Alexa রক্ষক যখন ধর্ষক

রক্ষক যখন ধর্ষক

প্রকাশিত: ১৮:০২ ১২ জুলাই ২০১৯  

অাফরোজা পারভীন, কথাশিল্পী, কলাম লেখক, সম্পাদক। জন্ম ৪ ফোব্রুয়ারি ১৯৫৭, নড়াইল। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে অবাধ পদচারণা। ছোটগল্প, উপন্যাস, শিশুতোষ, রম্য, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, গবেষণা ক্ষেত্রে ১০১টি পুস্তক প্রণেতা। বিটিতে প্রচারিত টিয়া সমাচার, ধূসর জীবনের ছবি, গয়নাসহ অনেকগুলি নাটকের নাট্যকার। `অবিনাশী সাঈফ মীজান` প্রামাণ্যচিত্র ও হলিউডে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য `ডিসিসড` চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। রক্তবীজ ওয়েব পোর্টাল www.roktobij.com এর সম্পাদক ও প্রকাশক। অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

উপর্যুপরি ঘটনায় দিশে হারিয়ে ফেলছি যেন। মুক্তি কোথায়? নুসরাত ধর্ষণ ও হত্যা নিয়ে লিখেছিলাম, ‘যোদ্ধা হও মেয়েরা।’  কিন্তু  যোদ্ধা হওয়াই এখন যথেষ্ট নয়। যোদ্ধা হবার জন্য পরিবেশ পরিস্থিতি আর প্রয়োগের স্থান থাকা দরকার। মেয়েরা যোদ্ধা হবে, প্রতিবাদী হবে, আঘাত করতে শিখবে, ঠিক আছে। তারা কুংফু কারাতে শিখে সেগুলোর প্রয়োগ করবে, তাও ঠিক আছে। কিন্তু যে নারীর সে সামর্থ্য নেই। তিনি কী করবেন? যিনি নিজেই ভালো করে চলতে ফিরতে পারেন না, তিনি কী করে যোদ্ধা হবেন, প্রত্যাঘাত করবেন? যে অন্ধ, পঙ্গু, বিকলাঙ্গ, বোধবুদ্ধিহীন নারী যাপিত জীবনের যন্ত্রণায় কাতর, সেকী করে যোদ্ধা হবে?

যে মেয়ে শিশু এখনো সাবালকত্ব পায়নি, পৃথিবীর নোংরামির স্বরূপ সম্পর্কে কিছুই জানে না, সেকী করে যোদ্ধা হবে? যে শিশুর বয়স মাত্র ৭ বছর, যে শিশু এখনো পুতুল খেলে কিংবা এরোপ্লেন দেখে ভাবে, বড় হয়ে পাইলট হবে, সে কী করে যোদ্ধা হবে? যে শিশুকে দুটো চকলেট দিলেই  আহ্লাদিত হয়, যে বোঝে না ধর্ষণ কী, ধর্ষণ কীভাবে হয় সে কীভাবে যোদ্ধা হবে? যে শিশু নিজ ভবনের উপরতলায় বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে উধাও হয়ে যায় আর তারপর তাকে পাওয়া যায় একই ভবনের পরিত্যক্ত একটা রান্নাঘরে ধর্ষণের পর মৃত অবস্থায় সে কী করে যোদ্ধা হবে? 

এ প্রশ্নের কোনো জবাব অন্তত আমার কাছে নেই। এ জবাবও আমার কাছে নেই যে, একশ বছর বয়সের যে বৃদ্ধাকে চৌদ্দ বছরের কিশোর ধর্ষণ করল, কেন করল, কোন বিবেচনায় করল, কোন আনন্দে করল?  সেকী মস্তিষ্ক বিকৃত! লুনাটিক, নাকী শয়তান!

মাত্র দিন কয়েকের মধ্যে কতগুলো ঘটনা ঘটে গেল। মাদারীপুর পৌরসভার টিবি ক্লিনিক সড়কে এক কিশোরীকে ধর্ষণ করে ভেন্টিলেটার দিয়ে নিচে ছুঁড়ে ফেলল পুলিশ কনেসটেবল মোক্তার। ছুঁড়ে ফেলে তার হাড় গোড় ভেঙে দিলো। এর আগে তাকে লাঠিপেটা করল। গর্ভবতী স্ত্রীকে বাড়ি পাঠিয়ে দুদিনও তর সইলো না এই পুলিশ প্রবরের। পুলিশ নাকী জনগণের রক্ষক, ত্রাতা? ত্রাতা যখন ভক্ষকের ভূমিকা নেয় তখন আর বাঁচার জো থাকে না!

ভ্রাতা ভক্ষকের ভূমিকা নেয়ার আরো ঘটনার প্রমাণ পাচ্ছি আমরা প্রতিদিন। নারায়নগঞ্জের ফতুল্লার বাইতুল হুদা ক্যাডেট মাদরাসার ১২ জন ছাত্রীকে ধর্ষণ করেছে অধ্যক্ষ আল আমিন। ধর্ষণের পর তাদের দিয়ে ওয়াদাও করিয়ে নিয়েছে যেন তারা কাউকে না বলে। তার মুঠোফোনে যৌন উত্তেজক এবং মেয়েদের হয়রানি করার নানা আলামত পাওয়া গেছে। সে ব্যক্তি নিজেই স্বীকার করেছে ধর্ষণের কথা।  হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচঙের চৌধুরীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোজাম্মেল হোসেন তার কাছে টিউশন পড়তে আসা ৫ম শ্রেণির ছাত্রীকে যৌন হয়রানি করেছে। ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে আগেও এই ধরণের একাধিক অভিযোগ রয়েছে। তারপরও তিনি স্বপদে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলেও জানা যায়নি। নাটোরের চন্দ্রকোনা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কলেজের ইসলামের ইতিহাসের শিক্ষক আব্দুল জলিলের স্ত্রী তার স্বামীর বিরুদ্ধে উপশহরের একটি বাসায় নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক ছাত্রী ধর্ষণের অভিযোগ তুলেছেন।  ছাত্রীর চিৎকারে রক্তাক্ত অবস্থায় ছাত্রীটিকে উদ্ধার করা হয়। কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে প্রধান শিক্ষক আকবর আলী চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণ করেছে। ধর্ষণের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আগেও ছিল।  মাদারীপুরে শিক্ষক রবিউল কর্তৃক এক ডজন ছাত্রীকে ধর্ষণ, তাদের ভিডিও ধারণ, সেই ভিডিও দেখিয়ে বার বার ধর্ষণ এবং বার বার গর্ভপাত ঘটানোর প্রমাণ মিলেছে।

আগে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল কোচিং বাণিজ্যের। এখনও সেটা আছে। কোচিং বাণিজ্যে অবশ্য শিক্ষকদের সঙ্গে অভিভাবকরাও একটা পার্ট। কারণ ছাত্র না পেলে তো আর কোচিং হয় না। কিন্তু সিস্টেমটাই এমন হয়েছে যে, কোচিং-এ না দিয়ে অভিভাবকরা করবেই বা কী! স্কুল কলেজে তো আগের মতো পড়াশোনা হয় না। 

পরিস্থিতি বিবেচেনায় দেখা যাচ্ছে শিক্ষকদের মধ্যে ধর্ষণ প্রবণতা বাড়ছে। আগে মাদরাসার শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ বেশি ছিল। এখন মাদরাসাই শুধু নয়, সাধারণ স্কুল কলেজ  সর্বত্রই ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। আর এটাও লক্ষণীয়, কো এডুকেশন স্কুল কলেজে সহপাঠীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ না উঠে উঠছে শিক্ষকের বিরুদ্ধে।  পরিবারের পরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একজন মানুষের দ্বিতীয় নিরাপদ আশ্রয়স্থল। শিক্ষকরা শ্রদ্ধেয়জন, অভিভাবক, গুরুজন। সেই অভিভাবকরা এখন লকলকে জিভ আর চোখে লালসা নিয়ে মেয়েদের গিলছে, গিলছে শিশু থেকে বৃদ্ধা পর্যন্ত। গিলেই ক্ষান্ত হচ্ছে না তাদের লালসার শিকারে পরিণত করছে। কেন, কারণ কী? এ ব্যাপারে  শুধু আইনী বিচারই যথেষ্ট নয়, মনঃবিশ্লেষণ বা মনঃসমীক্ষাও দরকার।

স্কুল কলেজে শিক্ষক নিয়োগের সময় তাদের চারিত্রিক সার্টিফিকেট নেয়া হয়।  সেই সার্টিফিকেটই যথার্থ বলে ধরে নেয়া হয়। কিন্তু সার্টিফিকেট তো আজকাল পথে ঘাটে পাওয়া যায়। শিক্ষক নিয়োগের বিশেষ করে মেয়েদের স্কুলে শিক্ষক নিয়োগের সময় শিক্ষকদের চরিত্র যাচাইয়ের জন্য আরো কী ব্যবস্থা নেয়া যায় সেটা সরকারের গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন। আর যে কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে এই জাতীয় অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ামাত্র দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া দরকার। ব্যবস্থা নেয়া হয় না বলেই ধর্ষণ বাড়ছে। 

 শহর, নগর, বন্দর, গ্রাম সর্বত্র চলছে ধর্ষণযজ্ঞ দিনে রাতে । অপরিচিত মানুষের চেয়ে পরিচিত মানুষের দ্বারাই ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে বেশি। কারাগারে পুরুষ কর্তৃক পুরুষ ও নারী কর্তৃক নারী ধর্ষণের মতো ঘটনাও ঘটছে।  যতটা ঘটছে তার অল্পই আমরা জানতে পারছি। লোকলজ্জা, পরনিন্দা, আইন আদালত করার ভয়ে অনেকেই ধর্ষিতা হয়েও চুপ করে থাকছেন। কারণ আমাদের সমাজ ধর্ষিতাকে ভালো চোখে দেখে না। একজন মেয়ে ধর্ষিতা হলে সে অপরাধ না করেই সমাজের চোখে অপরাধী হয়ে যায়। তার আচার-আচরণ, চলা-ফেরা, পোশাক-আশাকে দোষ ক্রুটি ধরা হয়। সমাজে, সংসারে, পরিবারে তার অবস্থান হয় উপেক্ষার, নিন্দার। তাকে বিয়ে দিতে অসুবিধা, লোকসমাজে নিতে অসুবিধা এমন অনেক কারণে ধর্ষণের কথা চেপে যায় পরিবারগুলোও। তাছাড়া ধর্ষণের শিকার ব্যক্তি ধর্ষকের দ্বারা, এবং কোনো কোনো সমাজে ভুক্তভোগীর নিজ পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের দ্বারা সহিংসতার শিকার হন। যেমন হয়েছে নুসরাত। 

ধর্ষণ এমন একটি অপরাধ যার জন্য কঠোরতম শাস্তি হওয়াই বাঞ্ছনীয়।আমাদের দেশে ধর্ষণের শাস্তি ১০ বছরের জেল। আর ধর্ষণের ফলে মৃত্যু হলে মৃত্যুদণ্ড। ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ডই হওয়া উচিত । আর আইনে যাইই থাকুক, প্রশাসনের অবহেলা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক অরাজনৈতিক চাপের কারণে আইন কার্যকর হয় না। 

তাই বলি পুলিশ কী করবে, বিচার  হবে কী হবে না সে ভাবনা নিয়ে তো বসে থাকলে চলবে না মেয়েরা। মেয়েরা, তোমরা সবার আগে  আত্মসমালোচনা করো, লোভ পরিত্যাগ করো, নিজেকে সম্মান করতে শেখো। তোমরা আত্মরক্ষা করতে শেখো, অন্যকে রক্ষা করতে শেখো। সচেতন হও তোমরা। মেয়েরাই মেয়েদের পাশে দাঁড়াও। সজাগ থাকো। শত হাত, আর শত চোখ দিয়ে আগলে রাখো নিজেকে, অন্যদের। অন্ধ-বিকলাঙ্গ- পাগল নারীদের জন্য অবারিত করো মমতা আর ভালবাসার হাত। আপনজনের মতো নজর রাখো তাদের উপর। নিজেকে বাঁচাতে লম্বা নখ রাখো, রাজপুত নারীদের মতো প্রয়োজনে নিজের কোমরে একটা ধাঁরালো অস্ত্র রাখো আর একটা করে অস্ত্র গুঁজে দাও আশপাশের অসমর্থ নারীর  কোমরে । আত্মরক্ষার অধিকার আইন স্বীকৃত। মেয়েরা, তোমরাই  তোমাদের ত্রাতা হও। আত্মশক্তি আর আত্মবিশ্বাসে দীপ্ত হও। শিক্ষক, পুলিশ, প্রশাসন, আইনের লোক যাদের তোমাদের রক্ষা করার কথা, তোমাদের জীবন গড়ে দেবার কথা তারা যখন  নোংরা হাত বাড়াবে তোমাদের দিকে মুচড়ে দাও সে হাত। প্রয়োজনে আরো এগোও। এগোও ঠিক ততটা নিজেকে বাঁচাতে, অন্যকে বাঁচাতে যতটা প্রয়োজন।  

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআ

Best Electronics
Best Electronics