Alexa রাসূল (সা.) এর প্রখর মেধার কয়েকটি চিত্র

রাসূল (সা.) এর প্রখর মেধার কয়েকটি চিত্র

মাওলানা ওমর ফারুক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২০:৪৩ ৪ ডিসেম্বর ২০১৯  

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

রাসূল (সা.)-কে নবী হিসেবে যে কামালাত এবং ওহীর মাধ্যমে যে জ্ঞান প্রদান করা হয়েছিল তা এখানে আলোচ্যবিষয় নয়। কেননা তা এত অধিক যে গণনা করাই দুষ্কর। এখানে তাঁর স্বভাবগত বুদ্ধিমত্তার কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরা হচ্ছে।

শত্রুর সংখ্যা কত?
হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, বদরের যুদ্ধের সফরে আমরা দেখলাম রাসূল (সা.) এর তাঁবুর আশেপাশে দু’জন লোক সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করছে। আমরা তাদের পিছু নিলাম। দেখলাম তাদের একজন কুরাইশ বংশীয়। আরেকজন কাফের সর্দার উকবা ইবনে আবি মুঈতের গোলাম। কুরাইশীকে ধরতে না পারলেও গোলাম আমাদের হাতে গ্রেফতার হলো। আমরা তাকে জেরা শুরু করলাম 
: সত্যি করে বল তোদের সৈন্যসংখ্যা কত? 
: তারা সংখ্যায় অনেক। সঠিক সংখ্যা বলতে পারব না। 
আমাদের একজন তাকে কষে এক থাপ্পড় লাগিয়ে ধমকে উঠলেন, জানিস না; তাই না। সত্যি করে বল, নাহলে তোর কপালে খারাবী আছে। 

কিন্তু অনেক ধমকাধমকি মারপিটেও তার নিকট থেকে শত্রুবাহিনীর সঠিক সংখ্যা জানা গেল না। অগত্যা তাকে রাসূল (সা.) এর নিকট হাজির করা হলো। তিনিও তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে কোনো সদুত্তর পেলেন না। সে শুধু বলছিল, তারা সংখ্যায় প্রচুর। কিন্তু সঠিক কত? তা আমি জানি না। রাসূল (সা.) বুঝলেন এভাবে তার নিকট থেকে কথা বের করা যাবে না। তিনি কৌশলে তা বের করতে চাইলেন 
খোশালাপের সূরে বললেন, আচ্ছা আমরা ময়দানের এ পাশে আছি। তোমরা ও পাশে আছ। তা তোমাদের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা কি? প্রতিদিন কয়টা উট জবাই হয়?
: দশটি উট। 
রাসূল (সা.) বলে উঠলেন, বুঝতে পেরেছি তোমরা সংখ্যায় এক হাজারের কাছাকাছি। কেননা একটা উঁট একশ জন লোক একদিনে খেতে পারে। তাহলে দশটা উঁট খেতে একহাজার লোকের প্রয়োজন। এভাবে কৌশলে তাদের সৈন্য সংখ্যা জানা গেল।

রাসূল (সা.) এর রণকৌশল:
হজরত কাব ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, কখনো এমন হত যে রাসূল (সা.) যুদ্ধের অভিযানের উদ্দেশ্যে যে দিকে যেতে চাইতেন মুখে তার বিপরীত দিকের কথা বলতেন। যেমন, যদি পূর্ব দিকের সফর হত, বলতেন পশ্চিম দিকে যেতে হবে। যেন মুনাফিকরা সঠিক গন্তব্যস্থল জানতে না পারে। কারণ, তাহলে তারা গোপনে যুদ্ধাভিযানের আগেই শত্রু পক্ষকে সাবধান করে দিতে পারে। ফলে শত্রু পক্ষ পূর্বেই সতর্ক হয়ে যাবে এবং মুসলমানদের অভিযান ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।

মদ্যপানের নিষেধাজ্ঞা:
আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বলেন, শরাব হারাম হওয়ার পূর্বেই আমরা রাসূল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, হে লোকসকল! আল্লাহ তোমাদেরকে শরাব থেকে রক্ষা করতে চান। আমার মনে হয় শরাবের ব্যাপারে কোনো ওহী শীঘ্রই অবতীর্ণ হবে। এর পূর্বেই যাদের নিকট প্রচুর পরিমাণ শরাব মজুদ আছে তারা তা বিক্রয় করে যা কিছু পার উপার্জন করে নাও। (হারাম ঘোষণা হলে কিন্তু তাও পারবে না)

দেখা গেল, এ ঘোষণার কয়েকদিন পরই শরাব হারাম হওয়ার ঘোষণা করা হলো। এখন শরাব পান করা, ক্রয় বিক্রয় করা, সবই নিষিদ্ধ হয়ে গেল। হারাম হওয়ার ঘোষণা শুনামাত্রই মুসলমানরা শরাবভর্তি বড় বড় পাত্র ঘর থেকে বের করে রাস্তায় ফেলে দিতে লাগলেন। মনে হলো যেন শরাবের বর্ষন শুরু হয়েছে। বুঝা গেল, রাসূল (সা.) হারাম হওয়ার পূর্বেই লোকদেরকে এ ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন যেন হারাম ঘোষিত হওয়ার পর তা পালনে মুসলমানদের সামান্য বিলম্বও না হয়। 

প্রতিবেশীর অনিষ্ট:
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূল (সা.) এর নিকট এক ব্যক্তি এসে অভিযোগ করে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার একজন প্রতিবেশী আমাকে অত্যন্ত কষ্ট দেয়। রাসূল (সা.) বললেন, তুমি তোমার ঘরের মালপত্র বের করে রাস্তার ওপর রেখে দাও। সে বাড়ি গিয়ে তাই করল। প্রতিবেশীরা তো অবাক! জিজ্ঞেস করল, কী ব্যাপার ভাই? এটা কী করছেন? 

সে বলল, ব্যাপার তেমন কিছু নয়। আসলে আমার এক প্রতিবেশী আমাকে অনেক কষ্ট দেয়। রাসূল (সা.) এর নিকট এ ব্যাপারে অভিযোগ করলে তিনিই এটা করতে বলেছেন। লোকেরা তা শুনে সেই প্রতিবেশীকে তিরস্কার করতে শুরু করল, ধিক্কার দিতে লাগল।

প্রতিবেশী তা জানতে পেরে দৌড়ে এসে লোকটির নিকট অতীত আচরণের জন্য ক্ষমা চাইল। ভবিষ্যতে কখনো তাকে কষ্ট না দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিল। এভাবে সেই ব্যক্তি প্রতিবেশীর কষ্ট থেকে মুক্তি পেল। 

দুশমনের ঐক্যে ফাটল:
হজরত যায়েদ ইবনে আসলাম থেকে বর্ণিত, একব্যক্তি হজরত হুযাইফা (রা.)-কে বলল, কেয়ামতের ময়দানে আমরা আপনাদের সম্বন্ধে আল্লাহর নিকট অভিযোগ পেশ করব যে, আপনারা নবী করিম (সা.) এর পবিত্র যুগ পেয়েছেন। তাঁর দর্শন লাভে ধন্য হয়েছেন। কত ভাগ্যবান আপনারা! কিন্তু আমরা তা থেকে বিরত। সেই সৌভাগ্য আমাদের জোটেনি।

হজরত হুযাইফা (রা.) বললেন, ও এই কথা! তাহলে শুন। আমরাও তোমাদের সম্পর্কে আল্লাহর নিকট অভিযোগ পেশ করব, তোমরা নবী করিম (সা.) এর যুগ দেখনি। তবুও তাঁর ওপর ঈমান এনেছ। এ কারণে তোমাদের ঈমান উত্তম।
 
তারপর সাহাবী স্বান্তনার সূরে বললেন, প্রিয় ভাতিজা! আল্লাহর শপথ; তুমি কি জানো? নবীযুগে জন্মগ্রহণ করলে তুমি কোন দলে থাকতে? মুসলমান না অমুসলমান। অর্থাৎ সাহাবী বোঝাতে চাইলেন, নবীযুগে জন্ম নিয়ে তাঁকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি তাতে কী? তুমি যে ঈমানের দৌলত লাভ করেছ, এটাই অনেক বড় নেয়ামত। তারপর বলতে শুরু করলেন, একটা ঘটনা বলি শুন।

খন্দকের যুদ্ধের সময় একরাতে আমরা নবী করিম (সা.) এর সঙ্গে ছিলাম। দুর্যোগপূর্ণ রাত, ভীষণ অন্ধকার, প্রচন্ড শীত, কনকনে ঠান্ডা, বিভীষিকাময় অবস্থা। সামনের ময়দানে কাফের সর্দার আবু সুফিয়ান তার সহযোদ্ধাদের সঙ্গে অবস্থান করছিল। তখন রাসূল (সা.) আমাদেরকে বললেন, কে আছ? শত্রুদের সংবাদ সংগ্রহ করে আনতে পারবে। আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাত দান করবেন। কেউ সাড়া দিল না। আল্লাহর রাসূল (সা.) পুনরায় বললেন, যে শত্রুদের সংবাদ এনে দেবে আল্লাহ তাকে জান্নাতে হজরত ইব্রাহিম (আ.) এর সাহচর্য দান করবেন। তবুও কেউ সাড়া দিল না। 

তখন হজরত আবু বকর (রা.) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! হোযাইফাকে পাঠিয়ে দিন।

রাসূল (সা.) ডাকলেন, হুযাইফা! আমি বললাম, আমি হাজির, হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা মাতা আপনার ওপর কোরবান হোক। 
: তুমি কি যেতে প্রস্তুত? 
: অবশ্যই, না আমার মৃত্যুর ভয় আছে, না ধরা পড়ার ভয় আছে।
: তুমি কখনোই ধরা পড়বে না।
: তাহলে তো কোনো চিন্তাই নেই।
: তুমি কোরাইশদের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়বে। ভান করবে, তুমি তাদেরই একজন। কৌশলে তাদেরকে বলবে যে, হে কুরাইশ! 
তারা কি ফন্দি এঁটেছে জানো? কাল যখন যুদ্ধের ময়দানে দু’ দল মুখোমুখি হবে, তখন তারা তোমাদেরকে আহ্বান করবে,
হে কুরাইশ তোমরা কোথায়?
হে আমাদের নেতৃবৃন্দ, তোমরা কোথায়?
হে মানুষের পথপ্রদর্শক, তোমরা কোথায়?
এইসব মধুর সম্বোধন দ্বারা তোমাদের আকৃষ্ট করতে চেষ্টা করবে। তারপর বলবে, তোমরা যেহেতু আমাদের নেতৃবৃন্দ, যুদ্ধের ময়দানে তোমরাই সম্মুখে থাকার বেশি হকদার।
এভাবে তারা তোমাদেরকে সম্মুখে রেখে যুদ্ধের সূচনা তোমাদের দ্বারাই করাতে চায়। এবং নিহত হলে যেন তোমাদের লোকই নিহত হয়।
তারা পেছন থেকে বেঁচে যাবে। সম্মুখে থেকে প্রাণ হারাতে রাজী নয়।
কুরাইশদেরকে এই কথা বলে তুমি কবীলায়ে কায়েস গোত্রে চলে যাবে। সেখানে গিয়ে কল্যাণকামিতার সূরে তাদেরকে বলবে, হে কবীলায়ে কায়েস (ইহুদী গোত্র), কুরাইশরা তোমাদের বিরুদ্ধে কি ষড়যন্ত্র করেছে তা কী জানো? 
কাল যুদ্ধের ময়দানে তোমাদেরকে বলবে 
হে দক্ষ অশ্বারোহী!
হে মহান বীরজাতি!
এইসব আকর্ষণীয় সম্বোধন দ্বারা তোমাদের আকৃষ্ট করবে। তারপর বলবে ‘তোমরা যেহেতু যুদ্ধজ্ঞানে অধিক পারদর্শী তোমরাই সম্মুখে থাক।’

এভাবে কুরাইশরা তোমাদের দ্বারাই যুদ্ধের সূচনা করতে চায়। আর নিজেরা পেছন থেকে প্রাণ বাঁচাতে চায়।

হোজাইফা (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) এর এই দিকনির্দেশনা নিয়ে আমি শত্রুদের অভিমুখে রওয়ানা হলাম।

সেখানে পৌঁছে দেখলাম, তারা আগুন পোহাচ্ছে। আমিও তাদের একজন হওয়ার ভান করে সেখানে বসে গেলাম এবং রাসূল (সা.) এর শেখানো কথাগুলো ফাঁকে ফাঁকে বলতে লাগলাম।

সুবহে সাদেকের কাছাকাছি সময়ে হঠাৎ আবু সুফিয়ান বলে উঠল লোকসকল, সাবধান! মনে হচ্ছে এখানে কোনো মুসলমান আছে। প্রত্যেকে যার যার সম্মুখ ব্যক্তির নাম, পরিচয় নিশ্চিত করো।

এটা শুনে তো ভয়ে আমার কলিজা শুকিয়ে গেল। এই বুঝি ধরা খেলাম। তৎক্ষণাৎ মাথায় একটা বুদ্ধি আসল। আমার সামনের লোকটির হাত চেপে ধরে সন্দেহভরা গলায় বললাম, এই তুমি কে? 
সে কিছুটা থতমত খেয়ে বলে উঠল, আরে আমাকে চিন না? আমি তো অমুকের পুত্র অমুক।

আমি বললাম, তাহলে তো তুমি মুসলমান নও। আমাদেরই লোক। এরপর সেখান থেকে উঠে কায়েস গোত্রে গিয়েও রাসূল (সা.) এর নির্দেশনা অনুযায়ী আলোচনা করে ফিরে এলাম।

সকাল হলে যখন উভয় দল যুদ্ধের প্রস্তুতি নিল তখন কায়েস গোত্রের লোকেরা তেমনই বলল যা আমি তাদেরকে শিখিয়েছিলাম।

তখন কুরাইশরা বলল, তাহলে রাত্রে যা আমরা শুনেছিলাম তা ঠিকই আছে। আমাদের বিরুদ্ধে ওরা এমন ষড়যন্ত্র করেছে। তারা উত্তেজিত হয়ে কবিলায়ে কায়েসকে গালমন্দ করা শুরু করল।

কবিলায়ে কায়েসও ছেড়ে দেবার পাত্র নয়। তারাও কুরাইশদেরকে পাল্টা জবাব দিল। এভাবে দুশমনের দুই দলের মাঝে ঐক্যের ফাটল দেখা দিল। আল্লাহর কী মহিমা! ওই দিন রাতেই প্রচন্ড ঝড় উঠল। শত্রুদের তাঁবু, আসবাবপত্র, হাড়িপাতিল সব লন্ডভন্ড করে দিল।
তাদের অবস্থা ‘ভিক্ষা চাইনা কুকুর সামলাও’ এর মতো হলো অর্থাৎ যুদ্ধ চাই না প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারলেই বাঁচি।

আবু সুফিয়ানের অবস্থা দেখলাম ‘শোচনীয়’। সে হন্তদন্ত হয়ে তার উটনীর কাছে যেতে চাইল। কিন্তু বাতাসের তীব্রতার জন্য পারল না। সোজা হয়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করল কিন্তু বাতাসের ধাক্কায় আছড়ে পড়ল। 
কাজ শেষে আমি রাসূল (সা.) এর নিকট এসে বিস্তারিত জানালাম এবং আবু সুফিয়ানের দুর্দশার কথাও জানাতে ভুললাম না।

এতে রাসূল (সা.) আনন্দে এমনভাবে হাসতে শুরু করলেন যে, তাঁর দাত মোবারক দেখা যাচ্ছিল। এই ঘটনায় দেখা গেল, রাসূল (সা.) যুদ্ধের ময়দানে কত নিপুণভাবে কৌশল প্রয়োগ করে শত্রুদেরকে ধরাশায়ী করলেন। বাধ্য হয়ে দুশমন দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ময়দান ছেড়ে পালাল।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে