Alexa মৃত্যু সনদে স্ট্রোক, প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে মামলা

মৃত্যু সনদে স্ট্রোক, প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে মামলা

সন্তোষ চন্দ্র সূত্রধর, আশুগঞ্জ (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৭:২০ ২১ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ২২:২২ ২১ অক্টোবর ২০১৯

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

স্ট্রোক করে মারা গেলেন মোর্শেদ মিয়া নামে এক ব্যক্তি! কিন্তু প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে তাদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেন তার স্ত্রী নাসমিকা। এ নিয়ে এলাকায় চলছে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া।

স্থানীয়রা জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে পুকুরের ইজারার টাকার ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দের জেরে দুই পক্ষের কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান মোর্শেদ মিয়া। কিন্তু এ ঘটনায় ১১ দিন পর রহস্যজনকভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঁচজনের নাম উল্লেখ ও আরো ৬/৭ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহতের স্ত্রী মোছা. নাসমিকা।

আদালত বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য আশুগঞ্জ থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছে। স্ট্রোকের মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড বলে মামলা দায়ের করায় এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। 

সরেজমিনে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপজেলার যাত্রাপুর গ্রামের বড়তল্লা মৌজার ৭২৮/৭২৯/৭৩২/৭৩৩ দাগের ১৫০ শতাংশ একটি পুকুরের মালিকানায় রয়েছে মোর্শেদ মিয়াসহ আরো অন্তত ২০-২৫ জন অংশীদার। সম্প্রতি পুকুরটির ইজারা নেয়া হাজী কুতুব মিয়ার ইজারার মেয়াদ শেষ হয়। লোকসানে পড়ার কারণে তিনি আর সেটি নিতে আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু এলাকাবাসীর চাপে পড়ে তিনি ছয় লাখ ৮০ হাজার টাকায় আবারো আগামী পাঁচ বছর ছয় মাসের জন্য ইজারা নেন। ইজারা নেয়ার সময় পুকুরের মালিকানায় থাকা একই এলাকার ইসহাক মিয়া, শাহজাহান মিয়া, হাজী কুতুব মিয়া, ধন মিয়া, তাজুল ইসলাম মেম্বার, সুমন ও কামালসহ আরো অনেক অংশীদার উপস্থিত থাকলেও ছিলেন না মোর্শেদ মিয়া।

উপস্থিত সবার সম্মতিক্রমে কুতুব মিয়া, আজাদ মিয়া, কামাল মিয়া ও নুরু মিয়া পুকুরটি ইজারা নেয়। কিন্তু সমস্যা হয় আগে থেকেই পুকুরে থাকা মাছগুলো নিয়ে। তাই সবার সিদ্ধান্ত মোতাবেক আগের মাছগুলো জাল দিয়ে ধরে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ৫ অক্টোবর শনিবার ভোরে আজাদ, কামাল ও নুরু মিয়াসহ আরো ছয়জন জেলে পুকুর থেকে মাছ ধরতে যায়। মোর্শেদ মিয়া পুকুর পাড়ে গিয়ে মাছ ধরার কারণ জানতে চাইলে আজাদসহ সবাই তাকে জানান তারা পুকুরটি ইজারায় নিয়েছেন। এ সময় হঠাৎ করেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন মোর্শেদ মিয়া।

পরে এলাকাবাসী তাকে উদ্ধার করে উপজেলার মেডিল্যাব হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। কিন্তু পরিবারের কোনো লোকেরা ময়নাতদন্ত করতে রাজি হননি। পরে ময়নাতদন্ত কিংবা সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি না করেই লাশ দাফন হয়। 

নিহত মোর্শেদ মিয়ার পারিবারিক অবস্থা বিবেচনা করে এলাকাবাসী কোনো কারণ ছাড়াই সবার পক্ষ থেকে চার লাখ টাকায় বিষয়টি সুরাহা করেন। কিন্তু এতে মোর্শেদ মিয়ার পরিবারের লোকজন আপত্তি জানান। পরে তারা কোনো কারণ ছাড়াই প্রতিবেশী হাজী কুতুব মিয়াকে প্রধান করে পাঁচজনের নাম উল্লেখ ও আরো ৬/৭ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে ১৬ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আদালতে একটি মামলা করেন। আদালত বিষয়টি তদন্ত করে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য আশুগঞ্জ থানার ওসিকে নির্দেশ দেয়। 

এদিকে মোর্শেদ মিয়ার মারা যাওয়ার পাঁচদিন পর ১০ অক্টোবর নিহতের ছেলে মো. কাউছার আলম আশুগঞ্জ সদর ইউপি থেকে একটি মৃত্যুসনদ সংগ্রহ করেন। সেখানে মোর্শেদ মিয়ার মৃত্যুর কারণ হিসেবে স্ট্রোক লেখা হয়। 

এই মামলার ৩ নম্বর স্বাক্ষী মো. কালাম মিয়া জানান, মোর্শেদ মিয়াকে আঘাত করতে আমি কাউকে দেখিনি। তিনি স্ট্রোক করেছিলেন। তাকে আমরা সবাই মিলে আগে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম। তাকে আঘাত করতে দেখিনি। 

এ বিষয়ে বড়তল্লা গ্রামের মোকলেছুর রহমান জানান, আমরা জানি মোর্শেদ মিয়া স্ট্রোক করে মারা গেছেন। কারণ তাকে কেউ কোনো ধরনের আঘাত করেননি। তারপরেও আমরা ওই পরিবারটিকে সহযোগিতা করার জন্য চেষ্টা করেছিলাম। 

আসামিপক্ষের লোকজন জানান, একজন ব্যক্তি স্ট্রোক করে মারা গেলেন কিন্তু রহস্যজনক কারণে আমাদের বিরুদ্ধে আদালতে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। আমরা এ বিষয়ে ন্যায় বিচার কামনা করি। 

মোর্শেদ মিয়ার স্ত্রী মোছা. নাসমিকা জানান, পুকুরের ইজারা নিয়ে দ্বন্দ্বে আমার স্বামীকে বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছেন আজাদ মিয়া। এ সময় আর কেউ সঙ্গে ছিলেন কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, আর কেউ ছিলেন না। 

আশুগঞ্জ থানার এসআই মো. জামাল উদ্দিন জানান, আদালত থেকে একটি আদেশ থানায় আসলে ওসি আমাকে বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য বলেন। আমি সরাসরি বিষয়টি তদন্ত করতে গিয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম মোর্শেদ মিয়া স্ট্রোক করে মারা গেছেন। সমস্যা হল এই মৃত ব্যক্তির কোনো সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করা হয়নি। ময়নাতদন্তও হয়নি। তাই আমরা আদালতের কাছে বিষয়টি তুলে ধরব। সে ক্ষেত্রে আদালতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএম