Alexa রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে সরকার!

রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে সরকার!

শরীফা খাতুন শিউলী, খুলনা  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১২:৪০ ১৬ নভেম্বর ২০১৯  

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

ট্রেড লাইসেন্স নবায়নে বর্ধিত ফি না নেয়ায় খুলনা বিভাগে শত কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। ট্রেড লাইসেন্স নবায়নে নির্দিষ্ট হারে উৎসে আয়কর দিতে হয়।

২০১৯ সালের অর্থ আইন দ্বারা এই উৎসে আয়করের পরিমাণ প্রায় ছয় গুণ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু খুলনা সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভায় এই বর্ধিত কর না নিয়েই ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করছে। পূর্ব নির্ধারিত আয়কর নেয়ায় কোটি কোটি টাকা রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। বিভাগের দশ জেলায় এই একই চিত্র।

পরিবর্তিত হারে উৎসে কর আদায়ের জন্য ট্রেড লাইসেন্স কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট এলাকার আয়কর কর্তৃপক্ষের সমন্বয় প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

যেকোনো এলাকায় ব্যবসা পরিচালনার জন্য সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও ইউপি ট্রেড লাইসেন্স দিয়ে থাকে। ইউপি বাদে শুধুমাত্র সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভা থেকে ট্রেড লাইসেন্স নেয়ার সময় লাইসেন্স ফি’র সঙ্গে আলাদাভাবে নির্দিষ্ট হারে উৎসে আয়কর দিতে হয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরের আয়কর পরিপত্রের ২০ নম্বর ক্রমিকে বলা হয়েছে, অর্থ আইন, ২০১৯ এর মাধ্যমে সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা কর্তৃক ট্রেড লাইসেন্স নবায়নকালে প্রযোজ্য উৎসে কর সংগ্রহের হার পরিবর্তন করা হয়েছে। পরিবর্তিত বিধান অনুযায়ী উৎসে কর সংগ্রহ করা হবে। 
ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের জন্য পূর্বের কর হার ৫০০ টাকা, পরিবর্তিত কর হার তিন হাজার টাকা, অন্যান্য সিটি কর্পোরেশনের জন্য পূর্বের কর হার ৩০০ টাকা, পরিবর্তিত কর হার দুই হাজার টাকা। জেলা সদরে অবস্থিত পৌরসভার পূর্বের কর হার ৩০০ টাকা, পরিবর্তিত কর হার এক হাজার টাকা। অন্য যেকোনো পৌরসভার পূর্বের কর হার ১০০ টাকা, পরিবর্তিত কর হার ৫০০ টাকা। পরিবর্তিত এই বিধান ২০১৯-২০ অর্থবছর হতে কার্যকর হবে। অর্থাৎ ১ জুলাই থেকে নতুন হারে উৎসে কর কর্তন প্রযোজ্য হবে।

১ জুলাই থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত খুলনা সিটি কর্পোরেশনে ১২ হাজার ৪৭০টি ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন হয়েছে। যার প্রত্যেকটিতে ৩০০ টাকা করে আয়কর জমা নেয়া হয়েছে। অথচ পরিবর্তিত বিধান অনুযায়ী দুই হাজার টাকা নেয়ার কথা। পূর্বের হারে আয়কর কর্তন করায় প্রত্যেকটিতে ১৭০০ টাকা কম নেয়া হয়েছে। ফলে শুধু খুলনা সিটি কর্পোরেশনেই দুই কোটি ১১ লাখ ৯৯ হাজার টাকা রাজস্ব বঞ্চিত হয়েছে সরকার।

এছাড়াও বিভাগের দশ জেলায় ৩৭টি পৌরসভায় বর্ধিত হারে আয়কর কর্তনের প্রমাণ মেলেনি। তাই বিভাগে প্রায় শত কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ বঞ্চিত হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।

খুলনা সিটি কর্পোরেশনের সিনিয়র লাইসেন্স অফিসার ফারুক হোসেন তালুকদার জানান, ২০১২ সালের ১৭ জুলাই স্থানীয় সরকার বিভাগের এক চিঠিতে ট্রেড লাইসেন্স ফি’র সঙ্গে ৩০০ টাকা উৎসে আয়কর কর্তনের নির্দেশ দেয়া হয়। যার স্মারক নং ১৫১৭। পরবর্তীতে নতুন কোনো নির্দেশনা না আসায় পূর্বের বিধানে আয়কর জমা নেয়া হচ্ছে। এমনকি কর বিভাগ থেকেও আমাদের কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়নি।

খুলনা জেলায় দুটি পৌরসভা পাইকগাছা ও চালনা। চালনা পৌরসভার মেয়র সনত কুমার বিশ্বাস জানান, আমরা বর্ধিত হারে আয়কর কর্তনের কোনো নির্দেশনা পাইনি। যে কারণে পূর্বের নিয়মে প্রতিটি ট্রেড লাইসেন্স ফি’র সঙ্গে ১০০ টাকা আয়কর নেয়া হচ্ছে। নির্দেশনা পেলে অবশ্যই নতুন হারে (৫০০ টাকা) আয়কর নেয়া হবে।

তিনি আরো জানান, ১ জুলাই থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৮০০ লাইসেন্স নবায়ন করা হয়েছে। সেই হিসেবে প্রায় তিন লাখ ২০ হাজার টাকা রাজস্ব আদায় কম করা হয়েছে শুধুমাত্র চালনা পৌরসভায়।

বাগেরহাট সদর পৌরসভার মেয়র খান হাবিবুর রহমান বলেন, আমরা পূর্বের গেজেট অনুযায়ী ট্রেড লাইসেন্স ফি’র সঙ্গে ৩০০ টাকা করে আয়কর জমা নিচ্ছি। এ সংক্রান্ত নতুন কোনো গেজেট আমরা পাইনি। তবুও আমরা খোঁজ নিচ্ছি নতুন বিধানে যদি এক হাজার টাকা নেয়ার নিয়ম থাকে তবে অবশ্যই সেটা নেয়া হবে।

মেহেরপুর জেলার গাংনী পৌরসভা চেয়ারম্যান মো. আশরাফুল ইসলাম জানান, আমাদের এখানে অধিকাংশ ছোট ছোট দোকানে ট্রেড লাইসেন্স ফি মাত্র ২০০ টাকা। তাদের কাছ থেকে যদি অতিরিক্ত ৫০০ টাকা আয়কর বাবদ নেয়া হয় তবে সেটা অনেক বেশি হয়ে যায়। ব্যবসায়ীরা এটা কীভাবে নেবে সেটাই দেখার বিষয়।

বিভাগের অধিকাংশ পৌরসভায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তারা কেউই বর্ধিত আয়কর কর্তনের বিষয়ে কিছুই জানেন না। ফলে পূর্বের নিয়মেই তারা ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের জন্য আয়কর নিচ্ছেন।

বাংলাদেশ ট্যাক্সেস বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও প্রবীণ আয়কর আইনজীবী মনিরুল হুদা জানান, এক্ষেত্রে উৎসে আয়করের পরিমাণটা একটু বেশি হয়েছে। যদিও করদাতারা পরবর্তীতে এটা বাৎসরিক আয়করের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারবেন। কিন্তু কিছু ছোট ব্যবসায়ী আছেন যাদের করযোগ্য আয় নেই তাদের জন্য একটু অসুবিধা হবে।

তিনি আরো জানান, বর্ধিত এই আয়কর চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর করতে হবে। এখনো যদি এটা কার্যকর না হয় তবে সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে। এজন্য স্থানীয় আয়কর বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট ট্রেড লাইসেন্স কর্তৃপক্ষকে সমন্বয় করতে হবে।

খুলনা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি কাজী আমিনুল হক বলেন, ব্যবসায়ীদের জন্য উৎসে আয়করের পরিমাণটা বেশি হয়েছে। তবে ভয়ের কিছু নেই এই টাকা পরবর্তীতে সমন্বয় করা যাবে। সরকারের এই নতুন বিধান মেনে নেয়ার জন্য তিনি ব্যবসায়ীদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।

খুলনা কর অঞ্চলের কমিশনার প্রশান্ত কুমার রায় জানান, ট্রেড লাইসেন্স নবায়নে বর্ধিত আয়কর নেয়ার জন্য সরকারি গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। তাই সবারই বিষয়টি জানা উচিত। তারপরও ট্রেড লাইসেন্স নবায়নে এখনো যারা (সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ) পূর্বের হারে আয়কর কর্তন করছেন তাদের অবশ্যই চিঠি দিয়ে জানানো হবে। আর এরমধ্যে যাদের কাছ থেকে পূর্বের হারে আয়কর নেয়া হয়েছে তারা পরবর্তীতে বাকি টাকা দিয়ে নতুন নবায়ন নিলে সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হবে না।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএম