Alexa মূর্খতার যুগে জ্ঞান চর্চায় রাসূল (সা.) এর অবদান

মূর্খতার যুগে জ্ঞান চর্চায় রাসূল (সা.) এর অবদান

(পর্ব-১)

নুসরাত জাহান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২১:২৪ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আপডেট: ২২:৩৬ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

শিরোনামের কথাটি প্রাচ্যকবি আল্লামা ইকবালের। মানবকুল সরদার, সকল পথের পথিকৃৎ এবং শেষ নবীর (সা.) শিক্ষাদান সংক্রান্ত বিষয়ের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি উক্ত কথাটি উল্লেখ করেছিলেন। 

রাসূল (সা.) এর পুরো জ্ঞানময় ব্যক্তিত্বকে ফুটিয়ে তুলতে এর চেয়ে উত্তম কোনো পূর্ণাঙ্গ বাক্য বোধহয় আর হতে পারে না। ব্যক্তি রাসূল (সা.) নিরক্ষর উপাধিধারী ছিলেন বটে কিন্তু তাঁর গোটা অস্তিত্বই ছিল কোরআন। ফলক ও কলম তো ছিল তাঁর জন্য বিলাসিতা। কারণ জ্ঞানার্জনের জন্য তিনি কখনোই কোনো উপকরণের মুখাপেক্ষি ছিলেন না। উপকরণকে বরং তাঁর অতিরিক্ত সৌন্দর্য স্বরূপ দেয়া হয়েছে। তাঁর পূর্ববর্তী যুগে জ্ঞানার্জনের উপায় ছিলো শ্রুতিনির্ভর। তিনি এসে তাতে একটি ঔজ্জ্বল্য দান করেছেন। তাঁর আগমনের পূর্বে দুনিয়া ছিল মূর্খতার ঘোর আঁধারে নিমজ্জিত। মানবদরদী এ শিক্ষকের শুভাগমনের ফলে সেই মূর্খতার কালো মেঘ কেটে গিয়ে জ্ঞানের সূর্য আলোকিত করতে আরম্ভ করেছে গোটা দুনিয়াকে। তাঁর আগমণপূর্বকালে মানবতা ছিল জাহেলি যুগ থেকে নিত্য পলায়নপর। তিনি এসে দুনিয়াতে শিক্ষার আবির্ভাব ঘটালেন।

মক্কার ‘ফারান’ পাহাড়ের চূড়া থেকে উড্ডয়নরত ইলমের সূর্য যখন চারদিকে ইলম ও মা‘রেফাতের চমক ছড়াতে লাগল, মূর্খতাজনিত অন্ধকার থেকে তখন মানবতার মুক্তি মিলতে থাকে। তাঁর আগমনের পূর্বে মানুষের জীবন চলাচল ছিল যাবতীয় চারিত্রিক ও আত্মিক দোষে দুষ্ট। দমন-পীড়ন ছিল অত্যন্ত ব্যাপক। হত্যা-লুণ্ঠন ছিল ক্রমবর্ধমান। চুরি-ডাকাতি ও দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার ছিল নিত্যাকার ঘটনা। সতী-সম্ভ্রান্ত নারীর বিপদশঙ্কা ছিল সার্বক্ষণিক। মেয়েদের ওপর থেকে সম্ভ্রম ও নিরাপত্তার চাদরকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলা হচ্ছিল বারংবার। মদপান আর জুয়া ছিল ক্ষয়িষ্ণু জীবনের অত্যাবশ্যকীয় অংশ। অথচ কুৎসিত এ আচরণগুলো ছিল মানবতার জন্য ভীষণ ধ্বংসাত্মক ও পীড়াদায়ক। ফলতঃ পুরো মানব সমাজের অস্তিত্বই ছিল ঝুঁকির সম্মুখীন।

এমন পরিস্থিতিতে তাঁর ওপর অবতীর্ণ ওহীর প্রথম শব্দটিই ছিল ‘ইক্বরা’- পড়। যেন ইঙ্গিত করা হল যে, পড়া এবং শিক্ষার অভাবেই চারিত্রিক এ অধঃপতন। সেই সঙ্গে কেয়ামত পর্যন্ত আগত সমগ্র মানবজাতিকে এ কথাও বুঝিয়ে দেয়া হল যে, তোমাদের বিশ্ব মানবতার শেষ নবী মূলত ইলম ও আখলাকেরই নবী। আর তাঁর ওপর অবতীর্ণ হওয়া শেষ আসমানি কিতাবটিও ইলম ও মা‘রেফাতের কিতাব। যার সর্বপ্রথম সবকই হচ্ছে শিক্ষা সংক্রান্ত। সর্বপ্রথম নাজিল হওয়া এ ওহির আয়াতগুলোতে পড়ার কথা এসেছে দু‘বার, শেখানোর কথা এসেছে দু‘বার এবং শিক্ষার উপকরণ কলমের কথা এসেছে একবার। অথচ এ ওহি যখন নাজিল হয়, গোটা আরব তখন শিরক ও মূর্তিপূজায় লিপ্ত। সময়ের দাবি তো ছিল বরং নাজিল হওয়া ওহীতে আল্লাহর একত্ববাদের ব্যাপারে তাগিদ দেয়া হবে। কিন্তু তা না করে বরং পড়ার ব্যাপারে তাগিদ দিয়ে এদিকে ইঙ্গিত দেয়া হলো যে, যাবতীয় এ অধঃপতনের গোড়া একমাত্র মূর্খতা।

মানবজাতির শিক্ষক তথা রাসূল (সা.) এর ওপর অবতীর্ণ কিতাব কোরআনে কারিমে এমনকী0 ‘কলম’ নামে আলাদা একটি সূরাও নাজিল করা হলো। মহান এ কিতাবের একদম শুরুর দিকেই আল্লাহ প্রথম মানব হজরত আদম (আ.) এর পরিচয় উল্লেখ করেছেন এজন্য যে, তাকে নামসমূহের জ্ঞান শেখানো হয়েছিল। এই জ্ঞানের মাধ্যমেই ফেরেশতাদের ওপর তার মাহাত্মকে প্রমাণ করা হয়েছে। নামসমূহের এ জ্ঞানে যখন ফেরেশতাগণ অপারগতা প্রকাশ করল, তখনই তাদেরকে হজরত আদমের সামনে সিজদায় মাথা নত করার হুকুম দেয়া হলো। মানবজাতির মহান শিক্ষক হজরত রাসূলে করিম (সা.) এর ওপর নাজিল হওয়া কিতাবে ইলম ও তৎসংক্রান্ত শব্দ উচ্চারিত হয়েছে ৭৮৫ বার। এ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ নয়। কোরআনে এমনকি ‘ইলম’ শব্দটিকে দ্বীনের অর্থেও ব্যবহার করা হয়েছে। এ কথা বুঝানোর জন্য যে, ইসলাম ধর্ম আসলে সরাসরি জ্ঞানই।

ইলম ও আখলাকের নবীর ওপর নাজিল হওয়া কোরআনুল কারিম স্পষ্ট ঘোষণা করেছে যে, আলেম এবং জাহেল তথা জ্ঞানী ও মূর্খ কখনো এক হতে পারে না। আলো ও আঁধার এবং জীবিত ও মৃত যেমন সমান হতে পারে না। তেমনি জ্ঞানী ব্যক্তি এবং জ্ঞানহীন নিরক্ষর ব্যক্তি কখনো এক হতে পারে না। কোরআনের বক্তব্য হচ্ছে, মুমিনদের মধ্য হতে যারা জ্ঞানী, জ্ঞানহীন সাধারণ মুমিনদের তুলনায় তাদের মর্যাদা বেশি। অনেক নবীর দোয়া কোরআনে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু আখেরি নবী, মানবতার শিক্ষক হজরত রাসূলে আকরাম (সা.)-কে আল্লাহ পাক যে দোয়াটি শিখিয়েছেন তা ছিল এক অনন্য দোয়া। ‘রব্বি যিদনি ইলমা’। তথা হে আমার রব! আপনি আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দিন। মানবতার শিক্ষক হজরত মুহাম্মাদ (সা.) এর এ জ্ঞান বৃদ্ধির দোয়া ও শিক্ষাদানকে কোরআনের ওই আয়াতটির সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায়, যেখানে মানুষকে কোরআন ও হিকমত শেখানোকে তাঁর নবী হিসেবে প্রেরিত হওয়ার মূল উদ্দেশ্য হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে, তিনিই নিরক্ষরদের মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমত। ইতিপূর্বে তারা ছিল ঘোর পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত। (সূরা: আল-জুমআহ, আয়াত: ২)

এমনকী নবী (আ.) নিজেও সদাচারণের পূর্ণাঙ্গতা এবং শিক্ষাদানকে নিজের নবী হিসেবে প্রেরিত হওয়ার মূল উদ্দেশ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমি শিক্ষকরূপে প্রেরিত হয়েছি।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২৯) অন্যত্র তিনি বলেন, আল্লাহপাক আমাকে শিক্ষক এবং সহজ ও সারল্য সৃষ্টিকারীরূপে প্রেরণ করেছেন (সহীহ মুসলিম: ১৪৭৮)

রাসূল (সা.) তো নিজেকে ‘মাদিনাতুল ইলম’ তথা জ্ঞানের শহর উপাধিতেও ভূষিত করেছেন এবং আলী (রা.)-কে বলেছেন সেই শহরের দরজা। তিনি বলেন, আমি জ্ঞানের শহর এবং আলী তার দরজা। নিজের জন্য ‘জ্ঞানের শহর’ উপাধি পছন্দ করেছেন যে নবী, তাঁর কাছে শিক্ষার কী গুরুত্বতা সহজেই অনুমেয়। এটা আরো বেশি বোঝা যায়, তাঁর এ বক্তব্য থেকে যে, তিনি প্রয়োজন পরিমাণ ধর্মীয় জ্ঞানার্জনকে সকল মুসলিম পুরুষ-নারীর জন্য জরুরি আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ইলমে দ্বীন শিক্ষা করা সকল মুসলমানের জন্য ফরজ।

জ্ঞানকে তিনি ‘আলো’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। জ্ঞান অন্বেষী ছাত্রের মর্যাদার ব্যাপারে তিনি বলেন যে, ফেরেশতা তার জন্য নিজের পালক বিছিয়ে দেয়। গোটা সৃষ্টিজীব এমনকী জঙ্গলের বিষাক্ত প্রাণী থেকে নিয়ে শুরু করে সমুদ্রের মাছ পর্যন্ত তার জন্য দোয়া করতে থাকে। তিনি বলেন, যে ছাত্র জ্ঞানার্জনের পথে চলল, সে যেন জান্নাতের পথ বেছে নিল। অন্যত্র বলেন, ইলমের মর্যাদা ইবাদতের চেয়েও বেশি। (মুসনাদে বাযযার)। তিনি এ কথাও বলেছেন যে, মূর্খ ব্যক্তির অধিক ইবাদতের তুলনায় অল্প ইলম বরং বেশি উত্তম। (ত্ববরানি)

একবার হজরত আবু যর (রা.)-কে তিনি বললেন, হে আবু যর, সকাল বেলায় এক হাজার রাকাত নামাজ আদায়ের চেয়ে কোরআনে কারিম থেকে একটি আয়াত শেখা তোমার জন্য অধিক উত্তম। (সুনানে ইবনে মাজাহ)

অধিকাংশ হাদিসের কিতাবেই ইলম সংক্রান্ত পূর্ণ একটি অধ্যায় পাওয়া যাবে। যেমন বুখারি শরিফে ওহী এবং ঈমানের অধ্যায়ের পরপরই ইলমের অধ্যায় শুরু হয়ে গেছে। হাফেজ ইবনে হাজার আসক্বালানি (রহ.) এর বক্তব্য মতে এ অধ্যায়ে ৮৬টি আছে মারফু’ হাদিস এবং ২২টি আছে সাহাবি ও তাবেয়ীদের বর্ণনা। ইলম ও আখলাকের এ নবী একদম প্রথমদিন থেকেই ইলম অন্বেষণের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। ইলমকে তিনি মুমিনের হারানো সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হারানো সম্পদ তাকেই বলা হয়, যা পাওয়ার জন্য মানুষ সারাক্ষণ অস্থির ও পেরেশান থাকে এবং তা লাভের জন্য আলাদা করে চেষ্টা-তদবির চালাতে থাকে। কোনো মহিলার অলঙ্কার হারিয়ে গেলে সে যে পরিমাণ ব্যাকুল ও উদ্বিগ্ন হয়ে যায়; অতঃপর তা পেয়ে গেলে যে অপার্থিব আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে তার অন্তর ইলম অন্বেষণের ব্যাপারেও একজন মুসলিমের ঠিক তেমনই অবস্থা হওয়া উচিত। চলবে...

মাওলানা সাইয়েদ আহমাদ ওমিদ নদভীর কলাম থেকে অনূদিত।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে