রাজনীতিতে উত্তাপ নেই, মানুষের বুকে আছে কি!

রাজনীতিতে উত্তাপ নেই, মানুষের বুকে আছে কি!

নি য় মি ত ক লা ম

প্রকাশিত: ১৭:০৬ ৭ এপ্রিল ২০১৯  

ফকির-ইলিয়াস--কবি-প্রাবন্ধিক-স্থায়ীভাবে-বসবাস-করছেন-নিউইয়র্কে-প্রকাশিত-গ্রন্থসংখ্যা---১৮-কমিটি-টু-প্রটেক্ট-জার্নালিস্টসএকাডেমি-অব-আমেরিকান-পোয়েটস-দ্যা-এমনেস্টি-ইন্টারন্যাশনাল-আমেরিকান-ইমেজ-প্রেস--এর-সদস্য

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন আর কোনো উত্তাপ নেই। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরংকুশ বিজয়ের পর, বিএনপি এখন ঘরকুনো। গণফোরাম, বিকল্পধারা দলগুলোর মতো অনেক মৌসুমী দলই প্রায় লাপাত্তা।

মেয়র নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচনেও তেমন উত্তাপ দেখা যায়নি। দেশের বিভিন্ন উপজেলায় বিএনপির কিছু বিদ্রোহী প্রার্থী ভোটে দাঁড়িয়েছেন। তাদের কেউ কেউ জিতেছেনও। তাদের দল থেকে বহিষ্কারও করেছে বিএনপি। এই বহিষ্কারের মাধ্যমে বিএনপি তাদের নিজ দলের বিদ্রোহের শেষ পেরেকটি ঠুকেছে। কারণ তৃণমূলের নেতাকর্মীদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কোনো রাজনৈতিক দলই দাঁড়াতে পারে না। টিকে থাকতে পারে না।

বাংলাদেশে এমন রাজনৈতিক স্থবিরতা হওয়ার কথা ছিল না। এর মূল কারণটি হচ্ছে, একটি মহল দেশে মৌলবাদী-জঙ্গীবাদী ধারা তৈরিতে মশগুল ছিলো। এরা ক্রমশ পরাজিত হয়েছে। কিন্তু পাশাপাশি শুদ্ধ রাজনৈতিক ধারার কোনো প্রতিদ্বন্ধি দল তৈরি হতে পারেনি। একটা বিষয় স্পষ্ট করে বলি, বিশ্বের বড় বড় নীতিনির্ধারকরা চেয়েছিল; বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জিতে আবার ক্ষমতায় আসুক। এটা আমেরিকা যেমন চেয়েছিল তেমনি চেয়েছিল ভারতসহ অন্যান্য মিতশক্তিগুলোও। এই সময়ে এভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে রাজনীতি। ফলে অন্য কোনো দল বা কর্মীদের মাঝে খুব বেশি উত্তাপ ছিল না। চারিদিকে একটি চাপা ভাব ছিল। কেউ যেন মুখ খুলছে না!

এটা কী ধরনের ভীতি, নাকি শান্তিপূর্ণ অবস্থা তা বলা কঠিন। অনেকেই বলছেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে! হ্যাঁ এগোচ্ছে। দখলের প্রতিযোগিতা, শুদ্ধ রাজনীতির পথকে রুদ্ধ করছে।মানুষ চেপে যাচ্ছে অনেক কিছু। এটা কিসের আলামত? কোনো চাপা ক্ষোভের বিষ্ফোরণ ঘটবে না তো! বাংলাদেশের বড় বড় ভবনগুলোতে আগুনে মৃত্যুর যে বিভীষিকা চলছে- তা রুখে দেয়ার জন্য সরকার কিংবা জনমানুষেরা কী করছেন!

 বাংলাদেশ এখন গুচ্ছ গুচ্ছ বস্তির সমাহার। অপরিকল্পিত নগরায়ন মানুষকে দিশেহারা করে তুলেছে। নদী আর নদী নেই। নদীর পার ঘেঁষে এখন টঙ দোকানের সারি।টিলা কেটে দখল করা হয়েছে। গাছ কেটে হরণ করা হচ্ছে সবুজ। দখল আর দখল। কোনো জবাবদিহিতা নেই। কেউ কাউকে কিছুই বলছে না।
গতবছর দেশে গিয়েছিলাম। দেখেছি প্রিয় শহর সিলেটের জিন্দাবাজারে বন্দর পয়েন্টের কাছে রাস্তার মাঝখানে ফলের দোকান। সড়ক দখল করে ব্যবসা। এরা কার লোক? এরা কাদের চাঁদা দিয়ে এখানে পসরা' সাজিয়ে বসে? কেউ কি জানেন না কিছুই?

না- বাংলাদেশের মানুষ এখন খুবই কৃত্রিম। আন্তরিকতা লোপ পেয়েছে ভীষণভাবে। মানুষ আত্মকেন্দ্রিক। নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। হ্যাঁ- বুকের উত্তাপ কমে গিয়েছে তরুণদের! 'রাজনীতির নীতি'-থামিয়ে দিয়েছে মানুষের দ্রোহ! আসলেই কি তাই? নাকি কোনো অশুভ শক্তি ফণা মেলছে ভেতরে ভেতরে?

যে দুইটি সেক্টরে মানবতা মুখ থুবড়ে পড়েছে তা হলো শিক্ষা এবং চিকিৎসা ব্যবস্থা। প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছিল লাগাতার। কেউ কিছুই করতে পারছুল না। কেন পারা যাচ্ছিল না ? নতুন শিক্ষামন্ত্রী এসেছেন। কী করবেন তিনি- তা দেখার জন্য দেশের মানুষ উদগ্রীব।

চিকিৎসার নামে গলিতে গলিতে এখন চিকিৎসালয়। শুধুই টাকার খেলা। রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। না না ধরণের রোগ। মানুষের স্বাস্থ্য দেখলেই বুঝা যায় সিংহভাগ মানুষ পুষ্টিহীনতার শিকার। অথচ ফলমূল, শাকসবজিতে ফরমালিন দিয়ে দেদারছে ব্যবসা চলছে। কেউ কিছুই বলছে না। চিকিৎসার জন্য বড় লোকেরা যাচ্ছেন বিদেশে। নিদেনপক্ষে ভারতে। আর গ্রামের মানুষ খুব মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে রোগশোকে হাসপাতালের করিডোরে। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভেতরের চিত্র দেখলে সুস্থ মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। কী বীভৎস সেই রূপ! এটাই কি আমাদের স্বাধীনতার ৪৮ বছরের চাওয়া-পাওয়া?

মানুষ ভদ্র সমাজব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে না। আপনি যদি বিল দিতে কিংবা ডাকঘরে, লাইনে দাঁড়ান দেখবেন মানুষ আপনার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। পানের লাল পিক ফেলছে ঠিক আপনার সামনেই। তরুণ ছেলে। থু থু ফেলছে আপনার মুখমন্ডল বরাবরে। এর বাষ্প এসে পড়ছে আপনার চোখে, মুখে, মাথায় চুলে! এ কেমন আচরণ ? মানুষ নিজেকে 'শিক্ষিত' দাবি করছে। কিন্তু তার অভ্যাস পাল্টাতে পারেনি, পারছে না।

আজ থেকে বিশ বছর আগে আমি আমার লেখায় বাংলাদেশ 'একটি উন্নয়নশীল দেশ'-বলে লিখেছিলাম। রাজনীতিকরা সেই দাবি করেছিলেন। এই ২০১৯ সালে এসে সেই কথাটিই 'জাতিসংঘ স্বীকৃতি' বলে চালানো হচ্ছে ! তাহলে এতদিন বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় ছিল? এর জবাব কী?

বাংলাদেশের উচ্চ-মধ্যবিত্তদের খাওয়ার মান বেড়েছে। এখন এলাকায় এলাকায় বিদেশি কায়দায় সুপার মার্কেট। মাছ মাংস শাক সবজি সহ সকল গ্রোসারি একই সুপারমার্কেটে পাওয়া যাচ্ছে। ধনীরা এখন এখন অনেক নামী সুপারমার্কেটের ক্রেতা। এই উন্নতি হয়েছে। কিন্তু গরীবো কেমন আছে গ্রামে গ্রামান্তরে?
কৃষক তার ফসলের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। অথচ আড়তদাররা ঠিকই তা কালোবাজারে বিক্রি করে মুনাফা লুটছে। দেখার কেউ নেই।

আমাদের অনেকেরই জানা আছে, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে সিংহভাগ রাজনীতিক আসেন আইনি বিষয়ে লেখাপড়া করে। পলিটিক্যাল এফেয়ার্স, ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস তাদের অবশ্য পাঠ্য তালিকায় থাকে। বাংলাদেশে এই সংখ্যা কমে যাচ্ছে। ফলে নৈতিক সুশাসনের প্রত্যাশা লোপ পাচ্ছে বলেই মনে করছেন সাধারণ মানুষ।
বাংলাদেশে যে বিষয়টি এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে, তা হলো বড় রাজনৈতিক দলের সাপোর্ট ছাড়া জনসেবামূলক কাজ করা দুরুহ ব্যাপার। আর রাজনীতিতে ইনভেস্টমেন্ট বিষয়টি যখন আসে, তখন মুনাফার বিষয়টিও চলে আসে পাশাপাশি।

খরচ করলে তা তো তুলে আনতে হয়। সেটাই এখন রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। যে বিষয়গুলো আমরা সকলেই জানি তা হলো, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অনুপস্থিতি সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে কাজ করতে পারে। পাশাপাশি সুশাসনের অভাব হলে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের সঠিক বিকাশ ঘটে না। ফলে সামাজিক বিশৃঙ্খলা দেখা যায়। এক্ষেত্রে সুশাসন নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অভিভাবক হিসেব কাজ করে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল নৈতিকতা ও মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ। নৈতিকতা ও মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ ছাড়া সমাজকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা কঠিন কাজ। সেই সাথে শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতার জন্য এর পরিচর্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর যে কোনো একটির অভাব হলেই সমাজে বিশৃঙ্খলা ও অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। তাই, সমাজ ও কার্যকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা ও উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির জন্য সুশাসন, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের উপস্থিতি একান্তই দরকার।

বাংলাদেশের গেল ৪৮ বছরে অর্থনীতি এখন অনেক মজবুত। বাংলাদেশ এখন মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সুশাসনের ঘাটতি ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। সুশাসনের অভাব ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেই দেশে অর্থনৈতিক পরিবেশে এক ধরনের বড় আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে। এ কারণেই অর্থনীতির এত সম্ভাবনা সত্ত্বেও বিদেশে পুঁজি পাচার হচ্ছে এবং দেশের ভিতরে আশানুরূপ বিনিয়োগ বাড়ছে না। বিনিয়োগকারীদের জন্য অর্থনৈতিক নীতি ও শাসনব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিকতার নিশ্চয়তা মিলছে না। আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে অনেক অর্জন হলেও স্বাধীনতার অর্থনৈতিক স্বপ্ন বিশেষ করে ন্যায়ভিত্তিক সমতা ও গণতন্ত্রের বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতার স্বপ্নের সবচেয়ে বড় অসম্পূর্ণতা হলো দেশের শাসনব্যবস্থা নিয়ে একটা টেকসই রাজনৈতিক বন্দোবস্ত এখনও করা যায়নি।

এ বিষয়ে রাজনীতিকদের কী ভূমিকা থাকতে পারে, তা ব্যবসায়ী সমাজকেও ভাবতে হবে। যেহেতু তারা এখন রাজনীতির দিকে ঝুঁকছেন। যে বিষয়টি বেশি পীড়াদায়ক তা হলো, উন্নয়নের নামে  সামাজিক বৈষম্য এবং শোষণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আর্থিক উন্নয়নে গার্মেন্টস, রেমিট্যান্স, কৃষি ক্ষেত্রে  সফলতার নিরাপত্তা দরকার। এসব খাতে যারা আমাদের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছেন তারা নিজ নিজ জীবনে নিরাপদ নন। বিশেষ করে গার্মেন্টস কর্মী ও প্রবাসী শ্রমিকদের সঙ্গে একধরনের বৈরি আচরণ করা হয় দেশে-বিদেশে । রাজনীতিকদের দ্বারা লুণ্ঠন, টেন্ডারবাজি ও মস্তানিতন্ত্র চলছে।সুশাসন চাইতে হলে গণতান্ত্রিক পরিবেশ দরকার।

বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে হলে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় কাজ করার গ্যারান্টি দিতে হবে। দেশটিকে গড়তে হলে লোভ-লালসার রাজনীতি পরিহার করতে হবে।
দেশের তৃণমূলে যারা জনপ্রতিনিধি, তাদের কাজ করতে দিতে হবে দলীয় মত বিবেচনা না করে। বাংলাদেশে রাজনীতির উত্তাপ এখন নেই। কিন্তু মানুষের মনের উত্তাপ যেন শীতল হয়ে না যায়। এই সাহস ও শক্তি না থাকলে সমাজ এগোতে পারে না।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর