Alexa রহস্যে ঘেরা কামরুপ কামাক্ষা

রহস্যে ঘেরা কামরুপ কামাক্ষা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৩:২০ ২৬ আগস্ট ২০১৯   আপডেট: ১৪:১৯ ২৬ আগস্ট ২০১৯

ছবি: কামাক্ষা মন্দির

ছবি: কামাক্ষা মন্দির

কামরুপ কামাক্ষা, বিশ্বের অন্যতম বিস্ময়কর স্থান হিসেবে পরিচিত ভারতের এই জায়গাটি। জায়গাটিকে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে অসংখ্য গল্প-কাহিনী। বলা হয়, এখানে অনেক কালো জাদু সাধক ও যোগিনী রয়েছে যারা সেখানকার বিখ্যাত কামাক্ষা মন্দিরে এসবের চর্চা করে থাকে। মূলত এই কামাক্ষা মন্দিরকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে এখানকার যাবতীয় রহস্য।

যদি কোনো মানুষ এখানে প্রবেশ করে, তবে সে আর কালো জাদুর বেড়াজাল ভেদ করে সেখান থেকে বের হতে পারেনা এবং চিরতরে বন্দি হয়ে যায় বলে কথিত রয়েছে। সেই ব্যক্তি তখন যোগিনীদের যৌনদাসে পরিণত হয়। কোনো ভাবে সে যদি সেখান থেকে বের হতেও পারে, তবে স্বাধীনতার মূল্য হিসেবে তাকে হারাতে হয় তার যৌবন।

আবার অনেকে সেখানে কালো যাদু শেখার উদ্দেশ্যে যায়। পরবর্তীতে যখন তারা ফিরে তখন আর তারা সাধারণ মানুষ থাকে না, শক্তিশালী তান্ত্রিকে পরিণত হয়। তবে এসব মানুষের লোককথা। 

কামাক্ষা কি?

হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, কামাক্ষা হলো স্বতী ও তার স্বামী দেবতা শিবের মিলন স্থান। স্বতী যখন মারা যান, শিব ঠাকুর তখন তার স্ত্রীর মৃত্যুর শোকে ও ক্ষোভে নাচতে শুরু করেন। শিবের ধ্বংসাত্মক নাচ থামাতে আরেক দেবতা বিষ্ণু স্বতীর মৃতদেহ চক্র দিয়ে কেটে ৫১টি টুকরো (শক্তি পিঠা) করে ফেলেন। সেই খণ্ডিত টুকরোগুলো আসামের গুয়াহাটি সহ আশেপাশের চারটি স্থানে এসে পড়ে এবং পরবর্তীতে সেই স্থানগুলোতে মন্দির নির্মাণ করা হয়।

 

কামাক্ষা মন্দিরের ইতিহাস

গুয়াহাটির কামাক্ষা মন্দির হলো ভারতের অন্যতম প্রাচীন মন্দির ও ৫১ শক্তি পিঠার একটি। কামাক্ষা মন্দিরকে কামরুপও বলা হয়ে থাকে। মূলত কামরুপ হলো এই অঞ্চলটির প্রাচীন নাম। অনেক সময় এই মন্দিরটিকে কামরুপ কামাক্ষাও নামেও ডাকা হয়। 

অষ্টম শতাব্দীতে নির্মিত এই মন্দিরটিকে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত বেশ কয়েকবার সংস্কার করা হয়। নিলাচল পাহাড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮’শ ফুট উপরে এই মন্দিরটি অবস্থিত। কালো যাদু সাধনার ক্ষেত্রে কামাক্ষা মন্দির খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্বাস করা হয়। 

অনেকে বলে থাকেন যে, ষষ্ঠদশ শতাব্দীর দিকে সুলায়মান কারানি’র সেনাপতি কালাপাহাড় কামাক্ষা মন্দীরটিকে গুড়িয়ে দিয়েছিলেন। তবে সম্প্রতি জানাগেছে যে, আসলে কালাপাহাড় মন্দিরটিকে ধ্বংস করেনি, ১৪৯৮ সালে হুসেইন শাহ যখন কামাতা রাজ্যে আক্রমন চালিয়েছিলেন তখন এটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। 

পরবর্তীতে কোচ রাজ বংশের বিশ্বসিংহ এটির ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পান এবং পুনঃনির্মাণ শুরু করেন। তবে তিনি সেটার কাজ শেষ করতে না পারলেও তার পূত্র নারায়ন সিংহ এর কাজ সমাপ্ত করেন। মন্দিরটির ধ্বংসস্তুপ ব্যবহার করেই সেটাকে পুনরায় নির্মাণ করা হয়। 

প্রাচীন গল্প-কাহিনীতে শোনা যায় মন্দিরটিকে কোচ বংশের শাসকেরা পুনঃনির্মাণ করলেও কামাক্ষা দেবী তাদেরকে সেখানে প্রার্থণা করার ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ করেন। এতে তারা এতই ভীতসন্ত্রস্ত হন যে এমনকি এখনও তাদের কোনো বংশধর মন্দিরটির দিকে পর্যন্ত তাকান না।

কামাক্ষা মন্দিরের মধ্যে আরো বেশ কয়েকটি মন্দির রয়েছে। সেগুলো হলো – সিতালা মন্দির, ললিতা কান্ত মন্দির, যোনি মন্দির, জয় দুর্গা মন্দির, ভানা দুর্গা মন্দির, রাজা রাজেশ্বরী মন্দির, স্মাসানাকালী মন্দির, কালী মন্দির ও শঙ্কেশভারী মন্দির। এছাড়া সেখানে শিব মন্দিরই রয়েছে পাচঁটি।

 

কামাক্ষা মন্দির নিয়ে লোককথা

কামাক্ষা মন্দির নিয়ে নানান গল্প ও লোককথা রয়েছে। বলা হয়ে থাকে, একবার স্বতীর পিতা তাকে এক বিশাল যজ্ঞে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। স্বতি সেখানে অংশ নিতে চেয়েছিলো। তবে তার স্বামী দেবতা শিব তাকে বাধা দেন। কিন্ত স্বামীর নিষেধ অমান্য করে স্বতী সেখানে অংশ নেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্বতীর বাবা শিবকে অপমান করেন। কিন্তু এতে স্বতী অনেক কষ্ট পান এবং ক্ষোভে যজ্ঞের আগুনে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। 

শিব তার প্রিয়তমা স্ত্রীর এমন করুণ মৃতু মেনে নিতে পারেননি। তিনি তার স্ত্রীর মৃতদেহ উদ্ধার করে সেটি নিয়ে ‘তান্দাভা’ শুরু করেন। তান্দাভা হলো শিবের এক ধরনের নৃত্য। এটিকে ‘ধ্বংসের নাচ’ও বলা হয়ে থাকে। 

শিবের ধ্বংসলীলা থেকে পৃথিবীকে বাঁচাতে দেবতা বিষ্ণু চক্র ব্যবহার করে স্বতীর দেহকে ৫১ টুকরো করে ফেলেন ও তা ফেলে দেন। এই কামাক্ষা মন্দিরে স্বতীর যোনি পড়েছিলো বলে বিশ্বাস করা হয়। তাই এই মন্দিরটিকে নারী ক্ষমতা ও উর্বরতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।

আরেক লোককথায় বলা হয়, এই কামাক্ষা মন্দির যেই স্থানটিতে অবস্থিত সেখানে শিব এবং স্বতী প্রেমলীলায় মত্ত হয়েছিলেন। এও বলা হয়ে থাকে যে, শিব একবার কামদেবকে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে সে আর তার কামকার্য উপভোগ করবেন না। কিন্তু পরবর্তীতে মন্দিরের এই স্থানটিতে স্বতীর খণ্ডিত যোনির টুকরো খুঁজে পাওয়ার পর তিনি সেই অভিশাপ থেকে মুক্তি পান। 

 

কালো জাদু এবং তন্ত্র সাধনা

কামাক্ষা মন্দিরটি বহু বছর ধরেই কালো জাদু এবং তান্ত্রিক সাধনার জন্য পরিচিত। তবে এখানে কালো জাদু সাধনার পাশাপাশি এর প্রভাব দূর করার জন্যও বিশেষ এক ধরনের পূজা করা হয়ে থাকে। মূলত সাধু এবং অঘৌরিরা এসব পূজার আয়োজন করে।

কালো জাদুতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এমন ব্যক্তিদের সাহায্য করার জন্য এটা করা হয়। পূজার আয়োজন করা এসব সাধু ও অঘৌরিদের মন্দিরের সর্বত্রই পাওয়া যায়। বিশ্বাস করা হয়ে থাকে যে, এই মন্দিরে দশ মহাবিদ্যা উপস্থিত রয়েছে। সেগুলো হলো -কালী, তারা, ত্রিপুরা, সুন্দরী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধুমাবতী, বগলামুখী, মাতাঙ্গি ও কমলা।

এই মন্দিরটিতে খারাপ আত্মা ও অশরীরীও ছাড়ানো হয়ে থাকে। বিশেষ করে অম্বুচাচি মেলার সময় হাজার হাজার তান্ত্রিক মন্দিরে জড়ো হয়ে এগুলো করে। 

বেশির ভাগ কালতন্ত্র এই মন্দির থেকেই সৃষ্টি হয়। বলা হয়ে থাকে যে, একজন তান্ত্রিক বা সাধককে পরিপূর্ণ সক্ষমতা অর্জণ করতে হলে অবশ্যই কামাক্ষা মন্দিরে গিয়ে দেবতাদের পূজা করে আসতে হবে। 

 

মন্দিরের বিভিন্ন যজ্ঞ ও আনুষ্ঠানিকতা

কামাক্ষা মন্দিরে বিভিন্ন ধরনের যজ্ঞ ও আনুষ্ঠানিকতা পালণ করা হয়। এসকল যজ্ঞ ও আনুষ্ঠানিকতার জন্য প্রাণী বলি দিতে হয়। এজন্য মন্দিরে পাঠা ও মহিষ বলি দেয়ার দৃশ্য খুবই সাধারণ একটি ব্যাপার।

তবে প্রাণী বলি দানের ক্ষেত্রে সব সময় পুরুষ প্রাণীই বলি দিতে হয়। নারী প্রাণী বলি দেয়া সেখানে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। 

কামাক্ষা মন্দিরের একটি বিশেষ পূজা হলো যোনি পূজা। দেবতা শিবের স্ত্রী স্বতির সম্মানে এখানে এই পূজার আয়োজন করা হয়ে থাকে। হাজার হাজার মানুষ এই পূজায় অংশ নেয়।

কামাক্ষা মন্দিরের আরেকটি বিশেষ যজ্ঞ হলো বশীকরণতন্ত্র। এর মাধ্যমে তান্ত্রিকরা মানুষকে বশ করে থাকে। সাধারণত ভালোবাসার মানুষকে কাছে পাওয়ার জন্য এটা করা হয়। এর মাধ্যমে ভালোবাসার মানুষকে পাওয়া সহ বিবাহ বিচ্ছেদ ঠেকানো, মনের অমিল দূর করা ও জীবনে সফলতা অর্জন করা যায় বলে বিশ্বাস করা হয়।

এটি ছাড়াও মন্দিরটিতে আরো বিভিন্ন ধরনের যজ্ঞ করা হয়। বিশেষ করে বিভিন্ন উৎসব বা মেলার সময়ে নানা ধরনের যজ্ঞ ও আনুষ্ঠানিকতা পালণ করা হয়ে থাকে। 

 

কামাক্ষা মন্দিরে যেতে হয় যেভাবে

বাংলাদেশ থেকে কেউ কামাক্ষা মন্দিরে যেতে চাইলে তাকে মেঘালয়ের ডৌকি সীমান্ত দিয়ে আসামে প্রবেশ করতে হবে। চাইলে কলকাতা থেকে বিমানে করেও গুয়াহাটিতে যাওয়া যাবে, তবে এতে খরচ অনেকটা বেশি পড়বে ।

সিলেটের তামাবিল সীমান্ত দিয়ে মেঘালয়ের ডৌকি সীমান্তে প্রবেশের পর সেখান থেকে শিলংয়ে যাওয়ার ট্যাক্সি নিতে হবে। দেড় হাজার থেকে দুই হাজার রুপির মধ্যে চারজনের জন্য একটি ট্যাক্সি ভাড়া করা যায়। 

এরপর শিলং থেকে গুয়াহাটি যাবার জন্য আবারো ট্যাক্সি বা জীপ নিতে হবে। সেক্ষেত্রে ট্যাক্সির সিট প্রতি দেড়শ রুপি ও জীপের সিট প্রতি ৮০ রুপি গুণতে হবে। 

এরপর গুয়াহাটির পল্টন বাজার থেকে লোকাল বাসে করেই রহস্যে ঘেরা সেই কামাক্ষা মন্দির এলাকা অর্থাৎ কামরুপ কামাক্ষায় যেতে পারবেন। 

আপনি চাইলে ঢাকার কমলাপুর থেকে বিআরটিসি বা শ্যামলী পরিবহণের বাসে করেও শিলংয়ে পৌঁছতে পারবেন। 

 

হোটেল এবং রেস্তোরা

গুয়াহাটির পল্টন বাজার এবং রেল স্টেশন এলাকায় বেশ কিছু হোটেল এবং রেস্তোরা রয়েছে। হোটেলগুলোয় আপনি ৭০০ থেকে ২ হাজার রুপির মধ্যে একটি সিঙ্গেল রুম ভাড়া নিতে পারবেন। এছাড়া রেস্তোরাগুলোতেও একশ থেকে তিনশ রুপির মধ্যে আপনি ভাত-মাছ, রুটি ইত্যাদি খেতে পারবেন। 

শপিং

গুয়াহাটির পল্টন বাজার, পান বাজার ও রেল স্টেশন এলাকায় কিছু শপিং সেন্টার রয়েছে। কেনাকাটা করতে চাইলে আপনারা যেতে পারেন সেখানে। 

গুয়াহাটিতে গেলে আপনার কিছু জিনিস মনে রাখতে হবে। আপনি যদি গুয়াহাটি থেকে লোকাল বাসে করে আশেপাশে কোথাও যেতে চান তাহলে আপনার সর্বোচ্চ ১০ থেকে ২০ রুপি ভাড়া হবে। এছাড়া আপনি চাইলে ট্যাক্সি ভাড়াও নিতে পারেন। 

ভ্রমণের সময় আপনার পাসপোর্ট, পরিচয় পত্র, নো অবজেকশন সার্টিফিকেট (এনওসি) সহ প্রয়োজনীয় সকল কাগজপত্রের একাধিক ফটোকপি করে রাখবেন। কারণ এই কাগজপত্রের কোনটি হারিয়ে গেলে ঝামেলায় পড়তে পারেন আপনি।

এছাড়া এসব কাগজপত্র আপনাকে সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করা থেকে শুরু করে হোটেল ভাড়া নেয়া ইত্যাদি কাজেও সাহায্য করবে। 

 

ডেইলি বাংলাদেশ/মাহাদী