যে মজার ঘটনা থেকে ওভেনের সূত্রপাত

যে মজার ঘটনা থেকে ওভেনের সূত্রপাত

অনন্যা চৈ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৩:২২ ১০ এপ্রিল ২০১৯  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করে দিয়েছে বিজ্ঞান। শুধু বৃহৎ গবেষণা থেকেই নয় অনেক সময় তুচ্ছ কোনো ঘটনা বা পাগলামী থেকেও আবিষ্কার হয়েছে নিত্যদিনের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জিনিস। বলা যাক ওভেনের কথা। রান্না ঘরের কোণায় থাকা বহুল ব্যবহৃত এ যন্ত্রটি মানুষের জীবনকে কতটা স্বস্তি দেয় তা সবারই জানা। কিন্তু এত গুরুত্বপূর্ণ এ যন্ত্রটির আবিষ্কার কীভাবে তা হয়তো বেশির ভাগ লোকেরই অজানা। অথচ এর সূত্রপাত হয়েছে মজার কোনো এক ঘটনা থেকে। চুলন জেনে নেয়া যাক সেই ঘটনা কী?

পার্সি স্পেন্সার নামের একজন ভদ্রলোক ল্যাবে বসে কাজ করছিলেন ম্যাগনেট্রন নিয়ে। তখন সময় ১৯৪৫ সাল। তিনি হাই-ফ্রিকোয়েন্সির মাইক্রোওয়েভ উৎপন্ন করার কাজ করছিলেন। সে ভদ্রলোকটির কোন প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রী ছিল না, তবে তিনি নিজেকে বিজ্ঞানী বলে দাবি করতেন। সে হিসেবে তিনি পরিশ্রমও করে যাচ্ছিলেন। এরপর সেই লোকটি যা করলেন, তা শুনলে বিস্মিত হবেন অনেকে। সেদিন তিনি কিছু চকলেট নিয়ে এসেছিলেন পকেটে পুরে, কাজের ফাঁকে খাবেন বলে।

একসময় তিনি কাজে বেশ মনোনিবেশ করলেন। ঠিক পরোক্ষণে তিনি টের পেলেন, তার প্যান্টের পকেট গরম হয়ে উঠছে। তিনি আরো খানিকবাদে বুঝতে পারলেন, চকলেটগুলো গলে তার প্যান্টটি একাকার হয়ে উঠেছে। এরপর তিনি কাজ বাদ দিয়ে সেদিকে মনোনিবেশ করলেন। হয়ত এমনকিছু অন্য কারো সঙ্গে ঘটলে রাগে গজগজ করতে করতে প্যান্ট পরিষ্কারে লেগে যেতেন।

যাইহোক, লোকটি তা করেননি। তার পুরো ভাবনা তখন চকলেট আর প্যান্ট নিয়ে। পার্সি স্পেন্সার (সে ভদ্র লোকটি) মূলত অনুসন্ধিৎসু মনের অধিকারী ছিলেন। তিনি ভাবতে শুরু করলেন, কেন চকলেট গলে পড়লো? এমন কিছু কি আছে যা চকলেট গলিয়ে ফেলল? তিনি এ নিয়ে ভাবতে ভাবতে বাইরে থেকে কিছু পপকর্ণ নিয়ে এলেন, রেখে দিলেন ম্যাগনেট্রনের সামনে। এরপর শুরু হল তা নিয়ে গবেষণা। একসময় গবেষক স্পেন্সারকে তাক লাগিয়ে ফটফট করে ফুটতে শুরু করলো পপকর্ণ।

এরপর জন্ম হলো নতুন এক যন্ত্রের, তার এ গবেষণায় বেরিয়ে আসলো মাইক্রোওয়েভ ওভেন। সেদিন হয়ত তিনি এসবে না ভাবলে এ যন্ত্রটির আবিষ্কার হতো না। অন্য কেউ হলে কি করতেন, একবার ভেবে দেখুন। কিন্তু স্পেন্সার তা না করে এর একটি ফলাফলের আশায় ছিলেন।

স্পেন্সারের জন্ম ১৮৯৪ সালের ৯ জুলাই। ব্রিটিশ এ ভদ্রলোকের মূলত প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা ছিল না, যা আমার লেখার আগেই বলেছি। অথচ, তিনি ছিলেন ওই সময়কার সেরা ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের একজন। অগ্রজ সেই ব্যক্তি তার পরদিন আবার একটি ডিম নিয়ে এলেন অফিসে। এটাও তিনি গবেষণার জন্য নিয়ে এসেছিলেন। আরেকটি কারণ ছিল অবশ্য। তার এ আবিষ্কার অফিসের একজন বিশ্বাসই করতে চাচ্ছিলেন না। তিনি পরদিন অবিশ্বাসী সহকর্মীর সামনে ডিমটি রাখলেন। ম্যাগনেট্রনের সামনে রাখতেই তা ফেটে সহকর্মীর মুখে গিয়ে ছিটকে পড়লো। পার্সি স্পেন্সারের আর কোনো সন্দেহ রইলো না, তিনি নিশ্চিত হলেন হাই-ফ্রিকোয়েন্সির মাইক্রোওয়েভ দিয়ে খাবার গরম করা সম্ভব এবং তা অতি অল্প সময়ে করা যাবে।

ওই সময় রেথন কোম্পানিতে পার্সি কাজ করতেন। তারা দেরি না করে দ্রুত এ আবিষ্কারের পেটেন্ট করিয়ে নিল, নাম দিল ‘রাডা রেঞ্জ (Rada Range)’। ঠিক তার দু’বছর পর ওই কোম্পানি বাণিজ্যিকভাবে বাজারে নিয়ে এল প্রথম মাইক্রোওয়েভ ওভেন, যার ভর ছিল সাড়ে সাতশ পাউন্ড। আর উচ্চতা ছিল আস্ত একজন মানুষের মত (৬ ফুট)। দামটাও তখনকার জন্য অনেক ছিল, পাঁচ হাজার ডলার। বর্তমান বাজারে তা প্রায় পঞ্চাশ হাজার ডলারের মতো। আরো বিস্ময়কর ছিল যে, ওই সময় ওভেন চালু করলে প্রায় কুড়ি মিনিট লাগতো কর্মক্ষম করতে, তারপর রান্না করা যেত আর গরম করা যেত। তবে ওভেন গরম হলে আলু সিদ্ধ হয়ে যেত মাত্র ত্রিশ সেকেন্ডে। 

তবে এটা সত্য যে, বর্তমানের অনেক দামী ওভেনের চেয়েও কর্মদক্ষতা বেশি ছিল সে যুগের মাইক্রোওয়েভ ওভেনের। অনেক বেশি স্থায়ী ছিল সেই ওভেন। কিন্তু কোম্পানির অদূরদর্শিতা ও অবহেলায় এ প্রযুক্তি একসময় হারিয়ে যায়। মাত্রাতিরিক্ত ক্রয়মূল্য, নতুন প্রযুক্তির প্রতি দ্বিধায় আর এগোনো মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।

এদিকে, ষাটের দশকে এসে শার্প বৃহৎ পরিসরে মাইক্রোওয়েভ ওভেন বাজারজাত করে। পরবর্তীতে রেথন একটি হোম এপ্লায়েন্স কোম্পানিকে কিনে নিয়ে বাসায় ব্যবহারের উপযুক্ত মাইক্রোওয়েভ ওভেন বাজারে নিয়ে আসে। যেগুলোর মূল্য ছিল আগের সেই ওভেনের তুলনায় অনেক কম। তাই মানুষ আস্তে আস্তে সে সব ওভেন গ্রহণ করতে শুরু করে আর দ্রুত রান্না করার কাজে ব্যবহার করে। 

আর এ ওভেন বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ বাড়িতেই মাইক্রোওয়েভ ওভেন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। হয়ত পার্সি স্পেন্সার যদি সেদিন চকলেট নিয়ে না আসতেন, আর সেটি মাইক্রোওয়েভ সোর্স ম্যাগনেট্রনের সামনে না রাখা হতো তাহলে আজ হয়তোবা এত দ্রুতগতির রকমারি খাবার রান্নার যন্ত্র আমরা পেতাম না। তাই ছোটখাট বিষয়কে এড়িয়ে যেতে নেই, কারণ এর দ্বারা বড় কিছু উদ্ভাবন হতে পারে!

ডেইলি বাংলাদেশ/এসআই