রবি ঠাকুরের প্ল্যানচেটে এসেও ধরা দেননি মেজ বৌঠান

রবি ঠাকুরের প্ল্যানচেটে এসেও ধরা দেননি মেজ বৌঠান

আঁখি আক্তার ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৯:২২ ২০ মে ২০১৯  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

রবি ঠাকুরের প্রেত চর্চা ছিল খুবই জনপ্রিয়। মৃত্যুর পরের জীবনে কি হয় তা নিয়েও তার ভাবনার শেষ ছিলনা।প্ল্যানচেটের মাধ্যমে তিনি পরকালের প্রিয়জনদের কাছে ডাকতেন। তাই তিনি যেমন বাঙালির জীবনে আজও অমর তেমনই নিজের জীবিতকালেও তিনি বারবার ফিরে গিয়েছিলেন পরপারের দ্বারে। তিনি প্ল্যানচেটের মাধ্যমে বহুবার ডেকে এনেছেন তাঁর প্রিয়জনদের। মৃত হয়েও তারা অমরের মত বিশ্বকবির ডাকে সারা দিয়ে ফিরে এসেছেন বারবার। কিন্তু প্রেত লোক থেকে প্ল্যানচেটের মাধ্যমে কাছে এসেও রবীন্দ্রনাথকে যিনি বলেননি তাঁর পরিচয় তিনি ছিলেন তার প্রিয় মেজ বৌঠান কাদম্বরি দেবী।

তাদের ভালোবাসা যেন অমর। রবির কাছে এসেও তিনি ধরা দেবেন না, ইহলোকে লুকোচুরি খেলার মতোই হয়তো পরলোকে গিয়েও এমনটাই চেয়েছিলেন কাদম্বরী দেবী। তাই রবীন্দ্রনাথের প্রেতচর্চার সময়ে তার আত্মীয় থেকে বহু কাছের মানুষ এসে তার সঙ্গে কথা বললেও একমাত্র কাদম্বরী দেবী কোনওদিন তার পরিচয় দেননি, কিন্তু বিশ্বকবি বুঝতে পারতেন ওই আত্মাটি কাদম্বরী দেবীই। এই মহামিলন চক্রের কথোপোকথন সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মনে কোন সন্দেহও ছিল না। তবে তার অনেক জীবিত আত্মীয়দের এ নিয়ে সংশয় ছিল।

কবির ডাকে সাড়া দিয়ে এসেছিলেন তার প্রায় সমস্ত প্রয়াত আত্মীয় ও বন্ধুরা। সেই তালিকা যথেষ্ট লম্বা। তালিকায় রয়েছে মেজদা সত্যেন্দ্রনাথ, নতুনদাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, পত্নী মৃণালিনী দেবী, বড় মেয়ে মাধুরীলতা, ছোট ছেলে শমীন্দ্রনাথ, প্রিয় ভাইপো বলেন্দ্রনাথ, হিতেন্দ্রনাথ। তার কাছের মানুষ সুকুমার রায়, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়, অজিত চক্রবর্তী, সন্তোষ মজুমদার, সতীশ রায় প্রমুখ ভক্তবৃন্দও তার কাছে এসেছিলেন পরলোক থেকে।

বার বার ডাকা সত্ত্বেও কখনোই আসেননি যারা তারা হলেন রবীন্দ্রনাথের বাবামশায় মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, মা সারদা দেবী, বড় দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ ও মেজ মেয়ে রেণুকা। যারা এসেছিলেন, তারা খোলাখুলি কবির প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন। এমনকি, ব্যক্তিগত ইচ্ছার কথাও বলেছেন। যেমন, সুকুমার রায় তার একমাত্র পুত্র সত্যজিৎ রায়কে শান্তি নিকেতনে রাখার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। সেই কথা কবি রেখেও ছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের বড় হয়ে ওঠা শান্তি নিকেতনের গুরুদেবের আশ্রমেই। প্ল্যানচেটে ডেকেই স্ত্রী মৃণালিনীর সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে বালবিধবা প্রতিমাদেবীর বিয়ের নিয়ে।

যারা রবি ঠাকুরের প্রেত চর্চা নিয়ে প্রশ্ন তুলত তেমন একজনকে কবি বলেছিলেন, “পৃথিবীতে কত কিছু তুমি জানো না, তাই বলে সে সব নেই? কতটুকু জানো? জানাটা এতটুকু, না জানাটাই অসীম।”

প্রসঙ্গত ছোটবেলা থেকেই প্রেত চর্চা কবির জীবনের অঙ্গ ছিল। তার কৈশোরে তিনি বহুবার অংশ নিয়েছিলেন প্রেত চর্চায় যা ঠাকুরবাড়ির অন্যতম অঙ্গ ছিল। তা থমকে গিয়েছিল হেমেন্দ্রনাথের আকস্মিক মৃত্যুর পর। বৃদ্ধ বয়সে তার ফের প্ল্যানচেট করার ইচ্ছা জাগে। একের পর এক প্রিয়জনকে হারিয়ে বেদনায় ভরপুর রবি ঠাকুরের মন তখন হয়তো চাইছিল আরও একবার প্রিয়দের সঙ্গে আলাপ করি। ১৯২৯ সালে শান্তি নিকেতনে রবীন্দ্রনাথের বন্ধু ও তার বহু কাব্যগ্রন্থের প্রকাশক মোহিতচন্দ্র সেনের মেয়ে উমা দেবীর ভালো ‘মিডিয়াম’হওয়ার কথা জানতে পেরে সেই ইচ্ছা আবারও জেগে ওঠে। প্রেত চক্রের যাবতীয় নিয়ম ভঙ্গ করে রবীন্দ্রনাথ উমার মুখোমুখি বসে তাকে প্রশ্ন করতেন। মিডিয়ামের হাতে কাগজ পেন্সিল থাকতো, তিনি উত্তর শুনে দ্রুত কথাগুলি লিখে কবিকে দেখাতেন। তাকে লিখতে সাহায্য করেতেন অমিয় চক্রবর্তী আর মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়। ঘরে আরও অনেকে উপস্থিত থাকতেন, কিন্তু প্রশ্ন শুধু কবিই করতেন। সেই সময়কালেই কবি তার জ্যোতিদাদা, স্ত্রী মৃণালিনী দেবী, বড় মেয়ে মাধুরীলতা, ছোট ছেলে শমী ঠাকুর, ভাইপো বলেন্দ্রনাথকে প্ল্যানচেটের মাধ্যমে ডেকে এনেছিলেন।

কিন্তু পরের বছর ২২ ফেব্রুয়ারী মাত্র সাতাশ বছর বয়সে খুবই কমদিনের রোগে ভুগে মারা যান রবি ঠাকুরের প্রিয় ‘মিডিয়াম’উমা। উমার মৃত্যুর সঙ্গেই বিশ্বকবির প্রেত চর্চা শেষ হয়।

ডেইলি বাংলাদেশ/এএ