Alexa যৌনপল্লীর শতাধিক সন্তানের মা হাজেরা!

যৌনপল্লীর শতাধিক সন্তানের মা হাজেরা!

আখি আক্তার ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:৫২ ৫ ডিসেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৭:০১ ৫ ডিসেম্বর ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

যৌনকর্মীদের নিয়ে গল্প কম বেশি সবারই জানা। কেউ কেউ খুব খারাপ প্রতিক্রিয়াই করে থাকেন তাদের প্রতি। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন এই যৌনকর্মীদের সন্তানদের নিয়ে। তাদের নিয়ে ভেবেছেন হাজেরা বেগম।

২০১০ সালে জুন মাসে ২৫ থেকে ২৬ জন শিশু নিয়ে শুরু হয় হাজেরার যাত্রা। যৌনপল্লীর সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের মা হয়ে তিনি তাদের দায়িত্ব নেন। যৌনপল্লীর শিক্ষাহীন মায়েদের আবদারে তাদের সন্তানদের সুশিক্ষিত করতে তিনি আগ্রহ দেখান। কারণ তিনি চাননি তাদের সন্তানরাও যৌনতার পেশাটি বেছে নিক। যৌনকর্মীদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ যাতে সুন্দর হয়, সেজন্যই তার এই নিঃস্বার্থ চেষ্টা।

হাজেরা বেগমের গল্পটিও ছিল হৃদয় কাঁপানো। সাত বছর বয়সে বাসা থেকে হারিয়ে যান হাজেরা। তার সৎ মা তাকে ঠিকমতো খেতে দিতেন না। তাই একদিন খাবারের জন্য তিনি মিরপুর থেকে একটি দোতলা বাসে ওঠেন। হঠাৎ তিনি বাসে (উপরের তলায়) ঘুমিয়ে পড়েন। তখন বাসটি এসে থামে জিপিও-তে। ঘুম ভেঙ্গে তিনি নিজেকে এক অপরিচিত জায়গায় পান। সে জায়গার কিছুই চিনতেন না। পরিচিত কেউ না থাকায় তিনি টোকাইদের সঙ্গেই থাকা শুরু করেন।

হাজেরা তার সন্তানদের সঙ্গেএভাবেই তিনি টোকাইদের সঙ্গে বড় হতে থাকেন। যখন হাজেরার বয়স দশ বছর, তখন একজন মহিলা তাকে ইংলিশ রোড নামের এক পতিতালয়ে বিক্রি করে দেন। ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি এই যৌনপল্লীতে ভয়ংকর জীবন অতিবাহিত করেন। অবশেষে ১৮ বছর বয়সেই হাজেরা ভবঘুরেদের শিক্ষা কেন্দ্রে লেখাপড়া শিখেন। ১৯৯০ সাল থেকেই এই জঘন্যতম পেশাটি ছেড়ে দেন হাজেরা। এরপর তিনি এনজিও ছাড়াও অন্যান্য কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।

তখন থেকেই হাজেরার মনে যৌনকর্মীদের অসহায় বাচ্চাদের জন্য তার কিছু করার আশা জাগে। হাজেরার যা ইনকাম ছিল তাতে তার নিজের খরচ চলেও বেশ কিছু টাকা ব্যাংকে রাখতে পারতেন। অবশেষে তার জমানো নয় লাখ টাকা দিয়ে তিনি যৌনকর্মীদের সন্তানদের জন্য একটি সেল্টার প্রতিষ্ঠা করেন। যার নাম দেন 'শিশুদের জন্য আমরা'।

তিনি ভাবেন, বাচ্চা পাশে থাকাকালীন মা যখন যৌন কর্মে লিপ্ত থাকেন, তখন সন্তানও তা শিখে যায়। যৌনকর্মীর ছেলে সন্তানগুলো হয় টোকাই। রাস্তায় ঘুরে ঘুরে দিন কাটায়। সব থেকে কষ্টের যে বিষয়টি তা হলো, যৌনকর্মীর মেয়ে সন্তানটি মায়ের জন্য কনডম কিনে রাখে। আর এই বিষয়টি হাজেরাকে বেশি নাড়া দেয়।

যৌনকর্মীর সন্তানদের আশ্রয়কেন্দ্র ব্যাপারটা কতোটা ভয়ানক। মেয়ে বাচ্চাটি জানে যে তার মা কি কাজ করে এবং সেজন্যই তার এই কনডম কিনে রাখা। চিন্তা করে দেখেন, তাহলে সেই বাচ্চাটির ভবিষ্যৎ কি হতে পারে!

হাজেরার এই সৎ কাজে অনেক এনজিও এবং দাতারা সাহায্যের হাত বাড়ান। তাদের সহায়তায় এসব বাচ্চাদের লালন পালন করছেন হাজেরা।

এসব শিশুদের স্কুলে ভর্তি করাতে খুব অসুবিধা পোহাতে হয়। তাই হাজেরা বেসরকারি যে স্কুলগুলো আছে যেমন- সুরভী, ব্র্যাক এসব স্কুলগুলোতে বাচ্চাদের ভর্তি করাতেন। একটা সময় যখন বাচ্চাগুলো প্রাথমিক শিক্ষা (৫ম শ্রেণি) অর্জন করেন, তখন বিভিন্ন স্কুল থেকে এসে হাজেরার কাছ থেকে বাচ্চাদের তাদের স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য অনুরোধ করেন। হাজেরা তখন তাদের এই বিষয়টি সবার আগে জানান যে, এই বাচ্চাগুলো যৌনকর্মীদের। কিন্তু প্রতি উত্তর ছিল হৃদয় ছোঁয়া- 'বিদ্যার দরকার ওরা বিদ্যা নিবে। কার বাবা কি কাজ করে, কে ভিখারির ছেলে, কে যৌনকর্মীর ছেলে- আমাদের জানার দরকার নেই।'

বর্তমানে ৫০ জন শিশু হাজেরার তত্ত্বাবধানে আছে। এই শিশুগুলো শুধু বাংলা শিক্ষাই নয়, পাশাপাশি আরবি শিক্ষায়ও শিক্ষিত হয়ে উঠছে। এই বাচ্চাদের বাসায় যাওয়া নিষেধ। প্রতিষ্ঠানেই তারা লেখাপড়া, খাওয়া , ঘুম, খেলা সবই করে। মোট কথা তাদের বেড়ে ওঠাই এই প্রতিষ্ঠানে। তবে বাচ্চাদের মায়েরা মাঝে মধ্যে এসে তাদের সন্তানদের সঙ্গে দেখা করে যেতে পারেন।

পরম স্নেহে সন্তানদের ভাত খাওাচ্ছেন মা হাজেরা গত নয় বছরে কয়েক'শ বাচ্চাকে পড়ালেখা ও হাতের কাজ শিখিয়েছেন হাজেরা। বড় হয়ে এদের মধ্যে অনেকেই ড্রাইভিং করে। আবার অনেকেই বৈদ্যুতিক কাজ করে। এসব কাজ করেই তারা তাদের বয়স্ক মায়েদের সহায়তা করে।

হাজেরার আশ্রয়ে থাকা শিশুরা তাকেই মা বলে পরিচয় দেয়। হাজেরার এখন ভালো লাগার সীমা নেই। সে কখনো ভাবেনি যে, সে এতো বাচ্চার মা হবে। এতো সন্তানদের খারাপ ভবিষ্যৎ এখন ভালোর পথে। হাজেরার নিজের কোনো সন্তান নেই। এই সন্তানগুলোই এসে তার পায়ের কাছে বসে থাকে। পরম ভালোবাসায় তাকে মা বলে ডাকে।

বাচ্চাগুলোই তাকে পরম স্নেহে বলে, 'মা একটু আদর করে দুই নলা ভাত খাইয়ে দাওগো মা। অনেক দিন তোমার হাতে ভাত খাই না।'  

একজন মায়ের জন্য এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কিছুই হতে পারে না। হাজেরা একজন সফল মা। অনেক অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়া সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করেছেন এই মা। তাইতো মায়ের তুলনা আর কারো সঙ্গেই করা সম্ভব হয় না।

ডেইলি বাংলাদেশ/এএ