Alexa ‘রাজধানীবাসি হাঁটতে পারলে বাসের ট্রিপ কমবে ৪০ শতাংশ’

‘রাজধানীবাসি হাঁটতে পারলে বাসের ট্রিপ কমবে ৪০ শতাংশ’

নিজস্ব প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২১:২৬ ১৫ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ১৯:৫৫ ১৬ অক্টোবর ২০১৯

স্থপতি ইকবাল হাবিব

স্থপতি ইকবাল হাবিব

ঢাকায় যারা বসবাস করেন তাদের নানা কষ্টের মধ্যে পড়তে হয় প্রতিনিয়ত। যানজট, ময়লা-আবর্জনা, জলাবদ্ধতা, বৃষ্টি হলেই স্যুয়ারেজ পানির লাইন একাকার। চলাচলে অযোগ্য খানাখন্দ রাস্তা, মশার কামড়, সুপেয় খাবার পানির অভাব, অপর্যাপ্ত গণপরিবহন, ফুটপাতে যত্রতত্র দোকান বসিয়ে পথ রোধ করা, গ্যাস-বিদ্যুৎ-ব্যবহারিক পানি নিরবিচ্ছিন্ন না থাকা, উন্নয়নের নামে প্রতি বছর ফুটপাত ভাঙা, রাস্তা খোঁড়াসহ বিভিন্ন দুর্ভোগ নগরবাসীর নিত্যদিনের সঙ্গী। এসব বিষয়ে কথা বলতে ডেইলি বাংলাদেশ-এর মুখোমুখি হয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেলোয়ার মহিন। 

অর্থের বিনিময়ে সুপেয় পানি সরবরাহের দায়িত্ব ওয়াসার। কিন্তু নগরবাসী পাচ্ছে ময়লা পানি। এর সমাধান কী?
ইকবাল হাবিব: ওয়াসার পানির বিষয়ে এমডি সফলতার চিত্র তুলে ধরলেও পরীক্ষায় দেখে গেছে ভিন্ন চিত্র। আদালতের রায় অনুযায়ী ৩৪টি জায়গায় পানি পরীক্ষা করে এর আটটিতেই মিলেছে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া। ওয়াসার ধৃষ্টতা মানা যায় না। অর্থের বিনিময়ে সুপেয় পানি সরবরাহের দায়িত্ব ওয়াসার। কিন্তু তারা তা করছে না। এটা যদি কোনো প্রাইভেট কোম্পানি করতো তাহলে আমরা ওই কোম্পানিকে সঙ্গে সঙ্গে জেলে দিতাম। খাদ্যে ভেজালের দায়ে অপরাধীদের যেমন জেলে পাঠানো হয়, তেমনি এরাও (ওয়াসার কর্মকর্তা) সমান অপরাধী। তাই জবাবদিহিতার জায়গা থাকতে হবে। তাহলেই সুন্দর সমাধান পাওয়া যাবে।

প্রতিদিনের কর্মঘণ্টা হতে একটা বড় অংশ ব্যয় হয় ঢাকার রাজপথে। মিনিটের রাস্তা পার হতে লাগে ঘণ্টা। এর কী কোনো সমাধান আছে?
যানজট ঢাকার বড় সমস্যা। এ সমস্যা সমাধানের জন্য দেখতে হবে ৩৬০ ডিগ্রিতে। ঢাকা মূলত মধ্যবিত্তের নগর। এই মধ্যবিত্তের পরিবেশ নিয়ে ভাবনাগুলো কী তা বোঝা প্রয়োজন। শহরের রাস্তাঘাট তেমন না বাড়লেও প্রতিদিন ৩৪-৩৬টি নতুন পরিবহন রাস্তায় নামছে। এতে যানজটের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সড়কে ঘটছে দুর্ঘটনা। এজন্য সমাধান হিসেবে নগরে করিডোর ভিত্তিক হাঁটার ব্যবস্থা চালু করতে হবে। পথচারীবান্ধব ফুটপাথ, বাসস্ট্যান্ড, জেব্রা ক্রসিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। এগুলো বাস্তবায়ন করতে পারলে ঢাকায় বাসের ট্রিপও অন্তত ৪০ শতাংশ কমে আসবে। একইসঙ্গে প্রাইভেট কারের অত্যধিক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে গণপরিবহন হিসেবে বাসের সংখ্যা বাড়াতে হবে।

পরিকল্পিত নগর হিসেবে গড়ে তুলতে কী কী পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন?
১৯৬৯ সালে ঢাকাকে বসবাসযোগ্য একটি নগরী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য একটি মাস্টার প্ল্যান তৈরি করা হয়। কিন্তু এখনো কার্যত সেই মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। আমি মনে করি এজন্য প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ। এর আগে যথাযথভাবে কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আইন প্রয়োগ করা যায়নি বলেই তার বাস্তবায়ন হয়নি। সংশ্লিষ্টরা ঢাকাকে পরিকল্পিত নগর হিসেবে গড়ে তুলতে প্রায় ব্যর্থ। শহরে ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা, উত্তরা মডেল টাউন, হাতিরঝিল, অধুনা পূর্বাচল মিলিয়ে বেশ কিছু ‘পকেট ডেভেলপমেন্ট’ হলেও পুরো ঢাকাকে বাসযোগ্য নগর হিসেবে গড়ে তোলা যায়নি। তবে ইদানিং বুড়িগঙ্গার দুই পাড়ে অবৈধ স্থাপনাগুলোতে উচ্ছেদ অভিযান চালাতে দেখা গেছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো ‘অ্যাকশনমুখী’ হয়েছে বলেই সব বাধা উপেক্ষা করে বড় বড় অবৈধ ভবন গুঁড়িয়ে দেয়া সম্ভব হয়েছে।

পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিবের সাক্ষাৎকার নেন দেলোয়ার মহিন

এদিকে, চকবাজারের চুড়িহাট্টায় আমরা আগুনের নির্মমতা ও ভয়াবহতা দেখেছি। ৬৭ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সামনে এসব থেকে মুক্তি পেতে যেসব শিল্পে দাহ্য বস্তু ব্যবহার করা হচ্ছে সেসব শিল্পের জন্য সুনির্দিষ্ট শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলতে হবে। এছাড়া ডিটেইল এরিয়াপ্ল্যান তৈরি করে ঢাকা বাসযোগ্য করে তোলার দিকে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন, যাতে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবন বা স্থাপনা সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে না পারে। এসব করা গেলেই এ শহরকে বসবাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব। এ ছাড়া জনঘনত্ব কমানোর পাশাপাশি জনগণকে সচেতন করার বিষয়ে জোর দেন তিনি।

এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলেই কি ঢাকা পরিকল্পিত নগরীতে পরিণত হবে?
সেটা বলছি না, তবে ঢাকা বসবাসযোগ্য থাকবে। আমি মনে করি, ঢাকার ভেতর থেকে প্রশাসনিক সব অফিস সরিয়ে নেয়া উচিত। কেননা বিশেষজ্ঞরাও এরআগে বিকল্প রাজধানী প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেছে।

বিকল্প রাজধানী করার মতো আশেপাশে এত জমি কোথায়?
ঢাকার পাশেই পূর্বাচল নতুন শহর নির্মাণ করছে রাজউক। সেখানে আবাসিক এলাকার পাশাপাশি অনাবাসিক এলাকাও চিহ্নিত করা আছে। বিকল্প রাজধানীর অফিস বা দফতরগুলো সেখানেই হতে পারে। যেমন মালয়েশিয়া সরকার কুয়ালালামপুরের অদূরে পুত্রজায়ায় তাদের প্রশাসনিক রাজধানী নির্মাণ করেছে। সুতরাং বেসরকারি প্রকল্পের সমন্বয় ঘটিয়ে পূর্বাচলকে আরো সম্প্রসারিত করা যেতে পারে। সমন্বিত পরিকল্পনা ও উন্নয়নের ব্যবস্থা করা হলে এখনো সেখানে ঢাকার একটা বিকল্প নগর সৃষ্টি করা সম্ভব।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসআই