানমারের কাছে হন্তান্তর করেছে বাংলাদেশ। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৫ হাজার রোহিঙ্গার নামের তালিকা মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে দিয়েছে বাংলাদেশ। মিয়ানমারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে তারা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরার জন্য বোঝাচ্ছেন। এখন এ বিষয় শুধু বোঝালে হবে না। মিয়ানমারের উচিত হবে যথাযথ উদ্যোগ নিয়ে তাদের দ্রুত নিজ দেশে নিয়ে যাওয়া।  

যদিও এর আগে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর চুক্তি সই করেছিল। পরে দুই দেশ ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম এগিয়ে নিতে ‘ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট’ চুক্তি করে। ‘ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট’ অনুযায়ী, প্রত্যাবাসন শুরু দুই বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। যার অংশ হিসেবে রোহিঙ্গাদের প্রথম দলের ফেরার কথা ছিল গত বছরের নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে। কিন্তু রাখাইনে অনুকূল পরিবেশ না থাকায় রোহিঙ্গারা ফিরতে রাজি না হওয়ায় এ কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। এখনো তেমন কিছু হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ তাদের বক্তব্য অনুযায়ী অনুকূল পরিবেশ কবে তৈরি হবে তা বলা মুশকিল। এখানে আসলে অনুকূল পরিবেশের দোহাই দেয়াটা শুধু লোক দেখানো। মিয়ানমারের আন্তরকিতায় ঘাটতি রয়েছে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি।
তবে আমাদের জন্য ভয়ের কারণ হলো রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান না হলে সন্ত্রাসী তৎপরতা বৃদ্ধি পেতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ মাঝে মাঝে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অপরাধ করে রোহিঙ্গারা ধরাও পড়ছে। এর ফলে আমাদের দেশের সামাজিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার মুখে পড়েছে। এসব থেকে আমাদের দ্রুত পরিত্রাণের জন্য প্রয়োজন রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রত্যাবাসন। বাস্তবতা হলো রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বাংলাদেশ শতভাগ আন্তরিক। কিন্তু বিপরীতে এ বিষয়ে মিয়ানমারের আন্তরিকতা প্রশ্ন সাপেক্ষ। তাই মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক ভাবে চাপ অব্যাহত রেখে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে সমাধানে আসতে হবে। 

ফিরে আসি ইতালিয়ান রাজনৈতিক দার্শনিক এন্থনিও গ্রামসি সেই কথায়। যেখানে তিনি বলেছেন- ‘সবকিছুই ভাল, কিন্তু একটা নিদিষ্ট সীমা পর্যন্ত’। এখন আমরা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে ভাল করেছি। তাদের বিপদে পাশে থেকেছি। কিন্তু এখন তারা যেভাবে অপরাধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিজেদের জড়াচ্ছেন তাই তারা ভালোর নিদিষ্ট সীমা অতিক্রম করেছে। তাই এ বিষয়ে আর নমনীয় হওয়ার সুযোগ নেই। বরং তাদের বিষয়ে আরো কঠোর হতে হবে। রোহিঙ্গারে ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে আন্তর্জাতিক চাপ আরো প্রবল করতে হবে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর