Alexa মেঘের বাড়ি মেঘালয়ে ঘোরাঘুরি

মেঘের বাড়ি মেঘালয়ে ঘোরাঘুরি

আসিফ সুফিয়ান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ০৯:৫২ ২২ জুলাই ২০১৯  

ছবি: লেখক

ছবি: লেখক

সবুজে ঘেরা উঁচু পাহাড়, তার বুক চিরে নেমে আসা ঝরনা, খানিকটা ওপরে মেঘেদের ছোটাছুটি। কেউ যেন তাদের কানে কানে শুনিয়ে দিচ্ছে ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা’। পাহাড়, ঝরনা, বৃষ্টিস্নাত সবুজ প্রকৃতি ইত্যাদি মিলে প্রকৃতি যেন আরেক স্বর্গ রচনা করেছে এখানে। বছরে ছয় থেকে সাত মাস মেঘালয় মেঘে ঢাকা থাকে। মেঘেদের খেলাঘর এই রাজ্যটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে এখানে ছুটে আসে। বলছি বাংলাদেশের সিলেটের সীমান্তবর্তী ভারতের মেঘালয়ের কথা।

সিলেট বেড়াতে গিয়ে আমরা অনেকেই আফসোস করি, উঁচু পাহাড়গুলোর পাদদেশে না যেতে পেরে। মন বারবার ছুটে যেতে চায় এসব পাহাড়ের চূড়ায়, জানতে চায় এ রাজ্যটির সম্পর্কে। মেঘালয় রাজ্যটি একটি পাহাড়ি রাজ্য এবং এখানে রয়েছে মন হরণকারী অনেক দর্শনীয় স্থান। নিজের ভ্রমণপিপাসু মনের তৃষ্ণা মেটাতে আমরা ৫ জনের একটি গ্রুপ ঢাকা থেকে সিলেট হয়ে শিলং-চেরাপুঞ্জি-স্নোংপেডেং ঘুরে আসি।

৫ জুলাই রাত ১টায় আরামবাগ থেকে রওনা দিয়ে সকাল ৮ টায় সিলেটের হুমায়ূন রশীদ চত্বরে পৌঁছে যাই। এরপর সময় নষ্ট না করে একটি সিএনজি ঠিক করি তামাবিল বর্ডার বা জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত। ভাড়া ৮০০ টাকা, পৌঁছাতে পৌঁছাতে সকাল ১০টা ৩০ মিনিট বেজে গিয়েছিল। তামাবিল বর্ডার পৌঁছে প্রথমেই ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ করে যাই বিজিবি পোস্টে। সেখান থেকে ভারতে প্রবেশ করি। তারপর শেষ করি ভারতের ইমিগ্রেশনের যাবতীয় কাজ।

জেনে রাখা ভালো, মেঘালয়ে ট্যুর প্লান করলে ৩-৪ জন অথবা ৬-৮ জনের গ্রুপ হলে জনপ্রতি কমপক্ষে ২থেকে ৩ হাজার টাকা বাঁচানো সম্ভব। আমরা পাচঁজন ইমিগ্রেশন অফিস থেকে বের হয়ে দেখলাম বেশ কিছু ছোট গাড়ি (কালো-হলুদ) ও জীপ দাঁড়িয়ে আছে। এদিকে ছোট গাড়িতে (সাদা) ৪ জনের বেশি বসা সম্ভব না, অন্যদিকে দামও বেশি। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম হেঁটে ডাউকি বাজার যাব।

ছবি : লেখক

আগে থেকে জানতাম, জুলাই মাসে এখানে বৃষ্টি হবে। কিন্তু আমরা যখন হাঁটা শুরু করলাম তখন দেখি উল্টো সূর্য আমাদের মাথার ওপর হা করে তাকিয়ে আছে! বাজারে গিয়ে অনেকক্ষন ছোট গাড়ির সন্ধানে ব্যর্থ হয়ে পরে একটি মাহিন্দ্রা জীপের কাছে গেলাম। ড্রাইভারকে আমাদের রুট প্ল্যান শেয়ার করি, ভদ্রলোক আমাদের বলে দিল ৪৫০০ রুপি লাগবে। পরে দরদাম করে ২০০ রুপিতে কমতে পেরেছিলাম! তখন দুপুর ১টা বাজে।

প্রথমে আমরা দুটো ফলস দেখি। খুবই চমৎকার! এমনিতেই অনেক গরম ছিল তার ওপর এত সুন্দর ফলস দেখে মনে হয়েছে ঝরনার সব পানি খেয়ে ফেলি! বরহিল ফলসের কাছে যেতেই দেখি মানুষ পানিতে দাপাদাপি করছে। আমাদেরও মনে হয়েছে এই গরমে গোসল সেরে ফেলি, কিন্তু সময় কম দেখে সেখানে আর দেরি করিনি।

আমাদের পরের গন্তব্য লিভিং রুট ব্রিজ এবং এশিয়ার সবচেয়ে পরিষ্কার গ্রাম মাউলিনং ভিলেজ। প্রথমে লিভিং রুট ব্রিজ দেখতে যাই, বলে রাখা ভালো এই ব্রিজ দেখতে হলে একটু কষ্ট করতে হয়। তাই সেখানে যাওয়ার সময় সঙ্গে পানি রাখা ভালো। কারণ ব্রিজের ওখানে পানি জুস সবই পাওয়া যায়, কিন্তু দাম বেশি। এরপর মাউলিনং –এ যাই। গ্রামটি পরিস্কার, তবে আমার কাছে মনে হয়েছে আমাদের দেশে এর থেকে সুন্দর গ্রাম আছে! তবে সেখানে পিচার/ইনসেক্টিভোরাস প্ল্যান্ট আছে, তা দেখতে ভুলবেন না!

গ্রামটির দেখার মাধ্যমে আমাদের প্রথম দিনের পর্যটন স্পট দেখা শেষ হয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে আমাদের চেরাপুঞ্জি যেতে ২-৩ ঘণ্টা লেগে যাবে, তাই কালক্ষেপন না করে গাড়িতে উঠে পড়ি। গাড়ি আঁকা-বাঁকা রাস্তা দিয়ে হাইওয়েতে উঠে গেলাম, এরই সঙ্গেই আবহাওয়া গরম থেকে ঠাণ্ডা হতে শুরু করল। সেখানকার অনুভূতিটা বলে বোঝানো সম্ভব নয়।

ছবি : লেখক

পরদিন প্রথমে যাই সেভেন সিস্টারস ফলসে, রৌদ্রজ্জ্বল দিন ছিল বলে খুব সুন্দর লাগছিল দেখতে। সেখানে থেকে যাই নোহকালিকাই ফলসে, প্রথম দেখাতেই আমার কাছে মনে হয়েছে কোনো মেয়ে পানি থেকে মাত্র ডুব দিয়ে উঠল এবং তার চুল বেয়ে পানি ঝরছে! এর আশপাশে রেস্তোরাঁ এবং স্যুভিনিয়ার শপ রয়েছে, সেখানে হরেক রকম জিনিস পাওয়া যায়, আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় লেগেছে কমলার মধু। এটি বছরে দু’মাস পাওয়া যায়, প্রতি কেজির দাম দাম ১২০০ রুপি।

এরপরের গন্তব্য ছিল মওসমাই কেভ। টিকিট নিয়ে ঢুকে দেখি কেভের প্রবেশ পথে মানুষ ফটো তুলছে, আরেকটু ভেতর যাওয়ার পর দেখি ভেতরে শ্বাসরোধী ব্যাপার! মানে যতেষ্ট আলো নেই, তার ওপর মানুষ অনেক বেশি। এলিফেন্ট ফলস দেখতে ৬টার আগে যেতে হবে তাই দেরি না করে রওনা হলাম। কিন্তু দেখি বৃষ্টি শুরু হলো, যেতে পথে ডেণ্ঠলেন ফলস নামার কথা ছিল কিন্তু এত বৃষ্টিতে আর বের হইনি।

এলিফেন্ট ফলস যেতে যেতে ৪টা ৩০ বেজে গিয়েছিল। ক্যাটস অ্যান্ড ডগ হচ্ছে কি আর করা ছাতা নিয়ে বের হয়ে গেলাম এলিফেন্ট ফলস দেখতে। এর অনেকগুলো ধাপ আছে কিন্তু এই বৃষ্টির জন্য কিছুই ভালো লাগছিল না। এদিকে আমাদেরকে হোটেলের ব্যবস্থা করতে হবে, তাই আমরা শিলং এর দিকে রওনা হলাম। এখানে বলে রাখি, এদিন আমাদের জীপ ভাড়া লেগেছিল ৩৬০০ টাকা।

শিলং শহর দেখার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু রবিবার ওখানে সাপ্তাহিক ছুটি থাকে। তাছাড়া বৃষ্টির কারণেও বের হইনি। আমরা শিলং বিশ্রাম নিয়েছি।  সেখানকার হোটেলে ওয়াইফাই ভালো ছিল না, সঙ্গে মোবাইলের নেটও ভালো কাজ করেনি।

এরপরে আমরা স্নোংপেডেং-এ যেতে ওই ড্রাইভারকে ফোন দেই। সে আমাদের শিলং থেকে নিয়ে ক্রাংসুরি দেখিয়ে তারপর স্নোংপেডেং নামিয়ে দেবে চার হাজার রুপির বিনিময়ে। আমরা তাতে রাজি হয়ে যাই। পরদিন সকাল বেলা উঠে ভরপেট খেয়ে রওয়ানা হলাম ক্রাংসুরির উদ্দেশ্যে। সেদিনও সকাল থেকে বৃষ্টি, আমরা গাড়িতে করে মনরোম দৃশ্য দেখতে দেখতে গন্তব্য স্থলে চলে গিয়েছি।

ক্রাংসুরিতে চাইলে আপনি রাতে তাবু অথবা হোমস্টেতে থাকতে পারবেন। সেখানে জিপ লাইনিং করা যায়, বর্ষাকালে বন্ধ থাকে বলে আমরা করতে পারিনি। আমরা ট্রেইল ফলো করে দু’পাশের বড়-ছোট গাছ দেখতে দেখতে হালকা বৃষ্টির মধ্যে হাইকিং করে ১৫ মিনিটের মধ্যে ফলসের সামনে চলে যাই। ফলসে পানির স্রোতের আওয়াজ আমরা অনেকদূর থেকেই শুনছিলাম, তা আসলেই ভয়ঙ্কর সুন্দর অনূভুতি।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে

Best Electronics
Best Electronics