Alexa যে পরিণতি হয়েছিল হুসাইন (রা.) এর হত্যাকারীদের 

যে পরিণতি হয়েছিল হুসাইন (রা.) এর হত্যাকারীদের 

শহীদুল ইসলাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৯:২৪ ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯  

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

ইসলামের ইতিহাসে কালো এক অধ্যায় হজরত হুসাইন (রা.) এর শাহাদাতের ঘটনা। এর আগে হজরত উসমান (রা.) এর শাহাদাতের ঘটনা ছাড়া এমন মর্মান্তিক কোনো ঘটনা ইসলামি জাহানে ঘটেনি। 

প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে আছির আল জাযারি ‘কামেল ফিত তারিখ’ গ্রন্থে তাতারিদের নির্মমতার বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখেন ‘আমি বহুদিন ভেবেছি এ মর্মান্তিক ইতিহাস লেখব কিনা। অবশেষে সিদ্ধান্ত নিয়েছি না লেখার মাঝে কোনো ফায়দা নেই। তাই এ বিষয়ে কলম ধরেছি।’ 
হয়তো হজরত হুসাইন (রা.) এর শাহাদাতের ইতিহাস লেখার বেলায়ও ঐতিহাসিকরা   দ্বিধাদ্বন্ধে ভুগেছেন, ইসলামের কলংকজনক এই অধ্যায় লেখব কিনা। আগামী প্রজন্মের শিক্ষাগ্রহণের চিন্তায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে লেখার।

হজরত হুসাইন (রা.) এর সফর নিয়ে ঐতিহাসিকরা নানা মত দিয়েছেন। বিষয় হচ্ছে ওই পরিস্থিতিতে হজরত হুসাইন (রা.) এর কূফায় যাওয়া উচিত হয়েছিল কিনা। কারণ হজরত ইবনে ওমর, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস-সহ (রা.) অনেক সাহাবি তাকে যেতে নিষেধ করেন। তারপরও তিনি কূফায় যাত্রা করেন। এ ব্যাপারে ইবনে তাইমিয়া (রহ.) এর আলোচনা তুলে ধরার প্রয়োজন মনে করছি। 

কারণ তার বক্তব্যটি হচ্ছে এ ব্যাপারে সবচেয়ে সুন্দর ও চমৎকার। তিনি লেখেন ‘হজরত হুসাইন (রা.) এর কূফায় সফরে জাগতিক বা দ্বীনি কোনো ফায়দায় নিহিত ছিল না। বরং ওই সফরের এক পর্যায়ে জালেমরা রাসূল (সা.) এর দৌহিত্রের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে এবং মাজলুম অবস্থায় নির্মমভাবে তাকে শহীদ করে। হজরত হুসাইন (রা.) এর যাত্রা ও পরবর্তীতে তাকে হত্যার দ্বারা ফেতনার যে দ্বার উম্মোচিত হয়েছিল তিনি বসে থাকলে তা হয়তো হত না। কারণ তার যা উদ্দেশ্য ছিল তা হাসিল হয়নি। উদ্দেশ্য ছিল মানুষের কল্যাণ সাধন ও জুলুম অন্যায়ের পথকে বন্ধ করা। বরং তাকে হত্যার দ্বারা কল্যাণের ধারা বন্ধ হয়েছে এবং খারাপের পথ আরও সুগম হয়েছে। 

হজরত উসমান (রা.)-কে হত্যা করার দ্বারা যেমন মুসলিম উম্মাহ গভীর ফেতনায় নিমজ্জিত হয়েছিল এখানেও তাই হলো।’ তারপর তিনি আরো লেখেন ‘হজরত হুসাইন (রা.) এর ব্যাপারে মুসলমানদের মাঝে তিন ভাগ। একদল বলে তাকে হত্যা করা ন্যায়সঙ্গত ছিল। কারণ তিনি উম্মাহের ঐক্যে ফাটল ধরাতে চেয়েছেন। একদল বলে তিনি হচ্ছেন ইমাম, যার আনুগত্য করা সকলের ওপর ওয়াজিব ছিল। আদর্শ মত হচ্ছে আহলে সুন্নত যা বলে। তাদের কথা হলো ‘তিনি মজলুম অবস্থায় শাহাদাত বরণ করেছেন। তিনি উম্মাহর খলিফা বা ইমাম ছিলেন না।’ (আলী মুহাম্মাদ সাল্লাবী, তারিখুল ইসলাম, খন্ড-১, পৃষ্ঠা-৩৮৮) প্রখ্যাত তাবেয়ী সাইদ ইবনে মুসায়্যিব (রহ.) বলেন, ‘হজরত হুসাইন (রা.) কূফায় যাত্রা না করলে ভাল হত। কিন্তু আল্লাহ তায়ালার ফয়সালা ছিল তা যা তিনি তার রাসূলের মাধ্যমে উম্মতকে জানিয়েছেন।’ (শামসুদ্দিন জাহাবি, সিয়ারু আলামিল নুবালা) 

আরব বিশ্বের প্রখ্যাত গবেষক আল্লামা খিজির বেগ বলেন ‘কূফাবাসীদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সেখানে যাওয়া, না যাওয়া ছিল ইজতেহাদি বিষয়। অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম ইজতেহাদ করে এ বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পেরেছেন। আর হজরত হুসাইন (রা.) ইজতেহাদ করেছেন। কিন্তু তিনি সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেননি। হাদিস দ্বারা প্রমাণিত ইজতেহাদে ভুল হলে গোনাহ নেই বরং সওয়াবের বিষয়।’ (আলী মুহাম্মাদ সাল্লাবী, তারিখুল ইসলাম, খন্ড-১, পৃষ্ঠা-৩৬৯) মোটকথা হচ্ছে ওই পরিস্থিতিতে হজরত হুসাইন (রা.) কূফার উদ্দেশ্যে বের হওয়াটা ছিল ইজতিহাদ। তাই এখানে তার সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা করা ঠিক হবে না।

কূফা নগরির গাদ্দারির ব্যাপারে মুসলিম বিশ্ব পরিচিত ছিল। কূফাবাসীর গাদ্দারি এখন প্রবাদ বাক্যে পরিণত হয়েছে। বলা হয় ‘আল কূফী লা ইউফি’ অর্থাৎ কূফাবাসী কখনো ওয়াদা রক্ষা করে না। হজরত হুসাইন (রা.)-কে নসিহত করতে গিয়ে হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছিলেন ‘কূফাবাসী গাদ্দারের দল। অতএব, আপনি ওদের কাছে যাবেন না। আপনি হেজাজে অবস্থান করুন। কারণ আপনি আরবের সর্দার।’ যাই হোক হজরত হুসাইন (রা.) নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে পরিবারসহ রওয়ানা হলেন। উবাইদুল্লাহ ইবনে জিয়াদ হজরত হুসাইনকে প্রতিহত করার জন্য আমর ইবনে সাদকে দায়িত্ব দেয়। সে এ ব্যাপারে ওজর পেশ করে কিন্তু উবাইদুল্লাহ তার উজর কবুল করেনি। তখন আমর ইবনে সাদ বাহিনী নিয়ে হুসাইন (রা.) এর মোকাবিলা করে। ইতোমধ্যে হজরত মুসলিম ইবনে আকিলকে মর্মান্তিকভাবে শহীদ করা এবং উবাইদুল্লাহ ইবনে জিয়াদের কারণে কূফাবাসীর গাদ্দারির সংবাদ হুসাইন (রা.) এর কাছে পৌঁছেছিল। তাই তিনি নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেন। তিনি প্রতিপক্ষের কাছে তিনটি প্রস্তাব দেন। হয়তো ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার কাছে আমাকে নিয়ে চলো আমি তার হাতে বাইয়াত হব। কিংবা আমাকে মদীনায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হোক। তৃতীয় প্রস্তাব ছিল কোনো প্রত্যন্ত সীমান্ত এলাকায় আমাকে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হোক। আমর ইবনে সাদ পত্র মারফতে উবাইদুল্লাহ ইবনে জিয়াদকে এ ব্যাপারে অবহিত করেন। উবাইদুল্লাহ ইবনে জিয়াদ তা প্রত্যাখ্যান করে স্বয়ং ওর হাতে বাইয়াত হওয়ার জন্য বলে। উবাইদুল্লাহর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পেছনে উস্কানি দিয়েছিল সীমার। হজরত হুসাইন সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এবং দুপক্ষের মাঝে যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধ ছিল অসম। হজরত হুসাইন (রা.) শাহাদাতের পেয়ালা পান করেন।

হজরত হুসাইন (রা.)-কে তার পরিবারসহ খুবই মর্মান্তিকভাবে শহীদ করা হয়। এর অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে মুসলিম বিশ্বে ‘মুখতার’ ঝড় বয়ে যায়। তার পুরো নাম হচ্ছে মুখতার ইবনে আবু উবাইদ ছাকাফী। ৬৬ হিজরিতে তার উত্থান শুরু হয়। ৬৭ হিজরিতে মুসআব ইবনে জুবাইরের হাতে নিহত হয়। মুখতার ছাকাফি নিজেকে কূফার গভর্নর দাবী করে। এবং বলে যে, মুহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়া তাকে হজরত হুসাইন (রা.) এর হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য পাঠিয়েছে। ঐতিহাসিকদের মতে মুহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়া সে বিষয়ে জানতেনই না। যাই হোক মুখতার ছাকাফির ভূমিকায় হজরত হুসাইন (রা.) এর হত্যাকারীরা সমূলে নিহত হয় বা রাতের অন্ধকারে এখানে সেখানে পালিয়ে জীবন রক্ষা করে। যার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নে দেয়া হলো।

হজরত হুসাইন (রা.) এর শাহাদাতের পেছনে মুখ্যভূমিকা ছিল উবাইদুল্লাহ ইবনে জিয়াদের। মুখতার ছাকাফি কূফায় প্রভাব বিস্তারের পর রাতের অন্ধকারে সে পালিয়ে যায়। কিন্তু ৬৭ হিজরিতে কূফা পুনরুদ্ধারের জন্য অভিযান চালায়। প্রথমে মাওসিল নগরি দখল করে। তখন মুখতার, ইবরাহিম ইবনে আশতারকে পাঠায় ইবনে জিয়াদকে প্রতিরোধ করার জন্য। খাজার নদীর তীরে ইবরাহিম ওর সঙ্গে তুমুল লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। যুদ্ধ সমাপ্তির পর ইবরাহিম বলে গতকাল স্বতন্ত্র একটা ঝাণ্ডার নিচে একজনকে হত্যা করেছি, একটু খুঁজ নিয়ে দেখ তো! দেখা গেলো সেই হচ্ছে ইবনে জিয়াদ। তখন তার মাথা কেটে দেহটাকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হলো। মাথাটা রেখে দেয়া হলো মুখতারকে দেখানোর জন্য। এ প্রসঙ্গে ইবনে আছির একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তিনি লেখেন ‘ইবনে জিয়াদ ও তার সহযোগীদের কল্লা কেটে মুখতার ছাকাফির কাছে পাঠানো হলে সে ওগুলোকে একটা পরিত্যক্ত ভবনে ফেলে রাখে। একটি চিকন সাপ এসে কল্লাগুলোতে ঢুকে পড়ে। আস্তে আস্তে এক পর্যায়ে সাপটি ইবনে জিয়াদের মাথাটাকে পেয়ে যায়। তখন তার নাক দিয়ে ঢুকে মুখ দিয়ে বের হয় আবার মুখ দিয়ে ঢুকে নাক দিয়ে বের হয়। এভাবে কয়েকবার করার পর সাপটি চলে যায়।’ 

হজরত হুসাইন (রা.) এর হত্যায় সরাসরি জড়িত ছিল আমর ইবনে সাদ। ঐতিহাসিক ইবনে আছিরের মতে, একদিন মুখতার ঘোষণা দিল আগামীকাল আমি ওমুক ওমুক গুণে গুণী ব্যক্তিকে হত্যা করব। উপস্থিত সকলে বর্ণনা দ্বারা বুঝে নিলো উদ্দেশ্য হচ্ছে আমর ইবনে সাদ। সংবাদ পেয়ে আমর এক আত্মীয়ের মাধ্যমে মুখতারের কাছে নিরাপত্তা চাইল। মুখতার বলল নিরাপত্তা দিব, শর্ত হচ্ছে কোনো ‘হদছ’ করতে পারবে না। ‘হদছ’ আরবি শব্দ। এর অর্থ হচ্ছে কোনো অঘটন ঘটানো, পেশাব পায়খানা করা। মুখতারের উদ্দেশ্য হচ্ছে দ্বিতীয়টি। এরপর টয়লেটে যখন যায় তখন গোলাম তাকে শর্তের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং মুখতারকেও সে সংবাদ দেয়। মুখতার তাকে হত্যার জন্য আবু আমারা নামে এক ব্যক্তিকে পাঠায়। সে আমরকে গিয়ে বলে আমীর তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছে। সে উঠতে গিয়ে জুব্বার সঙ্গে জড়িয়ে যায় এবং পড়ে যায়। তখন আবু আমারা তাকে হত্যা করে মাথাটা মুখতারের নিকট নিয়ে আসে। আমরের ছেলে বাপের মাথা দেখে বলে ওঠে তাহলে আমার বেঁচে থাকার স্বার্থকতা কোথায়? মুখতার তাকেও হত্যা করার নির্দেশ দেয়। তখন মুখতারের বক্তব্য ছিল আমরকে হুসাইন (রা.) ও তার ছেলেকে হুসাইন (রা.) এর ছেলের বদলায় হত্যা করা হয়েছে। তারপর মাথা দুটিকে মুহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়ার দরবারে পাঠায়।’  

হজরত হুসাইন (রা.) এর হত্যার পিছনে দ্বিতীয় ভূমিকা ছিল সীমারের। তাকে হত্যার পর দেহকে কুকুর দিয়ে খেতে দেয়া হয়। ইবনুল আছিরের বর্ণনা হচ্ছে ‘ সীমার পালিয়ে এসে এক জায়গায় আশ্রয় নেয়। সাথীরা বলে আমাদের এখানে ভয় হচ্ছে এখান থেকে চলে যাওয়া উচিত। সীমার বলে আল্লাহ ভয় দিয়ে তোমাদের ভেতর ভরে দিক, আমি এখানে তিন দিন অবস্থান করব। এরপর যখন তারা ঘুমিয়ে পড়ে হঠাৎ আওয়াজ শুনতে পায়। সীমারের সাথীরা তাকে রেখে পালিয়ে যায়। সীমার বর্শা দিয়ে প্রতিহত করার প্রস্তুতি নেয় কিন্তু তাকে সে সুযোগ না দিয়েই হত্যা করা হয়। এবং তার দেহটাকে কুকুরের জন্য ফেলে রাখা হয়।’ অন্যরাও যারা হুসাইন (রা.) এর শাহাদাতে অংশগ্রহণ করেছিল কাউকে মেরে আগুন দিয়ে পুড়ে ফেলা হয়। কেউ কেউ রাতের আধারে পালিয়ে জীবন রক্ষা করতে সক্ষম হয়। কিন্তু অদ্যাবধি কেউ জানে না পালিয়ে যাওয়াদের কারো কারো শেষ পরিণতি কী হয়েছিল।
 
এখান থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া দরকার, জুলুমের পরিণতি কখনো ভাল হয় না। ন্যায়ের পরাজয় সাময়িক কিন্তু যুগের পর যুগ তা মানুষের মাঝে চেতনার বাতিঘর হয়ে থাকে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে