Alexa যে দশ কারণে দিল্লির মসনদে ফের মোদি

যে দশ কারণে দিল্লির মসনদে ফের মোদি

প্রকাশিত: ১৪:৩৩ ২৩ মে ২০১৯   আপডেট: ১৪:৩৩ ২৩ মে ২০১৯

কবি হিসেবেই পরিচিতি অমিত গোস্বামীর। তবে উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও বেশ সুনাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এই লেখকের। পেশায় সাংবাদিক। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই ভারতে। তবে বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে বিশেষ টান। বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে উপন্যাস লিখে এরইমধ্যে সাড়া ফেলেছেন।

বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ফিরলেন নরেন্দ্র মোদি। দেশজুড়ে ঝড় তুলে সব আশঙ্কা নস্যাৎ করে দিয়ে রাজকীয় কামব্যাক। প্রত্যাশার গণ্ডি ভেঙে এই ফিরে আসা তার সমর্থকদের কাছে তাকে লার্জার দ্যান লাইফ করে তুলল।

এই ফলাফল হতবাক করে দিয়েছে বিরোধীদের। তারা ভেবে চলেছে মূর্খ-দরিদ্র-ব্রাহ্মণ-চণ্ডাল ভারতবাসী তাদের এমন ডোবান ডোবালো! মুখে বলছে – জনগণের রায় মাথা পেতে নিলাম। সত্যি সত্যি কি অন্য কিছু হওয়ার ছিল? এককথায় – না, ছিল না। বিরোধীরা কেন যে নিজেদের ভুল সনাক্ত করে ঐক্যবদ্ধ না হয়ে আলাদা আলাদা এবং পরস্পরের বিরুদ্ধে ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন, তা তারাই জানেন। হয়ত তাদের ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ছাতির জোশ মালুম ছিল না। নয়ত তাদের পারস্পরিক বিশ্বাস এতটাই কম ছিল যে তারা তৃতীয় পক্ষ নামক অলীক প্ল্যাটফর্ম গঠনের মতলবে ছিলেন। কিন্তু বাতাসে বিপদের গন্ধ পেয়েছিলেন দুজন– একজন নীতিশ কুমার ও অন্যজন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাই নীতিশ প্রথমে গাঁইগুঁই করলেও এনডিএ’তে ভিড়ে যেতে খুব একটা সময় নেননি। কিন্তু মমতা মুসলিম ভোটের কারনে প্রথম থেকেই অবস্থান নিয়েছিলেন পয়েন্ট অব নো রিটার্ন-এ। ভোট প্রচারে প্রতিটি কেন্দ্রে গেছেন এবং সরাসরি একটা ধারনা দিয়েছিলেন যে এই যুদ্ধ মোদি বনাম দিদি। যা কলকাতা বাদে সব জায়গায় ধর্মীয় মেরুকরন ত্বরান্বিত করেছে।

বিজেপি’র বিরুদ্ধে অভিযোগ কম ছিল না। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল বিজেপি। বেশ কিছু প্রতিশ্রুতিপালনে ব্যর্থ ছিল বিজেপি। নোটবন্দীর জন্যে মানুষের হয়রানির জন্যে দায়ী করা হয়েছিল বিজেপিকে, কর্মসৃষ্টিতে ব্যর্থতার জন্যে দায়ী করা হয়েছিল বিজেপিকে। তবু কেন এই মোদি ঝড়?

প্রথমত, বিজেপিকে রোখার জন্য বিরোধীদের যেভাবে সর্বত্র জোটবদ্ধ হওয়ার দরকার ছিল, তাতে তারা ব্যর্থ। সেই সুযোগ পুরোপুরি নিয়েছে বিজেপি।

দ্বিতীয়ত, পুলওয়ামা-বালাকোট-পাকিস্তানকে কেন্দ্র করে মোদি প্রচার পর্বে দেশের নিরাপত্তাকে যেভাবে তুলে ধরেছেন, মানুষ তাতে প্রভাবিত হয়েছে।

তৃতীয়ত, ভারতবাসী আর মিলিজুলি সরকারের পক্ষে মত দিতে প্রস্তুত নয়। ১৯৭৭ সালে জনতা পার্টি বিপুল ভোটে জিতলেও মোরারজি দেশাই পাঁচ বছর  ক্ষমতায় টিকতে পারেননি। মাত্র দু’বছর ছিল সরকারের মেয়াদ। এরপর চৌধুরী চরণ সিং প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। মাত্র ১৭১ দিনে সেই সরকারের পতন হয়। বফর্স কেলেঙ্কারির ইস্যু তুলে ১৯৮৯ সালে ক্ষমতায় আসেন ভি পি সিং। কিন্তু তার সরকার এক বছরও পূর্ণ করতে পারেনি। পরে চন্দ্রশেখরের সরকার  টিকেছিল আরো কম সময়। তাই মানুষ শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষপাতী।

চতুর্থত, ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’ স্লোগান ভালভাবে নেয়নি ভারতবাসী। দেশের প্রধানমন্ত্রীকে ‘চোর’ কেন ও কিসের ভিত্তিতে বলা হল তা মানুষের বোধের বাইরে ছিল। এর আগে বোফর্স ইস্যুতে রাজীব গান্ধীকে বিরোধীদের অন্যায়ভাবে ‘চোর’ বলাটা মনে রেখেছে তারা।

পঞ্চমত, বিকল্প দল বা নেতৃত্বের অভাব বিজেপিকে প্রথম থেকেই এগিয়ে রেখেছে। রাহুল গান্ধীকে নির্ভরযোগ্য নেতা বলে আজও স্বীকৃতি দেয়নি ভারত। বাকিরাও তথৈবচ এবং আঞ্চলিক স্তরে সীমাবদ্ধ।

ষষ্ঠত, জাতপাতের অঙ্ক মেলানো ও মুসলমান ভোট টানতে সক্ষম হওয়া। বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ যে দক্ষতায় আরো ২৮ টি ছোট বড় দলের সঙ্গে গাঁঠছড়া বেঁধেছেন তা তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেয়। বিশেষত বিহার ও উত্তর প্রদেশে। একইভাবে লক্ষণউয়ের শিয়া সম্প্রদায় বিজেপিকে বিনা শর্তে সমর্থন করেছে। এদিকে ‘তিন তালাক’ বিল পাস করানোয় মুসলমান নারীদের একটি বড় অংশের ভোট গেছে বিজেপি’র ঝুলিতে।

সপ্তমত, হিন্দুত্বের তাস। বিজেপি ধর্মীয় মেরুকরন করতে সক্ষম হয়েছে সীমান্ত এলাকায়। বিরোধীদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত মুসলিম তোষনের অভিযোগ অনেক হিন্দুকে বিজেপিমুখী করেছে। তাদের ইস্তাহারে পরিস্কার উল্লেখ করা আছে সব পক্ষের সহমতে রামমন্দির নির্মাণ, জম্মু-কাশ্মীরে সংবিধানে ৩৭০ ধারা বিলোপ করা হবে যা হিন্দুদের মনে যথেষ্ঠ রেখাপাত করেছে।

অষ্টমত, বিজেপিকে মানুষ আরেকটি সুযোগ দেয়ার পক্ষপাতী। একটা কথা মানুষের মনে গেঁথে গেছে যে বিজেপি ভুল করুক আর ঠিক করুক, কিছু তো করার চেষ্টা করেছে। বাংলায় যদিও বিজেপি করতে পারেনি, কিন্তু বাংলার বাইরে বাড়ি ও শৌচাগার তৈরির জন্যে টাকা সরাসরি মানুষের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পৌঁছেছে। এরকম বেশ কিছু কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্প বেশ কিছু রাজ্যে সাফল্যের সঙ্গে প্রয়োগ করা সম্ভব হয়েছে।

নবমত, বিরোধীদের সাংগঠনিক দুর্বলতা। কংগ্রেস ক্রমেই সাইনবোর্ড সর্বস্ব দলে পরিণত হয়েছে। গত পাঁচ বছরে এই দলটি ড্রয়িং রুম ফ্রেন্ডস’দের দলে পরিণত হয়েছে। আন্দোলন কোথায়? প্রতিবাদ কোথায়? জাতপাত অঙ্কের রাজ্য উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেসের সাংগঠনিক দুর্বলতা প্রকট হয়েছে। শেষ মুহূর্তে প্রিয়ঙ্কাকে নামানোর চমক কখনো বুথভিত্তিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে না। এখানেই মার খেয়েছে কংগ্রেস।  

এবং শেষত, প্রথম থেকেই স্পষ্টভাবে ভাবী প্রধানমন্ত্রীর নাম উল্লেখ করে নির্বাচনে নামা। বিরোধীদের এই ব্যাপারে দ্বিধা দ্বন্দ্ব ভোটারদের বিজেপিমুখী করেছে। কে প্রধানমন্ত্রী হবে তা না জেনে কেন মানুষ ভোট দেবে?

পশ্চিমবঙ্গে অশনি’র কালো মেঘ যে ঘনিয়ে আসছে তা সবচেয়ে ভালো বুঝেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কারন তিনি বুঝেছিলেন যে পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় মেরুকরনের সূত্রপাত আগেই হয়েছে। বিজেপি সফলভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মুসলিম তোষনের প্রতীক হিসেবে জনমানসে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে। তার ফলশ্রুতি ভোট শতাংশের হিসেবে গতবারের ১৭ শতাংশ থেকে বিজেপি প্রায় ৪০ শতাংশ ছুঁতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু শতাংশের হিসেবে তৃণমূলের ভোট কমেনি, বরং বেড়েছে। তাহলে বিজেপি’র ভোট বাড়ল কী করে? বাম ও কংগ্রেসের বেশিরভাগ ভোট ও কিছু বিক্ষুব্ধ তৃণমূলের ভোট বিজেপি’র পক্ষে গেছে। অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসেবে বিজেপি’র উত্থান ঘটল যারা কেন্দ্রীয় সরকারের সাহায্যে ও নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তিতে ভবিষ্যতে তৃণমূলকে গ্রাস করতে উদ্যত। কিন্তু বিজেপি’র এই উত্থানের কারণ কী? এই প্রসঙ্গে কয়েকটি কারন চট করে সামনে চলে আসবে।

১. ধর্মীয় মেরুকরন
তৃণমূলের অভিযোগ, ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে বিজেপি সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করে। হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ ও তার রাজনৈতিক সহযোগী বিজেপির প্রধান কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ। কিন্তু বাস্তব চিত্র এই যে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি তো সবদলই করছে। তৃণমূল বেশভূষা থেকে ইমাম ভাতা, মুয়াজ্জিম ভাতা চালু করে যে মুসলিম তোষণের রাজনীতি করেছে সেটা মুসলিমরাও স্বীকার করেন। সেই জন্যে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে হিন্দুত্বের প্রবক্তা বিজেপি’র পক্ষাবলম্বন করছে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।

২. শক্তিশালী বিরোধী শক্তি হিসেবে আবির্ভাব
বাম ও কংগ্রেস নেতা-কর্মী-বিধায়করা গত কয়েক বছরে দলে দলে তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। তাই বাম ও কংগ্রেসকে টপকে চতুর্থ থেকে দ্বিতীয় শক্তির দিকে উত্থান হচ্ছে বিজেপির। একটা কথা সত্যি যে বাম ও কংগ্রেস কর্মীরা যখন বারেবারে তৃণমূলের সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে তখন তাদের বাঁচানোর জন্যে আইনরক্ষকরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, পাশে দাঁড়িয়েছে বিজেপি। অতএব তৃণমূল বিরোধীদের জমায়েত হয়েছে বিজেপি’র পতাকার নিচে।

৩. তৃণমূলের নিচুতলায় দুর্নীতি
শাসক দলের তাবড় নেতা-মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে বেআইনি অর্থলগ্নি সংস্থার মাধ্যমে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। নারদ তদন্তে গোপন ক্যামেরায় টাকা নিতে দেখা গিয়েছে অনেককে। এই বিচারাধীন মামলাগুলির থেকে তৃণমূলের বেশি মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছে পঞ্চায়েত স্তরে দুর্নীতি ও উৎকোচ। নিচুতলার তৃণমূল কর্মীরা বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধা দিতে গ্রামবাসীদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছেন বলে অভিযোগ। স্কুল-কলেজে ভর্তি থেকে পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে টাকা নেওয়া হচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে উদ্ধত আচরণ, দুর্ব্যবহার। এই ব্যাপারগুলি যাচ্ছে বিজেপি’র বিরুদ্ধে।  

৪. সাংবাদিক কেনে তৃণমূল?
কেন্দ্রে সরকারে আগ্রাসী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি পশ্চিমবঙ্গে প্রচারে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তৃণমূল নেত্রীর সঙ্গে সরাসরি তার দ্বৈরথ। শাসক দলের সঙ্গে বিজেপি কর্মীদের সংঘাত হচ্ছে চতুর্দিকে। অথচ সংবাদমাধ্যম প্রচার করে চলেছে যত দোষ ওই বিজেপি। এর সাম্প্রতিকতম উদাহরণ অমিত শাহ’র রোড শো ও বিদ্যাসাগরের মুর্তি ভাঙা। দোষী কে – জনগণ কি বোঝেনি?

৫. গণতান্ত্রিক পরিসরের সঙ্কোচন
বিরোধীরা অহরহ অভিযোগ তোলে পশ্চিমবঙ্গে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছে। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, বিরোধী কন্ঠের স্বর ক্রমশঃ সঙ্কুচিত হয়ে আসছে তৃণমূলের আমলে। এর প্রতিবাদে কবি শঙ্খ ঘোষ লিখেছেন, ‘দেখ খুলে তোর তিন নয়ন/ রাস্তা জুড়ে খড়গ হাতে/ দাঁড়িয়ে আছে উন্নয়ন।' এই মন্তব্যকে চূড়ান্ত শ্লেষসহ আক্রমণ করেছে তৃণমূলের তৃতীয় শ্রেণির এক আদুরে নেতা। কবির সঙ্গে এই ব্যবহার সাংস্কৃতিক বাঙালি ভালো চোখে নেয়নি। এই পরিস্থিতিতে অনেকে বিজেপির হাত ধরছেন।

৬. প্রার্থী নির্বাচন
তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী তালিকা সাধারনের মনে ক্ষোভ ও কৌতুকের সৃষ্টি করেছে। পাঁচ জন ফিল্মি তারকা যাদের মধ্যে একজনেরও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নেই। অথচ একজন কবি-সাহিত্যিক প্রার্থীপদ পাননি যারা দলের সাংস্কৃতিক মুখ। বিভিন্ন কেন্দ্রে চাপিয়ে দেওয়া প্রার্থী খুব ভাল ভাবে নেয়নি মানুষ। এটাও তাদের বিপক্ষে গেছে।

নির্বাচনের ফলের প্রবণতা দেখে সোশাল মিডিয়াতে একজন লিখেছেন – দেশ জুড়ে ডুগডুগ শব্দ, ডুগডুগি বাজছে বাংলা জুড়ে। স্পষ্টতই বিজেপি’র জয়ের ফলে এই উচ্ছ্বাস প্রকাশ। কিন্তু অজান্তে একটা ভয়ংকর সত্যি কথা লেখক বলে ফেলেছেন। তা হল চড়াম চড়াম ঢাক পাঁচনের বাংলায় ডুগডুগি বাজানোর দলও এসে গেছে। কাজেই একতরফা বাজনা শুনে ঘরে ফিরে চোখের জল ফেলার দিন শেষ। তবে দুপক্ষের নেতানেত্রীদের মনে রাখতে হবে যে অশান্তি আর বাংলা মেনে নেবে না। কাজেই শান্তির বাতাবরন রাখার দায়িত্ব তাদের। না হলে ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর