মেকআপ ও উঁচু হিলের জুতা পরা যাবে কি? 

প্রশ্নোত্তর

মেকআপ ও উঁচু হিলের জুতা পরা যাবে কি? 

শহীদুল ইসলাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৯:৫৬ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

শিক্ষা-দীক্ষায় গুরুত্বের ক্ষেত্রে ইসলাম নারী-পুরুষের মাঝে কোনো তারতম্য করেনি। তাই নববী যুগ ও তার পরবর্তী সময়ে খ্যাতিমান জ্ঞানীদের তালিকায় অনেক নারীর নামও ছিলো। 

হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবাদের মাঝেও অনেক নারী সাহাবি ছিলেন। আল কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যারা জানে আর যারা জানে না উভয়ে কি সমান?’ (সূরা জুমার-৯)। 

উল্লিখিত আয়াতের মর্ম হলো জ্ঞানী আর মূর্খ সমান নয়। জ্ঞানী নারী-পুরুষ আর মূর্খ নারী-পুরুষের মাঝে পার্থক্য থাকবেই। জ্ঞান ও মূর্খতার কারণে পুরুষের যেমন মর্যাদাগত পার্থক্য হয় তেমনি নারীদের মাঝেও হতে পারে।

মূর্খতা সবার জন্য অভিশাপ, সে নারী-পুরুষ যেই হোক না কেন। ইসলাম সব মানুষকে শিক্ষা-দীক্ষার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে নারীর চেয়ে পুরুষের সক্ষমতা বেশি। তবে শিক্ষা-দীক্ষার কারণে পুরুষের চেয়েও ক্ষেত্র বিশেষ নারীরা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারে। যার বাস্তব দৃষ্টান্ত অতীত ও বর্তমান সমাজে অনেক আছে। সামাজিক অবস্থা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কিছু ব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটে আর সংযোজন ঘটে নতুন কিছু বিষয়ের। জানার পরিধি বিস্তৃত হয়। মুসলমান হিসেবে নতুন নতুন বিষয়গুলোর শরয়ী বিধি-বিধান জানার জরুরত হয়। মুসলমান মা বোনদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু বিধি-বিধান, যা জীবনাচারে পরিবর্তনের কারণে ফিকহে ইসলামিতে নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে; নিম্নে সেগুলো তুলে ধরা হচ্ছে। এগুলো মূলত আরবের বিভিন্ন মূফতিদের ফতোয়া সংকলন থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। আমলের নিয়তে সেগুলোকে জানবো। কাউকে ফতোয়া দেয়ার জন্য নয়।

প্রশ্ন : নারীদের কর্মস্থল কী কী হতে পারে এবং নারীদের বাইরে কর্মের হুকুম কী?

উত্তর : নারীদের কাজের ব্যাপারে কারো কোনো মতবিরোধ নেই। সবাই একমত যে, নারীরা কাজ করতে পারবে। তবে কথা হচ্ছে নারীদের কর্মস্থল নিয়ে, কোথায় তারা কাজ করবে। কর্মস্থলের বিবরণ হচ্ছে- নারীরা ওই কাজগুলো করবে, যা সাধারণত সব নারীরাই স্বামীর ঘরে করে থাকে। যেমন পরিবারের খাবার পাকানো, বাড়ি-ঘর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা এবং নারীর জন্য উপযুক্ত পারিবারিক সব কাজে সহযোগিতা করা ইত্যাদি। নারীদের শিক্ষা কার্যক্রম, ক্রয়-বিক্রয়, শিল্প যেমন: কাপড় বুনা, কাপড়ে রং করা, সূতা তৈরি ও সেলাই ইত্যাদিতে অংশগ্রহণের সুযোগ আছে। তবে শর্ত হচ্ছে, কর্ম সম্পন্ন করতে গিয়ে, শরীয়াহ পরিপন্থি কোনো কাজে লাগা যাবে না। যেমন: পরপুরুষের সঙ্গে নির্জনে কাজ করা বা নারীদের পরপুরুষের সঙ্গে এমনভাবে মিলেমিশে কাজ করা, যা দ্বারা ফেতনার আশংকা তৈরি হয়। অথবা কর্মস্থলে কাজ করা দ্বারা পরিবারের প্রতি দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে পরিবারের সম্মতিতে কাজের লোক নিয়োগ দিলে, যে ব্যক্তি তার কাজগুলো করে দেবে তাহলে বৈধ হবে। (সূত্র : ‘আল লাজনাতুত দায়িমা লিল ইফতা’ সংস্থার মুসলিম নারী সংক্রান্ত ফতোয়া সংকলন ‘ফাতওয়াল মারআতিল মুসলিমা’-৫২৫)।

একই বিষয়ের আরেক প্রশ্নের জবাবে আরবের প্রসিদ্ধ আলেম মুহাম্মাদ বিন সালেহ আল উসাইমিন লেখেন ‘নারীর কর্মস্থল এমন হওয়া চাই, যা নারীর জন্যই নির্দিষ্ট। যেখানে পুরুষের আনাগোনা থাকবে না। পুরুষের জন্য খাস জায়গায় নারীর কাজ করা জায়েজ হবে না।’  বহুদিন যাবত এ দেশের ইসলামি বুদ্ধিজীবী মহল নারীর শিক্ষা, কর্মস্থল আলাদা হওয়ার দাবী করে আসছে। কারণ, এক জায়গায় কাজ করার কারণে নারীরা নিরাপত্তাহীনতা ভোগে। অনেক ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষ সহকর্মী দ্বারা হয়রানির শিকার হন। তারপরও আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে এগুলো সহ্য করেই নারীরা একসঙ্গে কাজ করে যায়। অথচ নারীরা কাজের সুযোগ করে দেয়া যেমন দায়িত্ব তেমনি নিরাপত্তা ও ইজ্জতের হেফাজতের ব্যবস্থা করাও দায়িত্ব। নিরাপত্তা ও শরীয়াহ মেনে কাজ করার সুযোগ তৈরি হলে আরো বেশি সংখ্যক নারী কাজে যোগ দিবে। কর্মস্থল আলাদা হওয়া ছাড়া নিরাপত্তা ও শরীয়াহ মেনে কাজ করার সুযোগ নিশ্চিত করা কখনো সম্ভব নয়।

প্রশ্ন : মার্কেট বা টেইলার্সে পরপুরুষের সঙ্গে নারীদের কথা বলা জায়েজ হবে?

উত্তর : নারীরা, ব্যবসায়ী পরপুরুষের সঙ্গে কথা বলতে পারবে। তবে শর্ত হচ্ছে, প্রয়োজনীয় ও ফেতনামুক্ত কথা হতে হবে। ফেতনার আশংকা না থাকলে প্রয়োজনীয় বিষয়ে নারীরা পরপুরুষের সঙ্গে কথা বলার রীতি ইসলামের শুরুলগ্ন থেকেই চলে আসছে। কিন্তু কথা বলার সময় হাসি-মশকরা হলে, প্রয়োজন ছাড়া কথা হলে বা নরম সুরে বলা, যা দ্বারা শ্রোতার মনে নারীর প্রতি লালসা সৃষ্টি হতে পারে তাহলে কথা বলা নাজায়েজ ও হারাম। আল্লাহ তায়ালা আল কোরআনে বলেন, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তবে তোমরা পরপুরুষের সঙ্গে কোমলভাবে কথা বলো না, অন্যথায় যার মনে রোগ আছে সে লালসায় পড়ে যাবে। আর তোমরা সঙ্গত কথা বলো।’ (সূরা আহযাব-৩২)।

‘সঙ্গত কথা’ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানুষ সাধারণত যে ধরনের কথা বলে এবং প্রয়োজন পরিমাণ হয়। কথা প্রয়োজনের বেশি হলে, কথা বলার সময় চেহারা, বাহু বা হাতের কোনো অংশ পরপুরুষের সামনে প্রকাশ করলে নিষিদ্ধ বিষয়ের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাবে। এর দ্বারা অসামাজিক কর্মকাণ্ড, এমনকি সরাসরি গোনাহে লিপ্ত হওয়ার মতো অপরাধও সংঘটিত হতে পারে। অতএব, আল্লাহভীরু নারীদের জন্য জরুরি হচ্ছে, পরপুরুষের সঙ্গে কোমলভাবে কথা বলা থেকে বিরত থাকা। কখনো মার্কেটে যাওয়ার প্রয়োজন দেখা দিলে পর্দা ও ইসলামের আদব সমূহ মেনে যাওয়া। কথা বলার সময় সঙ্গত কথা বলা, যেখানে অতিরিক্ত কোনো কথা থাকবে না এবং অসামাজিক কর্মকাণ্ডের কারণ হতে পারে এমন কোনো বিষয়ও থাকবে না। (শাইখ সালেহ আল ফাওযান, ‘ ফাতওয়াল মারআতিল মুসলিমা’-৫২৬)।

প্রশ্ন : নখ লম্বা রাখার বিধান কী, চল্লিশ দিনের বেশি নখ রাখার বিধান কী?

উত্তর : নখ লম্বা রাখার উদ্দেশ্য হলো কাফেরদের সঙ্গে সাদৃশ্যতা অবলম্বন করা তাহলে নখ লম্বা রাখা হারাম হবে। কারণ, রাসূল (সা.) এক হাদিসে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি বিধর্মীদের সাদৃশ্যতা অবলম্বন করবে সে তাদের দলভূক্ত হবে।’ আর যদি মনের খাহেশ মিটানোর জন্য হয় তাহলেও এটা মাকরূহ হবে। কেননা নখ লম্বা রাখা মানুষের সৃষ্টিগত স্বভাব ও রাসূল (সা.) এর সুন্নতের পরিপন্থি বিষয়। (শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালেহ আল উসাইমিন, ‘ফাতওয়াল মারআতিল মুসলিমা’-৫০১)।

প্রশ্ন : নারীদের জন্য উঁচু  উঁচু জুতা পরার বিধান কী?

উত্তর : নারীদের উঁচু জুতা পরা উচিত নয় কয়েক কারণে যথা: উঁচু জুতা পরার কারণে পড়ে যাওয়ার আশংকা থাকে। ইসলাম মুসলমানদের নির্দেশ দিয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান থেকে বেঁচে থাকার জন্য। এ বিষয়ের দলীল হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার বাণী ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না।’ (সূরা বাকারা-১৯৫)। তা ছাড়া উঁচু জুতা পরার কারণে নারী যতটুকু লম্বা তারচেয়ে বেশি লম্বা দেখা যায়। এতে করে বিবাহের বিষয়ে পাত্রকে ধোঁকা দেয়ার সুযোগ তৈরি হয়। মানুষের সামনে নিজের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলার প্রবণতা থেকেও অনেকে লম্বা জুতা পরে। ইহাও ইসলামে নিষেধ। (আললাজনাতুদ দায়িমা লিল ইফতা ‘ফাতওয়াল মারআতিল মুসলিমা’-৫০১)। 

কোনো কারণ ছাড়া, স্বাভাবিকভাবে যদি লম্বা জুতা পরা হয় এবং পড়ার কোনো আশংকা না থাকে তাহলে অবৈধ হওয়ার কোনো কারণ দেখা যাচ্ছে না। (তবে এক গবেষণায় দেখা গেছে উঁচু  জুতা পরলে মানুষের বিভিন্ন রোগ হতে পারে। যদি তাই হয় তাহলে তা পরিধান করা নিষেধ হবে)।

প্রশ্ন : নারীদের মেকআপ ও স্টাইল করে চুল কাটা জায়েজ?

উত্তর : সৌন্দর্যের উপকরণ সম্পর্কে আল কোরআনে বলা হয়েছে ‘আপনি বলুন, কে হারাম করেছে আল্লাহর (সৃষ্ট) সৌন্দর্য (এর উপকরণ) কে যা তিনি আপন বান্দাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন, এবং (কে হারাম করেছে) খাওয়ায় পাক পবিত্র দ্রব্যাদি? আপনি বলুন এসব নিয়ামাত দুনিয়ার জীবনে (প্রকৃতপক্ষে) ঈমানদারদের জন্য, কেয়ামতের দিন একমাত্র তাদেরই জন্য। এভাবেই আমি আয়াতসমূহ তাদের জন্য সবিস্তারে বর্ণনা করি, যারা জানে (বুঝে)। (সূরা আ’রাফ ৩২)। আয়াতের মর্ম হলো, আল্লাহর সৃষ্ট সৌন্দর্য ও এর উপকরণ ব্যবহার করতে কোনো সমস্যা নেই।

হজরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) বিবাহের পরদিন রাসূল (সা.) এর দরবারে যখন গেলেন শরীরে তখন হলুদ রং লেগেছিলো। হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী ওই রং স্ত্রীর শরীর থেকে লেগেছিলো। এর দ্বারাও প্রমাণিত হয় সৌন্দর্য বর্ধণের জন্য সাজগোজ করতে কোনো সমস্যা নেই। তবে এই ক্ষেত্রে কয়েকটি শর্তযুক্ত করা হয়েছে।

এক. শরীয়ত যাদের সামনে সৌন্দর্য প্রকাশের অনুমতি দিয়েছে তাদেরকে দেখানোর নিয়তে করা হলে। দুই. এর দ্বারা কাউকে ধোঁকা না দিলে যেমন এমন মেকআপ করা হলো যার দ্বারা তার আসল রং পাল্টে গেলো। তিন. শরীরের যদি ক্ষতি না হয় তাহলে মেকআপ করতে কোনো সমস্যা নেই। (জামিউ আহকামিন নিসা, ৪/৪২৮)।

কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, হে নবী! আপনি ঈমানদার নারীদেরকে বলে দিন, তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভাই, ভাতিজা, ভাগনে, আপন স্ত্রী লোক যারা তাদের মালিকানাধীন, এমন পুরুষ সেবক যাদের (নারীদের সাথে) গরজ নেই ও নারীদের গোপন বিষয় সম্পর্কে অজ্ঞ বালক (এরা) ছাড়া কারো নিকট নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। (সূরা নুর, আয়াত: ৩১)।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ধোঁকা দেয় সে আমার উম্মতের দলভুক্ত নয়। (তিরমিযী শরিফ, হাদিস নম্বর ১৩১৫)।  

নারীরা স্বামীর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য তাদের হাত, ঠোঁট ও গণ্ডদেশ লাল করে, যে সাজ সজ্জা করে তা মূলত সৃষ্টির সঙ্গে কৃত্রিম সৃষ্টির সংমিশ্রণ হয় না। তাই এগুলো অধিকাংশ আলেমের নিকট নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত নয়। ( তাকমিলা ১০/১৬৯)।

সুতরাং এর মাধ্যমে বুঝা যায়, উল্লিখিত শর্ত সাপেক্ষে নারীরা মেকআপ করতে পারবে। তবে যদি সৌন্দর্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে শরীরে উল্কি আঁকে, ভ্রু চিকন করে তাহলে তা বৈধ হবে না। হজরত ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা.) বলেন, আল্লাহ পাক ওই নারীর ওপর লানত দিয়েছেন, যে অন্য নারীর মাথায় কৃত্রিম চুল সংযোজন করে, কিংবা নিজ মাথায় কৃত্রিম চুল সংযোজন করায় এবং যে নিজের শরীরে উল্কি আঁকে কিংবা অন্যকে আঁকিয়ে দিতে বলে। (বোখারী হাদিস নম্বর ৫৯৩৭)।

বর্তমানে নারীদের চুল কাটার স্টাইল কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরুষদের ন্যায়, যা সম্পূর্ণ রুপে হারাম। রাসূল (সা.) বলেন, আল্লাহ লানত করেছেন ওই নারীদের ওপর যারা পুরুষের সাদৃশ্যতা অবলম্বন করে। (বোখারী হাদিস, নম্বর: ৫৬৫৬)। 

তাছাড়া পাশ্চাত্যের অনুকরণে মুসলিম নারীরা এমনটি করে থাকে। যা ইসলামী সংস্কৃতি, সভ্যতা ছেড়ে তাদের সাদৃশ্য অবলম্বন করা। এ ব্যাপারে হাদিসে এসেছে যে, ‘ব্যক্তি যার সাদৃশ্য গ্রহণ করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত (সুনানে আবু দাউদ, ৪০৩১)। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে