মোগল পরিবারের মানবেতর জীবন

মোগল পরিবারের মানবেতর জীবন

ইউনুছ আলী আনন্দ, কুড়িগ্রাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৩:০৫ ৮ জুলাই ২০২০   আপডেট: ১৩:০৯ ৮ জুলাই ২০২০

অসহায় দিনমজুর মোগল হোসেনের বন্যা মোকাবিলায় একটি মাত্র চৌকি ও পলিথিনেই ভরসা

অসহায় দিনমজুর মোগল হোসেনের বন্যা মোকাবিলায় একটি মাত্র চৌকি ও পলিথিনেই ভরসা

ব্রহ্মপুত্র নদ বেষ্টিত কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার অসহায় দিনমজুর মোগল হোসেনের বন্যা মোকাবিলায় একটি মাত্র চৌকি ও পলিথিনেই ভরসা।

বন্যায় উপজেলার চরশৌলমারী ইউপির চর ইটালুকান্দা গ্রামের তার ছোট্র কুটির ডুবে যাওয়ায় ঘরে থাকা একটি চৌকি নিয়েই উচুঁ স্থানে আশ্রয় নেন মোগল। ছোট একটি চরে চৌকি বসিয়ে ও পলিথিনের ছাউনি দিয়ে পরিবার নিয়ে মানবেতর দিন কাটছে তার।

এখনও বসতভিটায় ফেরার সুযোগ হয়নি। পানি কখন শুকিয়ে যাবে। রাস্তা-ঘাট শুকিয়ে গিয়ে বাড়ি ফেরার সুযোগ আসবে এই অপেক্ষায় নদীর দিকে তাকিয়ে আছেন মোগল।

মোগল পরিবারের সাত সদস্যের জন্য দিনে একবার রান্নার ব্যবস্থা হলেও রাতে খাবার জুটছেনা। যে খাবারটি জোগাড় হয় তাও তরকারি ছাড়াই শুধু লবণ মিশিয়ে খেতে হয় তাদের। এরপরও বিশুদ্ধ পানির অভাব তো আছেই। এভাবে ১১ দিন অতিবাহিত হয় তার। এখন তার আর খাবার নেই।

এ অবস্থায় অসহায় মোগলের পরিবারের সাত সদস্যের এই মানবেতর দিন কাটলেও ত্রাণ সহায়তা পর্যাপ্ত পাচ্ছেন না তিনি। এই পরিস্থিতির মাঝে অসহায় মোগল তাকিয়ে আছেন সরকারি সহযোগিতার আশায়।

মোগল হোসেন বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদের চরাঞ্চলে দিনমজুরি করে  দুই ছেলে, তিন মেয়ে ও স্ত্রী মিলে সাত সদস্য নিয়ে সংসার চালাই। পাঁচ বারের নদী ভাঙা মানুষ আমি। নদী ভাঙনের কারণে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছোটাছুটি করাই আমার জীবনের ভাগ্য। নিজের জমি বলে কিছুই নেই। অন্যের ছয় শতাংশ জমিতে বসত ঘর করে বসবাস করছি।

একটি মাত্র চৌকি ও পলিথিন নিয়ে উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন সাত সদস্যের মোগল পরিবার

করোনাভাইরাসের কারণে গত তিন মাস থেকে কাজকর্ম নেই। এর মধ্যে বন্যা আসায় চরম কষ্টে পড়ি। বাড়ি-ঘর ডুবে যাওয়ায় একটি মাত্র চৌকি ও পলিথিন নিয়ে উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছি।

তিনি আরো জানান, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি কমলে খুশি হই ঘরে যেতে। আবার পানি বাড়লে মনটা খারাপ হয়। এভাবে ১১ দিন ধরে পড়ে আছি। খাবার শেষ হওযায় ভীষণ কষ্টে পড়েছি। শিশু ও পরিবার নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটছে।

ঘরের ছাউনি হিসেবে রাতের বেলায় পলিথিন আর দিনের বেলায় খোলা আকাশ। রান্না দিনে একবার তাও আবার বিশুদ্ধ পানির অভাব। মাঝে মাঝে শুধু লবণ মিশিয়ে ভাত খেতে হয়।

মোগল হোসেনের চাওয়া, সরকার তো অনেক মানুষের জন্য অনেক কিছু করছে। আমিও সরকারের সহযেগিতা চাই। কষ্টের এ জীবন থেকে বাঁচতে চাই।

চর শৌলমারী ইউপির মেম্বার শাজাহান আলী জানান, ব্যক্তিগতভাবে অসহায় মানুষদের সহযোগিতা করছি। মোগল মতো অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ানো সবার দায়িত্ব। সরকারি বরাদ্দ পেলে অসহায় মোগলের জন্য সহযোগিতা করবো।   

চর শৌলমারী ইউপি চেয়ারম্যান কেএম ফজলুল হক মন্ডল জানান, বন্যায় ইউপির ২২ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়েছে। মোগলের মতো মানুষদের কষ্ট লাঘবে যতটুকু সম্ভব খোঁজ খবর নিচ্ছি। ইউপি থেকে যথাসম্ভব সহযোগিতা করার চেষ্টা চলছে।

রৌমারী ইউএনও আল ইমরান জানান, বন্যা দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেছি। ডুবে যাওয়া বাড়ি-ঘরের ক্ষয়ক্ষতির সহযোগীতার জন্য তালিকা প্রণয়নের কাজ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কিছু তালিকায় ডিসি বরাবর পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে বন্যাদুর্গতরা সহায়তা পাবে।

কুড়িগ্রাম জেলা ত্রাণ অফিসের সর্বশেষ তথ্যমতে, এবারের বন্যায় ১৬ নদনদী বেষ্টিত কুড়িগ্রামের নয়টি উপজেলার নদ-নদী তীরবর্তী ৫৬ টি ইউপি প্লাবিত হয়েছে।

পানিবন্দী হয়ে পড়েছে লাখো মানুষ। এতে ফসলি জমি ক্ষতি হয় ৯ হাজার ৬০০ হেক্টর। সড়ক ভেঙে গেছে ৩৭ কিলোমিটার। বাঁধ ভেঙে গেছে ২৯ কিলোমিটার।

নদ-নদীর পানি কমা-বাড়ার কারণে নিম্নাঞ্চলের অনেক বন্যাকবলিত মানুষ এখনও ঘরে ফিরতে পারেনি। তবে উঁচু স্থানের বসতভিটা আছে এমন বন্যা কবলিতরা নিজ ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকে