Alexa যে কারণে ‘সুদ’ হারাম

যে কারণে ‘সুদ’ হারাম

প্রিয়ম হাসান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২০:৩৫ ১৯ অক্টোবর ২০১৯  

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

সুদ কী? কেন সুদকে হারাম করা হলো- এসব বিষয় যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে হলে প্রথমেই এ বিষয়ে আল-কোরআনে কী বলে তা জানা দরকার।

আল-কোরআনে সুদকে বলা হয়েছে রিবা। আল-কোরআনের চারটি সূরার মোট ১৫টি আয়াতকে রিবা সংক্রান্ত আয়াত বলা হয়। নাজিলের ক্রমিক ধারা অনুসারে সূরার নাম ও আয়াত নম্বরগুলো হচ্ছে:

(১) সূরা: রূম, ৩৯;

(২) সূরা: নিসা, ১৬০-১৬১;

(৩) সূরা: আলে ইমরান, ১৩০-১৩৪ এবং

(৪) সূরা: বাকারাহ, ২৭৫-২৮১;

এসব আয়াতে ‘রিবা’ শব্দটির উল্লেখ আছে মোট আট বার। সূরা রূমের ৩৯ নম্বর আয়াতে ১ বার, সূরা নিসার ১৬০ আয়াতে ১ বার, সূরা আলে ইমরানের ১৩০ আয়াতে ১ বার এবং সূরা বাকারাহর ২৭৫ আয়াতে ৩ বার, ২৭৬ আয়াতে ১ বার ও ২৭৮ আয়াতে ১ বার।

বস্তূত: আল-কোরআনের দৃষ্টিতে সুদ হচ্ছে পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করা এবং একটি বড় জুলুম; আর আল-কোরআনের লক্ষ্য হচ্ছে মানবসমাজ, তথা ইসলামী রাষ্ট্র থেকে এ জুলুমের অবসান ও নির্মূল করে ক্রয়-বিক্রয়ে পূর্ণ ইনসাফ কায়েম করা। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই আল্লাহ তায়ালা চারটি ধারাবাহিক পর্যায়ে উক্ত আয়াতগুলো নাজিল করেছেন। 

প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায় হচ্ছে শিক্ষা। এই পর্যায়ে আল্লাহ তাঁর বাণী নাজিল করে সুদের বাস্তব ও প্রকৃত চেহারা ও ফলাফল সম্পর্কে শিক্ষা দিয়েছেন। তৃতীয় পর্যায়ে আল্লাহ মুমিনদের সুদ খেতে নিষেধ করে পরিবেশ তৈরি করেছেন। ঈমানদারগণ যাতে সুদ বর্জন করে চলতে পারে সেজন্য তাদের অভ্যাস গড়ে তুলেছেন। আর চতুর্থ বা সর্বশেষ পর্যায়ে আইন নাজিল করে সুদকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ ঘোষণা করেছেন। ফলে ইসলমী রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে সুদী লেনদের আইনত নিষিদ্ধ হয়ে যায় এবং প্রক্রিত পক্ষে সুদ সম্পূর্ণরূপে উচ্ছেদ হয়।

সুদ ইহুদীদের একটা শিল্প:

‘ইহুদী’শব্দের সঙ্গে‘সুদখোর’শব্দটির গভীর সুসম্পর্ক থাকায় সুদখোর শব্দটিকে ইহুদীদের প্রতিশব্দ বলা যায়। কারণ, তারা যে সমাজেই বাস করেছে সেখানেই জঘন্য প্রথা সুদ চালু করেছে। এমনকী এ কর্মে তারা অত্যন্ত পাকা হয়ে ওঠে। ফলে তারা সুদখোর জাতি হিসেবেই কুখ্যাতি লাভ করে। সুদের সঙ্গে ইহুদীদের সম্পর্কের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘বস্তুতঃপূত-পবিত্র বস্তু যা ইহুদীদের জন্য হালাল ছিল তাদের সীমালঙ্ঘন এবং আল্লাহর পথে অনেককে বাধা প্রদান জন্য আমি তা হারাম করে দিয়েছি। এবং তাদের সুদ গ্রহণের জন্যও,যদিও তা তাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং অন্যায় ভাবে লোকদের ধন-সম্পদ গ্রাস করার জন্য। বস্তুত তাদের মধ্যে যারা কাফের তাদের জন্য তৈরি করে রেখেছি বেদনাদায়ক শাস্তি।’

প্রখ্যাত মুফাসিসর ইবনু কাসীর (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আল্লাহ ইহুদীদেরকে সুদ খাওয়া থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। অথচ তারা তা খেয়েই চলেছে, গ্রহণ করেছে, এবং তা খাওয়ার জন্য নানান ফন্দি বের করেছে। এমনকী তারা সুদকে ভক্ষণ করতে বিভিন্ন হালাল প্রথার সঙ্গে তার তুলনা করেছে।

ইহুদীরা তাদের নবীদের (আ.) সঙ্গে বিভিন্ন কৌশলের অবতারণা করেছে। নবীদেরকে ধোঁকা দিয়েছে। আল্লাহ কর্তৃক হারামকৃত সুদকে হালাল করতে তাঁদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। আল্লাহ সুদকে তাদের প্রতি শুধু হারামই করেননি বরং তা থেকে দূরেও থাকতে বলেছেন। সুদকে হালাল করতে ইয়াহুদীরা যে কৌশল অবলম্বন করেছে তা হলো, তারা পরস্পরের মধ্যে সুদী কারবারকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। আর বলতে থাকে যে, আমরা তো নিজেদের মধ্যে সুদী কারবার করি না। কিন্তু ইহুদী ব্যতীত অন্য ধর্মের লোকদের সঙ্গে সুদী লেনদেন কোনো সমস্যা নাই বরং তা জায়েজ আছে। এভাবে তারা হারামকে হালাল বানায়।

ইয়াহুদী ধর্মশাস্ত্র প্রতারণা,মুনাফেকী ও সুদের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনে অনুমতি দেয়। সুতরাং তারা বলে থাকে যে, ধোঁকার মাধ্যমে এবং সুদের মাধ্যমে অর্থ কামাই করা বৈধ। তবে তোমার ইয়াহুদী ভাইয়ের সঙ্গে ক্রয়-বিক্রযের প্রাক্কালে তাকে ধোঁকা দিও না,তার সঙ্গে প্রতারণাও করিও না।

শয়তানও তাদেরকে প্ররোচিত করতে থাকে এবং তাদের সঙ্গে খেলা করতে থাকে। আর এ কারণে তারা মনে করে যে, তাদের স্কলাররা যদি কোনো বিষয়কে হারাম করে থাকে তাহলে তা হারাম। আর যদি কোনো বিষয়কে হালাল করে থাকে তাহলে তা হালাল। যদিও সে বিষয় তাদের ওপর প্রবর্তিত বিধান তাদের আসমানী কিতাব‘তাওরাত, বিরোধী হয়ে থাকে।

১২১৫সালে ক্যাথলিন খ্রীষ্টান চতুর্থ ধর্মীয় কনফারেন্স আয়োজন করে। সে সম্মেলনের প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল সারা ইউরোপ জুড়ে ইহুদীদের সীমালঙ্ঘন ও বাড়াবাড়ির বিষয়টা। কারণ, সেসময় ইহুদীরা সুদ প্রথার মাধ্যমে অন্যান্য সম্প্রদায়ের তুলনায় সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছিল। ফলে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ইয়াহুদীরা অন্যদের তুলনায় শক্তিশালী আর্থিক ভিত গড়ে তুলেছিল। আর এ কারণেই অনৈতিক ও অবৈধ পদ্ধতি সুদ প্রথা রুখতে ইহুদীদের বিরুদ্ধে ওই সময় নানান শক্তিমূলক ব্যবস্থা প্রণয়ন করা হয়।

এরপর ১২৭২সালে ইংল্যান্ডের সম্রাট প্রথম এডওয়ার্ড সিংহাসনে আরোহনের পর ইয়াহুদীদের সুদচর্চা বন্ধ করতে একটি রুল জারি করেন। অতঃপর ১২৭৫ সালে ইহুদীদেরকে কঠিন নিয়মের আওতায় আনতে তিনি সংসদে অনেক কঠোর শর্তযুক্ত একটি প্রস্তাবনা পাশ করে নেন। যার নাম দেন‘রেজুলেশনস ফর দ্যা জিউস’। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, সবখানে সুদখোর ইহুদীদের যে শক্তিশালী সুদী প্রভাব রয়েছে তা প্রতিরোধ করা। শুধু খ্যীষ্টানদের ওপর থেকে তাদের প্রভাব মুক্ত করতে নয় বরং গরীব ইয়াহুদীদের ওপর থেকে সুদখোর ইহুদীদের প্রবাব মুক্ত করতেও ওই নীতি প্রণয়ন করা হয়।

চতুর্দশ শতাব্দীতে ইহুদী সুদখোররা প্রথমবারের মত ‘যিমানুল করর্য’ তথা ঋণের গ্রান্টার হিসেবে স্পেন- সরকার থেকে জনসাধারণ হতে সরাসরি ট্যাক্স আদায় করে সরকারি তহবিলে জমা দিত। এ সময়ে অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে ইহুদী সুদখোররা সবচেয়ে বেশি বর্বরতা ও নিষ্ঠরতার পরিচয় দিয়েছিল। টাকা তুলতে গিয়ে প্রয়োজনে তারা শরীরের মাংস কেটে রেখে দিতে কোনো দ্বিধা বা কার্পণ্যকরত না। এ কারণে ইহুদীদের বিরুদ্ধে প্রজাদের অন্তর চরম বিদ্বেষে ভরে উঠে এবং তাদের মাঝে প্রতিশোধের আগুন জ্বলে ওঠে।

এন্সাইক্লোপিডিয়া ব্রিটেনিকাতে এসেছে যে, চতুর্দশ শতাব্দীটা স্পেনীয় ইহুদীদের নিকট স্বর্ণযুক্ত ছিল। কিন্তু ১৩৯১সালে ফার্নান্দো মেরিটিস নামে খ্যীষ্টান ধর্মযাজকের নৈতিকমূলক বক্তব্য স্পেনের একটা গ্রামে ইহুদী গণহত্যায় বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছিল। সে বক্তব্য ইহুদীদের ওপর গণহত্যা চালাতে নেতৃত্ব দিয়েছিল। আর রাজা কর্তৃক ট্যাক্স আদায়ে ইহুদীদের ব্যবহারের কারণে প্রজারা ইহুদীদেরকে চরমভাবে ঘৃণা করত।

১৮৯১সালে বাসেলে প্রথম ইয়াহুদী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত সময়কালে ইউরোপ সমাজে সুদখোর ইহুদীদের চরিত্র ছিল অত্যন্ত ভয়ংকর ও হিংস্র। বিখ্যাতি ইংলিশ কবি উইলিয়াম সেক্সপিয়র তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্যা মার্চেন্ট অব ভেনিস’(১৫৯৬-১৫৯৯) এ ইহুদী সুদখোর শাইলকের বর্ববর চরিত্র তুলে ধরেছেন। সেখানে সুদখোর ইহুদী শাইলক শর্ত আরোপ করে যে, যদি ঋণগ্রহীতা সময়মতো দেনা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয় তাহলে তাকে তার শরীরের এক পাউন্ড মাংস কেটে নেয়ার অনুমতি দেবে।

ইহুদীদের বিশ্বকে শাসন করার পরিকল্পনা স্বরুপ বিখ্যাত বই (১৯০১ সালে লেখা হয়) ‘The Protocals of the Elders of Zion’ 
যাতে চব্বিশটা প্রোটকল রয়েছে, এর ২০তম অধ্যায়ে বলা হয়েছে যে, ‘ঋণ হচ্ছে সরকার বা কোনো রাষ্ট্রকে দুর্বল করার প্রথম হাতিয়ার। কেননা, ঋণ যখন সর্বদা তার মাথায় বোঝা হয়ে ঝুলতে থাকবে তখন সে আমাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে এহসান বা অনুগ্রহ পেতে হাত বাড়িয়ে দেবে।’

এটা ঋণ বলতে সেই ঋণ নয়,এটা হলো বিদেশি ঋণ যা নাম মাত্র সুদে নেয়া হয়। ধরুন, সুদ ৫% যা বিশ বছরে পরিশোধ করতে হবে। যদি চল্লিশ বছরে পরিশোধ করতে হয় তবে তার দ্বিগণ হারে পরিশোধ করতে হবে। আর যদি ষাট বছরে পরিশোধ করা হয় তাহলে তিনগুণ হারে পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু মূলধন যা ছিল তাই থাকবে।

একুশতম অধ্যায় বলা হয়, ‘আমরা অচিরেই আর্থিক বাজারের পরিবর্তে সরকারি স্টাইলে ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করব। এভাবে সব শিল্প প্রতিষ্ঠান আমাদের অনুগত থাকবে।’

‘ইহুদীদের এ ধরনের বুদ্ধিভিত্তিক বা ষড়যন্ত্রামূলক চাল একটি রাষ্ট্রকে দেউলিয়া বানিয়ে দিয়ে অবশেষে সে রাষ্ট্রের অর্থনীতির চাকাকে ভেঙ্গে দেয়। কেননা, যখনই সে রাষ্ট্র একটা প্রকল্প সমাধান করে এবং ঋণ পরিশোধ করে তখনই আবার নতুন রেটে নতুন সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হয়। এভাবে একটি রাষ্ট্র ইয়াহুদী লাটিমের সঙ্গে ঘুরতে থাকে যা তখনই থেমে যায় যখন রাষ্ট্র ধ্বংস হয়ে যায় এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অবস্থাকে অস্থির করে তোলে।’

আর ইহুদীরা বুদ্ধি করে স্বর্ণধাতুকে মুদ্রার মূল্যবান বানিয়েছে এবং মূল্যের মূলভিক্তি বানিয়েছে। আর ইহুদীদের এই পরিকল্পনা বিশ্বব্যাপী আজ প্রচলিত। বাইশতম অধ্যায়ে বলা হয়, ‘বর্তমান সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী সম্পদ সোনা আমাদের হাতে রযেছে। আর আমরা দুই দিনের মধ্যে বিশ্ববাজার থেকে যে কোনো পরিমাণ স্বর্ণ তুলে নিতে পারি।’

কিন্তু ইহুদীদের বিশ্বের সম্পদ ও স্বর্ণের অধিকারী হয়ে চুড়ান্ত উদ্দেশ্য কি?
ইহুদীরাই এ প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে যে, যতদূর সম্ভব পুরো বিশ্বকে নিজের প্রভাব ও কর্তৃত্বের আওতায় নিয় আসা। ইয়াহুদীদের উক্তি যে, যুগ যুগ ধরে যে স্বর্ণ আমরা জমা করে রেখছি। তা অবশ্যই আমাদেরকে আমাদের মূল লক্ষ পৃথিবীকে শাসন করতে সহযোগিতা করবে।

এজন্যই বিশ্বর ওপর ইহুদীদের নিয়ন্ত্রণ। শক্তিশালী ও বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানা তাদেরই, ব্যাংকগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণে, বিভিন্ন কলকারখানা তাদের নিয়ন্ত্রণে, স্বর্ণ তাদের নিয়ন্ত্রণে এবং সম্পদও তাদের 
হাতে। আর মানুষ তো সম্পদের দাস। সুতরাং মানুষ সম্পদশালীদের দাসে রুপান্তরিত হয়েছে।

হাদিসে এসেছে-প্রখ্যাত সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন,

‘তোমাদের মধ্যে যারা সুদ খায়, সুদ দেয়, সুদের হিসাব লেখে এবং সুদের সাক্ষ্য দেয় তাদের ওপর আল্লাহর লানত এবং এ অপরাধের ক্ষেত্রে সবাই সমান।’ (সহীহ বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী)।

হজরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেন, ‘রিবার গুনাহ সত্তর প্রকার, তার মধ্যে সবচেয়ে কম ভয়ংকরটি হলো একজন লোকের তার আপন মায়ের সঙ্গে ব্যভিচারের সমান।’ (ইবনে মাজাহ, আল বাইহাকি)।

হে আল্লাহ! আমাদের ছোট-বড় ও সন্দেহজনক সকল ধরনের সুদ থেকে দূরে রাখুন। আমিন।

সূত্র: সাপ্তাহিক আরাফাত

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে