নবী (সা.) এর সহধর্মিণীদের নাম এবং সংক্ষিপ্ত পরিচিতি (পর্ব-১)

নবী (সা.) এর সহধর্মিণীদের নাম এবং সংক্ষিপ্ত পরিচিতি (পর্ব-১)

প্রিয়ম হাসান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২১:৪৮ ১৩ জুলাই ২০২০   আপডেট: ১১:২৭ ১৪ জুলাই ২০২০

‘আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী।’ (সূরা: আল কলম, আয়াত: ৪)

‘আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী।’ (সূরা: আল কলম, আয়াত: ৪)

পবিত্র কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন আয়াতের মাধ্যমে প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উন্নত চরিত্রের সার্টিফিকেট দিয়েছেন। 

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا

‘যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্যে রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে।’ (সূরা: আহযাব, আয়াত: ২১)। 

আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,

وَإِنَّكَ لَعَلى خُلُقٍ عَظِيمٍ

‘আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী।’ (সূরা: আল কলম, আয়াত: ৪)।

বিশ্বনবী রাসূলুল্লাহ (সা.) এর প্রতিটি কথা, প্রতিটি কাজ, মৌন সমর্থন, হাসি, কান্না, আনন্দ, দুঃখ, কথাবার্তা, আলাপ-আলোচনা, উপদেশাবলী, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র অর্থাৎ পায়ের নখ কাটা থেকে আরম্ভ করে রাষ্ট্র পরিচালনা পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে মানুষের জন্যে রয়েছে অনুসরণের বাস্তব নমুনা। রাসূলুল্লাহর (সা.) জীবনের প্রতিটি পর্যায় অনুসরণযোগ্য বিধায় আলোচনার দাবী রাখে। তবে আজ আমরা শুধুমাত্র রাসূলুল্লাহর (সা.) পরিবারের (স্ত্রীদের) সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরবো।

-আল্লামা ছফিউর রহমান মোবারকপুরী’র ‘আর রাহীকুল মাখতুম’ (রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সর্বশ্রেষ্ঠ জীবনী গ্রন্থ) থেকে নবী পরিবারের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি অধ্যায়টি হুবুহু তুলে ধরা হলো। 

গ্রন্থটি বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেছেন- খাদিজা আখতার রেজায়ী।

(১) হজরত খাদিজা (রা.): হিজরতের আগে নবী করিম (সা.) এর পরিবার তিনি এবং তাঁর স্ত্রী হজরত খাদিজা (রা.) এর সমন্বয়ে গঠিত ছিলো। এ বিয়ের সময় নবী করিম (সা.) এর বয়স পঁচিশ এবং বিবি খাদিজার (রা.) বয়স ছিলো চল্লিশ বছর। হজরত খাদিজা (রা.) নবী করিম (সা.) এর প্রথম স্ত্রী। তার জীবদ্দশায় নবী করিম (সা.) অন্য কোনো বিয়ে করেননি। 

তাঁর সন্তানদের মধ্যে একমাত্র হজরত ইব্রাহিম ছাড়া অন্য সবাই ছিলেন বিবি খাদিজার (রা.) গর্ভজাত। পুত্রদের মধ্যে কেউই জীবিত ছিলেন না। তবে কন্যারা জীবিত ছিলেন। তাদের নাম হচ্ছে- হজরত যয়নব, হজরত রোকেয়া, হজরত উম্মে কুলসুম, এবং হজরত ফাতেমা (রা.)। 

যয়নবের বিয়ে হিজরতের আগে তার ফুফাতো ভাই হজরত আবুল আস ইবনে রবির সঙ্গে হয়েছিলো। রোকেয়া এবং উম্মে কুলসুমের বিয়ে পর্যায়ক্রমে হজরত উসমান (রা.) এর সঙ্গে সম্পন্ন হয়। হজরত ফাতেমা (রা.) এর বিয়ে বদর এবং উহুদ যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে হজরত আলী ইবনে আবু তালেব (রা.) এর সঙ্গে হয়। তাদের চার সন্তান হলেন- হজরত হাসান, হজরত হোসাইন, হজরত যয়নব এবং হজরত উম্মে কুলসুম (রা)।

রাসূল (সা.) তাঁর উম্মতের চেয়ে একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন। তিনি বিভিন্ন উদ্দেশে চারটির বেশি বিয়ে করার অনুমতি পান, একথা সবারই জানা। যেসব নারীর সঙ্গে নবী করিম (সা.) বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন তাদের সংখ্যা এগারো। তাঁর ইন্তেকালের সময় স্ত্রীদের নয়জন জীবিত ছিলেন। দু‘জন তাঁর জীবদ্দশায় ইন্তেকাল করেন। তার দু‘জন হচ্ছেন হজরত খাদিজা এবং উম্মুল মাসাকিন হজরত যয়নব বিনতে খোযায়মা (রা.)। এছাড়া অন্য দু‘জন নারীর সঙ্গেও তিনি বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন বলে বলা হয়ে থাকে, কিন্তু এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। তবে এ কথায় ঐক্যমত রয়েছে উল্লেখিত দু‘জন নারীকে তাঁর কাছে পাঠানো হয়নি।

নিচে আমরা হজরত খাদিজার পর নবী (সা.) এর সহধর্মিণীদের নাম এবং সংক্ষিপ্ত পরিচিতি পর্যায়ক্রমে তুলে ধরছি।

(২) হযরত সাওদা বিনতে যাময়া: বিবি খাদিজা (রা.) এর ইন্তেকালের কয়েক দিন পর নবী করিম (সা.) নবুয়তের দশম বছরের শাওয়াল মাসে হজরত সাওদা বিনতে যাময়া (রা.) এর সঙ্গে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। এর আগে হজরত সাওদা (রা.) তার চাচাতো ভাই সাকরান ইবনে আমরের বিয়ে বন্ধনে ছিলেন।

(৩) হজরত আয়েশা বিনতে আবূ বকর (রা): নবুয়াতের একাদশ বর্ষের শাওয়াল মাসে হজরত আয়েশা বিনতে আবূ বকর (রা.) এর সঙ্গে নবী করিম (সা.) এর বিয়ে হয়। হজরত সাওদার সঙ্গে বিয়ের এক বছর পর এবং হিজরতের দুই বছর পাঁচ মাস আগে এ বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। সে সময় হজরত আয়েশার বয়স মাত্র ছয় বছর। হিজরতের সাত মাস পরে শাওয়াল মাসের প্রথম তারিখে হজরত আয়েশাকে স্বামীর বাড়িতে পাঠানো হয়। সে সময় তার বয়স নয় বছর এবং তিনি ছিলেন কুমারী। নবী করিম (সা.) হজরত আয়েশা (রা.) ব্যতীত অন্য কোনো কুমারী মেয়েকে বিয়ে করেননি। হজরত আয়েশা (রা.) ছিলেন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় স্ত্রী। উম্মতে মোহাম্মদীর মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বাধিক জ্ঞানসম্পন্ন ফকীহ।

(৪) হজরত হাফসা বিনতে ওমর (রা.): তার প্রথম স্বামী ছিলেন খোনায়স ইবনে হোযাফা সাহমী (রা.) বদর ও ওহুদ যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে তার স্বামী ইন্তেকাল করেন। এরপর নবী করিম (সা.) তৃতীয় হিজরি সালে তার সঙ্গে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন।

(৫) হজরত যয়নব বিনতে খোযায়মা (রা.): তিনি ছিলেন বনু হেলাল ইবনে আমের ইবনে সাসা গোত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। গরিব মিসকিনদের প্রতি তার অসামান্য মমত্ববোধ এবং ভালবাসার কারণে তাকে উম্মুল মাসাকিন উপাধি প্রধান করা হয়। তিনি ছিলেন হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে জাহশ (রা.) এর স্ত্রী। ওহুদ যুদ্ধে উক্ত সাহাবি শাহাদাত বরণ করেন। এরপর নবী করিম (সা.) চতুর্থ হিজরিতে তার সঙ্গে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। নবী করিম (সা.) এর আট মাস পর তিনি ইন্তেকাল করেন।

(৬) উম্মে সালামা হেন্দ বিনতে আবী উমাইয়া (রা.): তিনি আবূ সালামা (রা.) এর স্ত্রী ছিলেন। চতুর্থ হিজরির জমাদিউস সানী মাসে তিনি বিধবা হন। একই হিজরি সালের শাওয়াল মাসে রাসূল (সা.) তার সঙ্গে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন।

(৭) যয়নব বিনতে জাহশ ইবনে রিয়াব (রা): তিনি ছিলেন বনু আসাদ ইবনে খোযায়মা গোত্রের নারী এবং রাসূল (সা.) এর ফুফাতো বোন। তার বিয়ে প্রথমে হজরত যায়দ ইবনে হারেশ (রা.) এর সঙ্গে হয়েছিলো। হজরত যায়দকে মনে করা হতো রাসূল (সা.) এর ছেলে, কিন্তু হজরত যায়দের সঙ্গে যয়নবের বনিবানা হয়নি। ফলে হজরত যায়দ (রা.) তাকে তালাক দেন। যয়নবের ইদ্দত শেষ হওয়ার পর আল্লাহ তায়ালা আয়াত নাজিল করেন-‘অতঃপর যায়দ যখন যয়নবের সঙ্গে বিয়ের সম্পর্ক ছিন্ন করলো, তখন আমি তাকে আপনার সঙ্গে পরিণয় সুত্রে আবদ্ধ করলাম।’ (সূরা: আহযাব, আয়াত: ৭)।

এ সম্পর্কে সূরা আহযাবে আরো কয়েকটি আয়াত নাজিল হয়েছে। এসব আয়াতে পালক পুত্র সম্পর্কিত বিতর্কের সুষ্ঠ ফয়সালা করে দেয়া হয়। বিস্তারিত আলোচনা পরে করা হবে। হজরত যয়নবের সঙ্গে পঞ্চম হিজরির জিলকদ মাসে বা এর কিছু আগে রাসূল (সা.) এর বিয়ে হয়।

(৮) জুয়াইরিয়া বিনতে হারেস (রা): তার পিতা ছিলেন খোযায় গোত্রের শাকা বনু মোস্তালেকের সর্দার। বনু মোস্তারেকের যুদ্ধবন্দীদের সঙ্গে জুয়াইরিয়াকেও নিয়ে আসা হয়। তিনি হজরত সাবেত ইবনে কায়স ইবনে শাম্মাস (রা) এর ভাগে পড়েছিলেন। হজরত সাবেত (রা.) শর্তসাপেক্ষে তাকে মুক্তি দেয়ার কথা জানান। শর্ত হিসেবে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদানের কথা বলা হয়। রাসূল (সা.) এ খবর জানার পর হজরত জুয়াইরিয়ার পক্ষ থেকে নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করে তার মুক্তির ব্যবস্থা করে তাকে বিয়ে করেন। এটা পঞ্চম হিজরির শাবান মাসের ঘটনা।

(৯) উম্মে হাবিবা রামলা বিনতে আবূ সুফিয়ান (রা.): তিনি ছিলেন ওবাদুল্লাহ ইবনে জাহশের স্ত্রী। স্বামীর সঙ্গে হিজরত করে তিনি হাবশায় গমন করেন। সেখানে যাওয়া পর ওবায়দুল্লাহ ধর্মান্তরিত হয়ে খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করে, পরে সেখানে তার মৃত্যু হয়, কিন্তু উম্মে হাবিবা নিজের দ্বীন এবং হিজরতের ওপর অটল থাকেন। সপ্তম হিজরির মহরম মাসে রাসূল (সা.) আমর ইবনে উমাইয়া যামরী (রা.)-কে একখানি চিঠিসহ আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশীর কাছে প্রেরণ করেন। সে চিঠিতে তিনি উম্মে হাবিবাকে বিয়ে করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। নাজ্জাশী উম্মে হাবিবার সম্মতি সাপেক্ষে তাকে বিয়ে দেন এবং শোরাহবলি ইবনে হাসানার সঙ্গে  নবী করিম (সা.) এর কাছে প্রেরণ করেন।

(১০) হজরত সুফিয়া বিনতে হুয়াই (রা): তিনি ছিলেন বনী ইসরাঈর সম্প্রদায়ের এবং খায়বারে বন্দী হন। নবী করিম (সা.) তাকে নিজের জন্য পচ্ছন্দ করেন এবং মুক্ত করে দিয়ে তার সঙ্গে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। সপ্তম হিজরিতে খায়বার বিজয়ের পর এ বিয়ে সম্পন্ন হয়।

(১১) হজরত মায়মুনা বিনতে হারেস (রা.): তিনি ছিলেন উম্মুল ফযল লোবাবা বিনতে হারেসের বোন। সপ্তম হিজরির জিলকদ মাসে ‘কাযা ওমরা’ শেষ করে, সঠিক অভিমত অনুযায়ী এহরাম থেকে হালাল হওয়ার পর নবী করিম (সা.) তাকে বিয়ে করেন। চলবে...

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে