রোগীকে রুকইয়া করার মাসনুন দোয়া

রোগীকে রুকইয়া করার মাসনুন দোয়া

পর্ব-২

ওমর শাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:৪৬ ৬ জুন ২০২০   আপডেট: ১৬:৪৯ ৬ জুন ২০২০

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যদি ঝাড়-ফুঁক করতে হয় তা হলে আল্লাহর কালামের দ্বারা এবং আল্লাহর নামে কর। কারণ আল্লাহ তায়ালার নামের মাঝে নিঃসন্দেহে তাসির আছে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যদি ঝাড়-ফুঁক করতে হয় তা হলে আল্লাহর কালামের দ্বারা এবং আল্লাহর নামে কর। কারণ আল্লাহ তায়ালার নামের মাঝে নিঃসন্দেহে তাসির আছে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুফরি ও শিরকি মন্ত্র ও বাক্যাবলীর পরিবর্তে আল্লাহ তায়ালার পবিত্র নাম দ্বারা ঝাড়-ফুঁক করেছেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে পদ্ধতি শিখিয়েছেন। যেমন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কোনো ব্যক্তি অসুস্থ হলে তোমরা এই দোয়া পাঠ কর,

আরো পড়ুন >>> ইসলামের দৃষ্টিতে রুকইয়া : জায়েজ নাকি নাজায়েজ? পর্ব-১

أَذْهِبِ البَاسَ رَبَّ النَّاسِ، اشْفِ وَأَنْتَ الشَّافِي، لاَ شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ، شِفَاءً لاَ يُغَادِرُ سَقَمًا

অনেক সময় তিনি দোয়া শিক্ষা দেয়ার পর বলেছেন, এ দোয়া পাঠ করে রোগীকে ঝাড়-ফুঁক কর। তিনি স্বয়ং এর ওপরে আমল করেছেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে এরূপ শিক্ষা দিয়েছেন।

সুরা ফালাক ও নাসের মাধ্যমে ঝাড়-ফুঁক করার আমল:

হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাদি.) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিদিনের আমল ছিল, তিনি রাতে শোয়ার পূর্বে সূরা ফালাক ও সূরা নাস এবং কোনো কোনো রেওয়ায়েতে আছে, সঙ্গে সূরা কাফিরূনও তিনবার করে পাঠ করতেন, এরপর নিজের দু’হাতে ফুঁকদিতেন এবং পুরা দেহের ওপর হাত বুলাতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং এভাবে ঝাড়-ফুঁক করেছেন। তিনি (সা.) এও বলেছেন, এ আমলের দ্বারা আমলকারী শয়তানের প্রভাবমুক্ত থাকে এবং সেহের ও যাদুটোনার হামলা থেকে নিরাপদ থাকে।

মৃত্যুশয্যায়ও ঝাড়-ফুঁকের আমল:

এক হাদিসে হজরত আয়েশা (রাদি). বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃতুশয্যায় ছিলেন, শরীর খুব দুর্বল ছিল। তিনি বিছানা থেকে উঠতে পারতেন না, এমনকী পবিত্র হাতও উপর দিকে তুলতে সক্ষম ছিলেন না। একদিন আমি ভাবলাম, এখন রাতের বেলা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সারা জীবন শোয়ার পূর্বে সুরা ফালাক ও নাস তিনবার করে পাঠ করে নিজের হাতে ফুঁক দিতেন এবং পুরা শরীরে হাত বুলিয়ে দিতেন কিন্তু আজকে এ আমল করার তাঁর শক্তি নেই। এরপর আমি নিজেই সূরা ফালাক ও নাস তিনবার করে পাঠ করে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র হাতে ফুঁক দিই এবং পুরা শরীরে তাঁর হাত বুলিয়ে দিই। আমি যদি আমার হাতে ফুঁক দিয়ে আমার হাত তাঁর শরীরে বুলিয়ে দিতাম তাতে এতটা তাসির ও ফায়েদা হত না, তাঁর নিজের হাত বুলানোর দ্বারা যতটা ফায়েদা হয়েছে।

এছাড়া আরো অনেক হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যদি ঝাড়-ফুঁক করতে হয় তা হলে আল্লাহর কালামের দ্বারা এবং আল্লাহর নামে কর। কারণ আল্লাহ তায়ালার নামের মাঝে নিঃসন্দেহে তাসির আছে।
 
হজরত আবু সায়িদ খুদরি (রাদি.) এর একটি ঘটনা:

হাদিসে হজরত আবু সায়িদ খুদরি (রাদি.) এর একটি ঘটনা বর্ণিত আছে। একবার সাহাবায়ে কেরামের একটি কাফেলা সফর থেকে মদিনায় ফিরে আসছিল। তাদের খাবার ও পানীয় শেষ হয়ে গিয়েছিল। পথিমধ্যে অমুসলামদের একটি পল্লী পড়ে। তারা পল্লীর লোকদের কাছে তাদের মেহমানদারি করার আবেদন জানাল। পল্লীর লোকেরা তাদের মেহমানদারি করতে অস্বীকার করে। সাহাবায়ে কেরামের কাফেলা পল্লী ছেড়ে কিছুদূর অগ্রসর হয়ে বিশ্রামের জন্য তাঁবু ফেলল। রাতের বেলা ছিল, তারা ভাবলেন, রাত এখানে কাঁটিয়ে সকালে অন্য কোথাও যেয়ে খাবার তালাশ করা যাবে।

আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা ছিল ভিন্ন। রাতের বেলা পল্লীর সরদারকে সাপে দংশন করে। পল্লীর লোকেরা সাপের বিষ নামানোর যত পদ্ধতি আছে সবগুলোই প্রয়োগ করল কিন্তু বিষ নামল না। কেউ একজন তাদেরকে বলল, সাপের বিষ নামানোর জন্য ঝাড়-ফুঁক করতে হয়, ঝাড়-ফুঁক জানে এরকম কাউকে ডেকে আনো। তারা বলল, ঝাড়-ফুঁক জানে পল্লীতে এরকম কেউ নেই। অন্য আরেকজন বলল, পল্লীর বাইরে যে কাফেলা তাঁবু গেড়েছে তাদেরকে গিয়ে জিজ্ঞাসা কর, তাদের মধ্যে কেউ হয়ত সাপের বিষ নামানোর ঝাড়-ফুঁক জানতে পারে।

পল্লীর লোকেরা সাহাবায়ে কেরামের কাছে আসল। সাহাবিদের মধ্যে হজরত আবু সায়িদ খুদরি (রাদি.) ছিলেন। তারা এসে তাকে জিজ্ঞাসা করল, আপনাদের মধ্যে সাপের বিষ নামাতে জানেন এমন কেউ আছে? আমাদের সরদারকে সাপে দংশন করেছে। হজরত আবু সায়িদ খুদরি (রাদি.) বলেন, হ্যাঁ! আছে। কিন্তু তোমরা অনেক কৃপণ, আমাদের কাফেলা তোমাদের পল্লীতে গিয়েছিল, তোমাদের কাছে মেহমানদারি চেয়েছিল, তোমরা আমাদের মেহমানদারি করনি। পল্লীর লোকেরা বলল, তোমরা আমাদের সর্দারের বিষ নামিয়ে দাও, তোমরাদেরকে একপাল বকরি ও প্রয়োজনীয় খাবার-দাবার দেব।

হজরত আবু সায়িদ খুদরি (রাদি.) বলেন, ঝাড়-ফুঁক সম্পর্কে আমার কোনো জ্ঞানই ছিল না কিন্তু আমি ভাবলাম, আল্লাহ তায়ালার কালামের মাঝে নিঃসন্দেহে প্রভাব আছে। তাই আমি তাদের সঙ্গে পল্লীতে গেলাম এবং সূরা ফাতেহা পাঠ করে সর্দারের শরীরের সাপে কাঁটা স্থানে ফুঁক দিলাম। আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছায় বিষ নেমে গেল। পল্লীর লোকেরা খুব খুশি হলো এবং আমাদেরকে ওয়াদা মোতাবেক একপাল বকরি দিল।

বকরির পাল নিয়ে আমি কাফেলার কাছে আসলাম। আমাদের সঙ্গীদের মধ্যে কেউ কেউ এ বকরির গোশত খেতে আপত্তি জানান। তাদের বক্তব্য ছিল, কোরআন পাঠের বিনিময়ে বকরিগুলো নেয়া হয়েছে। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা না করে আমরা খাব না।

ঝাড়-ফুঁক করে বিনিময় নেয়া:

কাফেলা মদিনায় পৌঁছল। হজরত আবু সায়িদ খুদরি (রাদি.) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হয়ে আদ্যপান্ত ঘটনা খুলে বললেন। এরপর জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের জন্য কি এ বকরির পাল হালাল হবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হ্যাঁ! তোমাদের জন্য বকরিগুলো হালাল হবে। আচ্ছা, বলো দেখি, সাপের বিষ নামানোর এ চিকিৎসা সম্পর্কে কিভাবে জানলে? হজরত আবু সায়িদ খুদরি (রাদি.) বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি ভাবলাম, অর্থহীন বাক্যাবলীতে যদি তাসির থাকতে পারে তাহলে আল্লাহর কালামে তো তার চেয়ে অনেক বেশি তাসির থাকবে। তাই আমি সূরা ফাতিহা পাঠ করি এবং তা দ্বারাই ঝাড়-ফুঁক করি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কথা শুনে খুশি হলেন এবং বকরিগুলো রেখে দেয়ার অনুমতি দিলেন।

দেখুন, এ ঘটনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু ঝাড়-ফুঁককেই সমর্থন করেননি বরং ঝাড়-ফুঁকের বিনিময়ে যে বকরির পাল লাভ হয়েছিল তাকেও হালাল সাব্যস্ত করেছেন। এ ধরনের আরো অনেক ঘটনা আছে যেগুলো থেকে জানা যায় ঝাড়-ফুঁকের জন্য স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন আমল করেছেন এবং সাহাবায়ে কেরামকেও আমল করার তাগিদ দিয়েছেন।

তাবিজের মাসনুন দোয়া:

তাবিজ কাগজের ওপরে লেখা হয়। কখনও কখনও তা ধুয়ে পান করা হয়, কখনও গলায় বা হাতে বাঁধা হয়, কখনও দেহের অন্যান্য অংশেও ব্যবহার করা হয়। তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং কোনো তাবিজ লিখেছেন এর প্রমাণ নেই। সাহাবায়ে কেরাম তাবিজ লিখেছেন এর প্রমাণ আছে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাদি.) বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক সাহাবাকেই নিম্নের দোয়াটি শিখিয়েছেন,

أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ، مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لاَمَّةٍ

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাদি.) ইহুদি ধর্ম ত্যাগ করে মুসলমান হয়েছিলেন। ইহুদিরা তাই তাকে শত্রুজ্ঞান করত এবং তার ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন রকম যাদুটোনা করত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে উপরিউক্ত দোয়াটি শিক্ষা দেন এবং বলেন, ‘তুমি এ দোয়া পাঠ করে পুরা শরীরে দম করবে, ইনশাআল্লাহ! যাদুটোনা কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। এরপর থেকে তিনি এর ওপর নিয়মিত আমল করতেন।

দোয়ার উপকারিতা:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন যে, যদি রাতের বেলা ভয়ে কারও নিদ্রা ভেঙে যায় এবং সে ভয় পায় তা হলে উপরিউক্ত দোয়াটি পাঠ করবে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাদি.) বলেন, আমি আমার বড় ছেলেকে এ দোয়া শিখিয়েছি। সে নিয়মিত দোয়াটি পাঠ করে শরীরে দম করত। আল্লাহ তায়ালা এর ফলে তাকে সবরকম ভয়-ভীতি থেকে নিরাপদ রাখেন। কিন্তু আমার ছোট ছেলে দোয়াটি পড়তে পারত না, তাই আমি তা কাগজে লিখে তার গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছিলাম। (তিরমিজি শরিফ)।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাদি.) থেকে বর্ণিত, যদি কোনো নারীর বাচ্চা প্রসবের সময় হয় তাহলে প্রসবের বিষয়টিকে সহজ করার জন্য একটি পরিষ্কার থালা বা প্লেটে উপরিউক্ত দোয়াটি লিখে তা ধুইয়ে নারীকে পান করাবে। আল্লাহ তায়ালা এর বরকতে সন্তান প্রসবকে সহজ করবেন। এ ছাড়া আরো অনেক সাহাবি ও তাবেয়ি থেকে বর্ণিত আছে যে, তারা লোকদেরকে তাবিজ লিখে দিতেন।

ঝাড়-ফুঁকের আমলই প্রকৃত সুন্নত:

তবে একটি কথা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য যে, হজরত হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলি থানবি (রহ.) বলেন, হাদিস থেকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে, তাবিজের উপকারিতা দ্বিতীয় পর্যায়ে, ঝাড়-ফুঁকেই ফায়েদা বেশি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এটি সরাসরি প্রমাণিত। তিনি নিজে এ আমল করেছেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে শিক্ষা দিয়েছেন এবং ঝাড়-ফুঁকের আমলের মাঝে তাসির ও বরকতও বেশি। যে ক্ষেত্রে ঝাড়-ফুঁকের দোয়াগুলো লোকেরা শিখতে পারে না বা অন্য কারো মাধ্যমে ঝাড়-ফুঁক করাতে পারে না, সেক্ষেত্রেই মূলত তাবিজের ব্যবহার হয়ে থাকে। চলবে...

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে