‘রক্তাক্ত উৎসবে’ বলি দিলেই পূরণ হয় মন বাসনা!     

‘রক্তাক্ত উৎসবে’ বলি দিলেই পূরণ হয় মন বাসনা!     

সাদিকা আক্তার  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১২:১৬ ২১ ডিসেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১২:১৯ ২১ ডিসেম্বর ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

‘আমরা চার বোন। একটি ভাইয়ের আশায় বাবা-মা উদগ্রীব ছিল। প্রায় আট বছর আগে ভাইয়ের জন্য কামনা করে গাধিমাই উৎসবে মানত করে পশু বলি দিয়েছিলাম। গাধিমাই দেবী আমাদের নিরাশ করেননি। ভাইয়ের আশা পূরণ করেছেন।’ এমনটিই বলছিলেন প্রিয়াঙ্কা যাদব নামের একজন ভক্ত। যিনি গাধিমাই উৎসবে নিয়মিত যোগ দেন। 

প্রায় ২৫০ বছর ধরে উদযাপিত হচ্ছে এক রক্তাক্ত উৎসব। বিশ্বের সবচেয়ে বড় রক্তাক্ত উৎসব হিসেবে পরিচিত এটি। নৃশংসও বটে, অদ্ভুত এই প্রথার শুরু হয় এক পুরোহিতের কথায়। তিনি না-কি স্বপ্নে দেখেন, শক্তির দেবী গাধিমাই তাকে বলেছেন, কারাগার থেকে তাকে মুক্ত করতে হলে রক্ত ঝরাতে হবে।

এরপর থেকেই লাখ লাখ ভক্ত ভারত ও নেপাল থেকে নেপালের বারিয়ারপুরে গাধিমাই দেবীর মন্দিরে যান। তাদের এই উৎসবে অংশ নেয়া নিজেদের একটি ইচ্ছা পূরণ করার সুযোগের মতো। যদিও প্রাণী অধিকারকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরেই এর বিরুদ্ধে কথা বলছেন। কারণ প্রাণী বলিদান অত্যন্ত নিষ্ঠুর একটি রীতি। 

পশু বলিদাননেপালের ঐতিহ্যবাহী এক অনুষ্ঠান এই গাধিমাই উৎসব। এতে প্রায় ৪ মিলিয়ন মানুষ অংশ নেয়। অংশগ্রহণকারীরা বিশ্বাস করেন, হিন্দু দেবী গধিমাইকে উৎসর্গ করে পশু বলি দিলে সব সমস্যার অবসান ঘটবে এবং সমৃদ্ধি বয়ে আনবে। আন্তর্জাতিক এক গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের তথ্যানুসারে, ২০১৪ সালে দেশটির ধর্মীয় এ পশু বলিদান প্রথা সমাপ্তি ঘোষণা করেছিল প্রাণী দাতব্য সংস্থাগুলো। 

তবে চলতি বছরে আবারো শুরু হয় এই উৎসবটি। ছাগল, ইঁদুর, মুরগি, শূকর আর কবুতর হত্যার মধ্য দিয়ে এ উৎসবটি চলতি বছরের ডিসেম্বরে। উত্সবের পর, প্রাণীদের মাংস, হাড় ও মাথা ভারত এবং নেপালের বিভিন্ন সংস্থাগুলোতে বিক্রি করা হয়।

নেপালের প্রত্যন্ত ওই এলাকা ঘুরে এসে একজন অধিকারকর্মী জানান, সর্বশেষ ২০১৪ সালে এই উৎসবে প্রায় দুই লাখ প্রাণী হত্যা করা হয়েছিল। জাগ্রত এই উৎসবে প্রাণী বলিদান দেয়ার বিরুদ্ধে ২০১৫ সালে হিউম্যান সোসাইটি ইন্টারন্যাশনাল এবং অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার নেটওয়ার্ক নেপাল বিজয় ঘোষণা করে জানায় যে, পশু বলিদান নেপালে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

একটি মহিষের কাটা মাথাতবে বারিয়ারপুর গাধিমাই মন্দিরের চেয়ারম্যান রাম চন্দ্র শাহ অবশ্য বলেন ভিন্ন কথা। তিনি জানান, এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ভক্ত হিন্দুদের অনুরোধ করা যেতে পারে, যেন তারা দেবীর উদ্দেশ্যে পশু বলি না দেন। তবে তাদের এ কাজ থেকে বিরত রাখতে বাধ্য করা যাবে না এবং এই রীতিও পুরোপুরি বন্ধ করা যাবে না। 

এ কাজে নেপাল সরকার কোনো রকম সহায়তা করেনি বলেও জানান উৎসবের চেয়ারম্যান মোতিলাল কুশোয়া। তা সত্ত্বেও নেপালের রাজধানী কাঠমন্ডু থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূরে বারিয়ারপুরের মন্দিরে পশু আনা হয়। ৩ ডিসেম্বর মঙ্গলবার ভোর থেকে ২০০ কসাই তাদের কাজকর্ম শুরুর প্রস্তুতি নেন। এই আয়োজনের মধ্যে রয়েছে বিনামূল্যের খাবার ও তাঁবু। এর পুরোটাই দান থেকে বহন করা হয়ে থাকে।

এই প্রথায় ভক্তদের বিশ্বাস রয়েছে বলেই গাধিমাই উৎসব ২৫০ বছর ধরে চলমান। সবাই তাদের মনবাসনা পূরণ করতে প্রাণী বলিদান দিয়ে থাকে। জাগ্রত এই রক্তাক্ত উৎসবে আসা ভক্তদের মনবাসনা পূরণ করেন গাধিমাই দেবী। এফপিকে বলেন উৎসব আয়োজক কমিটির সদস্য বীরেন্দ্রা প্রাসাদ যাদব।

রক্তাক্ত গাধিমাই উৎসবপ্রায় পাঁচ বছরের কম সময় আগে ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় রক্তাক্ত উৎসব’ বলে পরিচিত। নেপালের ধর্মীয় পশু বলিদান প্রথার সমাপ্তি ঘোষণা করেছিল প্রাণী দাতব্য সংস্থাগুলো। আবারো এই প্রথা শুরু হওয়া সত্ত্বেও প্রাণী অধিকার কর্মীরা এখনো আশা করছেন যে, তাদের বার্তা সবার কাছে পৌঁছে গেছে।

‘অধিকার কর্মীদের দাবিদাওয়ার ফলে সরকারের পাশাপাশি মন্দিরের কমিটিও একটা ধাক্কা খেয়েছে। উৎসবে যতো প্রাণী বলি দেয়া হতো, তার সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে আসছে, ‘বলছেন অ্যানিম্যাল ইকুয়ালিটি ইন্ডিয়ার কর্মকর্তা অমৃতা উবালে।

সূত্র: বিবিসি

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস