Alexa রোদ এনে দাও ।। বাবলী হক 

রোদ এনে দাও ।। বাবলী হক 

 নি ব ন্ধ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:২৪ ২৩ মার্চ ২০১৯   আপডেট: ১৫:২৫ ২৩ মার্চ ২০১৯

ছবি: ইন্টারনেট

ছবি: ইন্টারনেট

সাত বছর বয়সী সুস্মি মায়ের আঁচল ধরে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়ায়। হাসি-খুশি কিন্ত কথা কম বলে। যখন বলে প্রতিটি কথার পুনরাবৃত্তি করে। সুস্মি বনানীর তিন তলার ফ্ল্যাটে নিজের ঘরে বসে পাজল নিয়ে খেলছিল।

পড়ন্ত বিকেলের একটুকরো রোদ জানালা গলিয়ে মেঝেতে এসে পড়ে। খেলতে খেলতে হঠাৎ সুস্মির চোখ পড়ল রোদের দিকে। পাজল ছেড়ে লাফিয়ে নামল মেঝেতে। ফ্রকের দুই প্রান্ত ধরে ঘুরতে থাকল রোদকে ঘিরে।  বিকেলের রোদ একটু একটু করে সরে যাচ্ছে মেঝে থেকে। সুস্মি মেঝের দিকে তাকিয়ে দেখে রোদ নেই। ওমনি আচমকা চিৎকার শুরু করে দিল,  রোদ কোথায়? আমার রোদ এনে দাও। বাড়ির সবাই ছুটে এল। সুস্মির কথা বুঝতেই পারছে না সে কী চায়। অনেক কষ্টে মা বুঝল। সুস্মিকে বোঝাতে চাইল এখন রোদ ফিরিয়ে আনা যাবে না। ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে। সুস্মির চিৎকার ইতিমধ্যে গোঙানির রূপ নিয়েছে। অভিযোগ... রোদ কেন তার সঙ্গে খেলবে না?  রাগ, অভিমান কিছুতে কমছে না। বুড়ো  আঙুল মুখে গুঁজে না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।                      
সুস্মি একজন অটিস্টিক শিশু। তার বোধবুদ্ধির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আবেগ। সুস্মির আবেগ এখানে কোনো যুক্তি মানছে না। কারণ এ ধরনের শিশু প্রতীকী বা কাল্পনিক খেলায় নিজস্ব জগতে আনন্দে মেতে থাকে।  নিজেদের চারপাশে একটি আবরণ তৈরি করে থাকতে ভালোবাসে। সেখানেই সে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এমনকী সহজে সেই আবরণের ভিতর অন্য কাউকে ঢুকতে দিতেও চায় না। সে মনে করে তার আনন্দের জগৎ তার একান্তই নিজের।  সেখান থেকে বেরিয়ে আসতেও ভয় পায়। 
 মানুষের বোধ বুদ্ধির কিছুটা জন্মগত কিছুটা পরিবেশগত। বুদ্ধির জিনগত অংশ হল ‘ফ্লুইড ইনটেলিজেন্স’৷ জন্মের পর পরিবেশ- নির্ভর যে বোধবুদ্ধি তৈরি হয় সেটি হচ্ছে ‘ক্রিস্টালাইজড ইনটেলিজেন্স’। জিনের মধ্যে থাকে জন্মগত বুদ্ধির সংকেত। এই সংকেতের প্রকাশ ঘটে পরিবেশ ও শিক্ষার উপর। বংশগতভাবে বাবা-মার সূত্রে জিন থেকে পাওয়া মেধা-বুদ্ধির  সম্ভাবনা থাকলেও এর বাস্তবিক বহিঃপ্রকাশ ঘটে শেখার পরিবেশ, শেখানোর দক্ষতা ও পদ্ধতির উপর।  আশির দশকে প্রথম দিকে বোধ বুদ্ধির ক্ষেত্রে  আবেগকে তেমন ভাবে গুরুত্বও দেয়া হত না৷ কিন্ত এখন ভাবা হয় ক্ষমতা ও দক্ষতার ক্ষেত্রে আবেগের ভূমিকা অনেকখানি। সাধারণত  বিশেষ শিশুরা সম্পূর্ণ ভাবে আবেগের ওপর নির্ভরশীল।  কারণ তারা বেশিরভাগ সময় ভাষা এবং চিন্তায় দুর্বল থাকে।

সব মানুষের ইমোশন এক রকম হয় না। অনেকেরই  ইমোশনাল ইনটেলিজেন্স ভিন্ন থাকে। অনেক বুদ্ধিমান মানুষকে দেখা যায় খুব সামান্য কারণে হঠাৎ রেগে যায় বা অনেকে আবেগপ্রবণ হয়ে কেঁদে ফেলে। 

বিশেষ শিশুর ক্ষেত্রে দেখা যায় অকারণে এরা কাঁদতে শুরু করে। কান্নার কারণ বুঝতে পারাটা খুব কঠিন হয়ে যায় যেহেতু শিশুটি নিজেই জানে না কেন সে কাঁদছে। আবার কখনো নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলে, একা একা হাসতে থাকে অকারণে।  ভয়, রাগ, দুঃখ, আশ্চর্য হওয়া, আগ্রহ জাগা, বিরক্তি ও উত্তেজনা এসব প্রাথমিক আবেগ। এই সমস্ত আবেগ রাগায়, কাঁদায়, উত্তেজিত করে। বিশেষ শিশুর ক্ষেত্রে তাদের শারীরিক ও মানসিক জড়তা কাটানো জন্য কিছু থেরাপি ব্যবহার করা হয়৷ মনোবিশারদগন অটিস্টিক বাচ্চাদের জন্য যে থেরাপি দিতেন সেটা ছিল ভুল করতে করতে শেখা। কিন্ত গত দেড় দশক ধরে থেরাপির ধরন বদলে গিয়েছে।

থেরাপিগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যেন থেরাপি চলার সময় বাচ্চার মনে নানা ধরনের আবেগ তৈরি হয়। দেখা গিয়েছে থেরাপির পদ্ধতিগুলো নিয়মিত চর্চার ফলে শিশুদের   মানসিক জড়তা কাটাতে বেশ সক্ষম হয়েছে ৷  শিশুর প্রিয়জন, পছন্দের খাবার বা খেলনা দিয়ে তার আনন্দের আবেগটিকে জাগানো হয়। আবার সেটিকে সরিয়ে নিলে তার রাগ বা দুঃখও তেমনি হয়। এভাবে আবেগ চেনা বা আবেগ নিয়ন্ত্রণের বিশেষ ক্ষমতা বা এমপ্যাথি তৈরি হয়। সুস্হ বাচ্চাদের মতো না হলেও বয়সের সঙ্গে একটু বেশি সময় নিয়ে বিশেষ শিশুদের ভাবনা চিন্তায় একটু একটু করে ক্ষমতা বাড়ে। যে সব শিশুরা আবেগকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বোধবুদ্ধির প্রয়োগ করতে পারে না, তাদের জন্য নিয়মিত থেরাপি খুব প্রয়োজন। শুরুতে না হলেও পরবর্তীতে শিশু থেরাপিতে নিজেকে সম্পৃক্ত করে ফেলে। 

শেখার পদ্ধতি যদি আনন্দ ও আবেগের সঙ্গে হয় তাহলে তার মান ও গুণও বেড়ে যায়। বিশেষ শিশুদের ক্ষেত্রে যুক্তির চেয়ে আবেগ বেশি প্রাধান্য পায়। অনুভব ও আবেগের সঙ্গে যতটা সহজে শেখানো যায় ভয় বা বিরক্ত হলে শিশুটি নিজেকে ততটাই গুটিয়ে রাখে৷ এই ধরনের শিশুরা আত্মকেন্দ্রিক হয়। সামাজিকভাবে উদাসীন থাকে। স্বাভাবিক শিশুদের মতো অটিস্টিক শিশুরাও অনুকরণ করতে ভালোবাসে। মা বাবা ও ঘরের লোকের প্রভাব সব চেয়ে বেশি শিশুর উপরে পড়ে। তাদের অনেক বেশি মনোযোগী হতে হবে শিশুদের প্রতি। আবেগ প্রকাশে মুখের ভাষার চেয়ে শারীরিক ভাষায় তারা নিজেকে ব্যক্ত করতে চায়। তার ইচ্ছেগুলোকে মুখে নয় ইশারায় প্রকাশ করে। 

অনেক সময় শিশু আপনজনের কাছে প্রাধান্য পাবার জন্য, তাদের দৃষ্টি আর্কষণ করার জন্য অহেতুক জেদ করতে থাকে। তাদের রাগ, কষ্ট, আনন্দকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাকেও পরিবারের অন্যদের মতো প্রাধান্য দিতে হবে।    

অটিস্টিক শিশুর শারীরিক ও মানসিক অস্হিরতা, পড়াশোনায় অমনোযোগ, অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ স্হাপনে অসফল, জেদ করা এসব যে সমস্যাগুলি রয়েছে সেগুলিকে ওষুধ দিয়ে সারানো যায় না। শুধু মাত্র নিবিড় প্রশিক্ষণ দিয়েই এগিয়ে নেয়া যায়।  

ভাষা ও চিন্তনে দুর্বলতা কাটিয়ে 
স্বনির্ভর করে তুলতে হলে এসব বিশেষ শিশুকে সাংসারিক কাজ, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিচর্যা, সামাজিক আচার, বিনোদন, অর্থের ব্যবহার এগুলি শেখানো খুব জরুরি। নিয়মিত মানসিক চর্চা, শেখার আধুনিক পদ্ধতি ও পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে এই শিশুদেরকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।      

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএস/আরআর 
 

Best Electronics
Best Electronics