রাজাপুরের আতঙ্ক ভাই-ভাই বাহিনী

রাজাপুরের আতঙ্ক ভাই-ভাই বাহিনী

শরণখোলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:৪২ ৪ জুলাই ২০২০  

মিলনের ভাই নেহারুল

মিলনের ভাই নেহারুল

স্বামী কুয়েত প্রবাসী হওয়ায় শিশু দুই ছেলে মুছা ও আব্দুল্লাহকে সঙ্গে নিয়ে গৃহবধূ ফাতিমা বেগম বসবাস করতেন সুন্দরবন সংলগ্ন পশ্চিম রাজাপুর গ্রামে তার শ্বশুর আব্দুল গনি হাওলাদারের বাড়িতে। কিন্তু স্বামী বিদেশ যেতে না যেতেই ফাতিমার উপর কুনজর দেন একই গ্রামের বাসিন্দা প্রভাবশালী মো. সামাদ হাওলাদারের ছোট ছেলে মিলন হাওলাদার। 

মিলনের কু-প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় নানা অজুহাতে ঝগড়া-বিবাদের পাশাপাশি রাতের আঁধারে ফাতিমাকে ভয়ভীতি দেখাতে শুরু করেন মিলনসহ তার সহযোগীরা। এছাড়া ছেলে মুছাকে লেখা পড়ার জন্য স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করলে তাকেও পথে ঘাটে ভয়ভীতি দেখাতে আরম্ভ করেন মিলন। 

ফাতিমা বলেন, তিন বছর আগে আমার স্বামী বিদেশ চলে যান। এর পর থেকে মিলন নানাভাবে আমাকে উত্যক্ত করতে থাকেন। চলতি বছরের ১২ মে আমাকে মারধর করে পরনের কাপড় খুলে সড়কে টানা হেচড়া করেন এবং আমার কাছে থাকা লক্ষাধিক টাকা, একটি দামি মোবাইল ফোনসহ স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নেয় মিলনসহ তার চার ভাই। এ সময় মিলন বলেন, তোকে সড়কে ফেলে ধর্ষণ করলেও কেউ ঠেকাতে পারবে না।

মিলনের নির্যাতনের শিকার জনগণের একাংশ

মা হয়েও ছেলেটিকে কাছে রাখতে পারিনি। আমাকেসহ ছোট ছেলেটিকে ওই শয়তানেরা মেরে ফেললেও বিদেশ থেকে ওর বাবা এসে অন্তত বড় ছেলেকে তো পাবেন। তাই  বাধ্য হয়ে ছেলের স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে সন্তান দুটিকে নিয়ে ১০ কিলোমিটার দূরে উপজেলার বাংলা বাজার এলাকায় আমার বোনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। মাঝে মধ্যে ছোট ছেলেটিকে নিয়ে বাড়িতে আসি কিন্তু  রাত হলে মিলন ও তার ভাইয়েরা ঘরের চারদিকে ধারালো অস্ত্র নিয়ে ঘোরাঘুরি করে, ঘরের বেড়া-জানালা-দরজা ধাক্কাধাক্কি করে। তাই ভয়ে প্রায় রাতেই জেগে থাকি।

এছাড়া ঘর থেকে বের হলে তারা আমার পিছু নেয়, কোথায় যাই কি, করি সব সময় আমার উপর নজর রাখে মিলন ও তার সহযোগীরা। শুধু ফাতিমা বেগম নয়, বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার ধানসাগর ইউপির ৬ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম রাজাপুর গ্রামের বাসিন্দা (সাবেক) গ্রাম পুলিশ মো. সামদ হাওলাদারের ছেলে মিলনসহ তার কয়েক ভাইয়ের বিরুদ্ধে এমন অত্যাচারের অভিযোগ স্থানীয় একাধিক নারীর।

ওই প্রভাবশালী পরিবারের নির্যাতনের ফলে এরইমধ্যে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে পাঁচটি পরিবার। জমি দখল, নিরীহ মানুষকে মারধর, ছিনতাই, হত্যা ও ধর্ষণের মতো নানা অভিযোগ থাকার পরেও এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন মিলন ও তার ভাইয়েরা। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে থানা ও আদালতে একাধিক মামলা রয়েছে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্তরা ওই চক্রের বিরুদ্ধে বাগেরহাট-৪ আসনের এমপিসহ অ্যাডিশনাল এসপি (মোড়েলগঞ্জ সার্কেল) ও শরণখোলা থানা পুলিশের কাছে একাধিক অভিযোগ করেও এ পর্যন্ত কোনো প্রতিকার পাননি। তবে, পুলিশ বলছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এবং তদন্ত চলছে।

স্থানীয়রা বলেন, মিলন, নেহারুল, মনির ও ছগির এলাকায় রাম রাজত্ব কায়েম করেছে। তারা কতিপয় রাজনৈতিক ব্যক্তির ছত্র ছায়ায় থেকে দীর্ঘদিন ধরে নিরীহ মানুষের উপর নির্যাতন চালাচ্ছেন। তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে এলাকা ছাড়া হতে হয়। তাদের অত্যাচারে স্থানীয় বাসিন্দা হাফেজ হাওলাদার, ছেতারা বেগম, ইউনুস হাওলাদারসহ পাঁচটি পরিবার এরইমধ্যে এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। তাছাড়া বন সংলগ্ন এই এলাকায় পুলিশের কোনো নজরদারি না থাকায় তারা কয়েক ভাই মিলে যা খুশি তাই করে যাচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা কৃষক মো. আইয়ুব আলী আকন বলেন, কয়েক দিন আগে তার একটি গরু মিলনের বাড়িতে ঢুকে পড়ার অপরাধে তার গলায় গামছা লাগিয়ে মারধর করেন। পরে টেনে হেছড়ে সড়কে নিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করেন। ওই সময় মিলনের পায়ে ধরে প্রাণে রক্ষা পাই।

একই এলাকার বাসিন্দা সেতারা বেগম বলেন, মিলন, নেহরুল, মনির, ছগির ও নজরুল তার বাড়িতে গিয়ে তাকে মারধর করে ৪টি দাঁত ভেঙে দেয় এবং  হাঁস মুরগিসহ দুটি গরু নিয়া যায়। এখন ভয়ে রাতে বাড়িতে থাকেন না। 

তিনি আরো বলেন, তার (১.৬৫ একর) জমি মিলনরা চাষাবাদে বাধা দেয়ায় গত বছর ওই জমি অনাবাদি থাকে।  এছাড়া তার ভাইপো শহিদুলের স্ত্রী সুখীর উপর মিলন  কু-নজর ফেলায় ভাই হাফেজ হাওলাদার পরিবার নিয়ে গ্রাম ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

দিনমজুর ইউনুচের স্ত্রী হাসিনা বেগম জানান, প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে তিনি  গত ১৬ মে  রাত ৩টার দিকে ঘরের বাইরে গেলে মিলন তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। এ ঘটনায় শরণখোলা থানায় মামলা দিলে তার স্বামী ইউনুচকে মারপিট করে মামলা প্রত্যাহারের জন্য আটকে রাখে। পরে  মিলনেরা ৪-৫ ভাই মিলে তাদের হাঁস, মুরগি, কবুতর, গরুসহ বসত ঘরের মূল্যবান মালামাল লুটে নিয়ে যায়।

উপজেলার কদমতলা এলাকার বাসিন্দা হাফসা বেগম বলেন, এই গ্রামে আমার বাবার বাড়ি  কিন্তু বেড়াতে আসতে পারিনা। আমি বছরে ২-১ বার আসলেও  এলাকার নারী লোভীদের ভয়ে আমার স্কুল পড়ুয়া কুমারী মেয়েকে  কখনো এখানে নিয়ে আসি না । এই গ্রামে  মেয়েদের ১০-১২ বছরের মধ্যে বিয়ে দিতে হয়। বর্তমানে মিলন ও তার ভাইদের ভয়ে কুমারীসহ মধ্য বয়সের নারীরা অনেকটা রাত জেগে থাকেন।

স্থানীয় বাসিন্দা বেল্লাল, জাহিদ, জাহাঙ্গীরসহ কয়েকজন বলেন, সামাদ হাওলাদারের আট ছেলের মধ্যে মিলন, নেহরুল, মনির, ছগির ও নজরুল  নানা রকম খারাপ কাজের সঙ্গে জড়িত তাদের চরিত্র তেমন ভালো না।  গ্রামের মেয়ে ও গৃহবধূরা তাদের ভয়ে রাতে প্রসাব-পায়খানার জন্য ঘরের বাইরে যেতে পারে না। 

মিলনের প্রতিবেশী বৃদ্ধ মালেক হাওলাদার ও তার স্ত্রী আলেয়া বেগম বলেন, ছেলেরা চট্টগ্রামে চাকরি করেন। মেজ ছেলে বিয়ে করে বউকে তাদের সেবা যত্মের জন্য বাড়িতে রেখে যান। মিলনের কু-নজরের কারণে ছেলের কাছে বউকে পাঠাতে বাধ্য হয়েছি। মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে ১ লাখ ৬ হাজার টাকা  হাতিয়ে নেয় মিলন।

সাবেক ইউপি সদস্য ছিদ্দিকুর রহমান জানান, নেহারুল , মনির , মিলন ও ছগির হাওলাদার এলাকায় এক ধরনের রাম রাজত্ব কায়েম করেছে। মাদক ব্যবসার টাকার গরমে মেম্বার চেয়ারম্যান এমনকি থানায়  অভিযোগ দিয়েও মিলনের হাত থেকে বাঁচা যায় না এবং কেউ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় না।

স্থানীয় ইউপি সদস্য তালুকদার হুমায়ুন কবির সুমন বলেন, নেহারুল , মনির , মিলন ও ছগির হাওলাদারের বিরুদ্ধে মারধর, ধর্ষণ, নির্যাতন ও জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে। মিলন ও তাদের ভাইদের অত্যাচারে এলাকার ৪-৫টি পরিবার গ্রামছাড়া হয়েছে। এ অবস্থায় এলাকার শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে মিলন ও তার ভাইদের  আইনের আওতায় আনা জরুরি।

রাজাপুর বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, কিছুদিন আগে মিলন ও তার ভাইয়েরা বাজারের ৬টি দোকান চুরি করে। থানায় অভিযোগ ও স্বাক্ষী দেয়ার পরেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা হয়নি। এছাড়া দোকান পাট থেকে মালামাল নিয়ে টাকা দেয় না । চাইলে উল্টো মারতে আসে।

ইউপি চেয়ারম্যান মো. মইনুল হোসেন টিপু বলেন,  স্থানীয়দের বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে মিলন ও তার ভাইদেরকে পরিষদে ডাকা হয়েছে। কিন্তু তারা পরিষদে আসেনি। তারা আট ভাই, এর মধ্যে নেহারুল, মিলন ও মনির ডাকাতি থেকে শুরু করে  নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িত। কোনো পরিবারের সঙ্গে ঝগড়া- বিবাদ হলে মিলন রাতে ওই বাড়িতে গিয়ে নারীদের উপর নির্যাতন করেন। এসব অভিযোগ পুলিশকে  জানানো হয়েছে কিন্তু কিছুই হয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে মিলনের বাড়িতে গেলে তিনি সামনে আসেননি, তার পক্ষে ভাই নেহারুল দাবি করেন, তাদের বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ মিথ্যা জমিজমা নিয়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে বিরোধ থাকায় তাদের ফাঁসাতে নানামুখী ষড়যন্ত্র শুরু করেছে প্রতিপক্ষ।

শরণখোলা থানার ওসি এসকে আব্দুল্লাহ আল সাইদ বলেন, উভয় গ্রুপের মধ্যে জমিজমা নিয়ে বিরোধ আছে। পাল্টাপাল্টি একাধিক মামলাও হয়েছে। বিষয়গুলোর তদন্ত চলছে। এসব ঘটনায় যারাই জড়িত থাকুক না কেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচ