Alexa ‘রোগের কতা আধা শুনি কয় বড় ডাক্তোর দ্যাখান’ 

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল 

‘রোগের কতা আধা শুনি কয় বড় ডাক্তোর দ্যাখান’ 

সাজ্জাদ হোসেন বাপ্পী, রংপুর  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৮:১৯ ২৩ মে ২০১৯  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

‘ম্যালাক্ষণ খাড়া হই থাকিয়া ডাক্তোরের দ্যাখা পানু, কিন্তু কাম হইলো না। রোগের কতা শুনতিই চায় না। মিচ্ছা একনা (অল্প একটু) শুনি কয়, বড় ডাক্তোর দ্যাখান।’ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গাইনি আউটডোরে চিকিৎসা নিতে এসে ভোগান্তির কথা এভাবেই প্রকাশ করছিলেন নগরীর ধাপ এলাকার গৃহবধূ তানি। 

তিনি জানান, প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে অনেক টাকা প্রয়োজন। যা তার সাধ্যের বাইরে। এজন্য এসেছিলেন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আউটডোরে। কিন্তু তারা রোগের কথা শুনতেই চান না। বিরক্ত হন। একটুখানি শুনেই পাঠাতে চান প্রাইভেট হাসপাতালে। কোন ডাক্তার এমন বিরক্ত হয়েছেন নাম জানতে চাইলে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. তাবাছছুম আক্তারের কথা বলেন তিনি।

তানির অভিযোগমতে ডা. তাবাছছুমের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বিরক্ত হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন। তবে বড় ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পরামর্শের বিষয়টি স্বীকার করেন। হাসপাতালের নানা সংকট তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রতিদিন আউটডোরে যে পরিমাণ রোগী আসে। তা সামাল দেয়া আমাদের জন্য কষ্টকর। সময় নিয়ে সেভাবে রোগী দেখতে গেলে সবাইকে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব না। তখন আবার ওইসব অভিযোগ শুনতে হবে। 

তিনি জানান, ১ হাজার বেডের এই হাসপাতালে প্রতিদিন রোর্গী থাকে প্রায় তিন হাজারের মতো। এসব রোগীর চিকিৎসা সেবা দিতে হিমসিম খেতে হয় এখানকার চিকিৎসদের। 

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, চিকিৎসকসহ প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের ২৬০ পদের স্থলে এ হাসপাতালে কর্মরত রয়েছেন ১৯৩ জন। শূন্য রয়েছে ৬৭টি পদ। নার্সিং কর্মকর্তা কর্মচারীদের ৮০২টি পদের মধ্যে শূন্য রয়েছে ২৪টি পদ। অপরদিকে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের ১শ’ পদের মধ্যে ৩৯টি পদ শূন্য রয়েছে। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ৪৪৫টি পদের মধ্যে শূন্য রয়েছে ১৩২টি পদ। 

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেডিওলজি বিভাগের কর্মকর্তা হারুউল কবীর ডেইলি বাংলাদেশকে জানান, হাসপাতালের সিটি স্ক্যান, অটোক্লেভ মেশিন, কার্ডিয়াক, ভেন্টিলেটর, অ্যানেসথেসিয়া, এক্স-রে মেশিনসহ ওটির বেশকিছু যন্ত্রপাতি বিদ্যুতের লো-ভোল্টেজের কারণে অচল অবস্থায় পড়ে আছে। হাসপাতালে বিদ্যুতের সাব স্টেশন না থাকার কারণে মেশিনগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সাব স্টেশন নির্মাণের জন্য ও মেশিনগুলো মেরামতের জন্য পরিচালকের মাধ্যমে ঢাকায় দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও এর কোনো সুরাহা হয়নি বলেও জানান তিনি। 

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রংপুর বিভাগের রংপুর, নীলফামারী, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিহাট, দিনাজপুর ঠাকুরগাঁ ও পঞ্চগড় জেলার মানুষের পাশাপাশি জয়পুরহাট ও বগুড়া জেলার মানুষও চিকিৎসা সেবা নিয়ে থাকে। হাসপাতালে যে সব রোগী আসেন তাদের বেশিরভাগই গরীব আর নিম্ন আয়ের মানুষ। 

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৫টি বিভাগে রয়েছে ৪২টি ওয়ার্ড। এর মধ্যে ৩৮টি ওয়ার্ডে কার্যক্রম চলছে। ওয়ার্ডগুলো নোংরা ময়লা আর্বজনায় ভর্তি। গন্ধে প্রবেশ করা দায়। টয়লেটগুলো ব্যবহার অনুপযোগী। সবসময় অপরিষ্কার থাকে। সুইপার থাকলেও ঠিকমত পরিষ্কার করে না বলে অভিযোগ রয়েছে। ওয়ার্ডগুলোতে রয়েছে আলোর অভাব। ফ্যান থাকলেও তা ঘোরে না। টয়লেটের দরজা নেই। হাসপাতালে রয়েছে দালালদের উৎপাত। 

মেডিসিন ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী জাহানারা বেগম জানান, হাসপাতালে দায়িত্বরত চিকিৎসকরা তাদের ইচ্ছেমতো দায়িত্ব পালন করেন। ডাকলে বিরক্ত বোধ করেন। নার্সদের ব্যবহারও খারাপ। আয়ারা টাকা ছাড়া কাজ করতে চায় না। সব ওষুধ বাইরে থেকে নিয়ে আসতে হয়। 

তিনি জানান, বেডের অভাবে গত দুই দিন ধরে হাসপাতালের মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। হাসপাতালের ইউরোলজি বিভাগে রয়েছে চিকিৎসক সংকট। এই বিভাগে আছেন মাত্র দুইজন চিকিৎসক। কুড়িগ্রামের রৌমারী থেকে এসেছেন আহসান আলী। তিনি আরো জানান, অপারেশনের জন্য ২০ দিন ধরে এখানে ভর্তি আছেন। ইন্টার্নি চিকিৎসকরা তাকে দেখছেন। সিরিয়াল আসলে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখে অপারেশন করবেন। কবে দেখবেন তা তিনি নিজেও জানেন না। 

নগরীর জুম্মাপাড়া থেকে আসা আবুল হোসেন জানান, হাসপাতালে অনেক টেস্ট করা হয় না। বাহির থেকে তাদের করে নিয়ে আসতে হয়। এজন্য গুনতে হয় মোটা অংকের টাকা। তিনি জানান, সিটি স্ক্যান মেশিন অচল হয়ে পড়ে আছে। কবে ঠিক হবে তা কেউ বলতে পারে না। তার অভিযোগ হাসপাতালের কিছু কিছু চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ডবয়ের কারণে চিকিৎসা সেবায় একটা অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সরকারের উচিত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া। 

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পারিচালক মোহাম্মদ আব্দুল গনি হাসপাতালের বেশ কিছু বিষয়ে অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, রোগীর সঙ্গে আমরা ভালো ব্যবহার করলে তারাও আমাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে। আমরা চেষ্টা করি তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে। হাসপাতাল অপরিষ্কার, টয়লেটের বেহাল অবস্থা, বেড সংকট, ওষুধ সংকটসহ নানা সমস্যার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, আমি সবেমাত্র এই হাসপাতালে যোগদান করেছি। শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করছি। আশা করি সফল হব। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর/এস

Best Electronics
Best Electronics