রাজনীতির দাবাড়ু এরশাদ, হুইল চেয়ারে নতুন চাল
Best Electronics

রাজনীতির দাবাড়ু এরশাদ, হুইল চেয়ারে নতুন চাল

সোহেল রাহমান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ০২:১৮ ২৩ মার্চ ২০১৯   আপডেট: ১৫:১৯ ২৩ মার্চ ২০১৯

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

কানকথা শুনতে অভ্যস্ত রাজনীতির ব্যর্থ দাবাড়ু এরশাদ খানিকটা শক্তি ফিরে পেয়ে হুইল চেয়ারে বসেই দিলেন নতুন চাল। এবারো এক চালে নিলামে তুলেছেন চার গুটি। ক্রেতারাও প্রস্তুত। তবে সমস্যা হলো নতুন প্রজন্মকে বরাবরের মতো টেক্কা দিচ্ছেন নব্বই দশকে হালে হওয়া মন্ত্রী নামধারী শীর্ষ নেতারা। আর তাতে গুটি নাড়ছেন ফাস্টলেডি খ্যাত রওশন এরশাদ। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে পার্টির কফিনে শেষ পেরাকটি টুকলেন ৯০ এ গণ আন্দোলনে পরাজিত রাষ্ট্রপতি, বর্তমানে সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা, রাজনীতির আনপ্রেডিক্টেবল হিরো এরশাদ। 

একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মনোনয়ন বাণিজ্য ও আসন বিক্রির পর দলীয় কোন্দলে অনেকটাই ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে জাতীয় পার্টি। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে পরিবর্তন আনা হয় দলীয় নেতৃত্বে। 

পরিস্থিতি কিছুটা স্বভাবিক হলেও ঝিমিয়ে পড়ে পার্টি। নির্বচন শেষে হলেও, খেলা শেষ হয় না রোগির শয্যায় শুয়ে ওঁতপেতে থাকা এরশাদের। হঠাৎ শুরু করেন নারী আসনের খেলা। শোনা যায়, এবারো পার্টি ফান্ডের জন্য বরাদ্দ চাওয়া হয় ১২ কোটি। নিলাম আস্বস্ত করে ১৯ কোটি। নারী এমপি বানাতে সরকারি দফতরের একটি অফিসে হয় গোপন বৈঠক। 

আবারো থেমে যায় পার্টি। কিন্তু থেমে থাকেন না প্রতিদিনের খেলোয়াড় ও সুযোগ সন্ধানীরা। এবার শুরু করে পদ পদবীর বাণিজ্য। হুটহাট বিজ্ঞপ্তিতে আসে পদোন্নতির ব্যবসা। কোনো ধরনের নিয়মনীতি না মেনেই বেশ কয়েকজনকে করা হয় প্রেসিডিয়াম। পার্টির যুগ্ম আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম জয়কে সাংগঠনিক কার্যক্রমের স্বীকৃতি হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে করা হয় যুগ্ম মহাসচিব। সবই যেন ডিজিটাল। যেন সফটওয়ার।

এবার পদচ্যুত করা হলো ‘মিষ্টার ক্লিন ইমেজ ম্যান, সবার কাছে গ্রহণযোগ রাজনীতিবিদ সহধর জি এম কাদেরকে। এক চালেই আপাততো নিলামে উঠছে তিন পদ। কো-চেয়ারম্যান, বিরোধী দলীয় উপনেতা, মহাসচিব, এমনটাই দাবি করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নতুন প্রজন্মের একাধিক নেতা।

এদিকে নব্বই দশকে মন্ত্রী থাকা বেশ কয়েকজন নেতার দাবি পার্টির চেয়ারম্যান সব সময় ভালোর জন্যই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, আমরা তাকে সাধুবাদ জানাই। তাছাড়া চেয়ারম্যানের বয়স হয়েছে। দু'দিন পর জি এম কাদের চেয়ারম্যান হতে যাচ্ছেন। আর এবিএম রুহুল আমিন কো-চেয়ারম্যান। উপনেতার বিষয়ে এখনই বলা যাবে না। পার্টিতে টাকা নেই। এরশাদ সব অর্থ সম্পদ মৃত্যু ভয়ে নিজ স্টাফ ও আত্মীয় স্বজনদের বিলি বণ্টন করে নিঃস্ব-রিক্ত। যে কয় দিন বেচে থাকবেন, চলতে হবে অন্যের ঘাড়ে ভর করে। অর্থ সম্পদেও তেমনি। আর তাই নেতাকর্মীরাও সব ঝিমিয়ে পড়েছেন। নতুন মহাসচিব টাকা খরচ করা বা সুব্যবস্থাপনা করতে পারছেন না।

এ অবস্থায় পার্টি চাঙ্গা করতে যা প্রয়োজন সেটাই করা উচিত। চেয়ারম্যান যতক্ষণ জীবিত আছেন তার সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত। আমার নাম লিখবেন না। এসব বিষয়ে নাম প্রকাশ করে মুখ খুলতে রাজি হননি প্রেসিডিয়ামের কোনো নেতাই।

শুক্রবার গভীর রাতে জিএম কাদের ফোনে ডেইলি বাংলাদেশকে জানান, এ সিদ্ধান্তটি রহস্যজনক। জানি না, গতকালও এরশাদ সাহেবের সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা হলো। তিনি আমাকে বলেছিলেন, পার্টিটাকে ঠিকমতো দেখাশোনা করতে। আমি তাকে বললাম, এটা নিয়ে আমার একটু সন্দেহ হচ্ছে। এরপর লাইনটি কেটে যায়। 

এরশাদের রাজনৈতিক সচিব সুনীল শুভরায় বলেন, কাদেরকে কী কারণে সরানো হয়েছে তা স্যারের সাংগঠনিক নির্দেশেই আছে। ওইটাই কারণ। এছাড়া কোনো কারণ নেই।

এরশাদের পাঠানো সাংগঠনিক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আমি এর আগে ঘোষণা দিয়েছিলাম, আমার অবর্তমানে পার্টির কো-চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের পার্টি পরিচালনার সার্বিক দায়িত্ব পালন করবেন এবং আমি এটাও আশা করেছিলাম, পার্টির পরবর্তী জাতীয় কাউন্সিল তাকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করবে। কিন্তু পার্টির বর্তমান সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় আমার সেই ঘোষণা প্রত্যাহার করলাম। জিএম কাদের পার্টির পরিচালনা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। বর্তমানে পার্টির সাংগঠনিক কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়েছে এবং পার্টির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে। পার্টির সিনিয়র নেতারাও তার নেতৃত্ব মানতে অপারগ।

এতে আরো বলা হয়, সংগঠনের স্বার্থে পার্টির সাংগঠনিক দায়িত্ব এবং কো-চেয়ারম্যানের পদ থেকে গোলাম মোহাম্মদ কাদেরকে অব্যাহতি দেয়া হলো। তবে তিনি পার্টির প্রেসিডিয়াম পদে বহাল থাকবেন। তিনি সংসদে বিরোধী দলের উপনেতার পদে থাকবেন কিনা, তা জাপার পার্লামেন্টারি পার্টি তা নির্ধারণ করবে।

এদিকে ধারণা করা হচ্ছে, জিএম কাদেরের জায়গায় জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান পদে জাপার নয়া প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে দেখা যেতে পারে। পার্টির আরেকটি সূত্র বলছে, মহাসচিব পদেও আসছে পরিবর্তন। ঠিকাদারি হয়তো ফিরে পাচ্ছেন আগের মহাসচিব। হতে পারেন কো চেয়ারম্যানও। আর উপ নেতায় আসছে বাণিজ্য। তাও উঠেছে চড়া দাম। পাচ্ছেন ৯০ এর এক মন্ত্রী। পার্টির আরেকটি গোপন সূত্র বলছে, এবার কো চেয়ারম্যান হচ্ছে দু’টি। একটি পাচ্ছেন জেনারেল মাসুদ, অন্যটি উঠছে খোলাবাজারে। সূত্রটি বলছে, মহাসচিব পদটিও খেলাবাজারের অপেক্ষায়।

২০১৬ সালের ১৭ জানুয়ারি রংপুরে জাতীয় পার্টির কর্মী সম্মেলন ও জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তার ছোট ভাই জিএম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেন। ওই প্রক্রিয়ার অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন তখন পদ হারানো এবিএম রুহল আমিন হাওলাদার। বিপক্ষে অবস্থান নেন তখনকার মহাসচিব, সাবেক মন্ত্রী ও ডাকসু জিএস জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুসহ এমপিদের একটি অংশ। তাকে সমর্থন দেন ব্যরিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ চৌধুরী, কাজী ফিরোজ রশীদ চৌধুরী, সাবেক বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ (মরহুম) তাজুল ইসলাম চৌধুরীসহ অনেকে। দু’ পক্ষের সুযোগ নেন শুবিধাবাদীরা। কোনো পক্ষেই যাননি চেয়ারম্যানের এক সময়ের আস্থাভাজন, এরশাদ মুক্তি আন্দোলনে নির্যাতিত অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন খান। রওশনপন্থীরা বাধা হলে রওশন এরশাদকে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান করেন এরশাদ।

গেল বছর ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর সংসদে বিরোধী দলের উপনেতা হিসেবে কাদেরকে বেছে নেন এরশাদ। ধারণা করা হচ্ছিল, দলের পরবর্তী চেয়ারম্যান হবেন জিএম কাদের।

ডেইলি বাংলাদেশ/এলকে/আরএ

Best Electronics