Alexa রহস্যময়ী তাজমহলের অজানা কিছু তথ্য

রহস্যময়ী তাজমহলের অজানা কিছু তথ্য

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২০:৩৬ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আপডেট: ২০:৪২ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

পৃথিবীতে ভালোবাসার অনন্য নিদর্শন হিসেবে প্রায় চারশ বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে ভারতের উত্তর প্রদেশের আগ্রা’র ঐতিহাসিক তাজমহল। এর সৌন্দর্যে আজো সারা বিশ্বের প্রেমিকের চোখ তৃপ্ত হয়।

এটি ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট ও বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের একটি। মুঘল সম্রাট শাহজাহান তার প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজের স্মৃতিতে এই স্মৃতিস্তম্ভটি তৈরি করেছিলেন। 

তাজমহল নিয়ে অনেক গল্প ও কল্পকাহিনী প্রচলিত রয়েছে। তবে এসবের বেশিরভাগেরই যথাযথ প্রমাণ না থাকলেও কাহিনীগুলো বহু বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে রটে বেড়াচ্ছে। আজ আমরা তাজমহল সম্পর্কিত কয়েকটি রহস্যময় ও দৃঢ় কল্পকাহিনী সম্পর্কে জানাবো।

তাজমহল ও সম্রাজ্ঞী আরজুমান্দ বানু বেগম

অনেকেই হয়ত একটু ভ্রু-কুঁচকে তাকাতে পারেন আরজুমান্দ বানু আবার কে? তবে এই আরজুমান্দ বানুই হচ্ছেন মমতাজ মহল, যে নামে সারা পৃথিবীতে তিনি অমর হয়ে আছেন। পূর্ব-পুরুষদের মতো সম্রাট শাহজাহানের হেরেমেও ছিল অনেক স্ত্রী। তবে এতো রানীদের মাঝে এমন কেউ ছিলেন না যিনি মমতাজের মতো তার হৃদয় হরণ করতে পেরেছেন। 

মমতাজ ছিলেন তার তৃতীয় স্ত্রী। ১৯ বছরের পরিণয় জীবনে তাদের মোট সন্তান হয়েছিল ১৪টি। শেষ সন্তান জন্মদানের সময় তার প্রয়াণ ঘটে। এতে শাহজাহান এতোটাই কষ্ট পান যে তিনি তার স্ত্রীর স্মৃতিকে অম্লান করে রাখার জন্য একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যার নাম রাখা হয় তাজমহল। এটি তৈরিতে প্রায় ২২ বছর সময় লেগেছিল। এর নিমার্ণ কাজ শুরু হয় ১৬৩২ সালে ও শেষ হয় ১৬৫৩ সালে।

কর্মীদের হাত কাঁটার আদেশ

তাজমহল সম্পর্কে একটি খুবই প্রচলিত কল্পকাহিনী হলো এমন স্মৃতিস্তম্ভ যেন দ্বিতীয়টি আর নির্মিত না হয় তা নিশ্চিত করার জন্য শাহজাহান কারিগরদের হাত কাঁটতে আদেশ দিয়েছিলেন। 

বহু লোক এই কাহিনী বিশ্বাস করলেও এটি নিশ্চিত করার মতো কোনো প্রমাণ কখনও পাওয়া যায়নি। সুতরাং, এটি স্রেফ একটি পৌরাণিক কাহিনী হিসেবেই এটি মানুষের মুখে রটে বেড়াচ্ছে।

তাজমহলের খুঁত

যদিও আমরা তাজমহলকে নিখুঁত বলে বিবেচনা করি তবে এটি তা নয়। মহলটির মূল হলের সিলিংয়ে একটি ছোট গর্ত রয়েছে। কথিত আছে যে কারিগরদের একজন ইচ্ছে করেই এই গর্তটি রেখে দিয়েছিলো যেন শাহজাহানের নিখুঁত মহলের স্বপ্ন সত্য হতে না পারে।

নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর সকল কারিগরের হাতকাটার পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে পেরে তিনি এটি করেছেন বলে ধারণা করা হয়।।

এটি কি মমতাজের প্রথম সমাধি ছিল?

মমতাজের মৃত্যুর পরে ও তাজমহলে রাখার আগে তার মরদেহ পৃথক স্থানে দাফন করা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে মৃত্যুর ঠিক পরে তাকে বুহানপুরে সমাহিত করা হয়। তারপরে, দেহ আগ্রায় স্থানান্তরিত করা হয় এবং তাজমহলের কমপ্লেক্সে ১২ বছর তাকে সমাধিস্থ করা হয়। অবশেষে এটি তাজমহলের বেসমেন্টে স্থানান্তরিত হয় যেখানে এটির চূড়ান্ত বিশ্রামের স্থানটি পাওয়া যায়।

রহস্যজনক ঘর!

ধারণা করা হয়ে থাকে যে, তাজমহলের ভেতর অসংখ্য গুপ্ত কক্ষ রয়েছে। শাহজাহানের সময় থেকেই এই কক্ষগুলো তৈরি করা হয়েছিল এবং বর্তমান ব্যবস্থাতেও এই কক্ষগুলোতে খুব বেশি পরিবর্তন করা হয়নি। 

অনেকের ধারণা, তাজমহলের ভেতরে মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সম্রাট শাহজাহান। কারণ, শ্বেতপাথরের নিচেই একটি লাল পাথরের তৈরি সিঁড়ি চলে গিয়েছে এবং নদীমুখ করে থাকা ২২টি ঘরের মাঝে একটি ঘর রয়েছে যেটিকে মন্দিরের প্রবেশকক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা।

শাহজাহান বেশ শক্ত করেই এই ঘরের মুখ পাথরের সাহায্যে সিলগালা করে দিয়েছিলেন। মুঘল অন্য কোনো নিদর্শনের মাঝে এমন কোনো স্থাপনা পাওয়া যায়নি, যেখানে এমন চাতুরতার আশ্রয় নেয়া হয়েছিল। তবে এটি নিয়েও জনমনে নানা প্রশ্ন রয়েছে। সত্যিই কি শাহজাহান এই কক্ষের সিলগালা করেছিলেন, নাকি ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের এটি একটি গভীর ষড়যন্ত্র?

তাজমহলের রঙ বদলানোর ক্ষমতা

তাজমহল প্রকৃতপক্ষেই এক বিস্ময় তাতে কোনো সন্দেহ নেই। একটি জনপ্রিয় পৌরাণিক কাহিনী রয়েছে যে মহলটির রঙ দিনের সময় এবং আকাশের অবস্থার সঙ্গে পরিবর্তিত হয়।  এটা ধারণা করা হয়ে থাকে যে, তাজমহল হচ্ছে ওই রমণীর প্রতিকৃতি যিনি তার মনের অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের সম্পূর্ণ পরিবর্তন ঘটাতে সমর্থ হন।

ভোরের আলোয় এক হালকা গোলাপীর মূর্ছনায় মাতোয়ারা হয়ে ওঠে তাজমহল। সন্ধ্যার এটি দুধভরা সাদা দেখায়। চাঁদনি রাতে একটি হালকা নীল রঙের আভায় এক মনোমুগ্ধকর রূপ নেয়। এই পরিবর্তনগুলো তাজমহলকে দিয়েছে অনন্য এক বৈচিত্র্য।

ক্যালিগ্রাফি বনাম বৈদিক চিত্রকলা

আল্লাহ তাআলা’র ৯৯টি নামের অসাধারণ এক ক্যালিগ্রাফির সমন্বয় রয়েছে তাজমহলের অভ্যন্তরে। প্রতি বছর যারা তাজমহল দেখতে আসেন তারা এই ক্যালিগ্রাফি দেখে আশ্চর্য হন।

প্রশ্ন হচ্ছে, তাজমহল কি আসলে একটি কবর, নাকি ভালোবাসার নিদর্শন, নাকি অজানা এক রহস্যের ভান্ডার? তাজমহলের ভেতরে পাওয়া ২২টি কক্ষের ভেতর বৈদিক চিত্রকলার নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। শাহজাহান এই চিত্রকলাগুলোকে প্লাস্টার করে আবৃত করারও কোনো প্রয়োজন মনে করেননি। তিনি শুধু সিলগালা করে কক্ষগুলো বন্ধ করে দিয়েছেন। তাহলে এই ২২টি কক্ষের প্রয়োজন আসলে কি ছিল? জনগণের নিকট থেকে তাদের লুকানোরই বা দরকার ছিল কি? এমন সব নানা প্রশ্নে ঘুরপাক খাচ্ছে রহস্যসন্ধানীরা।

শ্বেতপাথরের নিচের করিডর

এবার ২২টি কক্ষের থেকে আমরা একটু বাইরে যাই। শ্বেতপাথরের নিচে থাকা লাল পাথরের নিচে যে গোপন সিঁড়িটি গিয়েছে, তার করিডরটি প্রায় ১২ফিট প্রশস্ত ও ৩০০ ফিট লম্বা। এর চারপাশে আমরা যে মোটা থামগুলো দেখতে পাই, এই থামগুলো তৈরি করা হয়েছে বৈদিক নকশার সাহায্যে। এই করিডরটিকে গ্রাস করেছে নিকষ কালো আঁধার কারণ, শাহজাহান এর চারপাশে থাকা ভেন্টিলেটরগুলোকেও সিল করে দিয়েছেন যাতে কোনো আলো বাতাস এর ভেতর আসতে না পারে।

কালো তাজমহল

বলা হয়ে থাকে সম্রাট শাহজাহান নিজের সমাধির জন্য আরো একটি তাজমহল তৈরি করতে চেয়েছিলেন। তিনি কখনই বিদ্যমান তাজমহলে তার স্মৃতিসৌধ রাখার কথা ভাবেননি। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন কেবল তার নিজস্ব একটি তাজমহলের। যমুনা নদীর অন্য তীরে এটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল এবং মহল দুটি একটি ব্রিজের মাধ্যমে সংযুক্ত হওয়ার কথা ছিল।

কালো তাজমহল এখন শুধুই একটি গল্প। তাজের নির্মাণ কাজ শেষ করার পরে নিজ পুত্রের হাতে সিংহাসনচ্যুত হওয়ার পর শাহজাহানের ইচ্ছা কি ছিল তা নিশ্চিত করে বলা যায়নি। কিন্তু উদ্যানের কালো মার্বেলগুলো যেন প্রশ্নের জন্ম দেয় বার বার।

শিবের মন্দির তাজমহল!

তাজমহল অতীতে আসলে শিব মন্দির ছিলো বলে ‘তাজমহল: সত্য গল্প’ নামক এক প্রতিবেদনে দাবি করেছিলেন পি.এন. ওয়েক নামক এক ব্যক্তি। সেই প্রতিবেদনে তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন যে এটি মুঘল শাসনামলের ভবন ছিল না। তিনি একটি কার্বন পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে এটি  শাহজাহানের রাজত্বের চেয়ে তিনশ বছর আগের পুরাতন একটি ভবন ছিল।

তবে এএসআই- এর তথ্যনুসারে, তাজমহল যে স্থানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে কোনো হিন্দু মন্দিরের অস্তিত্ব ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তাজমহল সম্পর্কে এই কল্পকাহিনী ছাড়াও সেই সময় তাজমহল নির্মাণ সম্পর্কিত কিছু বিতর্কিত বিষয় রয়েছে। অনেকে তাজমহলের মতো একটি বৃহৎ প্রকল্প তৈরির চেষ্টার জন্য মুঘল সাম্রাজ্যের ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আবার অনেকে তাজমহল তৈরির প্রয়োজনীয়তার পিছনে কোনো যুক্তিযুক্ত কারণও খুঁজে পাননি।

তাজমহল নিঃসন্দেহে সেই যুগের বৃহত্তম প্রকল্প। মুঘল ছিল সেই সময়ের বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ সাম্রাজ্য। তবুও এই বিশাল প্রকল্পের ব্যয় বহন করার ক্ষমতা শাহজাহানের সাম্রাজ্যের ছিল কিনা তা বড় বিতর্কের বিষয়। তাজমহল ও অন্যান্য ব্যয়বহুল প্রকল্প বাস্তবায়নের পর শাহজাহানের রাজত্বের শেষে মুঘল কোষাগার বেশ ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল।

শুধু তাই নয়, তাজমহলের শ্রমিকদের খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে মুঘল সাম্রাজ্যের কিছু জায়গায় কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ তৈরি হয়েছিল। এছাড়া এটি নির্মাণের জন্য অর্থের যোগান দিতে সাধারণ প্রজাদেরকে অনেক শুল্ক দিতে হতো। যদি কোনো শাসকের ব্যক্তিগত ভালোবাসার জন্য সাধারণ মানুষকে এত কষ্ট করতে হয়, তবে অনিবার্য কারণে সেই স্থাপত্যটি নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উত্থাপন হওয়াটাও বোধহয় স্বাভাবিক। একজন সম্রাটের ব্যক্তিগত সুখের সামনে মানুষ কতটা নাজুক ছিল এটি তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।

ডেইলি বাংলাদেশ/আর.এইচ/মাহাদী