Alexa যে সমীকরণে ভারতের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ

যে সমীকরণে ভারতের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৬:২৭ ২৩ জুন ২০১৯  

কবি হিসেবেই পরিচিতি অমিত গোস্বামীর। তবে উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও বেশ সুনাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এই লেখকের। পেশায় সাংবাদিক। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই ভারতে। তবে বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে বিশেষ টান। বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে উপন্যাস লিখে এরইমধ্যে সাড়া ফেলেছেন।

ক্রিকেট বিশ্বকাপের বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচটি আগামী ২ জুলাই ইংল্যান্ডের এজবাসটনে হতে চলেছে। 

এখন অবধি লীগ টেবিলের যা অবস্থা তাতে শীর্ষে আছে নিউজিল্যান্ড ৬ ম্যাচ খেলে ১১ পয়েন্ট, দ্বিতীয় স্থানে অস্ট্রেলিয়া ৬ ম্যাচ খেলে ১০ পয়েন্ট, তৃতীয় স্থানে ভারত ৫ ম্যাচ খেলে ৯ পয়েন্ট, চতুর্থ স্থানে ইংল্যান্ড ৬ ম্যাচ খেলে ৮ পয়েন্ট। বাংলাদেশ আছে ৬ ম্যাচ খেলে ৫ পয়েন্ট। বাংলাদেশের ম্যাচ বাকি আফগানিস্তান, ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে। ভারতের বাকি ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইংল্যান্ড, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে। লীগ টেবিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী বড় কিছু অঘটন না ঘটলে প্রথম তিনটি দল আর একটি বা দুটি ম্যাচ জিতলেই চলে যাবে সেমিফাইনালে। লড়াই যা হবে সেটা চতুর্থ স্থানের জন্যে। সেই জায়গার জন্যে লড়ছে মূলত চারটি দেশ ইংল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান। ইংল্যান্ডের সামনে তিনটি খেলা অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও নিউজিল্যান্ড। তিনটেই বড় গাঁট। তবে একটি জিতলে তারা পৌঁছবে দশ পয়েন্টে। খুব ভাল না খেললে তাদের সম্ভাবনা কম। শ্রীলংকার বাকি দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ভারত। এর দুটি জিতলে তারা পৌঁছে যাবে দশ পয়েন্টে।

পাকিস্তানের যদিও ৩ পয়েন্ট এবং চারটি খেলা বাকি কিন্তু তাদের সম্ভাবনা কম কারণ তাদের খেলতে হবে দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এবং সব ম্যাচ জিততে হবে। তাহলে পয়েন্ট হবে ১১। তবেই সেমিফাইনাল। যদি এখন অবধি পারফরম্যান্স বিচার করা যায় তাহলে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে হারানো উচিত তাদের। ভারতের সঙ্গে তারা সমানে টক্কর দেয়ার অধিকারী। তারা যদি নিয়মিত খুচরো রান তুলতে পারে এই দুই আফগানিস্তান ও পাকিস্তান ম্যাচ তাদের জেতা উচিত। ভারতকে হারাতে হলে তাদের প্রথম থেকে মারতে হবে। নাতুবা ভারতের ছন্দ নষ্ট করা কঠিন। লিটন দাসকে শুধু আগে পাঠাক বাংলাদেশ। তাদের আগামী তিনটি ম্যাচই জিততে হবে সেমিফাইনালে যেতে হলে। জিতলে পয়েন্ট হবে ১১ । এ তো গেল কী করলে কী হবে’র গল্প। কিন্তু দেখা যাক কীভাবে হবে।

বাংলাদেশ একদিনের ক্রিকেট বিশ্বকাপে বেশ কয়েকটি অঘটন ঘটিয়েছে। ১৯৯৯ সালের পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে ৩১ মে নর্দহ্যাম্পটনে আগে ব্যাট করে বাংলাদেশ করেছিল ২২৩ রান। পাকিস্তান অপ্রত্যাশিতভাবে গুটিয়ে যায় ১৬১ রানে। টেস্ট খেলা প্রথম কোনো দলের বিপক্ষে সেটিই ছিল টাইগারদের প্রথম জয়।  ২০০৭ বিশ্বকাপের সুপার এইটে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৬৭ রানে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। ৭ এপ্রিল গায়ানাতে আগে ব্যাট করে বাংলাদেশ ২৫২ রান করে । ২৫৩ রানের টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে দক্ষিণ আফ্রিকা বাংলাদেশের বোলিং ঘূর্ণিতে ১৮৫ রানে অলআউট হয়ে যায়। ২০০৭ সালের ১৬ মার্চ পোর্ট অব স্পেনে রাহুল দাব্রিড়ের ভারত গুটিয়ে যায় ১৯১ রানে। তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম এবং সাকিব আল হাসানের হাফ সেঞ্চুরিতে পাঁচ উইকেট হাতে রেখেই ঐতিহাসিক জয় তুলে নেয় টাইগাররা। ২০১২ এশিয়া কাপে প্রথম ধারাবাহিকতা দেখিয়েছিল বাংলাদেশ। সেবার এশিয়া কাপে ভারত এবং শ্রীলংকাকে পেছনে ফেলে পাকিস্তানের সঙ্গে ফাইনাল খেলে বাংলাদেশ। ফাইনালে ২ রানে পরাজয়ের পর সাকিব-তামিমদের কান্না আজও দেশের মানুষদের কষ্ট দেয়।

তারপরে এল সেই ম্যাচ। ১৯ মার্চ, ২০১৫ মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালের ভারত বনাম বাংলাদেশ। একটি নো বল নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত। ৯৯ রানে ব্যাট করছিলেন রোহিত শর্মা। বল হাতে বাংলাদেশি পেস বোলার রুবেল হোসেন। ফুলটস বলে মিড উইকেটে ক্যাচ দিয়ে ২২ গজ ছাড়ছিলেন রোহিত। হঠাৎ আম্পায়ার আলিন দারের কল, নো বল। তারপর ২৭ বলে ৪৫ রানের রোহিত ঝড়ে বাংলাদেশের কাছে পাহাড় সমান রানের লক্ষ্য রাখে ভারত। জবাবে ব্যাট করতে নেমে ১৯৩ রানে অল আউট হয়ে ১০৫ রানে ম্যাচ হারে বাংলাদেশ। এই হার মেনে নিতে না পেরে কার্যত আম্পায়ারিংকেই দোষারোপ করে বাংলাদেশ ক্যাপ্টেন মোর্তাজা। এমনকি আইসিসি প্রেসিডেন্ট মুস্তফা কামালও তেতে ওঠেন। শুরু হয় বাক যুদ্ধ। আইসিসির চেয়ারম্যান শ্রীনিবাসনের সাথে তর্কে লিপ্ত হয়ে পড়েন আইসিসির সভাপতি মুস্তফা কামাল। এই বিতর্কের রেশেই আইসিসির নিয়ম লঙ্ঘন করে সভাপতিকে বাদ দিয়ে জোরপূর্বক বিশ্বকাপের ফাইনালে বিজয়ীদের হাতে ট্রফি তুলে দেন চেয়ারম্যান শ্রীনিবাসন নিজেই। অপমানিত হয়ে বিশ্বকাপের পরপরই আইসিসি সভাপতির পদ হতে সরে দাঁড়ান মুস্তফা কামাল। সেই হার আজও বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে দগদগে ক্ষত’র মত বিরাজ করে। এক্ষেত্রে অবশ্যই বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের একটা দায় থেকেই যাবে। কারন ডিআরএস পদ্ধতির বিরোধিতা করেছিল ভারত। সায় দিয়েছিল বাংলাদেশ। এই পদ্ধতি চালু হয়ে গেলে এই বিতর্ক উঠত না। এবারের বিশ্বকাপে এই পদ্ধতি লাগু হয়ে গেছে।

সাম্প্রতিক অতীতে গত বছর ২৮ সেপ্টেম্বর এশিয়া কাপ ফাইনালে ভারত ও বাংলাদেশ মুখোমুখি হয়েছিল। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়েও ৩ উইকেটে হেরে যায় বাংলাদেশ। লিটন দাসের  অসাধারণ সেঞ্চুরির ওপর ভর করে বাংলাদেশ গড়েছিল ২২২ রান। উদ্বোধনীতে তরুণ অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজকে সঙ্গে নিয়ে দলকে বড় সংগ্রহের পথ দেখালেও শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। দলের ইনিংস খুব একটা বড় না হলেও লিটন দাসের সঙ্গে উদ্বোধনীতে দারুণ একটি পার্টনারশিপ গড়েন মিরাজ। দুজনে মিলে করেন ১২০ রানের জুটি।এর পর মিরাজ ৩৬ রানের একটা ইনিংস খেলে সাজঘরে ফেরেন। অবশ্য এর পরই বাংলাদেশের ইনিংসে ধস নামে, দ্রুত সাজঘরে ফিরেন ইমরুল কায়েস (২), মুশফিকুর রহিম (৫) ও মোহাম্মদ মিঠুন (২)। তবে এক পাশ আগলে রেখেছিলেন লিটন, পরে তিনি ১১৭ বলে ১২১ রান করে আম্পায়ারের এক বিতর্কিত সিদ্ধান্তে আউট হন। তাঁর এই ইনিংসে ১২টি চার ও দুটি ছক্কার মার ছিল। পরে মাহমুদউল্লাহ (৪) ও মাশরাফি (৭) দ্রুত ফিরে যান। শেষ দিকে নেমে সৌম্য সরকার ৪৫ বলে ৩৩ রান কিছুটা চেষ্টা করলেও, দলের সংগ্রহটা খুব একটা বড় জায়গায় নিতে পারেন নি। কুলদীপ যাদব ৪৫ রানে তিনটি এবং কেদার যাদব ৪১ রানে দুই উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের বড় সংগ্রহের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ান।

এরপরে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে শুরুতেই ভারতের ইনিংসে ধাক্কা লাগে। শিখর ধাওয়ান (১৫) ও আম্বাতি রাইডু (২) দ্রুত ফিরে যান সাজঘরে। পরে অবশ্য রোহিত শর্মার দৃঢ়তায় শুরুর ধাক্কা সামলায় তারা। ভারতীয় অধিনায়ক ৫৫ বলে ৪৮ রান করে আউট হন পেসার রুবেল হোসেনের বলে। এর পর মহেন্দ্র সিং ধোনি ৩৬, দিনেশ কার্তিক ৩৭, কেদার যাদব ২৩, রবিন্দ্র জাদেজা ২৩ ও ভুবনেশ্বর কুমার ২১ রান করেন। দুই পেসার মুস্তাফিজুর রহমান ও রুবেল হোসেন দুটি করে উইকেট নেন। একটি করে উইকেট নেন মাশরাফি বিন মুর্তজা, নাজমুল ইসরাম অপু ও মাহমুদউল্লাহ।

এবারের বিশ্বকাপে ভারত সেই তুলনায় সংহত দল। কাগজে কলমে সব বিভাগে বিশ্বসেরা। কিন্তু এমন দলকেও টুর্ণামেন্টে সবচেয়ে নীচের দল আফগানিস্তান গতকাল কাঁদিয়ে ছেড়েছে। কারন একটাই। অসাধারণ নিয়ন্ত্রিত বোলিং। ভারতের সাথে টক্কর দিতে হলে বাংলাদেশকে আবেগে ভাসলে চলবে না। ভারত যে ক্রিকেটে তাদের চেয়ে কয়েক যোজন এগিয়ে আছে সেটা স্বীকার করে নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। কী পরিকল্পনা তারা করবেন সেটা তাদের পেশাদার স্ট্র্যাটেজিস্ট, কোচ, ক্যাপ্টেন ঠিক করবেন। কিন্তু মূল উদ্দেশ্য থাকবে ভারতের ছন্দ নষ্ট করা। এটা করতে গেলে ব্যাটিংয়ে অনেক বেশি আক্রমনাত্মক হতে হবে তাদের। সাকিব আল হাসান দুরন্ত ফর্মে আছেন। লিটন দাসও। এদের আগে ব্যাট করার সুযোগ দিতে হবে। ভারতীয় বোলিং মার খেলেও কিন্তু ভেঙে পড়ে না। কাজেই রক্ষনাত্মক হলেই মুশকিল। আর বোলিংয়ের সময় স্রেফ স্টাম্প টু স্টাম্প বল করে যাও। যাতে মারার সুযোগ না পায়। একবার মারতে দিলে কিন্তু ভারত দুরমুশ চালিয়ে দেবে। ভয় নয়, হারানোর কিছু নেই ভেবে পজিটিভ ক্রিকেট খেলতে হবে বাংলাদেশকে। তাহলেই কার্যসিদ্ধি হতে পারে তাদের।

বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমী মানুষকে এই ম্যাচে বুঝতে হবে যে এটা নিতান্তই খেলা। যুদ্ধ নয়। এক পক্ষ হারবে। অন্যজন জিতবে। কাজেই নিজের ওপরে চাপ নিয়ে শরীর খারাপ করে ভারতীয় বন্ধুদের গালি দিয়ে সোশাল সাইট ভরাবেন না। নিজের দেশের বা প্রতিপক্ষ দেশের খেলোয়াড়দের গালির বন্যায় ভাসাবেন না। জাস্ট এনজয় দ্য গেম। বাঙালি শার্দুল বাহিনী জয় ছিনিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর হয়েই মাঠে নামবেন। তারপরেরটা দক্ষতার প্রদর্শনী। অনেক কিছুই হতে পারে। ভুলে যাবেন না ক্রিকেট মহান অনিশ্চয়তার খেলা। তাই সে এত সুন্দর।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর