যেভাবে এক লাখের গরু ১৩ হাজারে বিক্রি হল 

যেভাবে এক লাখের গরু ১৩ হাজারে বিক্রি হল 

নিজস্ব প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৩:০৫ ৩ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১৩:১৪ ৩ আগস্ট ২০২০

সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়লো আবুল হোসেনের গরু কেনার দৃশ্য।  ছবি: সমকাল

সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়লো আবুল হোসেনের গরু কেনার দৃশ্য। ছবি: সমকাল

কোরবানির পশুর হাটে ক্রেতা-বিক্রেতার দর কষাকষি হওয়াটাই স্বাভাবিক। বিক্রেতারা বেশি দাম চেয়ে থাকেন, আর ক্রেতা চান দাম কমাতে। বেশি দামের গরু কমদামে কিনতে পারলে তা হয় ওই ক্রেতার জন্য লাভ আর বেশি কম দামে বিক্রির ফলে ক্ষতি হয় বিক্রেতার।

এবার ঘটলো তেমনই একটি ঘটনা। একদল সঙ্গী নিয়ে গরু কিনতে যান হাজী সাহেব। তার বদলে সঙ্গীরাই বেশিরভাগ কথা বলে। তারা পশু বিক্রেতাকে জানায়, দাম যত বেশিই হোক না কোনো সমস্যা নেই। শুধু হাটের সবচেয়ে ভালো গরুটা তার চাই। আর এই গরুটাই তার পছন্দ হয়েছে। এরপর এক লাখ ১৩ হাজার টাকায় গরু কিনে নেন তারা। নগদ টাকার বান্ডিল তখনই দিয়ে দেন। পিকআপ ভ্যানে গরু তুলে নিয়ে চলে যান। 

এখন পর্যন্ত পুরো বিষয়টি ঠিকঠাকই মনে হলেও মূল ঘটনা ঘটে কিছু সময় পর। ব্যবসায়ী টাকা গুণতে গিয়ে দেখেন, এক হাজার বা ৫০০ টাকার নোটের বদলে সেগুলো কীভাবে যেন ২০, ৫০ আর ১০০ টাকার নোট হয়ে গেছে! গুনতে গুনতেই দেখলেন সব মিলিয়ে মাত্র ১৩ হাজার ৮০০ টাকা!

এমনই অভিনব কায়দায় গরু ব্যবসায়ীদের সর্বস্বান্ত করছিল দুইটি প্রতারক চক্র। অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত ব্যবস্থা নেয় পুলিশ।

শুক্রবার রাজধানীর বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে চক্রের ৩৫ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে একটি পিকআপ ভ্যান, একটি প্রাইভেটকার, এক হাজার টাকার ৫৮টি, ১০০ টাকার ৩২৬টি, ৫০ টাকার ৯০টি ও ১০ টাকার ৪৮৭টি নোট জব্দ করা হয়েছে। এ ঘটনায় বাড্ডা থানায় মামলা হয়েছে।

বাড্ডা থানার ওসি পারভেজ ইসলাম জানান, পশুর হাটে অনেক সময় জাল টাকা দিয়ে প্রতারণার চেষ্টা চালানো হয়। তবে এই চক্র দুটি একেবারেই ভিন্ন কৌশলে তৎপর ছিল। তাদের প্রচুর সংখ্যক সদস্য বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে পশুর হাটে যায়। দলে একজন বয়স্ক মানুষ থাকে, যাকে হাজী সাহেব হিসেবে পরিচয় দেয়া হয়। তাদের সঙ্গে গরু সামলানোর জন্য একজন রাখাল, পরিবহনের জন্য পিকআপ  ভ্যান সবই থাকে। বিক্রেতার চাওয়া দামেই গরু কেনার কথা বলে এবং ধর্মীয় বুলি ছেড়ে তারা একটা আস্থার পরিবেশ তৈরি করে। এরপর ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী টাকাও ঠিকই দেয়। 

তবে হাসিল দেয়ার সময় তাদের একজন বিক্রেতাকে টাকাগুলো লুকিয়ে ফেলতে বলে। কারণ হিসেবে জানায়, তারা দাম কম দেখিয়ে হাসিল কম দেবে। বিক্রেতা তাদের অনুরোধ রাখেন। তারা যখন হাসিল দেয়ার প্রক্রিয়ায় ব্যস্ত তখনই প্রতারক চক্রের একজন ‘হাতসাফাই’ করে ফেলে। মানে বিক্রেতাকে দেওয়া টাকার বান্ডিলগুলো সরিয়ে সেখানে ২০, ৫০ ও ১০০ টাকার বান্ডিল রেখে দেয়।

ওসি জানান, পশু ব্যবসায়ীদের বোকা বানাতে তারা পুরনো নোটগুলো সংগ্রহ করে। কারণ ১০-১৫ বছর আগের ওই নোটগুলো আকারে বড়। সেগুলো এখনকার ৫০০ বা এক হাজার টাকার নোটের প্রায় সমান। সেই সুবিধা নিয়ে চক্রের সদস্যরা বান্ডিলের ওপর ও নিচে একটি করে ৫০০ বা এক হাজার টাকার নোট দিয়ে ভেতরে ২০, ৫০ ও ১০০ টাকার নোট ভরে দেয়। অনেক টাকা দ্রুত গুণতে হয় বলে ব্যবসায়ীরা সাধারণত বান্ডিলের এক কোণা ধরে গুণে থাকেন। ভালো করে যাচাই করার আগে তাদের বোঝার উপায়ই থাকে না যে, ভেতরে কোনো কারসাজি আছে। আবার পুরনো হলেও টাকাগুলো আসল হওয়ায় কোথাও তল্লাশির মুখে পড়লেও তাদের অভিযুক্ত করার সুযোগ থাকে না। 

বাড্ডা থানার এসআই মো. হানিফ জানান, দুটি চক্রের মধ্যে একটির প্রধান ৬২ বছর বয়সী আবুল হোসেন। বেশিরভাগ সময় সে হাজী সাহেব সেজে দলের নেতৃত্ব দেয়। তার চুল-দাঁড়িতে মেহেদী দেয়া। আপাতদৃষ্টিতে তাকে একজন ধার্মিক মানুষ বলেই মনে হয়। এই সুযোগটিই কাজে লাগায় প্রতারকরা। অপর চক্রের দলনেতার নাম বেলায়েত। সে এখনো পলাতক।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরও তারা এ ধরনের প্রতারণা করেছে। এবার শুধু আফতাবনগর হাট থেকেই দুই দিনে আটটি গরু হাতিয়েছে তারা। এসব গরু দ্রুত দূরের কোনো হাটে নিয়ে বাজারদরের চেয়ে সস্তায় বিক্রি করেছে। কারণ তারা সাধারণত ১০ ভাগের এক ভাগ দাম দিয়ে গরু হাতিয়ে নেয়। তাই কমে বিক্রি করলেও তাদের প্রচুর লাভ থাকে।

গ্রেফতারদের একজন নোয়াখালী, একজন খুলনা ও বাকি সবাই মাদারীপুরের বাসিন্দা বলে জানা গেছে।

সূত্র: সমকাল

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএস