মে দিবস: শ্রমজীবীদের জন্য একটি দিন

মে দিবস: শ্রমজীবীদের জন্য একটি দিন

প্রকাশিত: ০০:১৫ ১ মে ২০২০   আপডেট: ০০:২০ ১ মে ২০২০

তরুণ লেখক রনি রেজা। ছাত্রজীবনে দেশের প্রথম সারির দৈনিকগুলোতে লিখতেন ফিচার, প্রবন্ধ, গল্প ও কবিতা। সে থেকেই যোগাযোগ গণমাধ্যমের সঙ্গে। একসময় এই সাহিত্যের গলি বেয়েই ঢুকে পড়েন সাংবাদিকতায়। বর্তমানে ডেইলি বাংলাদেশ-এ কর্মরত। পাশাপাশি অব্যহত রেখেছেন দৈনিক পত্রিকাগুলোয় লেখালেখি। প্রকাশিত গ্রন্থ- গল্পগ্রন্থ ‘এলিয়েনের সঙ্গে আড্ডা’ (২০১৯), শিশুতোষ গল্পগ্রন্থ ‘পাখিবন্ধু’ (২০২০)। স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন ‌‌‘বেহুলাবাংলা বেস্ট সেলার সম্মাননা-২০১৯’।

ইংরেজি মে মাসের প্রথম দিনটি শ্রমিকদের জন্য বরাদ্দ। হ্যাঁ, এই একটি দিনই বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবীদের বন্দনা করা হয়। ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড আর বড় বড় ব্যানারে শোভা পায় শ্রমিকদের অধিকার সংবলিত নানা স্লোগান। মোড়ে মোড়ে, উদ্যানে, অডিটোরিয়ামে হয় সভা-সেমিনার। সেখানে শ্রমিকদের জন্য থাকে নানা প্রতিশ্রুতি। পত্রিকার পাতা ভরে থাকে শ্রমিকদের জীবন-যুদ্ধের গল্প। টেলিভিশনের টক-শো’র প্রসঙ্গও ওই শ্রমিক অধিকার।

বর্তমানে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ভালো ভালো বাণী, স্লোগান ছড়িয়ে থাকে ফেসবুক, টুইটারের উঠোনজুড়ে। ভিন গ্রহের কোনো প্রাণী এলেও বুঝে ফেলবে আজকের দিনটি শ্রমিকদের জন্য। ১৩৪ বছর আগ থেকে চলে আসছে এভাবেই। ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প প্রতিষ্ঠানের শত শত শ্রমিক দিনে ৮ ঘণ্টা কাজ করার দাবি নিয়ে একটি জাতীয় আন্দোলন শুরু করে।

ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স অব দ্য ওয়ার্ল্ডের প্রতিবদনে উল্লেখ আছে, তখনকার সময়ে শ্রমিকেরা দিনে ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করত। শিকাগোর এ প্রতিবাদ কিছুদিন চলমান ছিল এবং মে ৩ এ শিকাগো নদীর উত্তর তীরে অবস্থিত ম্যাককরমিক রিপার ওয়ার্কসের শ্রমিকদের ধর্মঘট পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে রূপ নেয়। এ সংঘর্ষে কিছু শ্রমিক আহত হন, কিছু শ্রমিক নিহত হন। পরের রাতে এ সহিংসতা আরো বেড়ে যায়। শিকাগোর হেমার্কেট স্কয়ারে জমায়েত হওয়া আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ আসলে পুলিশের র‌্যাংকে একটি বোমা নিক্ষেপ করা হয়। এতে সাতজন পুলিশ নিহত হন এবং ৬০ জনের বেশি পুলিশ আহত হন। এরপর পুলিশ জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করলে কিছু শ্রমিক নিহত হন ও ২০০ শ্রমিক আহত হন, টাইমের প্রতিবেদন অনুসারে।

এসব ঘটনার স্মরণে (যা হেমার্কেট অ্যাফেয়ার নামেও পরিচিত) ইন্টারন্যাশনাল সোশালিস্ট কনফারেন্স মে’র ১ তারিখকে শ্রমিকদের জন্য আন্তর্জাতিক ছুটি ঘোষণা করেছে। এসব ইতিহাসের কথা। কিন্তু, বাস্তবতা কী বলে? শ্রমিক অধিকার কি প্রতিষ্ঠা পেয়েছে? কর্ম ঘণ্টা কতক্ষণ হবে? কতক্ষণ কাজ করলে এবং কতটুকু মূল্য পেলে একজন শ্রমিকের জীবন বিকশিত করার সুযোগ সে পাবে? জীবনের চাহিদা বলতে আসলে কী বোঝায়? শ্রমের কাজে নিয়োজিত পশু এবং মানুষের ভূমিকা কী? মূল্য এবং মর্যাদা কিভাবে বিবেচিত হবে? জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য উৎপাদন ও জীবন বিকাশের জন্য সংস্কৃতি নির্মাণে শ্রমের ভূমিকা কী? শ্রমিক কি শুধু প্রয়োজনীয় দ্রব্য উৎপাদনে শ্রম প্রদান করে নাকি সে উৎপাদিত দ্রব্যের ক্রেতাদের এক বিপুল অংশ, লক্ষ-কোটি শ্রমিক পণ্য না কিনলে তা বিক্রি হবে কিভাবে? শ্রমিকের মজুরি উৎপাদিত দ্রব্যের বিপণনে কী ভূমিকা রাখে বা রাখবে? ন্যায্য মজুরি আসলে কত হবে? মুনাফা আসে কোথা থেকে? মুনাফা বৃদ্ধিতে মালিকের তৎপরতা কতো ধরনের? শ্রমিক কেনো মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনে অংশ নেয়? শ্রমিকের জীবন এবং ভবিষ্যৎ শ্রম শক্তি তার সন্তানদের জীবন কেমন হবে? এরকম অসংখ্য প্রশ্ন সামনে রেখে আন্দোলনে সম্মিলিত হয় তখনকার শ্রমিকরা।

এতগুলো বছর পর এসেও যার উত্তর মেলেনি। বরং যুক্ত হয়েছে আরো অনেক প্রশ্ন। বিশ্বের এই দুর্বার এগিয়ে চলা, উন্নতি-অগ্রগতির পরও শ্রমিকের অধিকার কি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? এক কথায় যে কোনো অর্ধ শিক্ষিত, বা স্বশিক্ষিত শ্রমিকই জবাব দিতে পারবে। না। প্রতিষ্ঠা হয়নি। শ্রমের উদ্বৃত্ত মূল্যে গুটিকয়েক মানুষের হাতে পুঞ্জীভূত হয়েছে বিশ্বের সিংহভাগ সম্পদ। তাদের ইচ্ছেমতোই হচ্ছে সবকিছু। বৈষম্যের শিকার হচ্ছে শ্রমিকরা। পাচ্ছে না ন্যায্য মজুরি। এমনকি কর্মেরও নিশ্চয়তা নেই। বঞ্ছনা আর তিরস্কারের ঘটনার কমতি নেই।

পত্রিকার পাতা খুললেই দেখা যায়- শ্রমিক নির্যাতনের খবর দাঁত কেলিয়ে হাসে। কটাক্ষ করে শ্রমিক দিবসের নামের দিনটিকে। যে কোনো সংকটে আজও বেশি ভোগান্তির শিকার হতে হয় এই শ্রমিক শ্রেণিকেই। দেশে-বিদেশে এমন নানা চিত্র কারোই অজানা নয়। চোখ খুললে আমাদেরই আশ-পাশে এমন অসংখ্য উদাহরণ ধরা দেয়। বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো পর্যায়ে আর নেই। এরপরও আশা বেঁচে থাকে- শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য মজুরি বুঝে পাবে। মূল্যায়িত হবে তাদের শ্রম। সার্থক হয়ে উঠবে মে দিবস নামক দিনটি।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআর