রোজা না রাখা বা ভেঙ্গে ফেলার অনুমতি আছে যেসব কারণে
Best Electronics

রোজা না রাখা বা ভেঙ্গে ফেলার অনুমতি আছে যেসব কারণে

শহীদুল ইসলাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:৩৩ ১৪ মে ২০১৯   আপডেট: ১৬:৪১ ১৪ মে ২০১৯

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

ইসলাম মানুষের স্বভাবজাত একটি ধর্ম। দ্বীন হচ্ছে সহজ বিষয়। বোখারির এক হাদীসে এসেছে, দ্বীন সহজ। যে কেউ দ্বীনের মধ্যে কঠোরতা অবলম্বণ করবে সে দ্বীন থেকে বিচ্যুত হবে। মানুষের সাধ্যাতীত কোনো বিধান ইসলাম দেয়নি। 

এই বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায় রোজার ক্ষেত্রে। কারণ রোজা রাখা অনেক কষ্টের বিষয়। কিন্তু কারো জন্য যদি সাধ্যাতীত হয় তাহলে তাৎক্ষণিক তার জন্য রোজা না রাখার অনুমতি আছে।

রোজা যে আয়াতে ফরজ করা হয়েছে ওই আয়াতেই সাধ্যাতীত হলে রোজা না রাখার অনুমতির কথাও বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিলো তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। যাতে তোমরা পরহেজগার হতে পারো। (রোজা ফরজ) নির্দিষ্ট কয়েকদিন। তবে তোমাদের মধ্যে যে অসুস্হ বা মুসাফির হবে (তার ওপর তাৎক্ষণিক রোজা ফরজ নয়, বরং এ কারণে যে কয় দিন রোযা ভেঙ্গেছে) তার পরিবর্তে অন্য কোনো সময় রোজা রাখবে।’ (সূরা বাকারা-১৮৩-১৮৪)

কোরআনে বর্ণিত এই বিধানের কারণে ফকীহগণ কিছু সুরতে রোজা না রাখার অনুমতি দিয়েছেন। নিম্নে এর বিস্তারিত আলোচনা তুলে ধরা হচ্ছে-

(এক) সফর: কোনো ব্যক্তি যদি শরীয়ত কতৃক নির্ধারিত দুরত্বে ভ্রমণ করে তাহলে তার জন্য রোজা না রাখার অনুমতি আছে। শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত দুরত্ব, যতটুকু ভ্রমণ করলে রোজা না রাখার অনুমতি আছে, আটচল্লিশ মাইল। আর বর্তমানের কিলোমিটার হিসেবে বিরাশি বা তার চেয়ে বেশি ভ্রমণ দ্বারা রোজা না রাখার অনুমতি আছে। রোজা না রাখার বিধান বহাল থাকবে যতক্ষণ সে ভ্রমণরত থাকবে। ভ্রমণের বিধান যখন ওঠে যাবে তখন থেকে রোজা রাখা ফরজ হবে। ভ্রমণের বিধান রহিত হয়ে যাবে, ব্যক্তি যখন যেখান থেকে ভ্রমণ করেছিলো সেখানে ফিরে আসবে। বা ভ্রমণ করে যে স্হানে গিয়েছে সেখানে পনের দিন বা তার চেয়ে বেশি দিন থাকার নিয়ত করবে। ভ্রমণ অবস্হায় রোজা না রাখার বৈধতার দলীল হচ্ছে, কোরআনের এই আয়াত ‘রমজানে যে ব্যক্তি ভ্রমণে থাকবে সে অন্য সময়ে রোজা রাখবে।’ তাছাড়া বোখারী ও মুসলিম শরীফে হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, আমরা রাসূল (সা.) এর সঙ্গে এক সফরে ছিলাম। তখন আমাদের কেউ কেউ রোজা রাখে আর কতক রোজা রাখে নাই। তো আমাদের রোজাদাররা, যারা রোজা রাখে নাই তাদের এ কর্মকে দোষ মনে করে নাই। (সহীহ মুসলিম-১১১৬) 

ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, সফরে যে ব্যক্তি রোজা রাখে না, তার এটাকে দোষ মনে করো না। কারণ, রাসূল (সা.) কখনো কখনো রোজা রাখতেন আর কখনো রাখতেন না। (সহীহ মুসলিম-১১১৩)

কোনো ব্যক্তি যদি রোজা রেখে ভ্রমণ শুরু করে তাহলে ভ্রমণ করার কারণে তার জন্য রোজা ভাঙা জায়েয হবে না। কারণ সে রোজা রাখার পর ভ্রমণ শুরু করেছে। অতএব উক্ত রোজা পূর্ণ করা তার জন্য ওয়াজিব। তবে ওই অবস্হায় ভেঙ্গে ফেললে, তার ওপর শুধু কাযা ওয়াজিব হবে। কাফ্ফারা আসবে না। কারো যদি ভ্রমণে রোজা  রাখতে বেশি কষ্ট না হয় তাহলে রোজা রাখাই উত্তম। কারণ ভ্রমণে রোজা না রাখার অনুমতি থাকলেও পরবর্তীতে তা কাযা করতে হবে। তাই সক্ষমতা থাকলে, অন্য মাসে কাযা করার চেয়ে রমজানে রোজা রেখে ফেলাই উত্তম।

(দুই) অসুস্হতা: অসুস্হ ব্যক্তির জন্য রমজান মাসে রোজা না রাখা বৈধ, যখন আশংকা হবে যে, রোজা রাখলে রোগ বেড়ে যাবে বা সুস্হ হতে বিলম্ব হবে। অসুস্হ ব্যক্তি নিজে মনে মনে আশংকা করে রোজা ভেঙ্গে ফেললে চলবে না। বরং আশংকা হতে হবে কোনো আলামত দেখার মাধ্যমে বা অভিজ্ঞদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। কোনো অভিজ্ঞ
দ্বীনদার ডাক্তার যদি আশংকার কথা বলে তা ধর্তব্য হবে। কোনো অযোগ্য, অমুসলিম বা ফাসেক ডাক্তারের কথায় রোজা ভেঙ্গে ফেললে বাহ্যিকভাবে মনে হচ্ছে কাফ্ফারাও আদায় করতে হবে। যেমন নাকি কোনো আলামত বা অভিজ্ঞদের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে না জেনে ভেঙ্গে ফেললে কাফ্ফারা দিতে হয়। (আল ফিকহুল হানাফি ফি ছাওবিহিল জাদিদ, খন্ড-১, পৃষ্ঠা-৪৩৮) 

অতএব যেকোনো রোগের কারণে রমজানের রোজা ভেঙ্গে ফেলা জায়েয হবে না। কারণ অনেক রোগ আছে, যেগুলো রোজা না রাখার কারণে ভালো হয়ে যায়। বরং ওই রোগের জন্য রোজা না রাখা জায়েয, রোজা যে রোগের জন্য মুনাসিব নয়। রোযা যে রোগের মুনাসিব নয় এমন রোগীর রোজা না রাখার বৈধতার দলীল হচ্ছে আল কোরআনের বিধান ‘যে অসুস্হ হয় বা সফরে থাকে সে যেন অন্য সময় তা কাযা করে নেয়।’

(তিন) গর্ভধারণ ও সন্তানকে দুধ পান করানো: ইসলাম গর্ভবতী ও দুগ্ধ পান করায় এমন মহিলাকে রোজা না রাখার সুযোগ দিয়েছে। যদি তারা নিজেদের বা সন্তানদের জীবন নাশের আশংকা করে। দুধ পান করানোর ক্ষেত্রে নিজের বাচ্চা বা অন্য মহিলার বাচ্চার মাঝে বিধানগত দিক থেকে কোনো পার্থক্য নেই। নিজের বাচ্চার জীবন নাশের আশংকায় যেমন রোজা না রাখা বৈধ তেমনি অন্য মহিলার বাচ্চাকে দুধ পান করালে, ওই বাচ্চার জীবন নাশের আশংকার কারণে রোজা না রাখা বৈধ হবে। উক্ত মাসআলার দলীল হচ্ছে, হজরত আনাস (রা.) এর সূত্রে বর্ণিত একটি হাদীস, রাসূল (সা.) রোজা না রাখার অনুমতি দিয়েছেন গর্ভবতী মহিলাকে যদি সে নিজ সন্তানের ব্যাপারে আশংকা করে। আর সুযোগ দিয়েছেন দুগ্ধ পান করায় এমন মহিলাকে যিনি সন্তানের জীবনের আশংকা করে। (সুনানে ইবনে মাজাহ-১৬৬৮)

কোনো মহিলা যদি নিজের দুধ ভিন্ন অন্য কোনো মহিলার দুধের ব্যবস্হা করতে পারে, যেমন রমজানেও দুধ পান করাতে সক্ষম এমন মহিলাকে ভাড়া নিলো তাহলে সন্তানের মায়ের জন্য রোজা ভাঙ্গা জায়েয হবে না। আর যদি অন্য কোনো ব্যবস্হা করতে না পারে যেমন অর্থের অভাবে কাউকে ভাড়া নিতে পারে নাই বা বাচ্চা অন্য কারো দুধ পান করছে না তাহলেই কেবল সন্তানের ব্যাপারে আশংকা হলে মায়ের রোজা না রাখা জায়েয।

মাসআলা: কোনো দ্বীনদার অভিজ্ঞ ডাক্তার যদি সন্তানের সুস্হতার জন্য মাকে কোনো ওষুধ খেতে বলে তাহলে উক্ত ওষুধ খাওয়ার জন্য মায়ের রোজা ভাঙ্গা জায়েয হবে। (আল ফিকহুল হানাফি ফি ছাওবিহিল জাদিদ-খন্ড-১, পৃষ্ঠা-৪৩৯) ইসলাম মানুষের সাধ্যের প্রতি কী পরিমাণ খেয়াল রাখে এর দৃষ্টান্ত হতে পারে এই মাসআলা।

(চার) জীবন নাশের আশংকা হলে রোজা ভাঙ্গা:রোজাদারের যদি কঠিন পিপাসা বা ক্ষুধা লাগে, যার দরুণ নিজের জীবনের ব্যাপারে আশংকা দেখা দেয় বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার প্রবল ধারণা হয় তাহলে রোজা ভেঙ্গে ফেলা জায়েয। উক্ত সুরতে তার ওপর কাজা ওয়াজিব হবে কাফ্ফারা ওয়াজিব হবে না। এ জন্য রোজাদারের করণীয় হচ্ছে, রমজানে দিনের বেলায় কাজকে সংক্ষিপ্ত করা। তবে কোনো ব্যক্তি যদি দিনের বেলায় কাজকে সংক্ষিপ্ত করতে সক্ষম না হয় বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কারো সঙ্গে ইজারা চূক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিলো, এর মাঝে
রমজান চলে এসেছে আর মালিক চূক্তিকে রহিত করতে চাচ্ছে না বা কারো ফসল পেকে গেছে, কিন্তু স্বাভাবিক মজুরিতে কাজ করার মতো লোক পাচ্ছে না আবার সময় মতো কাটতে না পারলে ফসল নষ্ট হয়ে যাবে বা চুরি হয়ে যাবে তাহলে দিনের বেলায় কঠোর পরিশ্রমের কারণে রোযা ভেঙ্গে ফেলতে হলে কোনো গোনাহ হবে না।

উল্লেখ্য, যাদের দিনে কঠোর মেহনতের কারণে রোজা রাখা বা না রাখা উভয়টির সম্ভাবনা থাকে তাদের দিনের শুরুতেই রোজা ভেঙ্গে ফেলা জায়েয হবে না। বরং তাদের ওপর জরুরি হচ্ছে, রোজা শুরু করা। এরপর যদি তাওফিক হয় তাহলে রোজা রাখবে অন্যথায় ভেঙ্গে ফেলবে।

মাসআলা: এক ভাই প্রশ্ন করেছেন, আমার অনেক সন্তানাদি। যদি রোজা রাখি তাহলে কাজ করতে পারবো না। আর কাজ করতে না পারলে সন্তানাদি খাবার পাবে না। এই অবস্হায় আমার করণীয় কী?

উত্তর: আপনার করণীয় হচ্ছে, আপনি দিনের বেলায় রোজা রেখে কাজ শুরু করবেন। এরপর যদি পিপাসা বা ক্ষুধার কারণে রোযা ভেঙ্গে ফেলতে হয় তাহলে রোজা ভেঙ্গে ফেলবেন এবং উক্ত রোজা পরবর্তীতে কাজা করে নিবেন। কাফ্ফারা দিতে হবে না।

(পাঁচ) বার্ধক্যের চূড়ান্ত পর্যায় বা এমন রোগ যা থেকে সুস্হতার কোনো আশা নেই: কোনো ব্যক্তি যদি বার্ধক্য বা অসুস্হতার কারণে রোজা না রাখতে পারে তাহলে করণীয় হচ্ছে, প্রতি রোজার বদলায় সদকাতুল ফিতর পরিমাণ মাল গরিব- মিসকিনকে দান করবে। শরীয়তের পরিভাষায় এটাকে ফিয়া বলে। দাতার এখতিয়ার থাকবে, চাইলে রমজানের শুরুতেই দিয়ে দেবে বা রমজানের শেষে দেবে। ফিদয়া ওই সকল গরিব মিসকিনকে দেয়া যাবে, যাদেরকে যাকাতের মাল দেয়া যায়। 

যাদের রোজা ভাঙ্গার অনুমতি আছে তাদের করণীয়-

(এক) রমজানের দিনের বেলায় করণীয়: যারা কোনো ওজরের কারণে রোজা ভেঙ্গে ফেলেছেন, তাদের কর্তব্য হচ্ছে, দিনের বেলায় প্রকাশ্যে পানাহার থেকে বিরত থাকা।

(দুই) পরবর্তীতে করণীয়: যারা কোনো কারণে রোজা ভেঙ্গে ফেলেছেন, রমজান পরবর্তী তাদের করণীয় হচ্ছে, ওই দিনগুলোর রোজা কাজা করা। রোজা ভাঙ্গার ওজর থাকা অবস্হায়ই যদি কোনো ব্যক্তি মারা যায় এবং মাঝে অবকাশ কোনো সময় না পায়, যেখানে রোজাগুলো কাযা করতে পারতো তাহলে তার ওপর কাযা কাফ্ফারা কোনটাই ওয়াজিব হবে না। আর যদি সুস্হতা ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী এতটুকু অবকাশ পায়, যেখানে ইচ্ছা করলে রোজার কাযা আদায় করে নেয়া যেতো তাহলে তার ওপর ফিদয়া আদায়ের ওসিয়ত করে যাওয়া আবশ্যক।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে

Best Electronics