যেভাবে কাটছে সমকামীদের জীবন

যেভাবে কাটছে সমকামীদের জীবন

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১০:০৬ ২৬ মে ২০১৯  

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

কেনিয়ার নাইরোবির বাসিন্দা অ্যালেক্সা (ছদ্মনাম) বয়স যখন ১৪, তখন থেকেই তার মনে ছেলে বন্ধুকে ভালো লাগা শুরু হতে থাকে। ওই বন্ধুর নাম জেসি (ছদ্মনাম)। এমন ভালো লাগালাগি চলতে চলতে মাধ্যমিক পরীক্ষাও চলে আসে তাদের সামনে। নয়ন একদিন তার বন্ধুকে জানিয়ে দেন তার ভালো লাগার কথা। কিন্তু তিনি তা উড়িয়ে দেন। তাকে মানসিক ডাক্তার দেখানো হয়। কিন্তু নাছোড়বান্দা অ্যালেক্সা পরীক্ষা শেষে জেসিকে তার জীবনে লাগবে বলে জানিয়ে দেন। এ অবস্থায় জেসি তার বন্ধু থেকে চলে যান আত্মগোপনে। এদিকে অ্যালেক্সা বিষ পান করেন। পরিবারের ত্বরিত পদক্ষেপে সে যাত্রায় বেঁচে যান।

সুস্থ হয়েই আবারো ওই বন্ধুকে খুঁজে বেড়াতে থাকেন অ্যালেক্সা। এরমধ্যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে নিতে গড়ে তোলেন আরেক সমকামীর সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক। পরে আবারো জেসির সঙ্গে যোগাযোগ করতে সামর্থ্য হন তিনি। তবে এবার সফল অ্যালেক্সা। জেসি তার বন্ধু অ্যালেক্সার মতো সমকামিতায় বিশ্বাসী কিংবা আকৃষ্ট না হলেও মেনে নেয় সেই আবদার। কিন্তু সমাজ তাদের সম্পর্ক জানতে পারলে দু'জনকেই বের করে দেয়।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি সম্প্রতি দেশটির সমকামীদের নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, সমকামিতার বিরুদ্ধে কেনিয়ায় মানুষের মনোভাব অত্যন্ত কঠোর।

দেশটির আরেকজন সমকামী মালায়া। তিনি বলেন, প্রথম যেদিন বাবা-মাকে জানালাম, আমি একজন সমকামী, সেদিন থেকেই তারা আমাকে অস্বীকার করতে শুরু করল। আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হলো। পরিবার আমার সঙ্গে পুরোপুরি যোগাযোগ বন্ধ করে দিল। আমার যাওয়ার কোনো জায়গা ছিল না। এমতাবস্থায় বিশাল এক অবসাদের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম আমি। আমার কোনো কোনো বন্ধু আমাকে তাদের বাসায় থাকতে দিতে চাইছিল, কিন্তু তাদের পরিবারের আপত্তির কারণে তারা পারছিল না। অন্য কয়েকজন আমাকে থাকতে সুযোগ করে দিতে চাইছিল, কিন্তু সেজন্য তারা আমাকে তাদের বিছানায় পেতে চাইত।

মালায়া ও অ্যালেক্সার মতো অসংখ্য সমকামী রয়েছে কেনিয়ায়, যাদের জন্য প্রতিদিনকার জীবনযাপন খুব কঠিন হয়ে উঠেছে। দেশটিতে আইনে সমকামিতাকে অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। এ কারণে স্কুল থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লায় তাদের যেমন নানা ধরনের কটু মন্তব্যের শিকার হতে হয়, তেমনি সামাজিকভাবেও অনেক নিগ্রহের মধ্যে পড়েন। কেনিয়ার পুরুষ বা নারী সমকামী, বাইসেক্সুয়াল বা ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের আরো অনেক সদস্যের মতো মালায়াও হাইকোর্টের দিকে অধীর হয়ে তাকিয়ে রয়েছেন, যাতে করে দেশটির সমকামিতা বিষয়ে বিদ্যমান আইনটি বাতিল করা হয়।

সাতাশ বছরের সমকামী যুবক মালায়া নিজেকে ‘নারী’ ভূমিকায় দেখতে ভালোবাসেন। এখন একটি অ্যাডভোকেসি গ্রুপের সঙ্গে কাজ করছেন তিনি। তিনি বলছেন, মানুষের মনোভাব আস্তে আস্তে বদলাচ্ছে। আমার দুই বোন ও এক ভাই রয়েছে। তারা আমার সঙ্গে এখন নিয়মিত কথা বলে। আমার বাবা-মায়ের সঙ্গে একটি ভালো সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করছে আমার বোনরা। কিন্তু আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে বিরূপ প্রতিক্রিয়া আসতে পারে, সেই আশঙ্কায় তারা আমাকে মানতে রাজি হন না। তবে তাদের প্রতি আমার কোনো বিদ্বেষ নেই। আমি শুধু চাই, কোনো একদিন তারা আমাকে মেনে নেবেন।

কেনিয়ায় সমকামিতাকে বৈধতা দেয়ার জন্য বছরের পর বছর সমকামীরা আন্দোলন করছেন। তবে খ্রিষ্টান ও মুসলিম গ্রুপগুলো এর বিরোধিতা করে আসছে। তাদের ভাষ্য, সমকামিতাকে আইনগত বৈধতা দেয়া হলে তা আফ্রিকান সংস্কৃতির বাইরে চলে যাবে। তারা বলছেন, অনেক আফ্রিকান ভাষায় সমকামিতার জন্য কোনো শব্দ পর্যন্ত নেই।

কেনিয়ার একটি এনজিও, ন্যাশনাল গে এন্ড লেসবিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন বলছে, ২০১৪ সাল থেকে শুধুমাত্র তাদের প্রতিষ্ঠান থেকেই ১৫০০ ঘটনায় আইনি সহায়তা দেয়া হয়েছে।

সহিংসতার আশঙ্কায় অনেক সমকামী নারী-পুরুষ দেশ থেকে পালিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোয় আশ্রয় নিয়েছেন, যাদের মধ্যে রয়েছেন কেনেথ মাচারিয়া, যিনি যুক্তরাজ্যে শরণার্থীর আশ্রয় চেয়েছেন। তিনি এখন ‘সমকামীবান্ধব’ ব্রিস্টল বাইসন্স রাগবি দলে খেলেন।

আফ্রিকার অন্যান্য দেশের মতো কেনিয়ায় সমকামীদের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাচ্ছে। কেনিয়ায় এখন অনেক নারী পুরুষ নিজেদের সমকামী পরিচয়ের ব্যাপারে খোলাখুলিভাবে বলেন। কিন্তু তাদের ওপর হামলার বা সহিংসতার সম্ভাবনা এখনো কমেনি।

তুমাইনি (ছদ্মনাম) নামের আরেক সমকামী বলেন, আমি বারবার ভাবি, কোন কাপড় পরব এবং আমি কী করব। অন্য কেউ আমার সম্পর্কে কী ভাববে-এসব। আমি কখনোই জানি না যে, কার সঙ্গে আমি দেখা করতে যাচ্ছি। মানুষজন আমার পেছনে ফিসফাস করে। এটা যদি আমার বন্ধুর ব্যাপারে করে, তাহলে সেটায় আমার আপত্তি আছে। নতুন কোনো স্থানে গেলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেখান থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করি।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে